শিরোনাম : সর্বনিকৃষ্ট মূর্খতা
———-
তারা জিজ্ঞেস করল: সবচেয়ে বড় মূর্খতা কী?
আমি বললাম: আল্লাহর সঙ্গে শরিক করা, এটিই সবচেয়ে বড় মূর্খতা।
মুশরিকদের রূপ অনেক, কিন্তু তাদের সূচনা একটিই—শিরক। প্রকাশভঙ্গিতে তারা ভিন্ন ভিন্ন। কেউ মূর্তি গড়ে, স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণ করে, তারপর সেগুলোর সামনে সিজদায় লুটিয়ে পড়ে। কেউ সূর্য, চন্দ্র, নক্ষত্র, পৃথিবী, পাহাড়, সাগর, নদী, বৃক্ষ ও উদ্ভিদকে পূজা করে। আবার কেউ প্রাণী, পশু, পোকামাকড় এমনকি ক্ষুদ্র কীটকেও উপাস্য বানায়। আর একদল আছে, যারা ফেরেশতা, শয়তান, অত্যাচারী শাসক কিংবা আদমসন্তানের নেককারদের (জীবিত বা মৃত) ডেকে ডেকে সাহায্য চায়।
তারা বলল: আপনি শিরককে সবচেয়ে বড় মূর্খতা বললেন কেন? আমরা জানতে চাই, আপনি কী বোঝাতে চান?
আমি বললাম: তোমরা কী বলবে এমন একজনের ব্যাপারে, যাকে এক রাজা তার প্রাসাদে ডেকে নিলো, খেতে দিলো, পান করালো, পোশাক দিলো, ভালোবাসলো, অনুগ্রহে ভরিয়ে দিলো, আর সেই ব্যক্তি শেষে রাজাকেই অস্বীকার করল? অথচ সে রাজার দেওয়া পোশাক, বাসনপত্র, থালা, পেয়ালা, জগ, টেবিল এবং নানারকম খাদ্য-পানীয় গ্রহণ করল; বরং সে এগুলোকেই প্রশংসা, সম্মান, ভক্তি—এমনকি সিজদা ও ইবাদতের উপযুক্ত মনে করতে লাগল!
তারা বলল: আমরা তো কখনো শুনিনি কেউ কাপড় বা বাসনকে ধন্যবাদ জানায়! এ কেমন উদ্ভট উদাহরণ? আমরা বিস্মিত!
আমি বললাম: মূর্খতা তো বিস্ময়করই হয়। মুশরিক কি এমন কিছুর উপাসনা করে না, যা না তার ক্ষতি করতে পারে, না উপকার? যা তাকে কোনো কাজে আসে না, শোনে না, দেখে না, যার জ্ঞান নেই, ইচ্ছা নেই, জীবন নেই, মৃত্যু নেই; যা নিজে কিছু সৃষ্টি করতে পারে না, বরং নিজেই সৃষ্ট? তাহলে যে উদাহরণ তোমাদের এত অদ্ভুত লাগছে, তা কি তাদের ক্ষেত্রে খাটে না?
মুশরিকদের এই মূর্খতা এতটাই স্পষ্ট, তবু তারা তা দেখতে চায় না। তারা পশুর মতো, বরং তার থেকেও অধিক পথভ্রষ্ট।
তারা বলল: আপনি কীভাবে তাদের পশুর সঙ্গে তুলনা করলেন, বরং তার থেকেও নিকৃষ্ট বললেন?
আমি বললাম: আমি যদি একটি কুকুরকে বাটিতে করে খাবার দিই, সে কি আমাকে ধন্যবাদ দেবে, নাকি খাবার আর বাটিকে?
তারা বলল: সে আপনাকেই ধন্যবাদ দেবে, আপনার প্রতি অনুগত থাকবে।
আমি বললাম: কখনো কি দেখেছো, কুকুর নদী থেকে পানি পান করে নদীকে ধন্যবাদ জানায়?
তারা বলল: না।
আমি বললাম: যদি তুমি কুকুরের দিকে পাথর ছুঁড়ে মারো, সে কি পাথরের পেছনে ছুটে গিয়ে সেটাকেই কামড়াবে?
তারা বলল: না।
আমি বললাম: দেখো, কুকুরও বুঝতে পারে—কে দয়া করেছে, আর কোনটি সেই দয়ার মাধ্যম। অথচ মানুষকে যে বুদ্ধি দেওয়া হয়েছে, তা কুকুরকে দেওয়া হয়নি। তাহলে মুশরিকরা কি কুকুর ও অন্যান্য প্রাণীর চেয়েও বেশি পথভ্রষ্ট নয়?
আমি বললাম: মুশরিকদের জীবনের নানা ক্ষেত্রে ভয়াবহ বৈপরীত্য দেখা যায়।
তারা বলল: কীভাবে?
আমি বললাম: একজন মানুষ বলে, মূর্তি নাকি আল্লাহর প্রতীক এবং সমস্যার সমাধান দেয়। কিন্তু যদি তার সন্তান হারিয়ে যায়, আর তুমি তার সন্তানের একটি মূর্তি বানিয়ে বলো—এই নাও, এটাই তোমার ছেলে! তাহলে কি সে সন্তুষ্ট হবে এবং প্রকৃত সন্তানকে ছেড়ে দেবে?
তারা বলল: না।
আমি বললাম: মানুষ মন্দিরে গরুর মূর্তি পূজা করে, কিন্তু দুধের প্রয়োজন হলে কি তারা সেই মূর্তির কাছে যায়, নাকি আল্লাহ সৃষ্ট প্রকৃত গরুর কাছে?
তারা বলল: আমরা তো কাউকে গরুর মূর্তি দোহাতে দেখিনি।
আমি বললাম: যদি কেউ সোনার তৈরি মূর্তি চুরি করে নিয়ে যায়, সেই মূর্তিগুলো কি নিজেদের রক্ষা করতে পারে? অথবা চোর কোথায় লুকিয়েছে তা তাদের উপাসকদের জানাতে পারে?
তারা বলল: না।
আমি বললাম: এভাবে শিরকের সব ধরন গভীরভাবে বিবেচনা করো, মুশরিকরা আসলে কল্পনা ও মরীচিকার পূজা করে। যারা ফেরেশতা, জিন, মরিয়মপুত্র ঈসা, তাঁর মা এবং অন্যান্য সৃষ্টিকে ডেকে ডেকে সাহায্য চায়, তারা বিভ্রান্তির মাঝেই ঘুরপাক খাচ্ছে।
আমি বললাম: জেনে রাখো, আল্লাহই সমস্ত সৃষ্টিকে সৃষ্টি করেছেন, তাদের অস্তিত্ব, প্রতিপালন ও টিকে থাকার জন্য তিনি-ই তাদের একমাত্র নির্ভরতা। ছোট-বড় প্রতিটি বিষয়ে তারা তাঁরই মুখাপেক্ষী। তাঁর অনুগ্রহ ও দয়া ছাড়া সৃষ্টির জন্য কোনো কল্যাণ নেই। আর যদি তারা অবাধ্যতা করে, তবে তারা নিজেরাই নিজেদের ওপর জুলুম করে; যার পরিণতি স্পষ্ট অকল্যাণ এবং নিশ্চিত ক্ষতি।
———-
ক্যাটাগরি : ইসলামি চিন্তাধারা, ফিলোসোফি, তাজকিয়াহ, উপদেশ, সমালোচনা
✍ মূল : ড. মুহাম্মদ আকরাম নাদভী, অক্সফোর্ড।
✍ অনুবাদ যাচাই ও সম্পাদনা: মাওলানা মারজান আহমদ, সিলেট, বাংলাদেশ।
🔗 অনূদিত মূল প্রবন্ধের লিংক: 👇
https://t.me/DrAkramNadwi/2381