শিরোনাম : ওয়াসওয়াসা ও ঈমানের সংরক্ষণ
———–
| প্রশ্ন:
আসসালামু আলাইকুম, শায়খ। এটি শায়খ আকরাম বাংলা ফেসবুক পেইজের একজন পাঠিকার প্রশ্ন।
একজন বোন তার ঈমান নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তার মনে হয়, তার অবস্থা যেন সেই হাদিসের প্রতিফলন, যেখানে রাসূল সা. বলেছেন, এমন এক সময় আসবে যখন মানুষ সকালে মুমিন থাকবে, সন্ধ্যায় কাফির হয়ে যাবে; আবার সকালে কাফির, সন্ধ্যায় মুমিন।
তবুও তিনি আন্তরিকভাবে চান সব সময় ঈমানের ওপর অটল থাকতে। তিনি ফরজ নামাজ ও রোজা আদায় করেন, নফল ইবাদত করেন, অন্যদের দ্বীনের দিকে আহ্বান করেন এবং কুরআন তিলাওয়াত করতে সক্ষম। তার অন্তরে দ্বীনের ওপর দৃঢ় থাকার প্রবল আকাঙ্ক্ষাও রয়েছে।
কিন্তু এর পাশাপাশি তিনি অনুভব করেন, মাঝে মাঝে নিজের ঈমান নিয়ে তাকে ভেতরে ভেতরে কঠিন এক সংগ্রামের মধ্য দিয়ে যেতে হয়। এর কারণ কী হতে পারে, এবং এ অবস্থায় তার করণীয় কী? তিনি জানান, এই সমস্যা দীর্ঘদিন ধরে চলছে। শুরুতে যখন এটি অনুভব করেন, তখন দ্বীনের জ্ঞান খুব কম ছিল। এখন জ্ঞান ও সচেতনতা বাড়লেও তিনি পুরোপুরি এ থেকে মুক্ত হতে পারছেন না।
| উত্তর:
ওয়া আলাইকুমুস সালাম ওয়া রহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহ।
এই বোনের অবস্থা অত্যন্ত সতর্কতা, সূক্ষ্মতা ও আশ্বাসের সাথে বোঝা জরুরি। শুরুতেই পরিষ্কারভাবে বলা প্রয়োজন, তার অবস্থা সেই হাদিসের আওতাভুক্ত নয়, যেখানে বলা হয়েছে মানুষ এক সময় মুমিন, আরেক সময় কাফির হয়ে যায়।
সে হাদিস তাদের ব্যাপারে, যারা প্রবল ফিতনা, প্রবৃত্তি বা দুনিয়াবি চাপে সচেতনভাবে ও স্বেচ্ছায় তাদের ঈমানের ভিত্তি ত্যাগ করে বা আপস করে। কিন্তু যে মুমিন বাহ্যিক ও অন্তরে ইসলামের ওপর অটল থাকে, অথচ মাঝে মাঝে অন্তর্দ্বন্দ্ব, ক্ষণস্থায়ী সন্দেহ বা মানসিক অস্থিরতা অনুভব করে, তার ক্ষেত্রে এ হাদিস প্রযোজ্য নয়।
এই বোন যা অনুভব করছেন, সেটিকে অধিক সঠিকভাবে বলা যায়, ওয়াসওয়াসা। অর্থাৎ এমন এক ধরনের অনিচ্ছাকৃত চিন্তা বা কুমন্ত্রণা, যা মানুষের ইচ্ছার বাইরে আসে, এবং যাকে সে নিজেই অপছন্দ করে ও প্রতিহত করার চেষ্টা করে।
ইসলামি জ্ঞানচর্চায় এ বিষয়টি সুপরিচিত। আকিদা ও আত্মশুদ্ধির গ্রন্থগুলোতে এ নিয়ে বিস্তর আলোচনা রয়েছে। প্রকৃতপক্ষে, আন্তরিক ও দ্বীন-সচেতন মুমিনদের মধ্যেই এটি বেশি দেখা যায়, বিশেষত যারা নিজেদের ঈমান নিয়ে খুবই সতর্ক ও উদ্বিগ্ন।
এখানে একটি মৌলিক নীতি দৃঢ়ভাবে বুঝে নেওয়া জরুরি,
অপ্রত্যাশিত কোনো চিন্তা, সন্দেহ বা অন্তর্দ্বন্দ্বের উদয় হওয়া ঈমানের ক্ষতি করে না। বরং এ ধরনের চিন্তার প্রতি যে অস্বস্তি, দুশ্চিন্তা ও ঘৃণা অনুভূত হয়, সেটিই ঈমানের প্রমাণ।
এটি সেই বিখ্যাত ঘটনার মাধ্যমেও প্রমাণিত, যেখানে কিছু সাহাবি এমন কিছু চিন্তার কথা জানিয়ে উদ্বিগ্ন হয়েছিলেন, যা তারা উচ্চারণ করতেও ভয় পেতেন। তখন তাদের আশ্বস্ত করা হয়েছিল, এই চিন্তাগুলোর প্রতি তাদের বিরাগই হলো স্পষ্ট ঈমানের নিদর্শন।
অতএব, এই সংগ্রামকে কখনো নিফাক বা কুফরের লক্ষণ হিসেবে ভাবা যাবে না। বরং এটি একটি জীবন্ত, সজাগ ও সচেতন অন্তরের পরিচয় বহন করে।
এই বোনের নিজের কথাতেই তার সুস্থ অবস্থার স্পষ্ট প্রমাণ রয়েছে—
তিনি ফরজ ইবাদত আদায় করেন, নফল ইবাদতে যত্নবান, অন্যদের দ্বীনের দিকে আহ্বান করেন, কুরআন তিলাওয়াত করেন এবং ঈমানের ওপর দৃঢ় থাকার আন্তরিক ইচ্ছা রাখেন।
এগুলো কোনো ভেঙে পড়া ঈমানের লক্ষণ নয়; বরং এগুলো সেই মুমিনের পরিচয়, যিনি নিজের রবের সাথে সম্পর্ককে রক্ষা ও শক্তিশালী করতে নিরন্তর চেষ্টা করছেন।
তার এই অন্তর্দ্বন্দ্ব ঈমানের বিরোধী নয়; বরং ঈমানের পাশাপাশি চলমান একটি অবস্থা।
ওয়াসওয়াসার কারণ সাধারণত কয়েকটি বিষয়ে নিহিত—
এর একটি হলো শয়তানের কুমন্ত্রণা, যার লক্ষ্যই হলো মুমিনকে অস্থির করে তোলা এবং নিশ্চিত বিষয়েও সন্দেহ সৃষ্টি করা। লক্ষণীয় যে, শয়তান সাধারণত তাদেরকেই বেশি টার্গেট করে, যারা দ্বীনের ব্যাপারে সিরিয়াস; কারণ তাদের বিচলিত করা বেশি ফলপ্রসূ।
এছাড়া, দ্বীনের প্রতি অতিরিক্ত সংবেদনশীলতা মানুষকে নিজের চিন্তাগুলোর প্রতি অতিরিক্ত সচেতন করে তোলে। ফলে এমন অনেক বিষয়ও বড় মনে হয়, যা সাধারণত উপেক্ষিত হয়ে যেত। এভাবে ধীরে ধীরে এক ধরনের অভ্যন্তরীণ সতর্কতার চক্র তৈরি হয়, যা অজান্তেই ওয়াসওয়াসাকে টিকিয়ে রাখে।
এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এর চিকিৎসা।
শরিয়তের দিকনির্দেশনা এখানে অত্যন্ত স্পষ্ট এবং আশ্চর্যরকম বাস্তবসম্মত।
ওয়াসওয়াসার চিকিৎসা হলো, এতে জড়িয়ে না পড়া।
এই চিন্তাগুলো নিয়ে বিশ্লেষণ করা, নিজের ভেতরে তর্ক করা বা বারবার তা যাচাই করার চেষ্টা করা, এসব কিছুই এটিকে আরও শক্তিশালী করে।
সঠিক পন্থা হলো সচেতন উপেক্ষা,
এগুলোকে তুচ্ছ মনে করা, গুরুত্ব না দেওয়া এবং নিজের ইবাদত ও জীবনযাপন স্বাভাবিকভাবে চালিয়ে যাওয়া।