Skip to main content

AkramNadwi

শিরোনাম : তাশখন্দের ছাপ: ইবন সিনার স্মৃতি ও ইতিহাস

শিরোনাম : তাশখন্দের ছাপ: ইবন সিনার স্মৃতি ও ইতিহাসের নিঃশব্দ রায়
———

এই ক’দিন আমি উজবেকিস্তানের হৃদয় তাশখন্দে আছি। এখানে ইসলামি সভ্যতা বিষয়ক প্রথম আন্তর্জাতিক সম্মেলন (৭–১১ জুলাই ২০২৬) উপলক্ষে এসেছি, যা আয়োজন করেছে তাশখন্দের সেন্টার অব ইসলামিক সিভিলাইজেশন। কিন্তু এটিকে শুধু আরেকটি একাডেমিক সমাবেশ বলে মনে হয় না; বরং মনে হয় যেন শতাব্দীর পর শতাব্দীর ইতিহাস ভাঁজ খুলে এক ছাদের নিচে শুয়ে পড়েছে, আর পূর্ব-পশ্চিমের শিক্ষাবিদ, গবেষক, ইতিহাসবিদ ও চিন্তকরা মুখোমুখি বসে অতীত-বর্তমান-ভবিষ্যৎ নিয়ে ভাবনা-বিনিময় করছেন।

তাশখন্দের হাওয়ায় এক অদ্ভুত বৈশিষ্ট্য আছে—ইতিহাস যেন সুগন্ধির মতো ভাসমান। এ নগরীর পথে হাঁটলে শুধু বর্তমানের ভেতর দিয়ে নয়, সময়ের সরণিতেও চলতে হয়; প্রতিটি পায়ে চলার সাথে সাথে শতাব্দীর ধূলা যেন বসনে জমে। এ সেই ভূমি, যা ইমাম বুখারি, ইমাম তিরমিজি, আবু মনসুর মাতুরীদী, আবু রাইহান বেরুনী, আল-খোয়াড়িজমী, আল-ফারাবি ও ইবন সিনার মতো জ্ঞান-সূর্যোদয়ের সাক্ষী। এরা কেবল ব্যক্তিনাম নয়; সভ্যতার আকাশে ঝলসানো নক্ষত্র, যাদের দীপ্তি এখনো জ্ঞানের পথ আলোকিত করে।

সম্মেলনের নানান অধিবেশনে যখনই ইসলামি সভ্যতার নির্মাতাদের কথা ওঠে, এক নাম বারবার উজ্জ্বল জ্যোতির মতো ফিরে আসে—আল-শাইখুর রঈস আবু আলি আল-হুসাইন ইবন আবদুল্লাহ ইবন সিনা। সত্যিই, ইসলামি বুদ্ধিবৃত্তিক অট্টালিকাকে যদি মহিমান্বিত প্রাসাদের সঙ্গে তুলনা করা হয়, তবে ইবন সিনা তার অন্যতম প্রধান স্তম্ভ। তিনি যেন সুদৃঢ় কীপ Cypress-বৃক্ষ: মেজবুত শিকড়ে যুক্তির মাটিতে প্রোথিত, আর শাখা প্রসারিত দার্শনিকতা, যুক্তিবিদ্যা, চিকিৎসাশাস্ত্র, পদার্থবিদ্যা ও metaphysics-এর আকাশে।

মানব-ইতিহাসে মহামানসগণ বিরোধিতার কামান এড়াতে পারেননি; মেঘের প্রথম বিদ্যুৎ উচ্চশিখরেই পড়ে, আর আকাশ ছেঁড়া গৃহিনীই শিকারির নজর কেড়ে নেয়। ইবন সিনাও এর ব্যতিক্রম নন।

অপরিসীম মেধাবী ইমাম আবু হামিদ গাজালী—যার বিদ্যাবত্তা অনস্বীকার্য—তাঁর প্রসিদ্ধ ‘তাহাফুতুল ফালাসিফা’য় দার্শনিকদের কঠোর সমালোচনা করেন এবং তিনটি বিষয়ে ইবন সিনা ও আল-ফারাবীকে কুফরি দেখিয়ে রায় দেন। এ ছিল না কেবল সময়সীমাবদ্ধ কোনো ফতোয়া; বরং পরবর্তী কয়েক শতাব্দীর ইসলামি চিন্তাচর্চায় এর সুগভীর ছাপ পড়ে। পরে অসংখ্য কালামবিদ এ গ্রন্থের ব্যাখ্যা-বিস্তার করেন, আর দর্শনের বিরুদ্ধে এক শক্ত বিদ্বেষী ফ্রন্ট গড়ে ওঠে।

কিন্তু ইতিহাসের নদী এক তীর বেয়ে চলে না।

আল-আন্দালুসের দিগন্তে উদিত হলেন কাজী আবুল ওয়ালিদ ইবন রুশদ। সূক্ষ্ম যুক্তি ও নির্ভুল বিশ্লেষণে তিনি গাজালীর আপত্তি খতিয়ে দেখে অমর ‘তাহাফুতুত তাহাফুত’ রচনা করেন, যা আজও যুক্তিবাদ, ধৈর্য ও বিদ্বৎসমর্থনীর উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। এভাবে ইসলামি সভ্যতার ভেতরে সৃষ্টি হলো এক মহান সংলাপ—যে সংলাপে তরবারির নয়, যুক্তির পর যুক্তি মুখোমুখি; লক্ষ্য প্রতিপক্ষকে স্তব্ধ করা নয়, বরং যুক্তিকে যুক্তি দিয়ে জবাব দেওয়া।

আর যখন আট-নয় শতকের দূরত্ব থেকে এ পুরো নাটককে দেখা যায়, এক চমকপ্রদ সত্য উন্মোচিত হয়।

ফতোয়া থেকেছে; বিরোধিতা চলেছে; বিতর্ক মঞ্চস্থ হয়েছে—তবু ইবন সিনা তাঁর স্থান থেকে সরেননি।

তাঁর বৌদ্ধিক কদর্যতাই ছিল অতুলনীয়। মতভেদের ঝড় প্রবল বয়ে গেছে, তবু শিকড় আলগা হয়নি। সূর্যের দিকে ছিটানো মুঠো ধূলা তার আলো নিভায় না; সমুদ্রে ছোঁড়া পাথর ঢেউ তোলে, গভীরতা নয়। ইবন সিনার উত্তরাধিকারও তেমনি—সূর্যালোকে জ্বলে, সাগরের মতো ব্যাপক।

 তাঁর ‘আশ-শিফা’ দার্শনিকতা ও যুক্তিবিদ্যায় গুটিকয়েক গ্রন্থের সমাসনে আসীন, আর ‘আল-কানুন ফি তিব্ব’ চিকিৎসাবিদ্যায় এমন অধ্যায় খুলেছে, যা শতাব্দীর পর শতাব্দী বন্ধ হয়নি। প্রাচ্যের মাদরাসা থেকে পাশ্চাত্যের বিশ্ববিদ্যালয়—অগনিত শিক্ষাকেন্দ্রে এ দুটো বই মূলপাঠ। বহু ইউরোপীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে মেডিসিনের শিক্ষা ইবন সিনা ব্যতীত পূর্ণ হতো না। উপমহাদেশের মাদরাসাগুলিতেও—বিশেষত খায়রাবাদী বৌদ্ধিক ধারার শেষ প্রান্ত পর্যন্ত—‘আশ-শিফা’ ও ‘কানুন’ ছিল গুরুভার পাঠ্য। এগুলোর ওপর ভাষ্য, টীকাগ্রন্থ, বিতর্ক, আলোচনা রচিত হয়েছে; প্রজন্মের পর প্রজন্ম তা থেকে উপকৃত হয়েছে।

এখানে তাশখন্দে বসে, যেখানে এখনো ইবন সিনার মাতৃভূমির সুবাস ভাসে, হৃদয় বারবার একই সত্যে ফিরে যায়—ইতিহাসের মনে অদ্ভুত ধরন। গর্জন ধরে রাখে না সে; জ্ঞানের মৃদু ফিসফিসকে ধরে রাখে শতাব্দী পেরিয়ে। স্লোগানের প্রতিধ্বনি ধীরে ধীরে বাতাসে বিলিয়ে দেয়, কিন্তু শাশ্বত সত্যকে পাথরে খোদাইয়ের মতো অমলিন রাখে।

সভ্যতা ফতোয়া দিয়ে গড়ে না; সভ্যতা গড়ে বইয়ে। সংস্কৃতি দৌলত পায় নিন্দায় নয়, অনুসন্ধানে। শেষমেশ মানব-বোধকে প্রসারিত করা হাতই টিকে থাকে, প্রগতি রুদ্ধ করা কণ্ঠস্বর নয়।

সময়—পৃথিবীর সর্ববৃহৎ বিচারক।

শেয়ার করুন:

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *