Skip to main content

AkramNadwi

চাপাতি ও আলুর সবজি

চাপাতি ও আলুর সবজি<br>

মালয়েশিয়ায় পা রেখেই এক অদ্ভুত অনুভূতি আমাকে গ্রাস করে—ক্ষুধা যেন আমার কাছ থেকে দূরে সরে যায়। আগের সমস্ত সফরেও ঠিক এমনটাই ঘটেছিল। যাত্রা আরম্ভ হলেই দেহ-মন নতুন ছন্দে বাধা পড়ে, আর সেই রদবদলের সঙ্গেই ক্ষুধা কয়েক দিনের ছুটিতে চলে যায়। সে কবে ফিরে আসবে, পূর্বাভাস কখনও দেয় না।

আজ সকালের নাশতা বলতে শুধু একটি কাপে কালো কফি—দুধও নেই, চিনিও নেই। তারপর যথারীতি লেকচার দিলাম, ছাত্রদের প্রশ্নের জবাব দিলাম। নিজের কক্ষে ফিরে ল্যাপটপ খুলে বইয়ের কাজ শুরু করলাম। টীকা-হাওয়ালা খুঁজে নিলাম, বাক্য গুছিয়ে নিলাম, পৃষ্ঠা বাড়ল, ভাবনা এগোল; কিন্তু ক্ষুধা নিশ্চুপ রইল। কেউ যদি জিজ্ঞেস করত, “দুপুরে কী খেলেন?”—বলতাম, “কয়েকটি নতুন ভাবনা আর কিছু টাটকা সূত্র।”

দুপুর এলো-গেলো। সবাই আলোচনা শুরু করল—দুপুরের খাবার কোথায় হবে। আমি মুহূর্তের জন্য নিজের ভেতর তাকালাম; সেখানেও নির্বাকতা। দেহ বুঝি ঠিক করতে পারেনি, তার সত্যিই আহারের দরকার আছে কি না।

সন্ধ্যা সাতটায় মারওয়ান আসবেন, সঙ্গে থাকবেন আবু আল-ফারহান। সম্ভবত তাঁরা আমাদের কোনো চমৎকার রেস্তোরাঁয় নেবেন—সামুদ্রিক খাবার থেকে শুরু করে স্থানীয়-আন্তর্জাতিক পদ, যা-কিছু স্বাদ, গন্ধ আর সৌন্দর্যে সমৃদ্ধ। অথচ এমন পরিস্থিতিতেই আমার ক্ষুধা আরো সঙ্কুচিত হয়ে যায়। মনে হয়, এত বিকল্পের ভার সে বহন করতে পারবে না; তখন মন অন্য এক অনাড়ম্বর স্বাদের কথা ভাবে।

ঠিক তখনই অক্সফোর্ডের বাড়ির রান্নাঘর মনে পড়ে—নীরব ভেতর, তাওয়ায় ফুলে-ওঠা গরম চাপাতি…

আর আলুর সবজি।

কেবল “আলুর সবজি” বলা এর প্রতি সুবিচার নয়; এটা শুধু একটি পদ নয়, গৃহজীবনের প্রশান্ত প্রতীক।

সাধারণ আলু, মাপজোক করে কাটা—না অতিরিক্ত সরু, না বেশি মোটা। এতটাই নরম যে অনায়াসে গলে যায়, তবু যথেষ্ট দৃঢ় যে গঠন হারায় না। হলুদ তাদের সোনালি আভা দেয়, লবণ স্বাদ সাম্য রাখে, লালমরিচ হালকা উত্তাপ ছড়ায়, আর সূক্ষ্ম কাঁচা মরিচ প্রত্যেক গ্রাসে সতেজতার ঝলক যোগ করে। শেষে টাটকা ধনেপাতা—সবুজ, ঝরঝরে, অল্প আগে ধোওয়া।

সবকিছু হালকা আঁচে ধীরে-ধীরে সাঁতরাতে সাঁতরাতে যে মাটির সুগন্ধ ভেসে ওঠে, তা শুধু ক্ষুধাই জাগায় না; স্মৃতির দরজাগুলিও খুলে দেয়। সেই গন্ধ নাকে এসেই থেমে থাকে না, সরাসরি মস্তিষ্কের গভীরে নেমে যায়।

ওই গন্ধে থাকে বাড়ির নির্ভরতা, আপনজনের কোলাহল, আর দৈনিক জীবনের স্বস্তি—যার মূল্য মানুষ দূরে গিয়ে বোঝে। তাই দুনিয়ার সেরা রেস্তোরাঁও বাড়ির রান্নাঘরের এক চুমুক ঝোলের সমমানের শান্তি দিতে পারে না; কারণ কোনো কোনো স্বাদ শুধু মশলা-মিশ্রণ নয়, ভালোবাসা, সম্পর্ক ও স্মৃতির সমাহার।

তারপর একখানা গরম চাপাতি… নিছক সাদামাটা চাপাতি। তার এক টুকরো আলুর সবজিতে ডুবিয়ে মুখে তুললেই বোঝা যায়—খাদ্যের পরম তৃপ্তি কেবল পারদর্শিতায় নয়, পরিচিতিতেও নিহিত। অনেক সময় অতি সাধারণ খাবারও অতুল্য লাগে, কারণ তার সঙ্গে জুড়ে আছে জীবনের অন্তহীন মধুর স্মৃতি।

আজ সন্ধ্যায় আমি মারওয়ানকে নিশ্চয়ই বলব—এ শহরে কোথাও যদি আলুর সবজি আর চাপাতি মেলে, তবে আমাকে সেখানেই নিয়ে চলুন। তিনি হয়তো এক মুহূর্ত চমকে তাকাবেন, তারপর হেসে বলবেন, “এত দূর এসে এই-ই চাওয়া?” আর আমি মাথা নাড়ব—কিছু আকাঙ্খা পাসপোর্ট বদলায় না।

যদি সেই মুহূর্তে আমার সামনে এক দিকে বিশ্বের সেরা রেস্তোরাঁর বাহার, আর অন্য দিকে এক প্লেট আলুর সবজি ও দু’টি গরম চাপাতি রাখা থাকে—আমি বেছে নেব সেই পদ, যেখান থেকে বাড়ির গন্ধ ভেসে আসে।

বয়সের এই পর্যায়ে এসে বুঝেছি, ভ্রমণের সবচেয়ে প্রগাঢ় উপলব্ধি হলো—আমরা দুনিয়াজুড়ে স্বাদ খুঁজে বেড়াই, অথচ হাজার মাইল পাড়ি দিয়ে শেষে বুঝি, গভীরে প্রোথিত আস্বাদ ছিল ওই-ই, যা আমাদের ঘরের দস্তরখানায় নীরবে অপেক্ষা করেছিল।

এই মুহূর্তে আমার সমস্ত গবেষণা, দর্শন ও সফর-জ্ঞানের সারকথা—মানুষ যত দূরেই যাক, কখনও-সখনও তার হৃদয় মাত্র এক প্লেট আলুর সবজি আর গরম চাপাতিতে নিজের বাড়ি খুঁজে নেয়।

———-
ক্যাটাগরি : রিহলাহ, আখলাক, উসরাহ

✍ মূল : ড. মুহাম্মদ আকরাম নাদভী, অক্সফোর্ড।
✍ অনুবাদ যাচাই ও সম্পাদনা: মাওলানা মারজান আহমদ, সিলেট, বাংলাদেশ।
🔗 অনূদিত মূল প্রবন্ধের লিংক: 👇
https://t.me/DrAkramNadwi/9750

শেয়ার করুন:

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *