শিরোনাম : সূর্যও নয়, চাঁদও নয়
——–
তুমি আমাকে জিজ্ঞেস করেছ, নদুয়া থেকে ফারেগ হয়ে আমরা কী ধরনের বৈজ্ঞানিক-দীনী কাজের হাতে খড়ি নেব?
তোমার এই প্রশ্নে বিস্ময়ের সঙ্গে একটি ব্যথাও লুকিয়ে আছে। প্রশ্নটি বাহ্যত একজন শিক্ষার্থীর হলেও এর আড়ালে এমন এক মানসিকতা গোপন, যা সব সময় চায়—পথটা আগেই সমতল হবে, গন্তব্যে আগেই কাফেলা পৌঁছে থাকবে, আর তাকে শুধু তাদের পদচিহ্ন অনুসরণ করলেই চলবে। যেন সে এমন এক দুনিয়া খোঁজে, যেখানে প্রতিটি প্রদীপ প্রজ্জ্বলিত, প্রতিটি বাগান আগেই ফুল-ফল, আর প্রতিটি উপত্যকায় ঝরনা ঝরে যাচ্ছে।
যদি সত্যিই দৃশ্যপট এমন হতো, তাহলে হয়তো তোমার প্রশ্ন জায়েজ হতো। যদি জ্ঞানের সূর্য দিগন্তে পরিপূর্ণ জ্যোতি নিয়ে উদিত হতো, যার কিরণ পূর্ব-পশ্চিম সর্বত্র হৃদয় ও চিন্তাকে আলোকিত করত, তবে নিঃসন্দেহে বলা যেত—মধ্যদুপুরে যখন রৌদ্র মাথার ওপর জ্বলজ্বল করছে তখন আর প্রদীপ জ্বালাবার প্রয়োজন কী? কে-ইবা দুপুরের আলোয় হাতে মোমবাতি নিয়ে ঘোরে?
যদি উম্মতের আকাশে পূর্ণিমার বিশুদ্ধ শীতল চাঁদ ঝলমল করত, যার রূপালি আলোয় রাতের অন্ধকার গলে যেত, তবে দ্রষ্টব্য ছিল—চাঁদের আলো যখন চারদিকে ছড়ানো, তখন আর নক্ষত্রের অনুসন্ধান কেন?
কিন্তু, প্রিয়জন! চোখ মেলো, চারপাশে একবার গভীর দূরদৃষ্টি নিক্ষেপ করো, ইতিহাসের আয়নায় নিজেকে দেখো, উম্মতের দিগন্তে তাকাও—দেখবে বাস্তবতা সেই কল্পচিত্র থেকে কত ভিন্ন।
আজকের দুনিয়া এমন এক জনপদের ছবি আঁকে, যার মিনারগুলো টিকে আছে, অথচ আজানধ্বনি বিরল; মাদরাসাগুলো দাঁড়িয়ে আছে, কিন্তু ভাবনার উত্তাপ নিঃশেষ; গ্রন্থাগারগুলো পূর্ণ, তবু পৃষ্ঠাগুলোতে জীবনের শ্বাস কম; বই আছে অগণিত, কিন্তু বই রচনাকারী মস্তিষ্ক ক্রমে বিলুপ্ত; শব্দের ভিড় আছে, অথচ অর্থের ভান্ডার অনুপস্থিত; কণ্ঠস্বর অনেক, তবু সত্যের প্রতিধ্বনি দুর্লভ।
মনে হয় জ্ঞানের সূর্য দিগন্তের আড়ালে ঢলে পড়েছে, আর উম্মত দীর্ঘ এক সান্ধ্য ছায়ায় দাঁড়িয়ে। কোথাও-কোথাও ক্ষুদ্র কয়েকটি আলোর দ্বীপ এখনও জ্বলছে, কিন্তু ওই সীমাহীন অন্ধকার ছেদ করার মতো যথেষ্ট নয়। হৃদয়ে শিশিরের বদলে উৎকণ্ঠার ধুলা, চিন্তার নদীতে জল কম, স্থবিরতা বেশি; এবং মস্তিষ্কের বাগানে গবেষণার ফুল কম, অনুকরণের শরৎই বেশি।
হায়! যদি বুঝতে পারতে কেমন এক ভোর উম্মতের ওপর উদিত হয়েছে—একটি এমন দিন, যার রোদে উত্তাপ আছে কিন্তু আলো নেই; আর কেমন এক রজনী তার আঙিনায় অন্ধকার ছড়িয়েছে—এমন রাত যার তারা একে-একে ঝরে পড়েছে, যাত্রীরা দিক নির্ণয়ে বিপন্ন। এটা কেবল সময়ের অন্ধকার নয়, হৃদয়ের অন্ধকার; শুধু চিন্তার সঙ্কট নয়, দৃষ্টিশক্তির সঙ্কট; কেবল জনবলের ঘাটতি নয়, কর্মীবাহিনীর শূন্যতা।
শিবলী নোমানী যদি আজ জীবিত থাকতেন, তাহলে তোমার প্রশ্নের ওজন থাকত। সেই শিবলী, যিনি ব্যক্তি ছিলেন না, ছিলেন এক প্রতিষ্ঠান; তাঁর ভাবনা ছিল এক প্রদীপ নয়, এক নীহারিকা; যার কলমে জ্ঞানের মরু ও ফুলবাগানে রূপান্তরিত হতো; ইতিহাসের বিক্ষিপ্ত পাতা তাঁর দৃষ্টিতে গেঁথে যেত সুতোয়; যিনি সাহিত্যে মর্যাদা, ইতিহাসে সচেতনতা, সীরাত-গবেষণায় নতুন প্রাণ, সমালোচনায় ফিকির ও দৃষ্টিশক্তি এনেছিলেন। এমন সূর্যের উপস্থিতিতে প্রদীপ নিভে থাকলেও চলত।
আর যদি হামীদুদ্দীন ফারাহি ও সাইয়্যদ সুলায়মান নদভীর মতো প্রতিভাবান আলেমরা থাকতেন, তবে গবেষণার আসর কখনো নির্জন হতো না; কুরআনের রহস্যের তদব্বর, ইতিহাস-দরজা দিয়ে তাজা বাতাস, নতুন প্রজন্মের কাছে জ্ঞান কেবল ভাণ্ডার নয়, জীবন্ত ঐতিহ্য রূপে থাকত। তাঁদের কাছে জ্ঞান ছিল স্থবির সঞ্চয় নয়, বহমান নদী, যেখানে দিয়ে বয়ে গিয়ে জমিন সজীব হতো।
আর যদি আবুল আ’লা মওদুদী ও আবুল হাসান আলী নদভীর মতো দাওয়াতি ব্যক্তিত্বেরা সম্পূর্ণ মহিমায় বর্তমান থাকতেন, তাহলে তোমার এ প্রশ্ন জন্মাতই না। তাঁরা এমন মিনার, যাদের আলো দূর-দূরান্তের পথিককে পথ দেখায়; এমন কাণ্ডারী, যারা উম্মতের টালমাটাল তরীকে চিন্তার ঝড় পেরিয়ে তীরে ভিড়ান; এমন মালী, যারা মলিন উদ্যান-উম্মতে নতুন বসন্তের আশা জাগায়। তাঁদের কাছে জ্ঞান ছিল কেবল মনের খাদ্য নয়, হৃদয়ের উষ্ণতা; দাওয়াত কেবল বক্তৃতা নয়, জীবনের পয়গাম; চিন্তা কেবল বিতর্ক নয়, উম্মতের তাকদির বদলাবার সংকল্প।
কিন্তু দুঃখের বিষয়, তুমি এমন এক যুগে বেঁচে আছ, যখন আকাশ আগের মতো জ্ঞান-তারায় ভরা নয়। আজ দূরদৃষ্ট লোকের আকাল, গবেষকের কমতি, অন্তর্দৃষ্টির দুর্ভিক্ষ; যারা দিকনির্দেশক, গোটাকতক আঙুলেই গণনা করা যায়। সাহিত্য-সুষ্মা এতিম, গবেষণা প্রাণ খুঁজে ফেরে, দাওয়াতের কণ্ঠ ক্ষীণ, চিন্তার প্রদীপ ঝড়ে কাঁপছে।
এমন সময় যদি তুমি জিজ্ঞেস কর—“আমরা এখন কী করব?”—তা যেন পিপাসু তখনই জল খুঁজতে অযত্ন করে, যখন কূপ শুকিয়ে যাচ্ছে; কিংবা পথিক প্রদীপ তুলে ধরতে অস্বীকার করে, শুধু এ জন্য যে আগেকালে হাজার প্রদীপ জ্বলত।