Skip to main content

AkramNadwi

শিরোনাম: সূরা আনকাবুত-সম্পর্কে কিছু ভাবনা —– ড.

শিরোনাম: সূরা আনকাবুত-সম্পর্কে কিছু ভাবনা
—–
ড. মোহাম্মদ আকরম নাদভী
অক্সফোর্ড

সূরাটি শুরু হয়েছে এই প্রশ্ন দিয়ে—“أَحَسِبَ النَّاسُ أَن…”। এখানে ‘ḥasiba’ ক্রিয়াটির অর্থ ‘ভাবা’ কিংবা ‘অনুমান করা’ নয়; বরং এর সঠিক ব্যঞ্জনা ‘হিসেব-নিকেশ করা’, ‘পরিমাপ-পর্যালোচনা করা’। মানুষ যুক্তি-বুদ্ধি খাটিয়ে কোন বিকল্পকে কতটা দামি মনে করবে—এটাই এ শব্দের অন্তর্নিহিত অর্থ। সূরার শুরুতেই স্পষ্ট করে দেওয়া হয়েছে, মানুষের বড় ভুল হিসেব হলো এই ধারণা যে, শুধু মুখে ঈমানের ঘোষণা করলেই তারা নাজাত নিশ্চিত করেছে। বাস্তবতা এমন নয়।

ভুলটি হলো—“আমরা ঈমান এনেছি” বলেই সব দায়-দায়িত্বের সমাপ্তি ধরে নেওয়া, মনে করা যে আর কোন পরিবর্তন আসবে না—চিন্তা-চেতনা, মনের ইরাদা, ব্যক্তিগত খুদে কাজ থেকে বৃহত্তর সামাজিক-অর্থনৈতিক ব্যবস্থার প্রতিটি পর্যায়ে। অথচ ঈমান কেবল মুখের উচ্চারণ কিংবা কিছু আচার-অনুষ্ঠানের পরিচয় নয়; বরং এটি এমন এক জীবনব্যবস্থা-সংকল্প, যা অবিশ্বাসীদের জীবনপদ্ধতি থেকে মৌলিকভাবে আলাদা।

অবিশ্বাসীদের মত আমরাও পৃথিবীতে একই ভৌগলিক-প্রাকৃতিক শর্তের অধীন; ফলে শুদ্ধতা, দক্ষতা, লাভজনকতা, আনন্দ ইত্যাদি ‘সেক্যুলার’ মানদণ্ড আমাদের কাজেও প্রযোজ্য হয়। কিন্তু আমরা যেহেতু আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের প্রতি ঈমানের দাবি করেছি, তাই আরেকটি মানদণ্ড সর্বদা আমাদের ওপর কার্যকর—আমরা কি আল্লাহ ও তাঁর রাসূল নির্দেশিত চিন্তা-কর্মের মানে পৌঁছেছি? পার্থিব মানদণ্ডে কেউ নিশ্চিত হতে পারে যে তার কাজ সফল; বিশ্বাসীদের পক্ষে সে নিশ্চয়তা নেই। আমরা কেবল এতটুকুই জানি—চেষ্টা করেছি; সফল হয়েছি কি না, জানি না। এই অনিশ্চয়তা, আল্লাহর ক্ষমার প্রতিশ্রুতিতে দৃঢ় বিশ্বাসের সাথে মিলে, আমাদের ভিতরে বিনয়, সংযম, সহনশীলতা গড়ে তোলে—নিজের-পরের ব্যাপারে রায় দেওয়ার সময়, পরিকল্পনা-সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময়। আল্লাহ অবশ্যই বিচার করবেন—এ নিশ্চিত জ্ঞান এবং সেই বিচারের ফল সম্পর্কে অনিশ্চয়তা—এই দ্বৈত বোধই আল্লাহকে স্মরণে রাখার, আল্লাহর স্মরণে থাকার, তাঁকে না ভুলে যাওয়ার ও তাঁর কাছে বিস্মৃত না হওয়ার আকাঙ্ক্ষার ভিত্তি। একই সাথে সব মানবিক সম্পর্ক ও প্রাকৃতিক জগতের সাথে লেনদেনে সহমর্মিতা ও মর্যাদাবোধের ভিত্তিও এটিই।

“আমরা আল্লাহ ও রাসূলের প্রতি ঈমান এনেছি” বলা মানে এই স্বীকৃতি যে, আল্লাহই আমাদের ও সমগ্র জগতের স্রষ্টা; তিনি কল্যাণপ্রিয় ও কল্যাণকে ভালোবাসেন; আমাদের শুধু জীবিকা ও বেঁচে থাকার উপকরণই নয়, হিদায়াতও দিয়েছেন—নবী-রাসূল ও আসমানি কিতাবের মাধ্যমে। কিন্তু যারা এই স্বীকৃতির পরীক্ষা-নিরীক্ষা, এর সাথে আসা অধিকার-কর্তব্য মেনে নিতে চায় না—তারা প্রকৃতপক্ষে বলছে, সৃষ্টির পর থেকে আর আল্লাহর প্রয়োজন নেই। যেন তারা বলে, “আপনি আমাদের ও দুনিয়া তৈরি করেছেন—ধন্যবাদ। এবার আমাদের মতো করে চলতে দিন।” এই ভঙ্গির পেছনে ধারণা—আমরা মরণশীল ও সীমিত হলেও আত্মনির্ভর।

এই অনচিত্ত উপলব্ধি—যা সচরাচর উচ্চারিত হয় না—আমাদের দীনকে গভীরভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করে। ঈমানকে আমরা জাতীয় পরিচয়পত্রে লেখা নাম-ঠিকানা, জন্মস্থান, লিঙ্গের মত নিছক তথ্য বানিয়ে ফেলি। অথচ কুরআনের সর্বত্র, বিশেষত এ সূরাতেই, আল্লাহ স্পষ্ট করে দিয়েছেন—তিনি আমাদের ঈমান বিচার করবেন আমাদের শরীর-মনের ওপর এ ঈমান যে ছাপ সৃষ্টি করে, আয়ুর প্রতিটি পর্বে আমাদের শ্রম-চেষ্টার মাধ্যমে। তিনি প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন—শ্রেষ্ঠ চেষ্টা অনুযায়ী বিচার করবেন, বাকিটা মার্জনা করবেন। আমরা সে প্রতিশ্রুতির ওপর নির্ভর করি বটে, তবে কেবল “আমি মুসলিম” ঘোষণায় বা খানিকটা খাওয়া-পরা, পোশাক-পরিচিতিতে মুসলিমি পরিচয় ধরে রাখলেই সে প্রতিশ্রুতি বাস্তব হবে না।

সূরার মধ্যে-মাঝে মাকড়সার জালের নাজুকতার উল্লেখ থেকে এ সূরার নামকরণ। সূরার নামগুলো কুরআনের অবিচ্ছেদ্য ওহি নয়; এগুলো পরবর্তীতে সাংকেতিক সুবিধার জন্য স্থির হয়েছে। তবে যেহেতু ‘মাকড়সা-জাল’ (আয়াত ৪১) সূরার ঠিক মাঝখানে, দুই খণ্ড (১-৪০, ৪২-৬৯) আলাদা-সংযুক্ত করেছে, তাই এ নামের মধ্যেও এক অর্থপূর্ণ ইঙ্গিত রয়েছে।

মাকড়সার জাল ভঙ্গুর—হাত ছোঁয়ালেই ছিন্ন। তবে পাখির বাসা, পিঁপড়ার গহ্বরও ভঙ্গুর; যদি কেবল দুর্বলতা বোঝাতেই হতো, এগুলোও উদাহরণ হতে পারত। মাকড়সার ‘বাইত’ অন্য উপাদান জোগাড় করে নয়; সে নিজের শরীর থেকে সুতো তুলি গেঁথে ঘর বানায়। প্রজাতিভেদে নকশা এক হলেও কোন জালই হুবহু আরেকটার মত নয়; প্রত্যেক জালে জড়িয়ে থাকে মাকড়সা-বিশেষের ব্যক্তিগত পরিশ্রম, তার নির্দিষ্ট পরিবেশ-ইতিহাস। এভাবেই মাকড়সার গৃহ মানুষের “আমি-নির্ভর” বিভ্রমের এক স্পষ্ট রূপক, যা আয়াত ৩৯-এ উল্লিখিত কারুন, ফেরাউন, হামানের মধ্যে বিধ্বংসী রূপে দেখা গেছে।

সমালোচনার লক্ষ্য মাকড়সা নয়; যাবতীয় প্রাণীর মত এটি জীবনসংগ্রামে আল্লাহকে তাসবিহ করে—ওটাই তার ইবাদত। আত্মপ্রশংসা এর কাজ নয়—যেমন ফেরাউন-কারুন-হামানের কাজ ছিল, যাদের সম্বন্ধে আল্লাহ বলেন: فَٱسْتَكْبَرُوا فِى ٱلْأَرْضِ—“তারা

শেয়ার করুন:

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *