শিরোনাম: পরীক্ষায় মুখস্থ করার বোঝা
—–
ড. মুহাম্মদ আকরাম নদভী
অক্সফোর্ড
২২ আগস্ট ২০২৬
কেউ একদিন আমাকে জিজ্ঞেস করল, ‘নদওয়াহ্র পরীক্ষাগুলোর মধ্যে আপনার কাছে সবচেয়ে অপ্রীতিকর বিষয় কোনটি ছিল?’ প্রশ্নটি শুনতে সহজ, কিন্তু আমার পক্ষে উত্তরটা মোটেও সরল ছিল না। সাধারণ ছাত্রকে জিজ্ঞেস করলে সে হয়তো একটু ভেবে বলবে, ‘পরীক্ষাই!’ যে বিষয়টির আগমনেই শিক্ষার্থীর বুকে পাথর নেমে আসে, তার ভেতর থেকে আরও কোনো কষ্টকর দিক আলাদা করা যেন অসুস্থকে জিজ্ঞেস করা—‘রোগে সবচেয়ে যন্ত্রণাদায়ক উপসর্গটি কী ছিল?’
তবুও প্রশ্ন করা হয়েছে বলেই স্মৃতির পুরোনো আলমারি খুললাম। ধুলো ঝাড়লাম, কিছু পুরোনো প্রশ্নপত্র মিলল, কয়েকটি ভুলে যাওয়া বইয়ের পাতা উঁকি দিল, আর শেষে হাতের মুঠোয় এল একটি বিষয়ে—সেই পরীক্ষাপদ্ধতি, যেখানে উপলব্ধির চেয়ে মুখস্থের কদর ছিল বেশি।
যে প্রশ্নগুলোতে চিন্তা করতে হতো, উদ্ধৃতির গভীরে পৌঁছাতে, কোনো সমস্যার বিভিন্ন দিক গাঁথতে, অথবা লিখিয়ে আসলেই কী বলতে চেয়েছেন তা ব্যাখ্যা করতে—সেসব আমাকে ক্লান্ত করত না। সেগুলো আমার কাছে পরীক্ষা কম, বৈজ্ঞানিক সংলাপ বেশি ছিল। এমন প্রশ্ন ছাত্রকে মনের দরজা খুলতে বাধ্য করত, আর সেই সাধনাই আমাকে আনন্দ দিত।
আসল যন্ত্রণা ছিল সেসব প্রশ্ন, যেখানে প্রয়োজন হত কেবল স্মৃতির হাজিরা। প্রশ্ন দেখামাত্র মগজ ভাবত—এর অর্থ কী? স্মৃতি সঙ্গে সঙ্গে বলত—অর্থ পরেই দেখা যাবে, আগে তো বলো দেখি আমি কী কী মুখস্থ রেখেছি!
এ ধরনের প্রশ্নে প্রায়ই মনে হতো, পরীক্ষক যেন জানতে চান না ছাত্র বইটি বুঝেছে কি না; তিনি কেবল তার স্মৃতিভাণ্ডারের তলাশি নিতে চান—পকেটে কত নাম, কত সন, কত শিরোনাম, কত শব্দ জমা আছে।
ইবনে খালদুনের ‘মুকদ্দিমা’ এর মজার উদাহরণ। তাঁকে পড়তে আমি পছন্দ করতাম—চিন্তার বিস্তার, পর্যবেক্ষণের গভীরতা, সমাজের উত্থান-পতনে দূরদৃষ্টি, মানবসভ্যতার বিশ্লেষণ—এসবই কেবল ইতিহাস পড়া নয়, ইতিহাস বোঝার আহ্বান। আসল আকর্ষণ ছিল তাঁর ভাবনা, বিশ্লেষণ, সেই প্রশ্নে—সমাজ কেন জাগে, ক্ষমতাবান হয়, আবার পতিত হয়?
কিন্তু পরীক্ষার দুনিয়ায় এই মহত্ত্ব কখনো সামান্য এক প্রশ্নে নুয়ে পড়ত—ইবন খালদুনের ইতিহাস-কিতাবের পূর্ণ নাম কী?
এই প্রশ্ন ছিল আমার জন্য এক রহস্য। ভাবতাম—ইবন খালদুন জাতির উত্থান-পতনের এসব বিষয় ভেবেছেন, আর আমরা তাঁর বইয়ের নামের উত্থান-পতনে আটকে আছি!
কিন্তু পরীক্ষা আছে বলে নাম মুখস্থ শুরু করলাম। পরীক্ষা ঘনালেই তাঁর চিন্তা-ভাবনা পাশে, নামটাই মূখ্য হয়ে উঠত। আমরা পরস্পরকে জিজ্ঞেস করতাম, ভুলে যেতাম, আবার মুখস্থ করতাম। পরীক্ষাকক্ষের দরজা পর্যন্ত জিহ্বায় ঘুরত সেই দীর্ঘ শিরোনাম। কেউ শেষবার জিজ্ঞেস করত—‘নামটা মনে আছে তো?’—আর আমরা এক নিঃশ্বাসে আওড়াতাম—‘তাজরিয়ানুল ইবর, ওয়া দিওয়ানুল মুব্তাদা ওয়াল খবর ফি আইয়ামিল আরাবি ওয়াল আজামি ওয়াল বারাবির, ওয়ামান আসারাহুম মিন উলুস সুলতানিল আকবর’!
শিরোনাম এত দীর্ঘ যে মনে হতো—ইবন খালদুন বইয়ের নাম রাখেননি, ছাত্রদের জন্য আরেকটা প্রশ্নপত্র বানিয়েছেন! এমন যত্নে মুখস্থ করতাম, যেন বিশ্ব-বৈঠকে আমাদের উন্নতি এর ওপর নির্ভর করছে। পরীক্ষাকক্ষে ঢোকার মিনিটখানেক আগেও জপতাম; মনে হতো, এক অক্ষর ফসকে গেলেই ইবন খালদুনের রূহ এসে জিজ্ঞাসাবাদ করবে!
অবশেষে সেই মুহূর্ত এলো। প্রশ্নপত্রে প্রশ্নটা ছিল। আমরা নাম লিখে দায়িত্ব সেরেছি!
আজ পর্যন্ত কোনো বৈজ্ঞানিক আলোচনায় এই পূর্ণ নাম ব্যবহারের দরকার পড়েনি। আমি এখনো তাকে ‘তারীখে ইবন খালদুন’ বলি—দুনিয়া বোঝে। গুণীজনও বোঝেন, বইও তার পরিচয় হারায় না, ইবন খালদুনও বোধ করি রুষ্ট হতেন না।
অতএব প্রশ্ন—আমরা তা মুখস্থ করেছি কেন?
যদি উদ্দেশ্য বই চিনে রাখা হত, ‘তারীখে ইবন খালদুন’ই যথেষ্ট। যদি বইয়ের সাথে পরিচয় হত, পড়াই শ্রেয়। আর ইবন খালদুনের মেধা-মননের সন্ধান নিলে তাঁর তত্ত্ব-পদ্ধতি নিয়েই আলোচনা করা উচিত ছিল।
আর যদি উদ্দেশ্য কেবল স্মৃতি যাচাই—তবে স্বীকার করতেই হবে, ‘জ্ঞান’-এর নামে আমরা স্মৃতিকে দারুণ ব্যায়াম করিয়েছি!
এখানে সূক্ষ্ম, কিন্তু জরুরি পার্থক্য—মুখস্থ বিদ্যার সেবক হতে পারে; কিন্তু যখন সেটিই জ্ঞান হয়ে বসে, তখন সমস্যা।
স্মৃতি নিজেই মহান নিয়ামত। স্মৃতি না থাকলে জ্ঞানের অনেক অট্টালিকা গড়ে উঠত না। তবে শ্রেষ্ঠত্ব এই নয় যে, যা শোনে তাই হুবহু সঞ্চয় করে; বরং শ্রেষ্ঠত্ব হলো তথ্যকে উপলব্ধি-যোগসূত্র-দূরদৃষ্টিতে বদলে দিতে সাহায্য করা।
নইলে ছাত্রের মনে গড়ে ওঠে অদ্ভুত গ্রন্থাগার—বইয়ের পাহাড়, তাকভর্তি, কিন্তু প্রয়োজনের সময় কোন বই কোথায়, খবর নেই!
আমাদের পরীক্ষায় কখনো এমন কাণ্ডও দেখা যায়—ছাত্রের কাছে বইয়ের চেয়ে বই-সংক্রান্ত তথ্য বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
এ সমস্যা শুধু নদওয়াহ্ নয়। দারস-এ-নিযামি ধারায় এর আরেক, বোধ করি আরও মজার, রূপ দেখা যায়। সেখানে কয়েকটি বই এত যুগ ধরে উপনামে পরিচিত যে আসল নাম, লেখক—সবে আড়ালে: ‘কুত্বী’, ‘শামসিয়াহ্’, ‘সদরা’, ‘মীর