https://t.me/DrAkramNadwi/5784
بسم الله الرحمن الرحيم.
❝
:: মাওলানা সৈয়দ মুহাম্মদ ওয়াজিহ রশীদ নদভী রহ. দারুল উলুম নদওয়াতুল উলামার অন্যতম শ্রেষ্ঠ শিক্ষক ছিলেন। তিনি আরবি অনুবাদ ও রচনাশৈলীতে অসাধারণ দক্ষতা অর্জন করেছিলেন। আমাদের ছাত্রদের উপর যেমন তাঁর জ্ঞান ও সাহিত্যিকতার প্রভাব ছিল, তেমনি সৎকর্ম, তাকওয়া, নম্রতা ও সংযমে তিনি আমাদের জন্য এক অনন্য আদর্শ ছিলেন। আমি কখনো তাঁকে কারও গীবত করতে শুনিনি, আর না কোনো অনর্থক কথা বলতে দেখেছি। বরং তিনি অত্যন্ত স্বল্পভাষী ছিলেন।
তাঁর ইন্তেকালের পর আমি আরবি ভাষায় তাঁর জীবনী লিখেছি এবং উর্দু ভাষায় তাঁর উপর অনেক নিবন্ধ লিখেছি। তাঁর শিক্ষাদান ও প্রশিক্ষণ পদ্ধতি নিয়ে তাঁর জীবদ্দশায়ও আমি এক-দুটি নিবন্ধ লিখেছিলাম। কিন্তু মাওলানা সেগুলো পছন্দ করেননি। তিনি নিজের প্রশংসা ও প্রচার থেকে অত্যন্ত দূরে থাকতেন। তিনি আমাকে অত্যন্ত ভালোবাসতেন। তারপরও শেষ সাক্ষাতে, একান্তে আমাকে সতর্ক করেছিলেন যে, ভবিষ্যতে তাঁর সম্পর্কে কিছু না লিখি, কারণ এতে তিনি কষ্ট পান। আজ প্রথমবারের মতো আমি তাঁর এই উপদেশ প্রকাশ করছি।
এটা এমন এক সত্য যে, এতে কোনো দ্বিমত নেই—আল্লাহর প্রশংসায় অন্তর পরিশুদ্ধ হয়, বুদ্ধি আলোকিত হয়, এবং তাকওয়া ও সৎকর্ম বৃদ্ধি পায়। পক্ষান্তরে সৃষ্টিকুলের প্রশংসায় (বিশেষত অতিরঞ্জিত হলে) অন্তর অন্ধকারাচ্ছন্ন হয়, বুদ্ধি মলিন হয়, এবং আমলে অশুদ্ধতা আসে।
সৃষ্টিকুলের সব গুণ সীমিত। এই সাধারণ শাসন থেকে মানুষও মুক্ত নয়। যখন কোনো মানুষের প্রশংসা করা হয়, তখন সাধারণত দু’টি ক্ষতিকর বিষয় সৃষ্টি হয়:
১. প্রথম ক্ষতি হলো, যে গুণের কারণে মানুষের প্রশংসা করা হয়, তা থেকে মনে হতে পারে যে, এই গুণটি তার নিজস্ব। অথচ মানুষ আল্লাহর তৈরি। তার সব গুণই আল্লাহর সৃষ্টি। এটি আল্লাহর দান, করুণা ও অনুগ্রহ। এই গুণের কারণে যদি কেউ প্রশংসার যোগ্য হন, তবে তা একমাত্র রব্বুল আলামিন। তবে তিনি তাঁর দয়া ও করুণার মাধ্যমে মানুষকে কোনো পরিমাণ প্রশংসা করার অনুমতি দিয়েছেন। তাই প্রশংসার সময় এমন কিছু বলতে হবে, যা থেকে বোঝা যায় যে, এই গুণ তার নিজস্ব নয় বরং প্রদত্ত। মানুষের নিজের গুণ স্বীকার করা মিথ্যা ছাড়া আর কিছুই নয়। মিথ্যা অবশ্যই অন্তর কালো করে, আলোকিত করে না।
২. দ্বিতীয় ক্ষতি হলো, মানুষ সীমিত। তার শক্তি সীমিত, তার সময় ও স্থান সীমিত। ফলে তার সব গুণই সীমিত। যখন মানুষ তার কোনো বড় বা সম্মানিত ব্যক্তির প্রশংসা করে, তখন তাকে সীমাবদ্ধতার গণ্ডি থেকে বের করে ফেলার ভুল করে। যখন প্রশংসা সীমা অতিক্রম করে, তখন তা অবশ্যই মিথ্যা হয়। মিথ্যায় কখনো বরকত থাকে না, বুদ্ধি শুদ্ধ হয় না, আমলও সঠিক হয় না। এই মিথ্যা প্রশংসাই পরে পবিত্রতার মর্যাদা লাভ করে। এরপর সেখান থেকে শিরক ও কুফর উৎপন্ন হয়। মূর্তিপূজা, মূর্তি নির্মাণ, মহাপুরুষ পূজা ও কবর পূজা—সবই শিরক ও কুফরের নোংরা ধারাপ্রবাহ।
আল্লাহ তাআলার সত্তার কোনো সীমা নেই। তার কোনো শুরু বা শেষ নেই। তিনি সব কিছুর স্রষ্টা ও মালিক। তিনি রব্বুল আলামিন এবং আরহামুর রাহিমিন। তাঁর শক্তির কোনো সীমা নেই এবং না তাঁর জ্ঞানের কোনো সীমা। সব কিছু তাঁর ইচ্ছাধীন।
আমাদের ভাষার সীমিত শব্দাবলী তাঁর গুণাবলী প্রকাশে অক্ষম। বাগ্মী ও সাহিত্যিকদের সব কৌশল তাঁর প্রশংসার সামান্যতম অংশ বর্ণনা করতেও ব্যর্থ।
যদি সমুদ্রগুলো কালিতে পরিণত হয় এবং সব গাছপালা কলম হয়ে যায় এবং তার নিদর্শনগুলো লিখতে শুরু করে, তবে সমুদ্র ও গাছপালা শেষ হয়ে যাবে, কিন্তু তাঁর শব্দ শেষ হবে না। এমনকি অতগুলো সমুদ্র ও গাছপালা বারবার তৈরি হলেও তারা তাঁর গুণাবলীর সামান্য অংশও লিখতে পারবে না। বরং সত্য কথা হলো, যদি সমস্ত সমুদ্রের কালি কেবল সমুদ্রের মধ্যে লুকানো আল্লাহর নিয়ামতগুলো গণনা করার জন্য ব্যবহৃত হয়, তবে সেগুলোও যথেষ্ট হবে না।
প্রজ্ঞাবানদের কাছে এটি দিনের আলোর মতো স্পষ্ট যে, যদি সমস্ত বিজ্ঞানী ও ডাক্তাররা আল্লাহ তাআলা মানুষের ক্ষুদ্রতম আঙুলের ভেতরে যে গোপন রহস্য রেখেছেন তা জানার জন্য তাদের জীবন উৎসর্গ করেন, তবুও তারা তা কখনো পুরোপুরি জানতে পারবে না। এই ক্ষুদ্র আঙুলের বাস্তবতা সব মানুষের জ্ঞানের চেয়ে বেশি হবে।
এই মহাবিশ্বে কে আছে যে জীবন-মৃত্যুর অসীম রহস্য সমাধান করতে পারে? কে আকাশের সীমাহীনতা লিপিবদ্ধ করতে পারে? কে পারে মানুষের মস্তিষ্কের প্রকৃতি বিশ্লেষণ করতে ? কে পারে ভালোবাসা-ঘৃণার অর্থ প্রকাশ করতে ? কে স্মরণ-বিস্মরণের ধাঁধা বুঝতে পারে? কে স্থান ও অস্থানের সংজ্ঞা দিতে পারে?
বুদ্ধি হতবাক হয়ে যাবে, মন থমকে যাবে, দৃষ্টিও বিস্মিত হয়ে যাবে, হৃদয় জমে যাবে। কিন্তু এই দৃশ্যমান এবং অদৃশ্য স্রষ্টার কোনো সামান্য সৃষ্টির রহস্যও উদঘাটিত হবে না।
কতটা নির্বোধ সেই ব্যক্তি, যে সর্বজ্ঞ ও সর্বশক্তিমান আল্লাহর সামনে অন্য কারও প্রশংসা করার সাহস করে! কে সেই জ্ঞানহীন শত্রু, যে আল্লাহর মহিমার সামনে নিজেকে ভুলতে পারে না? সকল নবী যদি নূহ (আঃ)-এর জীবনকাল পান, তবুও তারা আল্লাহর প্রশংসার একটি কণাও বর্ণনা করতে সক্ষম হবে না। সকল ফেরেশতা যদি কোটি কোটি বছর সিজদা অবস্থায় থেকে তাঁর তাসবীহ পাঠ করেন, তবুও তারা আল্লাহর জ্ঞান ও শক্তির কোনও অংশ ধারণ করতে পারবে না।
মহান সেই সত্তা, যার তাসবীহ জ্ঞানের খাদ্য। বরকতময় সেই সত্তা, যার প্রশংসা অন্তরের প্রাণ। উচ্চ মর্যাদার সেই সত্তা, যার প্রশংসা সৃষ্টির মর্যাদা বৃদ্ধি করে।
হে সীমাহীন এবং সর্বব্যাপী আল্লাহ! আমরা তোমার প্রশংসা করতে অক্ষম। আমরা তোমার নিয়ামতের শোকর আদায়ে অপারগ। আমরা নির্বুদ্ধিতা ও অহংকারে নিমগ্ন। আমরা অস্তিত্বহীন, এবং আমাদের পূর্বপুরুষেরাও অস্তিত্বহীন। অস্তিত্বহীনতাই আমাদের প্রকৃতি। আমাদের কোনো দক্ষতা নেই, আমরা সকল গুণ থেকে বঞ্চিত। আমরা তোমার সৃষ্টি, এবং আমাদের মধ্যে যে কোনও গুণ রয়েছে, তা একমাত্র তোমারই।
শুধুমাত্র তুমিই প্রশংসার যোগ্য। আমাদের ত্রুটিগুলো ক্ষমা কর, আমাদের গুনাহগুলোকে উপেক্ষা কর, এবং তোমার কেবল নিজ অনুগ্রহ ও দয়ায় দুনিয়া ও আখিরাতে আমাদের ওপর বিশেষ রহমতের বৃষ্টি বর্ষণ কর। আমিন, ইয়া আরহামার রাহিমিন।
————
# জীবনী বিষয়ক আলোচনা # শিক্ষা
লিখেছেন :
মুহাম্মাদ আকরাম নাদভী – অক্সফোর্ড।
অনুবাদ যাচাই ও সম্পাদনা:
মাওলানা মারজান আহমদ, সিলেট, বাংলাদেশ।