Skip to main content

AkramNadwi

বহুবিবাহ

বহুবিবাহ

 ড. মুহাম্মদ আকরাম নাদভী

|| প্রশ্ন 

আস্-সালামু আলাইকুম ওয়ারাহমাতুল্লাহি ওয়াবারাকাতুহ,

সম্মানিত শায়েখ, উস্তায- ড. মুহাম্মদ আকরাম নদভী- আল্লাহ আপনার সব প্রচেষ্টাকে কবুল করুন, আপনার বিদ্যাপথের দৌড়ঝাঁপকে কবুল করুন।

শায়েখ, প্রশ্ন হল, আমরা দেখি সাহাবায়ে কিরাম এবং আজও আরব বিশ্বে দুই, তিন, চারটি বিয়ে করা একটি সাধারণ প্রথা। কিন্তু উপমহাদেশ, বিশেষত ভারতের ক্ষেত্রে বিষয়টি এতটা প্রচলিত নয়; এমনকি আলেম সমাজের মধ্যেও দু’টি স্ত্রী থাকার ঘটনা খুবই বিরল। কেন এমন হয়? আজ অসংখ্য বিধবা ও তালাকপ্রাপ্ত নারী আছেন, যারা সারাটি জীবন এভাবেই কাটিয়ে দেন। কেউ তাদেরকে পরামর্শ দেয় না, সহায়তা করে না, এমনকি এ বিষয়ে সঙ্ঘবদ্ধ কোন উদ্যোগও নেই। অনুগ্রহ করে এ ব্যাপারে দিকনির্দেশনা প্রদান করুন।

উমর মাহবুব নাদভী
নালা সুফারা, জিলা পালঘর, মহারাষ্ট্র

|| উত্তর 

ওয়ালাইকুমুস্-সালাম ওয়ারাহমাতুল্লাহি ওয়াবারাকাতুহ।

আপনি একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক ও শরিয়তসংশ্লিষ্ট বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন। এ বিষয়ে কথা বলার সময় আবেগ বা সামাজিক চাপ নয়, বরং কুরআন-সুন্নাহর আলোকে সংযম ও ইনসাফকেই মানদণ্ড বানাতে হবে।

এতে কোনো সন্দেহ নেই—ইসলামী শরিয়ত বহুবিবাহের অনুমতি দিয়েছে গভীর দীনী হিকমতের ভিত্তিতে; কেবল পুরুষের খেয়ালখুশি পূরণের জন্য নয়। কোন কোনো পরিস্থিতিতে সামর্থ্যবান, আল্লাহভীরু ও ন্যায়পরায়ণ ব্যক্তি যদি একাধিক বিয়ে করেন, তবে অনেক বিধবা, তালাকপ্রাপ্ত, এতিম সন্তানের মা এবং যারা উপযুক্ত পাত্র পাচ্ছেন না—এ ধরনের নারীদের নানা সংকট লাঘব হতে পারে। তাই ইসলাম এটিকে অনুমোদন করেছে; নিষিদ্ধ ঘোষণা করেনি, অপবাদও দেয়নি।

কিন্তু একইসঙ্গে আরেকটি বাস্তবতা সমান গুরুত্বপূর্ণ, বরং বর্তমান যুগে এ দিকেই অধিক গুরুত্ব দিতে হবে। একাধিক স্ত্রী ভরণপোষণ করা নিজেই এক বিশাল দায়িত্ব; এর শরয়ী দাবিগুলো পালিত না হলে এটি সমাধানের বদলে নতুন নতুন অবিচার ও সঙ্কটের উদ্ভব ঘটায়। দুর্ভাগ্যবশত আজ আমরা বহু ঘটনা দেখি—দ্বিতীয় বিবাহের পর প্রথম স্ত্রী ও তার সন্তানদের উপর জুলুম হয়, কিংবা দ্বিতীয় স্ত্রীও নিজ অধিকার থেকে বঞ্চিত থাকে। সুতরাং কেবল এই যুক্তি যথেষ্ট নয় যে, বহুবিবাহ কিছু সামাজিক সমস্যা সমাধান করে দিতে পারে; দেখতে হবে, এর ফলে আরো গুরুতর বিপর্যয় তৈরি হচ্ছে কি না।

কুরআন মজীদ বহুবিবাহের অনুমতির সঙ্গে ‘ইনসাফ’-কে শর্ত হিসেবে জুড়ে দিয়েছে। এ ইনসাফ কেবল ভালবাসার দাবি নয়; বরং বাসস্থান, ভরণপোষণ, সময় বণ্টন, মর্যাদা, গোপনীয়তা—সমস্ত দৃশ্যমান অধিকার নিশ্চিত করার নাম।

আমার মত হল—কোনো ব্যক্তি তখনই দ্বিতীয় বিয়ের অনুমতি পাওয়ার যোগ্য, যখন তিনি বাস্তবে নিম্নোক্ত শর্তগুলো পূরণ করার সামর্থ্য রাখেন:

১. প্রত্যেক স্ত্রীর জন্য আলাদা, স্বাধীন ও সম্পূর্ণ বাসস্থান নিশ্চিত করবে; যেখানে বসবাস, রান্নাঘর ও গৃহস্থালি ব্যবস্থা অন্য কোনো স্ত্রীর সঙ্গে একীভূত হবে না। প্রতিটি নারীর অধিকার—নিজ গৃহে স্বস্তি, মর্যাদা ও স্বাধীনতা উপভোগ করা।

২. প্রতিটি ঘর সংশ্লিষ্ট স্ত্রীর স্থায়ী ঠিকানা হবে, এবং সেই ঘরে অন্য কোনো স্ত্রী, তার সন্তান বা শ্বশুরকুলের কেউ—সেই স্ত্রীর অনুমতি ছাড়া প্রবেশ করতে পারবে না। এমনকি স্বামীও ওই গৃহে তার গোপনীয়তা ও অধিকারের পূর্ণ সম্মান করবে, কেননা ঘর ওই নারীর নিরাপদ আশ্রয় ও ব্যক্তিজীবনের কেন্দ্র।

৩. স্বামী তার আর্থিক সামর্থ্য অনুযায়ী প্রত্যেক স্ত্রীকে পর্যাপ্ত ও সমপরিমাণ নফকা দেবে—খাদ্য, পোশাক, চিকিৎসা, প্রয়োজনীয় ব্যয়সহ সব আর্থিক অধিকারে বিন্দুমাত্র তারতম্য হবে না, যাতে কাউকে অর্থনৈতিক জুলুমের শিকার না হতে হয়।

৪. স্বামী সকল স্ত্রীর মাঝে রাত্রীযাপন ও সময় বণ্টনে পূর্ণ সমতা রক্ষা করবে—পর্যায়ক্রমে সমান সময় ব্যয় করবে এবং অযৌক্তিক কারণে এক স্ত্রীকে অন্যের উপর অগ্রাধিকার দেবে না। যদি কোনো অনিবার্য কারণে রুটিনে ব্যতিক্রম ঘটে, তবে তা ইনসাফের সঙ্গে প্রতিকার করবে।

৫. নৈতিকতা, সদাচরণ ও মর্যাদাবোধের ক্ষেত্রেও স্বামী পূর্ণ সমতা বজায় রাখার আপ্রাণ চেষ্টা করবে; কারণ কোনো কোনো সময় আর্থিক ইনসাফ ঠিক থাকলেও ব্যবহার-সৌহার্দ্যে সুস্পষ্ট বৈষম্য রাখা হয়, যা মনোবেদনা ও জুলুমের পথ খুলে দেয়।

যদি এই মৌলিক শর্তগুলির একটিও পূরণের সামর্থ্য না থাকে, তবে দ্বিতীয় বিবাহ থেকে বিরত থাকাই কুরআনের মর্জির অধিক নিকটবর্তী। আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেছেন: فَإِنْ خِفْتُمْ أَلَّا تَعْدِلُوا فَوَاحِدَةً—“তোমরা যদি আশঙ্কা কর যে ন্যায়বিচার করতে পারবে না, তবে একটিতেই সন্তুষ্ট থাকো।” এই আয়াতে মূল জোর অনুমতির উপর নয়, বরং ন্যায়ের উপর। অনুমতি ন্যায়ের শর্তসাপেক্ষ; আর যেখানে ন্যায় প্রতিষ্ঠা সম্ভব নয়, সেখানে একটিমাত্র বিবাহেই সীমাবদ্ধ থাকা আল্লাহর নির্দেশ।

আপনি জানতে চেয়েছেন, উপমহাদেশ—বিশেষত ভারতে—বহুবিবাহ তুলনামূলকভাবে কেন কম প্রচলিত? এর পেছনে একাধিক সামাজিক কারণ রয়েছে। শতাব্দী ধরে এ অঞ্চলের পারিবারিক কাঠামো, অর্থনৈতিক অবস্থা, বাসস্থানের সংকীর্ণতা, সামাজিক রীতিনীতি ও আইনি জটিলতা আরব সমাজের তুলনায় ভিন্ন। সুতরাং সব সমাজে একই চিত্র থাকবে—এ কথা সঠিক নয়। শরিয়ত অনুমতি দিয়েছে, তবে কোনো সমাজে তার প্রসার বেশি হবে কি কম হবে, তা বহু বাস্তবিক বিষয়ে নির্ভরশীল।

একইভাবে, বিধবা ও তালাকপ্রাপ্ত নারীর সমস্যার সমাধান শুধু বহুবিবাহের মধ্যেই সীমিত রাখলে চলবে না। তাদের ভরণ-পোষণ, শিক্ষা, অর্থনৈতিক স্বনির্ভরতা, পারিবারিক সহায়তা, সামাজিক নিরাপত্তা ও উপযুক্ত সম্পর্কের সংস্থান নিশ্চিত করার জন্য সুসংগঠিত উদ্যোগ নেওয়া জরুরি। নিঃসন্দেহে কিছু নারীর জন্য দ্বিতীয় কিংবা তৃতীয় স্ত্রী হওয়া শ্রেয় ও সম্মানজনক সমাধান হতে পারে; তবে প্রত্যেক নারীর জন্য এটাই একমাত্র পথ নয়, আর সব পুরুষও সেই দায়িত্ব গ্রহণের যোগ্য নন।

সুতরাং এ বিষয়ে উভয় চরমপন্থা—অতিরঞ্জন ও অবহেলা—পরিহার করা আবশ্যক। বহুবিবাহকে ‘ভুলে যাওয়া সুন্নাহ’ মনে করে শর্তহীনভাবে সাধারণীকরণের আহ্বান যেমন সঠিক নয়, তেমনি একে নিন্দিত বা অবৈধ সাব্যস্ত করাও সমুচিত নয়। সঠিক দৃষ্টিভঙ্গি হল—এটি আল্লাহ তায়ালার একটি শর্তসাপেক্ষ অনুমতি, যার ভিত্তি ন্যায়, তাকওয়া, আর্থিক সামর্থ্য এবং স্বত্ব পূর্ণাঙ্গ রক্ষণাবেক্ষণ। যখন এই শর্তগুলি পূর্ণ হয়, তখন এটি কিছু সামাজিক সমস্যার সমাধানের উপায় হতে পারে; আর তা অপূর্ণ থাকলে, এই অনুমতিই অবিচার, বঞ্চনা ও পারিবারিক অস্থিরতার কারণ হয়ে উঠতে পারে।

 ———-

ক্যাটাগরি : উসরাহ, ফিকাহ, উপদেশ, ফাতাওয়া

✍ মূল : ড. মুহাম্মদ আকরাম নাদভী, অক্সফোর্ড।
✍ অনুবাদ যাচাই ও সম্পাদনা: মাওলানা মারজান আহমদ, সিলেট, বাংলাদেশ।
🔗 অনূদিত মূল প্রবন্ধের লিংক: 👇
https://t.me/DrAkramNadwi/9776

শেয়ার করুন:

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *