AkramNadwi

ইফতার পার্টি

ইফতার পার্টি

|১২|০২|২০২৬|

❖ প্রশ্ন:

অস্ট্রেলিয়া থেকে সম্মানিতা ডা. আমশা নাহিদ সাহেবা নিম্নোক্ত প্রশ্নটি পাঠিয়েছেন:

আসসালামু আলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়াবারাকাতুহ।
সম্মানিত শাইখ, আশা করি আপনি আল্লাহর কৃপায় সুস্থ ও ভালো আছেন।

আমি একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে আপনার দিকনির্দেশনা চাইছি। আমাদের সমাজে ঘরে ঘরে বড় বড় ইফতার সমাবেশ আয়োজনের প্রবণতা দিন দিন বাড়ছে। সাধারণত এসব অনুষ্ঠানে আর্থিকভাবে স্বচ্ছল বন্ধু-বান্ধব ও আত্মীয়দের আমন্ত্রণ জানানো হয়। উদ্দেশ্য হিসেবে বলা হয়, রোজাদারকে ইফতার করানোর সওয়াব অর্জন।

নিশ্চয়ই রোজাদারকে ইফতার করানো একটি মহৎ ও ফজিলতপূর্ণ কাজ। কিন্তু এর প্রকৃত চেতনা ও অগ্রাধিকারের দিকটি মানুষকে বোঝাতে গিয়ে আমি সমস্যায় পড়ছি, বিশেষত যখন এসব আয়োজনের পেছনে উল্লেখযোগ্য অর্থ ব্যয় হয় এবং যাঁরা অংশ নেন, তাঁরা কেউই আর্থিকভাবে অভাবগ্রস্ত নন।

আমার প্রশ্নগুলো হলো :
১. হাদিসে বর্ণিত রোজাদারকে ইফতার করানোর যে ফজিলত এসেছে, তা কি আর্থিকভাবে সচ্ছল ব্যক্তিদের ক্ষেত্রেও সমানভাবে প্রযোজ্য?
২. সওয়াব ও অগ্রাধিকারের বিচারে, এই ব্যয় কি দরিদ্র ও অসহায়দের দিকে প্রবাহিত করাই অধিকতর উত্তম নয়?
৩. এ ধরনের আয়োজন কি রিয়া, সামাজিক প্রতিযোগিতা কিংবা অপচয়ের ঝুঁকি তৈরি করতে পারে?
৪. এ বিষয়ে কীভাবে প্রজ্ঞা ও ভারসাম্যের সঙ্গে সমাজকে উপদেশ দেওয়া যায়, যাতে বিভাজন সৃষ্টি না হয়?

অনুগ্রহ করে আপনার ইলমি দিকনির্দেশনা প্রদান করুন, যাতে আমি বিষয়টি সঠিক ও হিকমতের সঙ্গে উপস্থাপন করতে পারি।
জাযাকুমুল্লাহু খাইরান।

❖ উত্তর:

ওয়া আলাইকুমুস সালাম ওয়া রহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহ।

আপনি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং সময়োপযোগী একটি প্রশ্ন তুলেছেন। আল্লাহ তাআলা আপনাকে দ্বীনের সঠিক ব্যাখ্যা তুলে ধরার এবং উম্মাহর কল্যাণচিন্তার তাওফিক দান করুন।

বাস্তবতা হলো, এটি কেবল একটি সামাজিক প্রবণতা বা সাংস্কৃতিক অভ্যাসের প্রশ্ন নয়; বরং এটি রমজান মাসের আত্মা, তার উদ্দেশ্য এবং ঈমানি অগ্রাধিকারের গভীর উপলব্ধির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট। তাই এ বিষয়ে আলোচনা আবেগের বশে নয়, বরং জ্ঞান, ভারসাম্য ও নীতিগত ভিত্তির ওপর হওয়া প্রয়োজন।

রমজানুল মোবারককে যদি তার প্রকৃত তাৎপর্যে দেখা যায়, তবে এটি দাসত্বের নবায়ন, নফসের পরিশুদ্ধি, কামনা-বাসনার শৃঙ্খলন এবং কুরআনের সঙ্গে জীবন্ত সম্পর্ক গড়ে তোলার মাস। এ মাস মানুষকে ভিড়ের কোলাহল থেকে নির্জনতায়, গাফলত থেকে যিকিরে, দুনিয়ার চাকচিক্য থেকে আখিরাতের জবাবদিহিতার দিকে ফিরিয়ে আনে। কুরআন নাজিল হয়েছে এই মাসেই, যাতে মানুষ তার জীবনের দিকনির্দেশনা সংশোধন করতে পারে। সুতরাং যে কোনো আচরণ, যা এই মনোযোগকে ছড়িয়ে দেয় বা এই কেন্দ্রিকতাকে দুর্বল করে, তা অন্তত গভীরভাবে বিবেচনার দাবি রাখে।

এটি অনস্বীকার্য যে হাদিসে রোজাদারকে ইফতার করানোর বিরাট ফজিলত বর্ণিত হয়েছে। একজন মুসলমানের জন্য এটি সৌভাগ্যের বিষয় যে সে কারও রোজা ভাঙার উপলক্ষ্যে সহজতার কারণ হতে পারে। তবে ফিকহ ও গভীর দৃষ্টিসম্পন্ন আলেমরা সবসময় এ দিকটি তুলে ধরেছেন, শরিয়ত কেবল আমলের বাহ্যিক রূপ দেখে না; বরং তার প্রেক্ষাপট, প্রয়োজন, প্রভাব এবং অগ্রাধিকারকেও গুরুত্ব দেয়।

এই কারণেই অভাবগ্রস্ত, অসহায়, মুসাফির, ছাত্র বা শ্রমিককে আহার করানোর সওয়াব কেবল খাওয়ানোর মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না; এর সঙ্গে যুক্ত হয় দায়িত্ববোধ, সহমর্মিতা এবং সামষ্টিক দায়ভার পালনের দিকটিও।

কিন্তু যখন একই কাজ একটি নির্দিষ্ট সামাজিক ছাঁচে ঢেলে “ইফতার পার্টি” রূপ নেয়, তখন দৃশ্যপট বদলে যেতে শুরু করে। এখানে প্রয়োজন নয়, প্রাধান্য পায় সামাজিক অবস্থান; সরলতা নয়, বৈচিত্র্য ও বাহুল্য হয়ে ওঠে মানদণ্ড; নিভৃত ইখলাসের বদলে জন্ম নেয় প্রদর্শনের পরিবেশ।

এ পর্যায়ে প্রশ্নটি আর কেবল এই নয়, খাওয়ানো বৈধ কি না। বরং প্রশ্ন হলো, এই পদ্ধতি কি রমজানের প্রকৃত চেতনাকে শক্তিশালী করছে, নাকি ধীরে ধীরে তাকে আড়ালে সরিয়ে দিচ্ছে?

সামাজিক অভিজ্ঞতা বলে, ইফতার পার্টির প্রস্তুতিই হয়ে ওঠে এক বড় ব্যস্ততা। দিনের বড় অংশ কাটে কেনাকাটায়; তারপর রান্না, পরিবেশন, আপ্যায়ন, আর শেষে গুছিয়ে নেওয়ার ক্লান্তি। ফলত শরীর অবসন্ন হয়ে পড়ে; তারাবিতে খুশু প্রভাবিত হয়; তিলাওয়াত ও দোয়ার সময় সংকুচিত হয়ে আসে। এভাবে যে মাস ইবাদতের বসন্ত হয়ে আসে, তা ব্যবস্থাপনার ভারে ধীরে ধীরে নুইয়ে পড়ে।

বৃহৎ সমাবেশ মানুষের অন্তর্নিহিত দুর্বলতাকেও সঙ্গে নিয়ে আসে। আলাপচারিতা অনেক সময় অসতর্কতার দিকে মোড় নেয়, কোথাও গীবত, কোথাও তুলনা, কোথাও আর্থিক প্রদর্শন, আবার কোথাও হীনমন্যতা কিংবা আত্মগরিমা। অথচ রমজানের লক্ষ্য হলো হৃদয়গুলোকে সংযুক্ত করা এবং সেগুলোকে আল্লাহর সামনে অবনত করা। যদি পরিবেশ অজান্তেই হৃদয়ে দূরত্ব সৃষ্টি করে, তবে আমাদের থেমে ভাবা উচিত। অর্থনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকেও বিষয়টি ভেবে দেখা প্রয়োজন। একটি ইফতার পার্টিতে যে পরিমাণ অর্থ ব্যয় হয়, তা দিয়ে বহু ঘরে চুলা জ্বলতে পারে; কত রোগীর ওষুধ কেনা সম্ভব; কত শিশুর প্রয়োজন মেটানো যায়। শরিয়তের রূহ আমাদের এটাই শিক্ষা দেয়, সম্পদ সেখানে পৌঁছে দাও, যেখানে তার প্রয়োজন অধিক এবং যার প্রভাব দীর্ঘস্থায়ী। একেই বলা হয় কল্যাণের অগ্রাধিকার নির্ধারণ।

এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে পারিবারিক ব্যবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক। রমজান শিশুদের দীনি শিক্ষাদীক্ষার এক স্বর্ণালী সুযোগ। যদি পরিবারের সদস্যরা প্রতিদিন বাইরে নানা সমাবেশে ছড়িয়ে থাকে, তবে সেই সম্মিলিত আধ্যাত্মিক অভিজ্ঞতা তৈরি হয় না, যা পরিবারকে ইবাদতের বন্ধনে আবদ্ধ করে। সরল ইফতার, জামাতে নামাজ, তারপর ঘরে প্রশান্ত পরিবেশে একত্রে বসা, এসবই এমন আমল, যা ভালোবাসা, দায়িত্ববোধ ও ধার্মিকতাকে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে সঞ্চারিত করে।

এ কথা বলা যথার্থ, আসল ফজিলত নিহিত রয়েছে ভারসাম্যে। কখনও কখনও নিকট আত্মীয় বা প্রিয়জনদের আহ্বান করা, সরলতা অবলম্বন করা এবং তাকে দ্বীনি কল্যাণের উপলক্ষে পরিণত করা নিঃসন্দেহে বরকতময়। কিন্তু যখন ইফতার পার্টি একটি রেওয়াজ, প্রতিযোগিতা বা সামাজিক পরিচয়ের প্রতীক হয়ে ওঠে, আর ইবাদতের মূল চেতনা তার আড়ালে পড়ে যায়, তখন সংশোধনের প্রয়োজন স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

উপদেশের ক্ষেত্রে প্রজ্ঞাই মূল শর্ত। হৃদয় জয় করে কথা বলা, অগ্রাধিকার স্পষ্ট করে তোলা এবং মানুষকে উত্তম পথে আহ্বান করা, এগুলো কঠোর ভাষার চেয়ে অধিক কার্যকর। তাদের এভাবে বোঝানো যেতে পারে যে :
১. আমাদের প্রকৃত লক্ষ্য আল্লাহর সন্তুষ্টি ও নৈকট্য; মানুষের দৃষ্টিতে মর্যাদা নয়।
২. সওয়াবের উচ্চতা নির্ভর করে ইখলাস ও প্রয়োজনের ওপর।
৩. রমজানের মূল পুঁজি হলো সময়; অপ্রয়োজনীয় ব্যস্ততায় তা নষ্ট করা বঞ্চনার কারণ হতে পারে।

যখন কথাটি নিষেধাজ্ঞা ঘোষণার ভঙ্গিতে নয়, বরং উত্তম কল্যাণের স্তরের দিকে আহ্বান হিসেবে উপস্থাপিত হবে, তখন ইন শা আল্লাহ অন্তরে কোমলতা সৃষ্টি হবে এবং মানুষ স্বতঃস্ফূর্তভাবে নিজেদের পথ পুনর্বিবেচনা করবে।

আল্লাহ তাআলা আমাদের এ মাসের মহিমা অনুধাবনের তাওফিক দিন, আমাদের আমলসমূহকে তার চেতনার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করে দিন, এবং আমাদের সম্পদ ও সময়কে এমন খাতে ব্যয় করার সামর্থ্য দিন যা তাঁর সন্তুষ্টির অধিক নিকটবর্তী। আমাদের ইবাদতকে রিয়া, অপচয় ও গাফলত থেকে হেফাজত করুন এবং আমাদেরকে প্রকৃত অর্থে রমজানের কল্যাণ লাভকারীদের অন্তর্ভুক্ত করুন।

ওয়াল্লাহু আ‘লাম বিস-সাওয়াব।

——————

ক্যাটাগরি : রামাদান, উপদেশ, তাজকিয়াহ, ফাতাওয়া

✍ মূল : ড. মুহাম্মদ আকরাম নাদভী, অক্সফোর্ড।
✍ অনুবাদ যাচাই ও সম্পাদনা: মাওলানা মারজান আহমদ, সিলেট, বাংলাদেশ।
🔗 অনূদিত মূল প্রবন্ধের লিংক: 👇
https://t.me/DrAkramNadwi/8402

শেয়ার করুন:

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *