AkramNadwi

রামাদান: আত্মার পুনর্জাগরণের মাস

রামাদান: আত্মার পুনর্জাগরণের মাস

|১৫|০২|২০২৬|

بسم الله الرحمن الرحيم
শিক্ষার্থীরা প্রায়ই জানতে চায়, এমনভাবে কীভাবে রামাদানকে বরণ ও যাপন করা যায়, যাতে তা ক্ষণিক ধর্মীয় আবেগের উচ্ছ্বাসে সীমাবদ্ধ না থেকে জীবনে স্থায়ী ও গভীর রূপান্তরের সূচনা ঘটায়?

এই প্রশ্ন কেবল ভক্তিমূলক নয়; এটি দার্শনিকও। রামাদান কোনো বিচ্ছিন্ন পবিত্র বিরতি নয়, যা জীবনের অবিরাম প্রবাহের মাঝে সাময়িকভাবে সংযোজিত। বরং এটি আত্মার এক নিবিড় শিক্ষাপ্রক্রিয়া, এক কেন্দ্রীভূত আত্ম-প্রশিক্ষণ।

এর বিধানগুলো কেবল আনুষ্ঠানিক আচার নয়; এগুলো এমন উপকরণ, যা মনোযোগকে পুনর্বিন্যাস করে, আকাঙ্ক্ষাকে শুদ্ধ করে এবং মানুষকে তার সত্তা ও উদ্দেশ্য সম্পর্কে নতুন করে ভাবতে শেখায়। নৈতিক গুণাবলির দৃষ্টিতে রমযান একটি উদ্দেশ্যপূর্ণ সাধনা, এর মূল লক্ষ্য মানুষের চরিত্র গঠন। এটি এমন এক মানুষ গড়ে তুলতে চায়, যার জীবন নৈতিকতা ও আধ্যাত্মিক উৎকর্ষের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।

তাই এর সাফল্য নির্ধারিত হয় না মাসের ভেতরে কতটা তীব্র সাধনা হলো তা দিয়ে; বরং মাসশেষে সেই সাধনার প্রভাব কতদিন স্থায়ী থাকে, তা দিয়েই এর মূল্যায়ন।

রোজা, যাকে অনেক সময় কেবল খাদ্য ও পানীয় থেকে বিরত থাকার মধ্যে সীমাবদ্ধ ভাবা হয়, আসলে মনস্তাত্ত্বিক ও নৈতিক দিক থেকে আকাঙ্ক্ষা নিয়ন্ত্রণের এক প্রযুক্তি। সাধারণ জীবনে মানুষ প্রবৃত্তিকে আইন বলে মেনে নিতে অভ্যস্ত হয়ে পড়ে; রামাদান সেই অভ্যাসে ব্যাঘাত ঘটায়। প্রবৃত্তির আসনচ্যুতি ঘটিয়ে আনুগত্যকে সিংহাসনে বসায়। পুনরাবৃত্ত অনুশীলন ইচ্ছাশক্তিকে দৃঢ় করে; আত্মা তাৎক্ষণিক তাড়নার বিরুদ্ধে দাঁড়াতে শেখে, এবং আত্মসংযম ধীরে ধীরে স্বভাব হয়ে ওঠে।

যখন সংযম কেবল খাদ্য-পানীয়ে সীমাবদ্ধ না থেকে দৃষ্টি, কল্পনা ও বাক্যের ওপরও প্রসারিত হয়, তখন পাপের গঠনপ্রণালি উন্মোচিত হয়। বাহ্যিক অনুশাসন ও অভ্যন্তরীণ প্রবণতার মধ্যে এক সঙ্গতি তৈরি হয়। অভ্যাস তখন কেবল পুনরাবৃত্ত কাজ নয়; তা চরিত্র নির্মাণের ছাঁচে পরিণত হয়। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই পুনরাবৃত্ত কর্মই ব্যক্তিত্বের স্থায়ী রূপ নির্ধারণ করে।

পাঁচ ওয়াক্ত সালাতও অনুরূপভাবে আকাঙ্ক্ষাকে পুনর্বিন্যস্ত করে, সময়ের কাঠামোকেই নতুন অর্থ দেয়। নির্ধারিত সময়ে নামাজ আদায় করা মানে সুবিধাকে অতিক্রম করে মহত্ত্বের কাছে আত্মসমর্পণ করা। জামাতে নামাজে এই আত্মসমর্পণ দৃশ্যমান রূপ পায়; সারিবদ্ধ দেহগুলো আল্লাহর সামনে সমতার ঘোষণা দেয়, সাময়িকভাবে দুনিয়াবি স্তরবিন্যাসকে স্থগিত করে।

রাতের নফল ইবাদত ধৈর্য ও সহনশীলতা বৃদ্ধি করে; তবে অতিরিক্ত কষ্টসাধন ভেঙে পড়ার ঝুঁকি ডেকে আনে। বিচ্ছিন্ন ও আকস্মিক তীব্রতার চেয়ে নিয়মিত ও পরিমিত সাধনাই চরিত্র গঠনে অধিক নির্ভরযোগ্য। গৃহপরিসরে নিয়মিত ইবাদত শিশুদের সামাজিকীকরণ করে, মূল্যবোধ প্রজন্মান্তরে পৌঁছে দেয় এবং দৈনন্দিন জীবনের ভেতর স্মরণকে স্থাপন করে। একই সঙ্গে দোআ ও তওবা আত্মজ্ঞানকে গভীর করে; নিজের নির্ভরতা ও অপূর্ণতার স্বীকৃতি অহংকারের প্রতিরক্ষামূলক কাহিনিগুলোকে নমনীয় করে এবং অন্তরকে বিকাশের জন্য উন্মুক্ত করে।

রামাদান মানুষের মনোযোগকে কুরআনের দিকে ফিরিয়ে দেয়, যার উদ্দেশ্য দৃষ্টিভঙ্গিকে রূপান্তরিত করা। মানুষ শুধু কাজ করে না; সে বেছে বেছে মনোযোগ দেয়। আর যার দিকে মনোযোগ নিবদ্ধ হয়, সেটিই তার চরিত্রের গতিপথ নির্ধারণ করে। কেবল তিলাওয়াত যথেষ্ট নয়; তা হতে হবে মনোযোগ-শৃঙ্খলা ও নৈতিক প্রজ্ঞার অনুশীলন।

ভাবনামূলক পাঠ বিশ্বাসীকে প্রশ্ন করতে শেখায়: কোন গুণাবলি আমাকে আহ্বান করছে? কোন দোষ উন্মোচিত হচ্ছে? আমার প্রবণতাগুলো কোথায় অপূর্ণ? পরিচিত আয়াতও নতুন গভীরতা উন্মোচন করতে পারে, যদি হৃদয় প্রস্তুত থাকে। তখন আত্মনির্ভরতার আত্মতুষ্ট কাহিনি ভেঙে যায়, আর নৈতিক ও আধ্যাত্মিক সম্ভাবনার নতুন পথ উন্মুক্ত হয়।

জ্ঞান একা যথেষ্ট নয়; অন্তর্দৃষ্টি বাস্তবে রূপ নিতে হবে। ধৈর্যের প্রশংসা শোনার অর্থ অস্থিরতার বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়া। উদারতার প্রশংসা কৃপণতার চ্যালেঞ্জ। কুরআনের নৈতিক লক্ষ্য পূর্ণতা পায় তখনই, যখন তা আচরণকে রূপান্তরিত করে।

অন্যদের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রেও গুণাবলির চর্চা সমান গুরুত্বপূর্ণ। রোজা রেখে যদি মানুষ গীবত, প্রতারণা বা শোষণে লিপ্ত হয়, তবে সে রোজা অর্থহীন । কথা ও কাজের প্রভাব ইবাদতের সময়সীমা অতিক্রম করে বেঁচে থাকে। তাই বাক্য ও আচরণে সতর্কতা বৃদ্ধি আত্মসংযমকে প্রশিক্ষিত করে; বিশ্বাসী নিজেকে জিজ্ঞেস করে, আমি যা বলছি বা করছি, তা কি সত্য? প্রয়োজনীয়? মর্যাদাপূর্ণ?

সকল ক্ষেত্রে অখণ্ড সততা নিশ্চিত করে যে ইবাদত নির্ভরযোগ্যতা ও ন্যায়পরায়ণতায় প্রতিফলিত হয়। রামাদান আল্লাহর সামনে সবার সমান ভঙ্গুরতা সম্পর্কে সচেতনতা বাড়ায়; অহংকার সংযত হয়, বিচারে উদারতা জন্মায়। অন্যদের প্রতি সদিচ্ছা সরল আবেগ নয়; এটি সচেতন অনুশীলন। তা বিদ্বেষকে নিঃশেষ করে এবং সামাজিক বন্ধনকে স্থিতিশীল করে।

তবু রামাদান কেবল শৃঙ্খলা বা সংযমের নাম নয়; এটি আত্মার উৎসব, এক আসমানি মেহমান, যার আগমনে দুনিয়া আনন্দে ভরে ওঠে। মুমিনরা যখন রূপক পাহাড় বেয়ে ওঠে, আত্মিক শিখরে আরোহণ করে, তখন তারা সর্বোচ্চ উচ্চতা থেকে অবতীর্ণ এই সম্মানিত অতিথিকে অভ্যর্থনা জানায়। যদি স্বর্গীয় পাখিদের পাখা ও ফেরেশতাদের বাহু একযোগে স্বাগত জানাতে প্রসারিত হতো, তবে আকাশ নিজেই ধ্বনিত হতো অভিনন্দনের ঘোষণায়। প্রতিটি অঙ্গভঙ্গিতে ঝরে পড়ে আনন্দ; প্রতিটি দৃষ্টিতে জ্বলে ওঠে আলোক; প্রতিটি হৃদয় ভরে ওঠে ভক্তিতে।
“অনুগ্রহ ও রহমতের মাসকে সালাম! প্রাচুর্য ও সৌন্দর্যের মাসকে সালাম! নৈকট্য ও দোয়ার মাসকে সালাম! স্বাগতম, হে সম্মানিত মেহমান!”

নবচাঁদ উদিত হয়; বিচ্ছেদের সময় বিদায় নেয়। অস্থিরতা স্তিমিত হয়; আত্মা খুঁজে পায় প্রশান্তি। শরতের শুষ্কতা সরে যায়, আত্মার বসন্ত ফিরে আসে। প্রিয়তম যেন সূর্যের মুখাবয়বে আত্মপ্রকাশ করেন; কোমল এক নতুন প্রস্ফুটন ফুটে ওঠে। বেদনা প্রশমিত হয়, হৃদয় সান্ত্বনা পায়, বুলবুলি তার বিলাপ থামায়, কারণ আসমান ঘোষণা করে আধ্যাত্মিক জাগরণের সুসংবাদ। কুরআন তিলাওয়াতের সময় এসেছে, আযানের ধ্বনি ধ্বনিত হয়েছে; আল্লাহর শিক্ষা গ্রহণের ঋতু উপস্থিত।

রোজা তখন অন্তরের পরিশুদ্ধির বাহন হয়ে ওঠে; হৃদয়কে শোধন করে, মানবচরিত্রকে পরিপূর্ণতার দিকে নিয়ে যায়। সংযমী আত্মা প্রবৃত্তিকে অতিক্রম করে, ক্ষুধা ও তৃষ্ণা তাকে বিচলিত করে না, শারীরিক দুর্বলতা তাকে ভেঙে দেয় না, হৃদয়ের প্রলোভন আর তাকে আবদ্ধ রাখতে পারে না। বুদ্ধি প্রবৃত্তির গণ্ডি পেরিয়ে সূক্ষ্ম জগতে বিচরণ করে, আসক্তি থেকে মুক্ত হয়; দেহ আল্লাহর নির্দেশে আত্মসমর্পণ করে। ফেরেশতারা বিস্ময়ে অবলোকন করে, রোজা পরিশুদ্ধি, পরিপূর্ণতা ও মানবাত্মার সূক্ষ্ম পরিমার্জন।

ইফতার এক উদযাপন, ইবাদতের ঈদ। তা চিহ্নিত হয় প্রশংসা, তাসবিহ ও প্রিয়তমের স্মরণে। রোজাদার বান্দা হয়ে ওঠে রবের অতিথি, স্বর্গীয় ভোজের যোগ্য সম্মানিত মেহমান; ফেরেশতারা তার সঙ্গী। তার দোয়া কবুল হয়, তার প্রয়োজন পূর্ণ হয়। আত্মসংযমের মাধ্যমে জাহান্নামের একটি দরজা রুদ্ধ করলে, প্রভু জান্নাতের হাজার দরজা উন্মুক্ত করে দেন। রোজাদার আত্মা দুনিয়াবি মর্যাদাকে অতিক্রম করে উন্নীত হয়; পার্থিব জাঁকজমক ম্লান হয়ে যায় সেই চিরন্তন রাজ্যের সামনে, যা অনুগতদের জন্য প্রস্তুত। রায়্যান নামক বিশেষ দ্বার অপেক্ষমাণ, সারা বছর ধরে সজ্জিত এক জান্নাতে প্রবেশ করাবে নিবেদিতদের, এমন এক রাজ্যে, যার আনন্দ দুনিয়ার সব জৌলুসকে ছাড়িয়ে যায়।

এভাবেই রামাদানের মানদণ্ড অস্তিত্বগত ও চিরন্তনও। এটি আকাঙ্ক্ষাকে গঠন করে, মনোযোগকে পুনর্নির্দেশ করে, আত্মপরিচয়ের কাহিনি পুনর্লিখন করে। এটি এমন চরিত্র সৃষ্টি করে, যা গুণের প্রতি সজাগ, আল্লাহর প্রতি মনোযোগী এবং সৃষ্টির প্রতি দয়ালু। এর সৌন্দর্য কেবল সংযমে নয়; প্রেমে, আত্মসমর্পণে ও আনন্দে, অন্তরের আলোকিত হয়ে ওঠায়, আত্মার প্রস্ফুটনে।

আল্লাহ আমাদের দান করুন এমন শৃঙ্খলা, যাতে কঠোরতা না থাকে; এমন জ্ঞান, যাতে অহংকার না জন্মায়; এমন ইবাদত, যাতে প্রদর্শন না থাকে। আমরা যেন এমন হৃদয় নিয়ে বেরিয়ে আসি, যা আল্লাহর দিকে উন্মুক্ত, তাঁর কালামের প্রতি গ্রহণশীল এবং তাঁর বান্দাদের প্রতি রহমতে পরিপূর্ণ। আমীন।

————-

ক্যাটাগরি : রামাদান, ইসলামি চিন্তাধারা, তাজকিয়াহ, শিক্ষা

✍ মূল : ড. মুহাম্মদ আকরাম নাদভী, অক্সফোর্ড।
✍ অনুবাদ যাচাই ও সম্পাদনা: মাওলানা মারজান আহমদ, সিলেট, বাংলাদেশ।
🔗 অনূদিত মূল প্রবন্ধের লিংক: 👇
https://t.me/DrAkramNadwi/8420

শেয়ার করুন:

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *