শিরোনাম : নদওয়ার বিষণ্ন ঈদ
|২০|০৩|২০২৬|
بسم الله الرحمن الرحيم
সেই ঈদটি আমার স্মৃতিতে এমন এক ক্ষতের মতো গেঁথে আছে, যা চোখে ধরা পড়ে না, সহজে ভাষায়ও ধরা যায় না; কিন্তু সময় সময় তার অস্তিত্ব এমনভাবে জানান দেয়, যেন নীরবতার কোনো বন্ধ দরজার আড়াল থেকে কেউ অবিরাম কড়া নাড়ছে। দিনটি ছিল আনন্দের, কিন্তু আমাদের জন্য আনন্দ যেন কোনো পুরোনো অভিধান থেকে মুছে গিয়েছিল।
আমি আর আমার বন্ধু আফতাব আলম আযমী, সফরের ক্লান্তি বয়ে, ঠিক ঈদের দিনই যখন নদওয়ায় পৌঁছালাম, তখন মনে হলো, আমরা যেন কোনো জীবন্ত প্রতিষ্ঠানে নয়, বরং এমন এক নগরে প্রবেশ করছি, যেখানে জীবন নেই, শুধু স্মৃতিগুলোই নিঃশ্বাস নেয়।
নদওয়া যে জায়গা শিক্ষাজীবনের দিনগুলোতে জ্ঞান ও চিন্তার এক প্রবহমান নদী হয়ে থাকত, সেদিন মনে হচ্ছিল, যেন সেই নদীর জল কোনো অজানা মরুভূমি শুষে নিয়েছে, আর উপরে পড়ে আছে শুধু শুষ্ক পাথরের নিষ্প্রাণ ঝিলিক। না ছিল ছাত্রদের হাসি, না পায়ের শব্দ, না কোনো বিদ্যাচর্চার প্রতিধ্বনি। চারদিকে এমন নিস্তব্ধতা, যেন দেয়ালগুলোও কথা বলতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে, আর সময় নিজেই এই জায়গাটিতে থেমে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। করিডোরে হাঁটতে হাঁটতে মনে হচ্ছিল, আমরা যেন কোনো স্বপ্নের ভেতর দিয়ে চলছি; কিন্তু এমন এক স্বপ্ন, যার কোনো ব্যাখ্যা নেই, আছে শুধু ক্লান্তি।
রমজানের ছুটি আর বার্ষিক পরীক্ষার কারণে পুরো ক্যাম্পাস প্রায় ফাঁকা। কিছু শিক্ষক আর তাঁদের পরিবার ছিল বটে, কিন্তু তারাও যেন কোনো বিশাল কাফেলার পর পড়ে থাকা ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা ছায়া। স্থাপনাগুলো তাদের জ্ঞানগরিমা নিয়েও অচেনা লাগছিল, যেন এক জনবহুল শহর থেকে হঠাৎ আনন্দ হিজরত করে গেছে, আর ইট-পাথর নিজেরই শূন্যতায় বিস্মিত হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।
আমরা যখন নিজের কক্ষে ঢুকলাম, নীরবতা এমনভাবে আমাদের অভ্যর্থনা জানাল, যেন সে আগেই সেখানে অপেক্ষা করছিল। ঘরটি ছিল নির্জীব, নিররঙ, যেন সেও উৎসব উদ্যাপন করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে।
আমরা নিজের হাতে কিছু সবজি রান্না করে খেলাম। সেটি যেন খাবার ছিল না, ছিল এক প্রকার বাধ্যতা, যেমন কোনো পথিক নির্জন স্টেশনে সময় কাটানোর জন্য ঠান্ডা চা পান করে। প্রতিটি লোকমা মনে হচ্ছিল, যেন স্বাদ নয়, নীরবতাকেই গিলে ফেলা হচ্ছে।
এই ঈদে সবকিছুই ছিল, অথচ ঈদটাই অনুপস্থিত। না ছিল সেমাই, না মিষ্টির ঘ্রাণ, না ঈদির খাম, না কোনো দরজায় কড়া নাড়া, না কোনো দাওয়াতের প্রতীক্ষা। মনে হচ্ছিল, উৎসব তার সমস্ত রঙ-রূপ গুটিয়ে কোনো বেশি প্রাণবন্ত জগতে চলে গেছে, আর আমরা পড়ে আছি তার ফাঁকা খোলসে।
নদওয়ার যে পরিবেশ সাধারণ দিনে ছাত্রদের কোলাহল আর বিদ্যাচর্চার সুরে মুখর থাকে, সেদিন তা এমন ছিল, যেন হঠাৎ কোনো শহরে কারফিউ জারি হয়েছে। চারদিকে এক ভারী নীরবতা, এমন নীরবতা যা শুধু নীরব নয়, দমবন্ধ করা, যেন বাতাসও শ্বাস নিতে ভয় পাচ্ছে।
আমরা যা রান্না করেছিলাম, তা ছিল শুধু সাধারণ এক সবজি, তাতে না ছিল ঈদের কোমলতা, না আনন্দের স্বাদ। মনে হচ্ছিল, আমরা কোনো উৎসবে নয়, বরং এক ধরনের বেঁচে থাকার বাধ্যতায় টিকে আছি। না কোনো বিশেষ পদ, না কোনো সুগন্ধ, না কোনো ঘরের স্মৃতি, শুধু একটি হাঁড়ি, আর তার সামনে বসে থাকা আমরা দু’জন নীরব পথিক।
সবচেয়ে বড় বেদনা ছিল, আমরা নিজেদের সান্ত্বনা দেওয়ার চেষ্টাও করিনি। সাধারণত এমন দিনে মানুষ কাউকে ফোন করে, কারও দরজায় যায়, অথবা অন্তত নিজের মনকে এই ভ্রান্ত সান্ত্বনা দেয় যে ঈদ তো আছে। কিন্তু এখানে না ছিল সে পরিবেশ, না সেই মানসিক শক্তি। আফতাব আলম আযমী আর আমার মধ্যে কথার চেয়ে নীরবতাই ছিল বেশি, যেন শব্দগুলোও এই দিনের নির্জীবতায় ক্লান্ত হয়ে সরে গিয়েছিল।
এই ঈদ কোনো সাধারণ একাকিত্বের ঈদ ছিল না। এটি ছিল ঠিক তেমন এক ঈদ, যা কোনো প্রিয়জনের ইন্তেকালের পরপরই এসে পড়ে, যখন ঘর থাকে, কিন্তু ঘরে “কেউ” থাকে না। সেই একই দেয়াল, একই আলো, একই আঙিনা, কিন্তু সবকিছুর মাঝখানে দাঁড়িয়ে থাকে এক গভীর অনুপস্থিতি, যা প্রতিটি উপস্থিত জিনিসকে অর্থহীন করে দেয়। তখন আনন্দ শুধু একটি শব্দ হয়ে থাকে, অনুভূতি নয়।
আমার গভীরভাবে উপলব্ধি হয়েছিল, এটি শুধু সরলতা বা নির্জনতা ছিল না; বরং এটি ছিল এক সম্মিলিত বঞ্চনা, যেখানে উৎসবও তার অর্থ হারিয়ে ফেলে। এটি ছিল এমন এক মুহূর্ত, যখন ঈদ ক্যালেন্ডারে ছিল, কিন্তু জীবনে ছিল না, যেন আলো আছে, কিন্তু চোখ অন্ধ হয়ে গেছে।
আজ যখন সেই ঈদের কথা মনে পড়ে, তখন অক্সফোর্ডের নিঃসঙ্গতাও তার তুলনায় কিছুটা হালকা, কিছুটা সুশৃঙ্খল মনে হয়। সেখানে অন্তত নিঃসঙ্গতারও একটি বিন্যাস ছিল। কিন্তু নদওয়ার এই নীরবতা ছিল এক গভীর, ভারী শূন্যতার মতো, যা চারপাশের সবকিছুকে নিজের ভেতরে টেনে নিচ্ছিল।
এই ঈদ আমার জন্য আনন্দের দিন ছিল না; বরং এমন এক অভিজ্ঞতা ছিল, যা আমাকে শিখিয়েছে, কখনো কখনো উৎসব কেবল ক্যালেন্ডারেই থেকে যায়, হৃদয়ে নয়। আর কিছু দিন এমনও আসে, যেগুলো জন্ম নেয় আনন্দের জন্য, কিন্তু অন্তরের শূন্যতা সেগুলোকে শোকে পরিণত করে, ঠিক সেই ঈদের মতো, যা ছিল নীরব, ছিল বিবর্ণ, এবং নিজেরই আনন্দহীনতায় নিঃশব্দে পেরিয়ে