Skip to main content

AkramNadwi

আমি মৃত্যুকে ভয় করি না
——-

তাবেয়ী মহাপুরুষ খালিদ ইবনে মাআদান রাহমাতুল্লাহি আলাইহির জীবনীকারগণ এ বিষয়ে একমত যে, তিনি মৃত্যুকে ভালোবাসতেন। তিনি বলতেন, যদি কোথাও মৃত্যুকে একটি চিহ্ন হিসেবে স্থাপন করা হতো, আর মানুষ সেখানে পৌঁছানোর জন্য প্রতিযোগিতায় নামত, তবে আমিই সবার আগে সেখানে পৌঁছে যেতাম।

আবু উসামা বলেন, আমরা যখন সুফিয়ান সাওরীর কাছে বসতাম, তখন তাঁর মুখে সর্বদা মৃত্যুর কথাই শুনতাম। একবার সুফিয়ান সাওরী আমাদের সামনে সাওরের সূত্রে খালিদ ইবনে মাআদানের এই উক্তি বর্ণনা করেন যে, যদি মৃত্যু এমন একটি পথচিহ্ন হতো, যার দিকে মানুষ দৌড়ে প্রতিযোগিতা করত, তবে আমার চেয়ে শক্তিশালী কেউ না হলে কেউই আমাকে অতিক্রম করতে পারত না। আবু উসামা বলেন, খালিদ ইবনে মাআদানের এই কথা শোনার পর থেকেই সুফিয়ান সাওরীর অন্তরে তাঁর প্রতি গভীর ভালোবাসা জন্মে যায়।

কিন্তু আমাদের অবস্থা তার সম্পূর্ণ বিপরীত। আমরা মৃত্যুকে ভীষণ ভয় পাই। কোনো সভায় এর নাম উচ্চারিত হওয়াও আমাদের ভালো লাগে না। মৃত্যুভয় আমাদের ওপর এতটাই প্রভাব বিস্তার করেছে যে, যেকোনো জিনিসে মৃত্যুর আভাস পেলেই আমরা আতঙ্কিত হয়ে উঠি, এমনকি মৃত্যুর কল্পনাতেও আমরা শিউরে উঠি। কবরস্থানের পাশ দিয়ে যেতে ভয় লাগে, কাউকে মৃত্যুযন্ত্রণায় কাতর হতে দেখলে হৃদয় ভারী হয়ে আসে, শরীর কেঁপে ওঠে, খাওয়া-দাওয়ার স্বাদ চলে যায়। এ কারণেই হাদিসে মৃত্যুকে বলা হয়েছে লালসা ও ভোগবিলাস ধ্বংসকারী।

মৃত্যু হলো এই দুনিয়া থেকে বিদায়, প্রিয়জন ও আপনজনদের থেকে বিচ্ছেদ। আমরা আসলে কী? মৃত্যুর ভয় এমন এক বাস্তবতা, যা বড় বড় ইমামদেরও বিচলিত করে তুলেছে। একবার হাসান বসরী রাহুমাতুল্লাহি আলাইহি একজন অসুস্থ ব্যক্তির খোঁজ নিতে গেলেন। তিনি দেখলেন, লোকটি মৃত্যুযন্ত্রণায় ছটফট করছে, তীব্র কষ্ট ও যন্ত্রণায় নিমজ্জিত। এই দৃশ্য তাঁর হৃদয়ে গভীর রেখাপাত করে। তিনি ভারাক্রান্ত মনে ফিরে এলেন। বাড়িতে তাঁর সামনে খাবার পরিবেশন করা হলে তিনি বললেন, এগুলো সরিয়ে নাও। আজ আমি মৃত্যুর এক মর্মান্তিক দৃশ্য দেখেছি। এখন থেকে নিজের মৃত্যুর জন্য প্রস্তুতি নেওয়াতেই আমি ব্যস্ত থাকব।

সুফিয়ান সাওরী ও খালিদ ইবনে মাআদানের মতো মানুষদের কথা আমরা বইয়ে পড়ি বটে, কিন্তু বাস্তবে এমন কাউকে খুঁজে পাওয়া কঠিন, যিনি তাদের মতো মৃত্যুকে ভালোবাসেন, বা অন্তত তাকে ভয় পান না। মৃত্যুভয় স্বাভাবিক, কিন্তু আমাদের এই অতিরিক্ত ভয়ের পেছনে রয়েছে আমাদের কুকর্ম, ঈমানের দুর্বলতা এবং প্রভুর সাথে সাক্ষাতের আকাঙ্ক্ষার অভাব।

নদওয়ার উপ-নাজিম মাওলানা সাইয়্যেদ মুহাম্মদ হামযা হাসনী, যিনি সদ্য জুমার দিনে ইন্তিকাল করেছেন, তিনি ছিলেন যুহদ, স্বল্পভাষিতা, বিনয় এবং খ্যাতি থেকে দূরে থাকার ক্ষেত্রে অতীতের সৎ মানুষের এক জীবন্ত প্রতিচ্ছবি। সাধারণত তাঁর গুণাবলি ও মহত্ত্ব তাঁর সমসাময়িকদের কাছেও অজানা ছিল। আমরা তাঁর সঙ্গে দেখা করতাম, কিন্তু আমাদের পরিচয় ছিল খুবই সামান্য। তাঁর চরিত্রের সৌন্দর্য ও মহত্ত্ব আমাদের কাছে গোপনই ছিল। মৃত্যুর পর তাঁর পরিবারের সদস্য ও নিকটজনদের কাছ থেকে তাঁর যে গুণাবলির কথা শোনা যাচ্ছে, তা আমাদের বিস্মিত করছে এবং আমাদের হৃদয়ে তাঁর মর্যাদা বহুগুণে বাড়িয়ে দিয়েছে।

অনেকের কাছ থেকে শোনা যায়, যখন তিনি দেখতেন তাঁর পরিবারের লোকেরা মৃত্যুকে ভয় পাচ্ছে, তখন তিনি বলতেন, তোমরা কি মৃত্যুকে ভয় পাও? আমার তো মৃত্যুকে ভয় লাগে না। এই সংক্ষিপ্ত বাক্যের মধ্যে যে ঈমান, যে দৃঢ় বিশ্বাস, যে আল্লাহর সঙ্গে গভীর সম্পর্ক, যে দুনিয়ার প্রতি অনাসক্তি লুকিয়ে আছে, তার গভীরতা আমাদের মতো দুনিয়ায় ডুবে থাকা মানুষদের পক্ষে উপলব্ধি করা কঠিন। এই একটি বাক্যই আমার অন্তরে তাঁর প্রতি গভীর ভালোবাসা সৃষ্টি করেছে।

হায়, অঙ্গীকারের সেই প্রাচীন যুগের এক প্রহরী আজ বিদায় নিলেন। যিনি ছিলেন সৌন্দর্যের অন্বেষণে মগ্ন, তিনি আজ চলে গেলেন। এই আসর থেকে এক নির্বাক কাইস বিদায় নিল, এই মহফিল থেকে এক পাগল অথচ প্রাজ্ঞ মানুষ চলে গেলেন। আল্লাহ তাঁর ওপর রহমত বর্ষণ করুন এবং তাঁকে চিরস্থায়ী জান্নাত দান করুন।

কতই না সৌভাগ্যবান সেই পবিত্র আত্মাগণ, যারা এই নশ্বর জগতের প্রকৃত স্বরূপ উপলব্ধি করেছে, যারা এর মোহময়তা থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে, যারা রাজা-বাদশাহর দরবারকে তুচ্ছ জ্ঞান করে, যারা এই পৃথিবীর সংকীর্ণতায় ক্লান্ত, যারা মায়ার মরীচিকায় প্রতারিত হয় না, যাদের দৃষ্টি নিবদ্ধ থাকে আখিরাতের নিয়ামতের দিকে, যারা জান্নাত ছাড়া অন্য কিছুর ওপর সন্তুষ্ট নয়, যারা ফিরদাউসের বিস্তৃতির মূল্য বোঝে, যাদের কাছে আল্লাহর সেই বাণীর রহস্য উন্মোচিত হয়েছে যে, সেখানে দেখবে অফুরন্ত নিয়ামত আর এক মহা রাজ্য, যারা আল্লাহর সান্নিধ্যের আকাঙ্ক্ষায় উদ্বেল।

হে পরম প্রতিপালক, আমাদের এমন প্রজ্ঞা দান করুন, যাতে আমরা এই দুনিয়াকে প্রকৃত রূপে দেখতে পারি, ক্ষণস্থায়ী সম্পদ ও নশ্বর ভোগবিলাস থেকে বিমুখ হতে পারি, আপনার সাক্ষাতের আকাঙ্ক্ষা আমাদের অন্তরে প্রাধান্য পায়, এবং আমরা আপনার দরবারে উপস্থিতির প্রস্তুতিতে নিজেদের নিয়োজিত করতে পারি। আমাদের জীবনের প্রতিটি মুহূর্ত যেন আপনার আনুগত্যে অতিবাহিত হয়।

হে আমাদের মালিক, আমাদের সৎ করে দিন, আমাদের এমন দহন, এমন ব্যথা ও বেদনা দান করুন, যা আমাদের বস্তুগত ভোগ থেকে মুক্ত করে দেয় এবং ইবাদত ও আনুগত্যের চিরস্থায়ী আনন্দের সঙ্গে আমাদের পরিচিত করে তোলে। আমিন।

———-

ক্যাটাগরি: তাজকিয়াহ, উপদেশ, স্মরণ

✍ মূল : ড. মুহাম্মদ আকরাম নাদভী, অক্সফোর্ড।
✍ অনুবাদ যাচাই ও সম্পাদনা: মাওলানা মারজান আহমদ, সিলেট, বাংলাদেশ।
🔗 অনূদিত মূল প্রবন্ধের লিংক: 👇
https://t.me/DrAkramNadwi/2918

শেয়ার করুন:

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *