১১/২/২০২৬
بسم الله الرحمن الرحيم
শহরের এক শান্ত পাড়ায় এক সম্মানিত শায়খ এসে ভাড়া নিলেন একটি নিরিবিলি ফ্ল্যাট। তিনি এসেছেন মুলতানের দিক থেকে। গায়ে সাধারণ আবায়া, অন্তরে নির্মলতা, স্বভাবে সংযম ও স্থিরতা। তাঁর মুখমণ্ডলে যেন ধ্যানমগ্ন প্রশান্তির ছাপ স্পষ্ট। কথা শুরু করতেন সব সময় এক মধুর সম্বোধনে— “হে প্রিয় ভাই” আর তাঁর প্রতিটি বাক্য যেন ধৈর্য ও চিন্তার দিকে আহ্বান হয়ে উঠত।
ভোরের হাঁটাহাঁটিতে প্রায়ই তাঁর সঙ্গে দেখা হতো। আমরা দু’জন শহরের কোলাহল থেকে দূরের গলিপথ ধরে নীরবে হেঁটে যেতাম। তিনি আপন মনে সকালের যিকির করতেন, আর আমার হৃদয় সেই নীরবতা থেকে অর্থ আহরণ করত। যেন আমরা এমন কিছু খুঁজছি, যা শব্দে ধরা যায় না। সকাল তখন গভীরতর হয়ে উঠত, বাতাসের প্রতিটি দোলায় যেন ভেসে আসত কোনো অজানা প্রশ্ন।
টানা তিন দিন হাঁটতে বের হইনি। চতুর্থ ও পঞ্চম দিনও অলসতায় কেটে গেল। ষষ্ঠ দিনের প্রভাতে তাঁর সঙ্গে দেখা হতেই দেখলাম, অভ্যাসের বিপরীতে তিনি তসবিহ গুটিয়ে পকেটে রাখলেন, উষ্ণ হাসি হেসে বললেন,
“হে প্রিয় ভাই, আজ আমার বাড়ি চলো। নিজের হাতে তোমাকে চা খাওয়াব।”
আমি তাঁর পিছু নিলাম। মনে এক অদ্ভুত প্রত্যাশা। তাঁর ঘরে ঢুকেই মনে হলো, যেন বসার ঘরে নয়, প্রবেশ করেছি এক মহাগ্রন্থাগারে। দেয়ালজুড়ে বিরল ও প্রাচীন বই। কিছু মসৃণ চামড়ার বাঁধাই, কিছু সময়ের ছোঁয়ায় বিবর্ণ। হলদে পাতাগুলো থেকে ভেসে আসে জ্ঞান ও প্রজ্ঞার গন্ধ। ঘরজুড়ে এক গভীর স্তব্ধতা, যেন অতীত যুগের প্রতিধ্বনি সেখানে এখনও বেঁচে আছে।
শায়খ কিছুক্ষণ রান্নাঘরে গেলেন। আমি বইগুলোর শিরোনাম পড়তে পড়তে ইতিহাসের গভীরে ডুব দিলাম। নিস্তব্ধতার ভেতর যেন অদৃশ্য চিন্তা ও আত্মার সাড়া শুনতে পেলাম। টেবিলে খোলা ছিল তাসাউফের গ্রন্থ। পাশে একটি খাতা, দুই পাতার ভাঁজে রাখা পেন্সিল, যেন মালিক একটু আগেই উঠে গেছেন, অথচ তাঁর হৃদয় ও ভাবনা রয়ে গেছে অক্ষরের ভেতর। মনে হলো, এ ঘরের প্রতিটি বস্তু ভাষার চেয়েও গভীর এক ভাষায় কথা বলে জীবনের অর্থের সন্ধান নিয়ে।
কিছুক্ষণ পর তিনি ফিরে এলেন। হাতে ট্রে, দুই কাপ চা, নোনতা বিস্কুট, খেজুর, আর দুটি মিষ্টি। আমরা চা পান করতে করতে আলাপ জমালাম। তিনি বিস্তৃত জ্ঞানের অধিকারী, গভীর দৃষ্টিসম্পন্ন, অথচ ভাষায় সহজ। কথোপকথন যেন হৃদয়ের ভেতর লুকানো গোপন দরজা খুলে দিচ্ছিল।
হঠাৎ তিনি থামলেন। চোখে অন্তর্লোকের দীপ্তি। বললেন,
“হে প্রিয় ভাই , আমার মনে এক প্রশ্ন ছিল। এই বইগুলোর ভাঁজে ভাঁজে তার উত্তর খুঁজেছি। বহু উত্তর পেয়েছি, কিন্তু হৃদয় তৃপ্ত হয়নি। একদিন রুটি কিনতে বাজারে গেলাম, কাজের লোক ছুটিতে ছিল। হেঁটে যাচ্ছিলাম, দেখি সামনে এক ছোট ছেলে। তার জুতো ছিঁড়ে গেছে। তাকে ডাকলাম।
সে এল। জিজ্ঞেস করলাম, ‘বাবা, তোমার জুতো এমন ছেঁড়া কেন?’
সে বলল এমন এক কথা, যা আমার অন্তর কাঁপিয়ে দিল: ‘আমার বাবা মারা গেছেন…।’
তারপর নীরবতা। যেন পুরো শহর থেমে গেল তার কণ্ঠ শোনার জন্য।
আমি স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইলাম। চারপাশের সবকিছু গুরুত্বহীন হয়ে গেল। শুধু সেই শিশুর মুখ, নিষ্পাপ, বিষণ্ন, পিতৃহীনতার ছায়ায় আচ্ছন্ন। আমি তার হাত ধরলাম, বললাম, ‘চলো, তোমার জন্য জুতো কিনে দিই।’
তাকে নিয়ে ঢুকলাম একটি ভালো মানের দোকানে। বিক্রেতাকে বললাম, ‘সবচেয়ে ভালো জুতোটাই পরিয়ে দিন।’ ছেলেটি দামি, সুন্দর জুতো পরল। তার মুখ উজ্জ্বল হয়ে উঠল, যেন সূর্য নিজের সমস্ত উষ্ণতা তার হৃদয়ে ঢেলে দিয়েছে। কিছু অর্থও দিলাম, বিদায় নিয়ে চলে এলাম।
কিছুক্ষণ পর সে দৌড়ে এসে আমার পায়ে জড়িয়ে ধরল। মাথা তুলে সরল কণ্ঠে জিজ্ঞেস করল,
‘আপনি কি আল্লাহ?’
আমি তাকে বুকে তুলে নিয়ে বললাম,
‘না বাবা, আমি তোমার মতোই একজন মানুষ।’
সে নির্মল স্বরে বলল,
‘তাহলে আপনি আল্লাহর বন্ধু। গত রাতে আমি আল্লাহর কাছে দোয়া করেছি। বাবা সব সময় বলতেন, আল্লাহর কাছে চাইলে তিনি দেন। আমি বলেছিলাম, হে আল্লাহ, আমার জুতো ছিঁড়ে গেছে, আমাকে নতুন জুতো দিন।’
এ কথা শুনে আমার ভেতর আবেগের বন্যা বইতে লাগল। অশ্রু অজান্তেই গড়িয়ে পড়ল, যেন হৃদয় নিজেই অশ্রু দিয়ে সেই মুহূর্ত লিখে রাখছে।
শায়খ কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন। তারপর বললেন,
“সেদিন বুঝেছি, আল্লাহর বন্ধু হওয়া কঠিন কিছু নয়। এক এতিমের মাথায় হাত বুলিয়ে দাও, এক বিধবার পাশে দাঁড়াও, এক দরিদ্রের প্রয়োজন পূরণ করো, এটাই আল্লাহর সখ্যতা। এর জন্য উপাধি লাগে না, স্লোগান লাগে না, জটিল তত্ত্ব লাগে না, ছাপানো বই বা দীর্ঘ ভাষণও নয়। আল্লাহর সঙ্গে প্রকৃত বন্ধুত্ব আমাদের দৈনন্দিন কাজে, আমাদের হৃদয়ের মমতায়, অন্যের প্রতি মনোযোগে, বিনিময়ের আশা ছাড়াই বাড়িয়ে দেওয়া সহায়তার হাতে।”
তিনি প্রায়ই বলতেন,
“হে প্রিয় ভাই, আল্লাহর সান্নিধ্য পাওয়া সহজ, কিন্তু কে আছে তা অনুসন্ধান করতে ?”
আমরা দূরের পথ খুঁজি, নির্জন কোণ, অন্ধকার খানকাহে , গুহা ও পাহাড়ে। জটিল শিরোনাম আর দুর্বোধ্য গ্রন্থে উত্তর খুঁজি। অথচ আল্লাহ আমাদের থেকে দূরে নন। ছোট, বিনম্র পদক্ষেপে, এক আন্তরিক হাসিতে, এক প্রয়োজনীর সহায়তায়, এক নিষ্পাপ হৃদয়ের দোয়ায়, আমরা তাঁর দিকে এগিয়ে যাই। এমন সান্নিধ্য, যা কল্পনাকারীর কল্পনাকেও ছাড়িয়ে যায়।
প্রতিটি দুঃখ মোচনে, প্রতিটি সহায়তায়, প্রতিটি দোয়া পূরণে আমরা যখন কারণ হই, প্রতিটি উদ্বেগ সরিয়ে দিলে, সেখানে আল্লাহর স্নেহময় হাত আমাদের দিকে প্রসারিত হয়।
অতএব, আল্লাহর বন্ধু হও, কথায় নয়, কাজে। ভণ্ডামিতে নয়, সত্যতায়।
হে আল্লাহ, আমাদের আপনার বন্ধুত্বে গ্রহণ করুন, আমাদের সৎকর্মশীলদের অন্তর্ভুক্ত করুন।
(বিঃদ্রঃ মূল গল্পটি একজন উর্দুভাষী লেখকের রচনা; তবে আমি এতে সংযোজন করেছি এবং বিস্তৃত করেছি।)
————–
ক্যাটাগরি : তাজকিয়াহ, উপদেশ, ইসলামি চিন্তাধারা, ফিলোসোফি, সমালোচনা
✍ মূল : ড. মুহাম্মদ আকরাম নাদভী, অক্সফোর্ড।
✍ অনুবাদ যাচাই ও সম্পাদনা: মাওলানা মারজান আহমদ, সিলেট, বাংলাদেশ।
🔗 অনূদিত মূল প্রবন্ধের লিংক: 👇
https://t.me/DrAkramNadwi/8392