শিরোনাম: নম্রতাই পথের খিজর
—–
লেখক: ড. মুহাম্মদ আকরাম নাদভী
অক্সফোর্ড
১৬/৬/২০২৬
সুফিয়্যাদের বিশ্বাস, আধ্যাত্মিক পথের ঘুরপ্যাঁচের ঘোলাটে উপত্যকায় কোনো সালিক যখন ‘হাইরাহ’-র মরুভূমিতে হতবুদ্ধি হয়ে পড়ে—গন্তব্যের রেখা ঝাপসা হয়ে যায়, পথের সব চিহ্ন চোখের আড়ালে সরে যায়—তখন হযরত খিজর আলাইহিস্সালাম দয়ার হাত বাড়িয়ে তাকে মঞ্জিলে পৌঁছাবার সূত্র দেন। তাঁদের মতে, অন্ধকার রাতে যেমন একটি দীপশিখা পথিককে হোচট খাওয়া থেকে বাঁচায়, তেমনই হযরত খিজর আলাইহিস্সালাম বিভ্রান্ত আত্মাকে দিকনির্দেশনা দিয়ে গোমরাহির খাদ থেকে তুলে হিদায়তের রাজপথে বসিয়ে দেন। বহু তাসাউফপন্থী তো স্বাভাবিক অবস্থাতেও তাঁর তাওয়াজ্জুহ ও মদদের উপস্থিতি মানেন; আধ্যাত্মিক সফরে তাঁকে স্থায়ী পথপ্রদর্শক ও চাহিদা পূরণকারী মনে করেন। তাদের আশা-আকাঙ্ক্ষার একাংশ সদাই বাঁধা থাকে হযরত খিজরের সাথে।
কিন্তু মু’মিন জীবনের চিত্র ভিন্ন। তাদের সফর-ই-হায়াতে জ্বলতে থাকে একটাই আলো—সেটি সেই নূর, যা রব্বুল্‘আলামীন স্বয়ং অন্তরে ফেলেন। তারা নিজ কৌশল-ক্ষমতার বাহুতে ভরসা করে না, কোনো সৃষ্টির ঠেকনাকেই মুক্তির নোঙর মনে করে না। হৃদয়ের গহিনে তারা সদাই অনুভব করে নিজের অক্ষমতা। মানুষ জ্ঞানের আকাশ ছুঁক, ইবাদতের শিখরে উঠুক, তবু সে আল্লাহ তাআলার দরবারের দরিদ্র ভিক্ষুক—এই অনুভূতিই তাদের অন্তরে বিনয়ের ঝরনা চালু রাখে।
নম্রতা—একটি আয়না, যেখানে মানুষ নিজের আসল সত্তা দেখতে পায়। এটা নফ্সের মুকুট খুলে দাসত্বের কাফন গায়ে তোলা; নিজের দুর্বলতার স্বীকারোক্তি, আর রব্বে যুল্জালালের মহিমার সামনে বিনম্র শির নত করা। যে হৃদয়ে নম্রতা বাসা বাঁধে, সেখানে আত্মমুগ্ধতার কাঁটা গজায় না; সেখানে তাওয়াদু‘র ফুল ফোটে, মারিফাতের সুবাস ছড়ায়।
‘নম্রতাই পথের খিজর’—যে দিশা অনেকে বাহ্যিক কোনো গাইডে খোঁজেন, ঈমানদাররা তা খুঁজে নেন হৃদয়ের গভীর বিনয়ে। নম্রতা তাদের কুতুবনকশা—গন্তব্যের দিকনির্দেশ দেয়; তাদের প্রদীপ—অন্ধকার ভাঙে; তাদের তরী—ঝড় জলে তীরে ভিড়ায়; তাদের প্রভাতী বাতাস—ভুল পথের কাফেলাকে গন্তব্যের সুগন্ধ জানায়।
আল্লাহ তাআলার কাছে বান্দার সবচেয়ে প্রিয় আচরণ এ-ই। মানুষ যখন নিজের শক্তির মূর্তি ভেঙে ফেলে, সামর্থ্যের মুকুট পায়ের কাছে নামিয়ে রাখে, সব আশা-ভরসা একমাত্র স্রষ্টার দিকে ঘুরিয়ে দেয়—তখনই আল্লাহর রহমত তাকে আগলে নেয়। সাফল্যের বন্ধ দরজাগুলি খুলতে থাকে, অন্তর্দৃষ্টির প্রস্রবণ ফুঁটে ওঠে, হিদায়তের দিগন্ত উজ্জ্বল হয়। মনে হয়, নম্রতাই সেই চাবি, যা ইলাহি অনুগ্রহের ভাণ্ডার খুলে দেয়।
কত বড় পার্থক্য তার মধ্যে, যার চোখ সৃষ্টির দিগন্তে আটকে আছে, আর তার মধ্যে, যে দৃষ্টি নিবদ্ধ রেখেছে স্রষ্টার দরজায়। এক জন আশ্রয়-আশ্রয় খুঁজে ফেরে, আরেক জন রব্বে কারীমের রহমতের ছায়ায় পনা নিবে। এক জনের হৃদয় সুপারিশের ঘিরে তওয়াফ করে, আরেক জন সরাসরি মালিক-ই-আর্য-ও-সামা-র দরবারে হাত পাতে। প্রথম জনের আশা সীমিত, দ্বিতীয় জনের আশা অসীম; প্রথম জনের ঠেকনা ক্ষণস্থায়ী, দ্বিতীয় জনের ঠেকনা অনন্ত।
এইজন্যই মু’মিনদের কাছে সত্যপথের সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য গাইড কোনো বাহ্যিক সত্তা নয়, বরং হৃদয়ের সেই নম্রতা, যা মানুষকে নিজের আসল অবস্থার সাথে পরিচিত করায় এবং প্রভুর সাথে সম্পৃক্ত করে। মানুষ যখন নিজের অসহায়ত্ব বোঝে, তখনই হিদায়তের দরজা খুলে যায়। তার বিনয় তার প্রদীপ, তার নতি তার পাথেয়, আর তার নম্রতা তার পথের খিজর হয়ে যায়।
ঐশ্বরিক নৈকট্য গন্তব্যে যাওয়ার মহাসড়কে সবচেয়ে উজ্জ্বল মিনার, সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য পথপ্রদর্শক ও সবচেয়ে সুরক্ষিত পাথেয়—নম্রতা। এই সেই খিজর, যা কখনও দিক হারায় না, আর যার দিশানির্দেশে চলা যাত্রী কখনও গন্তব্য-বঞ্চিত হয় না।
———
ক্যাটাগরি: #উপদেশ, #চরিত্র, #আধ্যাত্মিকতা, #ধর্মতত্ত্ব
✍ মূল : ড. মুহাম্মদ আকরাম নাদভী, অক্সফোর্ড।
✍ অনুবাদ: এই নিবন্ধটি AI দ্বারা অনুবাদ করা হয়েছে।
https://WhatsApp.com/channel/0029VbAxp2qGpLHHqQ3LoY0w