শিরোনাম : চিন্তার ভুল থেকে কীভাবে বাঁচা যায়?
(নদওয়ার ফারেগীনদের উদ্দেশে ভাষণ)
بسم الله الرحمن الرحيم
এ কথা দেখে গভীর কষ্ট হয় যে, আমাদের অনেক ফারেগীন রচনা ও লেখালেখির ক্ষেত্রে চিন্তা ও ভাষা, উভয় দিক থেকেই ত্রুটিপূর্ণ ভুলে আক্রান্ত, অথচ তারা নিজেরাই সে সম্পর্কে সচেতন নন। অথচ নদওয়ার দুই মহান ব্যক্তিত্ব, আল্লামা শিবলী নুমানী ও আল্লামা সাইয়্যিদ সুলায়মান নাদভী, উর্দু প্রবন্ধ রচনা ও সাহিত্যিক উপস্থাপনাকে বিস্ময়কর উচ্চতায় পৌঁছে দিয়েছিলেন।
ভাষার শুদ্ধতা মানে শুধু এই নয় যে, বক্তব্য বানান ও ব্যাকরণের ভুল থেকে মুক্ত থাকবে; বরং তার সঙ্গে এটাও জরুরি যে তা যেন বাগ্মিতা ও অলংকারের মানদণ্ডে উত্তীর্ণ হয়। একইভাবে চিন্তার শুদ্ধতা মানে কেবল এই নয় যে দাবি প্রমাণ-সমর্থিত হবে; বরং এর সঙ্গে এটাও প্রয়োজন যে তাতে যতদূর সম্ভব দৃষ্টিভঙ্গির নীতিগুলোর যথাযথ প্রয়োগ ঘটবে। এই প্রবন্ধে সেসব নীতিরই আলোচনা করা হয়েছে, প্রথমে সংক্ষেপে, তারপর বিস্তারিতভাবে।
সংক্ষেপে:
চিন্তার ভুল থেকে বাঁচার সারকথা হলো—আপনি যখনই কিছু লিখবেন, নিজের লেখার সমালোচক হয়ে উঠুন। আপনার লেখার প্রতিটি অংশ নিয়ে যে প্রশ্নগুলো উঠতে পারে, সেগুলো মনে রাখুন এবং চেষ্টা করুন আপনার লেখা যেন সেই সব আপত্তি ও সংশয়ের ঊর্ধ্বে থাকে, যা এই বিষয়ের কোনো বিশেষজ্ঞ বা অভিজ্ঞ পাঠকের মনে জাগতে পারে। পাঠকের কাছে স্পষ্ট হয়ে উঠুক, আপনার মনে কী কী প্রশ্ন উত্থাপিত হয়েছে এবং আপনি কত দক্ষতার সঙ্গে সেগুলোর সমাধান করেছেন। সমালোচনাবোধ যত পরিপক্ব হবে, ততই আপনি ভুল থেকে নিরাপদ থাকবেন। আর এই গুণটি গড়ে ওঠে ব্যাপক অধ্যয়ন ও শক্তিশালী বিশ্লেষণক্ষমতার মাধ্যমে।
বিস্তারিত আলোচনা:
বিস্তারিত আলোচনার কয়েকটি মৌলিক উপাদান রয়েছে :
১. কেন্দ্রীয় বিষয়:
প্রতিটি প্রবন্ধের একটি কেন্দ্রীয় বিষয় থাকে। প্রয়োজন হলো, সেই বিষয়টি আপনার মনে সুস্পষ্ট থাকা এবং আপনার লেখার প্রতিটি অংশ যেন যুক্তিসঙ্গতভাবে সেই কেন্দ্রীয় বিষয়ের সঙ্গে সংযুক্ত থাকে। যে অংশ এই কেন্দ্রীয় বিষয়ের সঙ্গে সম্পর্কিত নয়, তা অতিরিক্ত ও অপ্রয়োজনীয়, এবং লেখাকে এসব বাড়তি অংশ থেকে মুক্ত রাখা উচিত। অপ্রাসঙ্গিক প্রসঙ্গও একই শ্রেণিতে পড়ে। মাওলানা মনাযির আহসান গিলানীর “হিন্দুস্তানের শিক্ষা ও তরবিয়ত ব্যবস্থা” গ্রন্থটি এ ধরনের অতিরিক্ত প্রসঙ্গ ও বিস্তারে পরিপূর্ণ, যার ফলে এর উপকারিতা অনেকাংশে ক্ষুণ্ন হয়েছে। জ্ঞানীজনদের মধ্যে এ ত্রুটি এড়ানোর দুটি স্বীকৃত পদ্ধতি আছে, একটি হলো, অতিরিক্ত প্রসঙ্গকে আলাদা প্রবন্ধে রূপ দেওয়া; আর যদি কোনো কারণে তা অপরিহার্য হয়, তবে সংক্ষেপে তা ফুটনোটে উল্লেখ করা।
২. দাবি (দলিলের ভিত্তি):
কেন্দ্রীয় বিষয়টি প্রমাণ করার জন্য আপনি নানা দাবি উত্থাপন করেন, যেগুলোকে مقدمات বলা হয়। এসব মুকাদ্দিমার ওপর সমালোচনামূলক দৃষ্টি দেওয়া জরুরি; কারণ এগুলো যত সঠিক হবে, আপনার বক্তব্য তত বেশি জ্ঞানসম্মত হবে। উদাহরণস্বরূপ, আপনি যদি বলেন, অমুক রাষ্ট্র অবৈধ, তবে সঙ্গে সঙ্গে নিজেকে প্রশ্ন করুন: একটি রাষ্ট্র অবৈধ হওয়ার অর্থ কী? অথবা আপনি যদি “অবৈধ দখল” শব্দটি ব্যবহার করেন, তবে সেই পরিভাষার স্পষ্ট ব্যাখ্যা দেওয়া আপনার জন্য অপরিহার্য। এই ব্যাখ্যা প্রথমে আপনাকেই উপকৃত করবে, তারপর পাঠককে।
৩. বিরোধী দাবি:
শুধু সেই দাবিগুলোই উল্লেখ করবেন না, যা আপনার মূল বক্তব্যকে শক্তিশালী করে; বরং সেসব বিরোধী দাবিকেও সামনে আনুন, যা আপনার যুক্তির দুর্বলতা প্রকাশ করতে পারে। এর সুফল হলো, আপনি এবং আপনার পাঠক উভয়েই ভারসাম্য ও সংযমের পথে চলতে পারবেন। যেমন, অবৈধ দখলের প্রসঙ্গে বলা যায়, মুসলমানরা যে সব দেশ দখল করেছিলেন, সেগুলো কি অবৈধ ছিল না? ইসলামী ফিকহে “عنوة” পরিভাষা কি অবৈধকে বৈধ করে দেওয়ার পথ তৈরি করে না?
৪. সামগ্রিক বিধান ও ব্যতিক্রম:
প্রতিটি সাধারণ বিধানেরই কোনো না কোনো ব্যতিক্রম থাকে, কখনো কখনো সেই ব্যতিক্রমের সংখ্যা অনেক বেশি হয়। সাধারণত তরুণ ও অনভিজ্ঞদের দৃষ্টি কেবল সার্বিক বিধানের দিকে থাকে, ফলে তারা প্রজ্ঞা থেকে দূরে সরে যায়। উদাহরণস্বরূপ, অনেক আবেগপ্রবণ ব্যক্তি বলেন—মুসলমানদের সঙ্গে আল্লাহর সাহায্য রয়েছে। কিন্তু ভেবে দেখুন, এই সাধারণ বক্তব্য কি সব ধরনের ব্যতিক্রম থেকে মুক্ত?
৫. সূত্র ও উদ্ধৃতি:
প্রবন্ধে যখন কোনো ব্যক্তির বক্তব্য উদ্ধৃত করবেন, তখন অবশ্যই তার সূত্র উল্লেখ করুন। সূত্রবিহীন বক্তব্য আপনার দাবিকে দুর্বল করে দেয়। সূত্র উল্লেখের সময় প্রাথমিক ও গৌণ গ্রন্থের পার্থক্য বজায় রাখুন। আর এমন গ্রন্থের উদ্ধৃতি কখনো দেবেন না, যা মূল উৎস হিসেবে গণ্য নয়। অনেক আলেম “মিশকাতুল মাসাবিহ”, “বুলূগুল মারাম” ইত্যাদি গ্রন্থকে সরাসরি উৎস হিসেবে উল্লেখ করেন, যা তাদের বিদ্বৎসম্মানকে ক্ষুণ্ন করে।
এই নীতিগুলো মেনে চললে লেখার ভেতর চিন্তার দৃঢ়তা, ভাষার সৌন্দর্য এবং উপস্থাপনার ভারসাম্য—সবই একসঙ্গে বিকশিত হবে, আর লেখক ধীরে ধীরে ত্রুটি থেকে মুক্ত এক পরিণত সাহিত্যিক হয়ে উঠবেন।