https://t.me/DrAkramNadwi/2914
بسم الله الرحمن الرحيم.
❝
নদওয়ার স্নাতকদের উদ্দেশ্যে বক্তৃতা ❞
যখন কোনো কিছু পেশা হয়ে যায়, তখন তার পরিসর সঙ্কুচিত হয়ে যায়, তার লক্ষ্য সীমিত হয়ে পড়ে, এবং তার প্রকৃত উপযোগিতা পেছনের সারিতে চলে যায়। উদাহরণ হিসেবে বর্তমান মহামারিকে নেওয়া যাক। আপনি যদি একজন রাজনীতিবিদ হন, তাহলে আপনার অগ্রাধিকার হবে কিভাবে এই মহামারিকে নিজের বা নিজের দলের রাজনৈতিক স্বার্থে কাজে লাগানো যায়। আর আপনি যদি ব্যবসায়ী হন, তাহলে আপনার পরিকল্পনা হবে কিভাবে এই সুযোগ কাজে লাগিয়ে বেশি থেকে বেশি অর্থ উপার্জন করা যায়। রাজনীতিকে পেশা হিসেবে গ্রহণকারী বা ব্যবসায়ী ব্যক্তিদের কাছে মহামারি থেকে সুরক্ষা, বিপদগ্রস্ত মানুষের সাহায্য, কিংবা কোনো মানবিক সেবার বিষয়গুলো মৌলিক গুরুত্বের অধিকারী নয়।
একইভাবে, যখন কারো মৃত্যু হয়, তখন পেশাদার বক্তা ও সাংবাদিকরা চেষ্টা করেন কিভাবে এই ঘটনাকে নিজের স্বার্থে কাজে লাগানো যায় এবং এর মাধ্যমে ব্যক্তিগত বা গোষ্ঠীগত লক্ষ্য অর্জন করা যায়। মৃত ব্যক্তির পরকালীন মুক্তি, তার জন্য দোয়া করা, তার আত্মীয়-স্বজনের প্রতি সহানুভূতি প্রকাশ করা ইত্যাদি মূল মনোযোগের বিষয় হওয়া উচিত হলেও এসব তাদের আগ্রহের বাইরে থাকে।
এই পেশাদার বক্তা ও সাংবাদিকরা এমনকি মৃত্যুর দিনের বিষয়েও চিন্তা করেন না। তারা এটাও ভাবেন না যে আজ কবরের ভেতর মৃত ব্যক্তির প্রথম দিন, তার ওপর কিভাবে পরিস্থিতি আসতে পারে। মৃতের পরিবারের ওপর শোকের পাহাড় ভেঙে পড়েছে, তারা সান্ত্বনা ও সমবেদনার কথা শোনার অধিকার রাখে। কিন্তু পেশাদাররা এসব বিষয় উপেক্ষা করে মৃত ব্যক্তির কাফন-দাফনের আগেই তাদের মানবতাবিহীন এজেন্ডা কার্যকর করতে শুরু করেন।
তারা মৃত ব্যক্তির সমালোচনা করে, তার ব্যক্তিত্ব বিকৃত করে, তার উদ্দেশ্য ও চরিত্রকে কলঙ্কিত করে, পুরনো ভুলে যাওয়া গল্পগুলো এক এক করে খুঁজে বের করে, পুরনো হিসাব মিটিয়ে ফেলে, এবং মৃত্যুকে একটি লাভজনক বাণিজ্যিক চুক্তি হিসেবে বিবেচনা করে এর থেকে যতটা সম্ভব লাভ তোলার চেষ্টা করে।
দুঃখজনক হলো, আমরা জ্ঞান ও দ্বীনের সঙ্গে সংশ্লিষ্টরাও এই নিকৃষ্ট ও নিন্দনীয় চরিত্রের মধ্যে জড়িয়ে পড়েছি। নির্মম জানোয়ারের মতো এবং মৃত খাদক পাখির মতো আমরা আমাদের ভাইদের মৃতদেহের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ি। তাদের দেহের টুকরো টুকরো করি, আনন্দ নিয়ে তাদের মাংস খাই, এবং অন্যদেরও এই অপবিত্র আনন্দে অংশগ্রহণ করতে উৎসাহিত করি। অথচ আমাদের দায়িত্ব ছিল যে আমরা দ্বীন হানিফের প্রতিনিধিত্ব করব, কুরআন ও সুন্নাহর শিক্ষার ওপর আমল করব, এবং অন্যদের তা প্রচার করব।
আমরা ভুলে যাই যে পৃথিবীর সব ধর্ম ও সংস্কৃতির একটি সাধারণ সম্মানজনক নীতি হলো, মৃত ব্যক্তির জন্য দোয়া করা, তার সৎগুণাবলির কথা উল্লেখ করা, এবং তার আত্মীয়-স্বজনের প্রতি সহানুভূতি প্রকাশ করা।
সব ধর্ম ও সংস্কৃতির ওপর ইসলামের শ্রেষ্ঠত্ব সুপ্রতিষ্ঠিত। আসমান থেকে নাযিল হওয়া এই পবিত্র ধর্ম যেভাবে এই মহান মানবিক গুণাবলিকে সংরক্ষণ করেছে তা বিস্ময়কর, এবং এর তুলনায় কোনো সমমানের ঐতিহ্য উপস্থাপন করা সম্ভব নয়। মৃত্যুর সংবাদ শোনা মাত্র প্রত্যেক মুসলিম “ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিঊন” পড়ে। সে নিজের মৃত্যুর কথা স্মরণ করে, দুনিয়া ও দুনিয়ার সাফল্য ও আনন্দ থেকে তার মন দূরে সরে যায়।
মৃত ব্যক্তির কাফন-দাফনের আয়োজন করে, মৃত ব্যক্তি যতই গুনাহগার হোক তার জানাজার নামাজ পড়ে, তার জন্য ক্ষমা প্রার্থনা ও নেকি প্রেরণের দায়িত্ব পালন করে। যদি মৃত ব্যক্তির ওপর অন্যদের অধিকার থাকে, তবে তা পরিশোধ করার বা অধিকারীদের কাছ থেকে ক্ষমা করানোর চেষ্টা করা হয়। যেন আমাদের ভাই পবিত্র হয়ে যায়, আল্লাহর ক্ষমার যোগ্য হয়, কবর ও পরকালের শাস্তি থেকে বেঁচে যায়, এবং জান্নাত লাভ করে। সর্বাধিক দয়ালু আল্লাহ জানাজা পড়া ও ক্ষমা প্রার্থনা করার লোকদের মহাপুরস্কার দান করেন।
সহীহ বুখারি ও সহীহ মুসলিমের একটি হাদিসে আছে, যে ব্যক্তি জানাজার নামাজ পড়ে সে এক কীরাত (বিশাল পুরস্কার) পায়। আর যে ব্যক্তি জানাজার পেছনে চলতে থাকে এবং দাফনে অংশগ্রহণ করে, সে দুই কীরাত পায়। আর প্রতিটি কীরাত একটি বিশাল পাহাড়ের সমান।
এছাড়াও, একজন মুসলিম মৃত ব্যক্তির আত্মীয়দের সান্ত্বনা দেয়, তাদের জন্য খাবারের আয়োজন করে, সান্ত্বনামূলক কথা বলে, এবং তাদের সামনে মৃত ব্যক্তিকে নিয়ে এমন কোনো কথা বলে না যা তাদের কষ্ট দেয়।
হাদিসগুলোতে মৃত ব্যক্তিকে নিন্দা করা থেকে বিরত থাকতে বলা হয়েছে এবং মৃতের আত্মীয়দের কষ্ট দেওয়া স্পষ্টভাবে নিষিদ্ধ করা হয়েছে। বরং আমাদের সব অবস্থায় অন্যদের দোষ ঢাকার আদেশ দেওয়া হয়েছে এবং সতর্ক করা হয়েছে যে, আমাদের কথা বা কাজের দ্বারা কারো কষ্ট হওয়া উচিত নয়।
ও আফসোস! ও দুঃখ! এই পৃথিবীতে এমন লোকেরাও বাস করে যারা বলে, মৃত ব্যক্তির প্রশংসা করা, তার গুণাবলি উল্লেখ করা এবং তার আত্মীয়-স্বজনের প্রতি সহমর্মিতা প্রকাশ করা বক্তৃতা ও সাংবাদিকতার নীতির বিরুদ্ধে। তাই প্রশংসার সাথে নিন্দা, প্রশংসার সাথে সমালোচনা এবং সহমর্মিতার পাশাপাশি কষ্ট দেওয়া বিষয়ক কথাও থাকতে হবে যেন আমাদের নিরপেক্ষ পেশাগত আচরণে কোনো প্রভাব না পড়ে। এদের মধ্যে যারা বেশি চতুর, তারা নিজেদের আচরণকে একটি বৈজ্ঞানিক রূপ দেওয়ার চেষ্টা করে এবং বলে, মানবিক মূল্যবোধ ছাড়াও পরলোক বিষয়ক সমালোচনামূলক মূল্যবোধও রয়েছে, তাই কেবল মানবিক মূল্যবোধের ওপর নির্ভর করা মারাত্মক ভুল এবং সুস্পষ্ট অবিচার।
কিছু আলেম এই বিষয়টিকে ধর্মীয় আবরণের মধ্যে ঢেকে ফেলে এবং কিছুটা নিরীহ ভঙ্গিতে নিজেদের গোপন চিন্তা প্রকাশ করে যে, যদি মৃত ব্যক্তির অপমান করা না হয়, তাহলে তার ভ্রান্ত মতবাদকে মানুষ সঠিক মনে করতে শুরু করবে, তাকে সম্মান করতে শুরু করবে এবং সহজ-সরল মুসলমানেরা বিভ্রান্ত হয়ে পড়বে।
কিছুক্ষণ চিন্তা করলে বোঝা যাবে, এ ধরণের অমর্যাদাপূর্ণ ও অভদ্র আচরণের বৈধতা দেওয়ার জন্য এই যে অজুহাত খুঁজে নেওয়া হচ্ছে, তা কতটা নিন্দনীয় এবং দূষিত। তাদের বোঝানো দরকার যে, এই মুহূর্তে কেবল মানবিক মূল্যবোধের সম্মানের আহ্বান জানানো হচ্ছে, কোনো ভ্রান্ত মতবাদের সমর্থন করা হচ্ছে না এবং তার চিন্তা-ভাবনার প্রচার করা হচ্ছে না। যদি কোনো পাপী ব্যক্তির জানাজা পড়ার মাধ্যমে পাপের প্রসার না ঘটে, তাহলে একজন বিরোধী ব্যক্তির জন্য দোয়া করার মাধ্যমে তার ভ্রান্ত মতবাদের প্রচার কীভাবে সম্ভব? এখানে তো বলা হচ্ছে না যে, আপনাকে কোনো গঠনমূলক সমালোচনা করতে হবে না কিংবা কোনো ব্যক্তিত্বের বিভিন্ন দিক নিয়ে তুলনা করতে হবে না। আপনাকে অবশ্যই তা করতে হবে। শুধু বলা হচ্ছে যে, এখনো এই ঘটনা নতুন। এটি সমালোচনা এবং পর্যালোচনার সময় নয়। ভবিষ্যতে কোনো সময় ভদ্র উপায়ে এই গঠনমূলক কাজটি করা যেতে পারে।
একবার একটি জানাজা অতিক্রম করল, তখন সাহাবায়ে কেরাম রাদিয়াল্লাহু আনহুম তাকে প্রশংসা করলেন। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, “ওয়াজিব হয়ে গেল।” এরপর আরেকটি জানাজা অতিক্রম করল, তখন লোকেরা তার নিন্দা করল। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, “ওয়াজিব হয়ে গেল।” হজরত উমর রাদিয়াল্লাহু আনহু জিজ্ঞেস করলেন, “ওয়াজিব হওয়ার অর্থ কী?” তিনি বললেন, “যে জানাজার প্রশংসা করেছ, তার জন্য জান্নাত ওয়াজিব হয়ে গেল, আর যে জানাজার নিন্দা করেছ, তার জন্য জাহান্নাম ওয়াজিব হয়ে গেল। তোমরা পৃথিবীতে আল্লাহর সাক্ষী।” অর্থাৎ, তোমরা কোনো ব্যক্তির নিন্দা করো না, নাহলে মৃত ব্যক্তির ক্ষতি হবে। শুধু প্রশংসা করো, যাতে তার উপকার হয়। এই অর্থের প্রতি ইঙ্গিত করে ইমাম বুখারি রহমতুল্লাহি আলাইহি তার হাদিসের জন্য
কিছু আলেমের মতে, এই সাক্ষ্য দেওয়ার বিশেষত্ব কেবল সাহাবায়ে কেরাম রাদিয়াল্লাহু আনহুমের জন্য নির্ধারিত। যদি এটিকে সাধারণ রাখা হয়, তাহলে কোনো মুসলমান জান্নাতে প্রবেশ করতে পারবে না। কারণ, আমাদের প্রত্যেক ফেরকা অপর ফেরকার লোকদের নিন্দা করে এবং তাদের ওপর অভিশাপ দেয়। যদি আমাদের এই আচরণকে সাক্ষ্য হিসেবে গ্রহণ করা হয়, তাহলে সব মুসলমান জাহান্নামে চলে যাবে।
প্রথম অর্থের সমর্থনে বুখারি শরিফের সেই বর্ণনা রয়েছে, যেখানে বলা হয়েছে, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, “মৃত ব্যক্তিদের নিন্দা করো না, কারণ তারা তাদের আমল অনুযায়ী (পরিণতির দিকে) চলে গেছে।” এই হাদিসের বর্ণনাকারী ছিলেন হজরত আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহা। তিনি নিজে এই বিষয়টি কঠোরভাবে মেনে চলতেন এবং কোনো ব্যক্তির মৃত্যু হওয়ার পর, যতই সে খারাপ হোক, তার সমালোচনা করতেন না।
তোমাদের মাদরাসার তিনজন প্রবীণ—আল্লামা সাইদ সুলাইমান নদভী, ইসলামিক চিন্তাবিদ হজরত মাওলানা সাইদ আবুল হাসান আলি নদভী এবং মাওলানা সাইদ মুহাম্মদ রাবি হাসানি নদভী—মৃত্যুর ওপর প্রচুর লিখেছেন। তাদের লেখাগুলো পড়ো। সেগুলো ইসলামের সুন্নত এবং মানবতার মহৎ মূল্যবোধের সর্বোত্তম প্রতিনিধিত্ব করে। এরপর তাদের জ্ঞানী পন্থা ও উত্তম রীতিনীতি অনুসরণের চেষ্টা করো।
সারকথা হলো, মৃত ব্যক্তির ভালো দিকগুলো বর্ণনা করা এবং তার খারাপ দিক নিয়ে মুখ খুলে নিজেকে কলুষিত না করা মানবতার মহৎ মূল্যবোধের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত। এবং এটি হলো সম্মানিত লোকদের নিয়ম। তারা মানবিক মূল্যবোধকে সমালোচনা ও পেশাগত মূল্যবোধের ওপরে স্থান দেয়। এটাই সব ধর্মের শিক্ষা। এটাই কোরআন ও সুন্নাহর দাওয়াত। এবং এটাই পূর্ববর্তী মনীষীদের পদ্ধতি। আল্লাহ আমাদের সঠিক পথ প্রদর্শন করুন। আমিন।
———-
# উপদেশ
লিখেছেন :
মুহাম্মাদ আকরাম নাদভী – অক্সফোর্ড।
অনুবাদ যাচাই ও সম্পাদনা:
মাওলানা মারজান আহমদ, সিলেট, বাংলাদেশ।