AkramNadwi

রাজনৈতিক ক্ষমতা যে সমস্যার সমাধান নয়, তার আরেকটি গ

রাজনৈতিক ক্ষমতা যে সমস্যার সমাধান নয়, তার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষ্য হলো মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশগুলোর অবস্থা, যেখানে শাসনক্ষমতা মুসলমানদের হাতে। সেখানকার পরিস্থিতিও কতটা শোচনীয়! বরং কিছু মুসলিম দেশে ইসলাম ও মুসলমানদের অবস্থা ভারতের চেয়েও করুণ।

আমাদের জীবনের উদ্দেশ্য:
পরিবর্তন বা সংস্কারের কোনো পদক্ষেপ নেওয়ার আগে আমাদের গভীরভাবে উপলব্ধি করতে হবে, আমাদের জীবনের উদ্দেশ্য কী। তারপর নতুন করে মূল্যায়ন করতে হবে আমাদের সব পরিকল্পনা ও প্রচেষ্টা, এসব কি সত্যিই সেই উদ্দেশ্যের জন্য অপরিহার্য? এগুলোর মধ্যে পারস্পরিক সামঞ্জস্য কতটুকু?

যার সামান্যও ঐশী গ্রন্থের জ্ঞান আছে এবং যিনি নবীদের ইতিহাস সম্পর্কে অবগত, তিনি সহজেই বুঝবেন, অন্য জাতির অনুকরণে আমরা আমাদের জীবনের লক্ষ্য বদলে ফেলেছি। ফলে আমাদের চিন্তার ধরনও বদলে গেছে। আমরা সেই উপায় ও পদ্ধতি গ্রহণ করেছি, যা অন্য জাতিগুলোর চিন্তার চূড়ান্ত রূপ।

একসময় আমাদের ও অন্য জাতির সম্পর্ক ছিল দাওয়াতদাতা ও দাওয়াতপ্রাপ্তের। আজ আমরা বিশ্বের সব জাতির প্রতিদ্বন্দ্বী ও প্রতিযোগীতে পরিণত হয়েছি। সেই পরিচয়ে আমরা তাদের সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপন করি, আর তারাও আমাদের সঙ্গে তেমনভাবেই আচরণ করে। স্বাভাবিকভাবেই, এ অবস্থায় পারস্পরিক বিদ্বেষ ও শত্রুতা বাড়া ছাড়া অন্য কোনো সম্ভাবনা থাকে না।

আমাদের সূচনা-বিন্দু হওয়া উচিত, নিজেদের লক্ষ্যকে চিনে নেওয়া। এই পৃথিবীতে আমাদের উদ্দেশ্য আল্লাহর ইবাদত। বাকি সবকিছু এই মৌলিক উদ্দেশ্যের সহায়ক মাত্র।

মুসলমানদের জন্য অত্যন্ত জরুরি, ইবাদতের প্রতি সঠিক মনোযোগ দেওয়া এবং দৃঢ় সাহস ও অঙ্গীকার নিয়ে ব্যক্তিগত ও সামাজিক পরিসরে ঈমান ও ইসলাম প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করা। আমাদের সংখ্যাগরিষ্ঠ কেবল নামেমাত্র মুসলমান; ইসলামের স্তম্ভসমূহ পালনে অঙ্গীকারবদ্ধ মানুষের সংখ্যা খুবই কম। এ ক্ষেত্রে কঠোর প্রয়াস ও সংগ্রাম প্রয়োজন। মুসলমানদের ঈমান ও ইসলামের পথে সুদৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত করা, এটাই হওয়া উচিত আমাদের মৌলিক ও সর্বাগ্রে অগ্রাধিকার।

পরিকল্পনা:
এই মৌলিক লক্ষ্যকে সামনে রেখে আমাদের একটি দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা প্রণয়ন করতে হবে, যার মাধ্যমে ব্যক্তি ও সমাজ এমন গুণাবলিতে সমৃদ্ধ হবে, যা দুনিয়া ও আখিরাত, উভয় জগতের সফলতার চাবিকাঠি।

১. শিক্ষা, পরিকল্পনার প্রথম ভিত্তি
এই পরিকল্পনার সূচনা হবে শিক্ষা দিয়ে। আমাদের নিশ্চিত করতে হবে, প্রত্যেক মুসলমান অন্তত এতটুকু কুরআন ও সুন্নাহর জ্ঞান অর্জন করবে, যা তাকে আল্লাহর বান্দেগি যথাযথভাবে আদায় করতে সক্ষম করে। পাশাপাশি এমন মানুষও তৈরি করতে হবে, যারা ইসলামী জ্ঞানে গবেষণার উচ্চ আসনে অধিষ্ঠিত হতে পারে।

এরপর প্রয়োজন দুনিয়াবি শিক্ষার প্রতি মনোযোগ। আজকের বাস্তবতায় দুনিয়াবি শিক্ষা কেবল জ্ঞান অর্জনের মাধ্যম নয়; বরং সম্মানজনক উপার্জন ও কর্মসংস্থানের প্রধান পথ। প্রত্যেক গ্রাম, প্রত্যেক শহর, এমনকি প্রত্যেক মুসলিম অধ্যুষিত এলাকায় নিশ্চিত করতে হবে, মুসলিম শিশুরা যেন শিক্ষার আলো থেকে বঞ্চিত না হয়। আর্থিক ও অনার্থিক যেসব বাধা সামনে আসে, সেগুলোর সমাধান বের করতে হবে। শিক্ষার পথে কোনো অজুহাত বা প্রতিবন্ধকতা যেন দাঁড়াতে না পারে।

এমন ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে, যাতে আমাদের সন্তানরা উচ্চমানের শিক্ষা লাভ করতে পারে। দরিদ্র পরিবারের শিশুদের ফি পরিশোধের ব্যবস্থা, তাদের জন্য বৃত্তি, আর দুর্বল শিক্ষার্থীদের জন্য উপযুক্ত টিউশনের সুযোগ সৃষ্টি করা, এসবকে অগ্রাধিকার দিতে হবে।

শ্রেষ্ঠত্ব ও উৎকর্ষ হওয়া উচিত আমাদের বৈশিষ্ট্য। আজকের পৃথিবীতে মর্যাদা তারই, যে নিজ ক্ষেত্রে অগ্রগণ্য। যোগ্যতা ও উৎকর্ষ এমন শক্তি, যা সাম্প্রদায়িক ও সংকীর্ণ মনোভাবাপন্ন মানুষও সহজে উপেক্ষা করতে পারে না।

২. কল্যাণমূলক কর্মযজ্ঞ
দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ হলো সমাজসেবামূলক কাজের বিস্তার। যারা দৈনন্দিন খাদ্য থেকে বঞ্চিত, তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। মেয়েদের সম্মানজনক বিয়ের ব্যবস্থা করার প্রয়াস নিতে হবে। রাষ্ট্রীয় নীতির কারণে অনেক মুসলমান জীবিকার উৎস হারাচ্ছে, তাদের জন্য যথার্থ বিকল্প ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে।

৩. নৈতিকতা ও চরিত্রগঠন
এই পরিকল্পনার আরেকটি প্রধান স্তম্ভ হলো নৈতিক উৎকর্ষ নির্মাণ। আমাদের নৈতিক অবস্থা অন্যদের তুলনায় উন্নত নয়। লজ্জাহীনতা, অশ্লীলতা, অসততা, এসব আমাদের ভেতরে বিস্তার লাভ করেছে। অস্থিরতা ও অতিরিক্ত ক্রোধ বহু নৈতিক ব্যাধির জন্ম দিচ্ছে। এমনকি আলেম ও শিক্ষিত শ্রেণির মধ্যেও নৈতিক অবক্ষয় দেখা যাচ্ছে। সম্পদ ও পদমর্যাদার প্রতি আকর্ষণ বেড়েই চলেছে।

জাতি হিসেবে আমাদের টিকে থাকা এই নৈতিক মূল্যবোধের ওপর নির্ভরশীল। পরিবার ও সামষ্টিক জীবনের ভাঙনের বড় কারণ আমাদের নৈতিক দুর্বলতা। নারী, শিশু, পিতা-মাতা, আত্মীয়স্বজন, দরিদ্র ও এতিমদের অধিকার আদায়ে এবং তাদের সম্মান রক্ষায় আমরা বড় অংশে গাফিল। এসব বিষয়ে বিশেষ মনোযোগ দেওয়া জরুরি। নৈতিক শিক্ষার সুশৃঙ্খল কর্মসূচি আমাদের সংস্কারচেষ্টার মৌলিক অংশ হওয়া উচিত।

শেয়ার করুন:

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *