ভূমিকা:
এই মুহূর্তে শুধু ভারতেই নয়, বরং সারা বিশ্বে মুসলমানরা যে পরিস্থিতির ভেতর দিয়ে অতিক্রম করছে, তার ভয়াবহতা সম্পর্কে সচেতন ও সাধারণ, সকলেই অবগত। বহুদিন ধরেই আমাদের রাজনৈতিক শক্তি ভেঙে পড়েছে। আমাদের সামষ্টিক ঐক্যের বন্ধন ছিন্নভিন্ন হয়ে গেছে। গোষ্ঠীগত সংকীর্ণতা আমাদের রগে রক্তের মতো মিশে গেছে। আমাদের স্বভাব হয়ে উঠেছে বিভাজনমুখী। আমাদের জীবন, সম্পদ, সম্মান ও মর্যাদার অনিরাপত্তা, আমাদের অপমান ও অসহায়তার স্পষ্ট প্রতিচ্ছবি।
বিভিন্ন দেশে চাকরির শর্ত এমনভাবে বদলে দেওয়া হচ্ছে যে মুসলমানদের জন্য কর্মসংস্থান ক্রমেই কঠিন হয়ে উঠছে। মুসলিম কর্মচারীদের দুর্ভোগ বাড়ছে। মুসলিম নারীদের পর্দা সমালোচনা ও বৈষম্যমূলক আচরণের লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়েছে। স্কুল, হাসপাতাল ও গণরেস্তোরাঁ থেকে হালাল খাবারের আইনি সুবিধাগুলো একে একে বাতিল করা হচ্ছে। এমনকি দাফন-কাফনের প্রাপ্য সুবিধাগুলোও হুমকির মুখে। আর সেই সময়ও দূরে নয়, যখন সমঅধিকারের সংবিধানকে ব্যবহার করা হবে নারী ও সমকামী ইমাম নিয়োগের মতো বিষয়ের পক্ষে।
ভারতে মুসলমানদের সংখ্যা বেশি হওয়ায় অস্থিরতা দমনের পদক্ষেপগুলো হয়তো প্রকাশ্য রূপে সবসময় দেখা যায় না। তবে পুলিশি অভিযান, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের তদন্ত, মসজিদ-মাদ্রাসার জন্য কঠোর বিল্ডিং বিধি ও লাইসেন্স আইন, এসব আইনি অস্ত্রের প্রয়োগ অব্যাহত রয়েছে। ফলে মুসলমানরা নিজেদের শৃঙ্খলাবদ্ধ ও সীমাবদ্ধ এক বাস্তবতায় আবদ্ধ অনুভব করছে।
এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় আমরা নানা স্তরে বিচ্ছিন্ন ও অসংগঠিত প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি। কিন্তু সুস্পষ্ট লক্ষ্য ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার অভাবে অগ্রগতির বদলে আমরা আরও অবনতি ও পশ্চাৎপদতার দিকে গড়িয়ে পড়ছি।
সমস্যার কারণ:
এমন অবস্থায় অন্যকে দোষারোপ করা যেন আমাদের স্বভাবে পরিণত হয়েছে। অথচ সত্য হলো, আমাদের সংকটের কারণ অন্যদের সাফল্য নয়, বরং আমাদের নিজেদের ব্যর্থতা। আমাদের বিরোধীরা যে গন্তব্যের দিকে ছুটে চলেছে, সেটিই চূড়ান্ত গন্তব্য নয়; তাই সেখানে পৌঁছেও তাদের পতন ও ভাঙন অনিবার্য।
আমাদের অস্থিরতার কারণ তাদের অগ্রগতি হওয়া উচিত নয়। প্রকৃত উদ্বেগের কারণ হওয়া উচিত, আমাদের নিজের একটি নির্দিষ্ট গন্তব্য থাকা সত্ত্বেও আমরা তা ত্যাগ করেছি এবং অন্যদের পথকেই নিজের পথ বলে ধরে নিয়েছি। ফলে আমাদের ও তাদের পথচলা, কর্মপদ্ধতি ও সংগ্রামে আর কোনো পার্থক্য অবশিষ্ট নেই।
পরীক্ষা:
মুসলমান হিসেবে আমাদের যে মর্যাদা ও অবস্থান, আমাদের অন্তরে যে আশা ও সাহসের সঞ্চার রয়েছে, তা আমাদের প্রতিপক্ষের নেই। আর এ মর্যাদার মূল্য আমাদের দিতেই হবে। যুগে যুগে আল্লাহবিশ্বাসীদের কাছে এই মূল্য দাবি করা হয়েছে। আর সেই মূল্য হলো, আমাদের ঈমান ও বিশ্বাসের পরীক্ষা।
আমরা কি কেবল তখনই ঈমানের ওপর অবিচল থাকি, যখন আমাদের হাতে থাকে ক্ষমতা, প্রভাব, প্রতিপত্তি ও সমৃদ্ধি? নাকি দুর্বলতা, কঠিনতা, দুঃখ-কষ্ট ও দারিদ্র্যের মাঝেও আমরা দ্বীন ও ঈমান আঁকড়ে থাকতে পারি?
ঈমানদাররা কি নিজেদের সারিতে ঐক্য সুদৃঢ় রাখতে সক্ষম? আমরা কি সম্মিলিত পরিকল্পনা প্রণয়ন করে একসঙ্গে কাজ করতে পারি? নাকি সাময়িক স্বস্তি ও ক্ষণস্থায়ী স্বার্থের জন্য আমরা আমাদের নীতি, দ্বীনি ও সামষ্টিক স্বার্থ বিসর্জন দিয়ে বিচ্ছিন্ন পরিচয়, বিভক্ত দল ও গোষ্ঠীকেই আমাদের চূড়ান্ত পরিচয় বানিয়ে নেব?
এই প্রশ্নগুলোর জবাবই নির্ধারণ করবে, আমরা কেবল ইতিহাসের দর্শক হয়ে থাকব, নাকি আবারও ইতিহাস নির্মাণের সাহস অর্জন করব।
রাজনৈতিক পরিবর্তন:
কিছু পরিস্থিতিতে কল্যাণকর ফল অর্জনের জন্য প্রচলিত পরিবর্তনের পদ্ধতি কার্যকর হয় না। উদাহরণস্বরূপ, বর্তমানে বহু দেশে আপনি কাকে ভোট দিচ্ছেন, তা বিশেষ অর্থবহ নয়। কারণ সেখানে প্রকৃত ক্ষমতা রাজনীতির দৃশ্যমান স্তরের বহু গভীরে প্রোথিত। আপনি উপরিভাগের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে প্রভাব ফেললেও ভেতরের বাস্তবতা বদলায় না।
এ অবস্থা যেন এক প্রবহমান নদীতে ছোট বা বড় পাথর নিক্ষেপ করার মতো। মুহূর্তের জন্য জলে ঢেউ ওঠে, কিছু আলোড়ন সৃষ্টি হয়; তারপর নদী আবার নিজের স্রোতে, নিজের গতিতে বয়ে চলে।
ভারত, ইউরোপ ও আমেরিকার বহু দেশে মুসলমানদের পক্ষে বাস্তব রাজনৈতিক পরিবর্তন আনা বা রাজনৈতিক দলগুলোকে প্রভাবিত করা কার্যত অসম্ভব হয়ে পড়েছে। কারণ সেখানে ইসলাম ও মুসলমানদের বিরুদ্ধে গভীর বিদ্বেষের পরিবেশ গড়ে তোলা হয়েছে। যতক্ষণ পর্যন্ত মুসলমান তার মুসলমান পরিচয় অস্বীকার না করবে, ততক্ষণ তার কথা ও কাজ সন্দেহের চোখে দেখা হবে; তার ওপর আস্থা রাখা হবে না। আর ধীরে ধীরে মুসলমানদের প্রভাব ও ক্ষমতার অবস্থান থেকে সম্পূর্ণভাবে সরিয়ে দেওয়া হবে।
আমাদের এই তিক্ত বাস্তবতা স্বীকার করা উচিত, বর্তমানে আমরা রাজনৈতিক ক্ষমতার উপযুক্ত নই। এবং রাজনৈতিক ক্ষমতা আমাদের সমস্যার সমাধানও নয়। আমাদের অযোগ্যতার প্রমাণ এটাই যে আমরা সঠিকভাবে আমাদের মাদরাসা, মসজিদ, কেন্দ্র, প্রতিষ্ঠান, এমনকি নিজেদের ঘর-পরিবারও সুশৃঙ্খলভাবে পরিচালনা করতে পারি না।
রাজনৈতিক ক্ষমতা যে সমস্যার সমাধান নয়, তার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষ্য হলো মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশগুলোর অবস্থা, যেখানে শাসনক্ষমতা মুসলমানদের হাতে। সেখানকার পরিস্থিতিও কতটা শোচনীয়! বরং কিছু মুসলিম দেশে ইসলাম ও মুসলমানদের অবস্থা ভারতের চেয়েও করুণ।
আমাদের জীবনের উদ্দেশ্য:
পরিবর্তন বা সংস্কারের কোনো পদক্ষেপ নেওয়ার আগে আমাদের গভীরভাবে উপলব্ধি করতে হবে, আমাদের জীবনের উদ্দেশ্য কী। তারপর নতুন করে মূল্যায়ন করতে হবে আমাদের সব পরিকল্পনা ও প্রচেষ্টা, এসব কি সত্যিই সেই উদ্দেশ্যের জন্য অপরিহার্য? এগুলোর মধ্যে পারস্পরিক সামঞ্জস্য কতটুকু?
যার সামান্যও ঐশী গ্রন্থের জ্ঞান আছে এবং যিনি নবীদের ইতিহাস সম্পর্কে অবগত, তিনি সহজেই বুঝবেন, অন্য জাতির অনুকরণে আমরা আমাদের জীবনের লক্ষ্য বদলে ফেলেছি। ফলে আমাদের চিন্তার ধরনও বদলে গেছে। আমরা সেই উপায় ও পদ্ধতি গ্রহণ করেছি, যা অন্য জাতিগুলোর চিন্তার চূড়ান্ত রূপ।
একসময় আমাদের ও অন্য জাতির সম্পর্ক ছিল দাওয়াতদাতা ও দাওয়াতপ্রাপ্তের। আজ আমরা বিশ্বের সব জাতির প্রতিদ্বন্দ্বী ও প্রতিযোগীতে পরিণত হয়েছি। সেই পরিচয়ে আমরা তাদের সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপন করি, আর তারাও আমাদের সঙ্গে তেমনভাবেই আচরণ করে। স্বাভাবিকভাবেই, এ অবস্থায় পারস্পরিক বিদ্বেষ ও শত্রুতা বাড়া ছাড়া অন্য কোনো সম্ভাবনা থাকে না।
আমাদের সূচনা-বিন্দু হওয়া উচিত, নিজেদের লক্ষ্যকে চিনে নেওয়া। এই পৃথিবীতে আমাদের উদ্দেশ্য আল্লাহর ইবাদত। বাকি সবকিছু এই মৌলিক উদ্দেশ্যের সহায়ক মাত্র।
মুসলমানদের জন্য অত্যন্ত জরুরি, ইবাদতের প্রতি সঠিক মনোযোগ দেওয়া এবং দৃঢ় সাহস ও অঙ্গীকার নিয়ে ব্যক্তিগত ও সামাজিক পরিসরে ঈমান ও ইসলাম প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করা। আমাদের সংখ্যাগরিষ্ঠ কেবল নামেমাত্র মুসলমান; ইসলামের স্তম্ভসমূহ পালনে অঙ্গীকারবদ্ধ মানুষের সংখ্যা খুবই কম। এ ক্ষেত্রে কঠোর প্রয়াস ও সংগ্রাম প্রয়োজন। মুসলমানদের ঈমান ও ইসলামের পথে সুদৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত করা, এটাই হওয়া উচিত আমাদের মৌলিক ও সর্বাগ্রে অগ্রাধিকার।
পরিকল্পনা:
এই মৌলিক লক্ষ্যকে সামনে রেখে আমাদের একটি দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা প্রণয়ন করতে হবে, যার মাধ্যমে ব্যক্তি ও সমাজ এমন গুণাবলিতে সমৃদ্ধ হবে, যা দুনিয়া ও আখিরাত, উভয় জগতের সফলতার চাবিকাঠি।
১. শিক্ষা, পরিকল্পনার প্রথম ভিত্তি
এই পরিকল্পনার সূচনা হবে শিক্ষা দিয়ে। আমাদের নিশ্চিত করতে হবে, প্রত্যেক মুসলমান অন্তত এতটুকু কুরআন ও সুন্নাহর জ্ঞান অর্জন করবে, যা তাকে আল্লাহর বান্দেগি যথাযথভাবে আদায় করতে সক্ষম করে। পাশাপাশি এমন মানুষও তৈরি করতে হবে, যারা ইসলামী জ্ঞানে গবেষণার উচ্চ আসনে অধিষ্ঠিত হতে পারে।
এরপর প্রয়োজন দুনিয়াবি শিক্ষার প্রতি মনোযোগ। আজকের বাস্তবতায় দুনিয়াবি শিক্ষা কেবল জ্ঞান অর্জনের মাধ্যম নয়; বরং সম্মানজনক উপার্জন ও কর্মসংস্থানের প্রধান পথ। প্রত্যেক গ্রাম, প্রত্যেক শহর, এমনকি প্রত্যেক মুসলিম অধ্যুষিত এলাকায় নিশ্চিত করতে হবে, মুসলিম শিশুরা যেন শিক্ষার আলো থেকে বঞ্চিত না হয়। আর্থিক ও অনার্থিক যেসব বাধা সামনে আসে, সেগুলোর সমাধান বের করতে হবে। শিক্ষার পথে কোনো অজুহাত বা প্রতিবন্ধকতা যেন দাঁড়াতে না পারে।
এমন ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে, যাতে আমাদের সন্তানরা উচ্চমানের শিক্ষা লাভ করতে পারে। দরিদ্র পরিবারের শিশুদের ফি পরিশোধের ব্যবস্থা, তাদের জন্য বৃত্তি, আর দুর্বল শিক্ষার্থীদের জন্য উপযুক্ত টিউশনের সুযোগ সৃষ্টি করা, এসবকে অগ্রাধিকার দিতে হবে।
শ্রেষ্ঠত্ব ও উৎকর্ষ হওয়া উচিত আমাদের বৈশিষ্ট্য। আজকের পৃথিবীতে মর্যাদা তারই, যে নিজ ক্ষেত্রে অগ্রগণ্য। যোগ্যতা ও উৎকর্ষ এমন শক্তি, যা সাম্প্রদায়িক ও সংকীর্ণ মনোভাবাপন্ন মানুষও সহজে উপেক্ষা করতে পারে না।
২. কল্যাণমূলক কর্মযজ্ঞ
দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ হলো সমাজসেবামূলক কাজের বিস্তার। যারা দৈনন্দিন খাদ্য থেকে বঞ্চিত, তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। মেয়েদের সম্মানজনক বিয়ের ব্যবস্থা করার প্রয়াস নিতে হবে। রাষ্ট্রীয় নীতির কারণে অনেক মুসলমান জীবিকার উৎস হারাচ্ছে, তাদের জন্য যথার্থ বিকল্প ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে।
৩. নৈতিকতা ও চরিত্রগঠন
এই পরিকল্পনার আরেকটি প্রধান স্তম্ভ হলো নৈতিক উৎকর্ষ নির্মাণ। আমাদের নৈতিক অবস্থা অন্যদের তুলনায় উন্নত নয়। লজ্জাহীনতা, অশ্লীলতা, অসততা, এসব আমাদের ভেতরে বিস্তার লাভ করেছে। অস্থিরতা ও অতিরিক্ত ক্রোধ বহু নৈতিক ব্যাধির জন্ম দিচ্ছে। এমনকি আলেম ও শিক্ষিত শ্রেণির মধ্যেও নৈতিক অবক্ষয় দেখা যাচ্ছে। সম্পদ ও পদমর্যাদার প্রতি আকর্ষণ বেড়েই চলেছে।
জাতি হিসেবে আমাদের টিকে থাকা এই নৈতিক মূল্যবোধের ওপর নির্ভরশীল। পরিবার ও সামষ্টিক জীবনের ভাঙনের বড় কারণ আমাদের নৈতিক দুর্বলতা। নারী, শিশু, পিতা-মাতা, আত্মীয়স্বজন, দরিদ্র ও এতিমদের অধিকার আদায়ে এবং তাদের সম্মান রক্ষায় আমরা বড় অংশে গাফিল। এসব বিষয়ে বিশেষ মনোযোগ দেওয়া জরুরি। নৈতিক শিক্ষার সুশৃঙ্খল কর্মসূচি আমাদের সংস্কারচেষ্টার মৌলিক অংশ হওয়া উচিত।
৪. অমুসলিমদের সঙ্গে সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্ক
অমুসলিমদের সঙ্গে উত্তম সম্পর্ক গড়ে তুলতে হবে। অমুসলিম প্রতিবেশীর খোঁজখবর রাখা, তাদের উপহার দেওয়া, অনুষ্ঠানে আমন্ত্রণ করা—এসব সম্পর্ককে উষ্ণ করে। প্রতিটি মহল্লায় বর্ণ, জাতিগত ও সামাজিক বিভাজনের ঊর্ধ্বে উঠে মুসলিম ও অমুসলিমদের যৌথ সমাবেশ আয়োজন করা যেতে পারে—যেখানে আপ্যায়নের ব্যবস্থা থাকবে এবং মানবিক, নাগরিক ও পারস্পরিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়ে মতবিনিময় হবে।
তাদের শিশু ও প্রবীণদের প্রতিও আমাদের আন্তরিক আগ্রহ প্রকাশ করা উচিত। সম্পর্ক যত দৃঢ় হবে, গণমাধ্যম ও ইসলামবিরোধী সংগঠনগুলোর নেতিবাচক প্রভাব ততটাই হ্রাস পাবে।
৫. ধৈর্য ও সংযমের অনুশীলন
বর্তমান পরিস্থিতিতে আমাদের অসীম ধৈর্য ও সহনশীলতা অবলম্বন করতে হবে। আমাদের উত্তেজিত করার চেষ্টা অব্যাহত থাকবে। ধর্মীয় ও অ-ধর্মীয় শোভাযাত্রা আমাদের এলাকায় এনে প্ররোচিত করা হবে, উপাসনালয়গুলোকে বিতর্কে জড়ানো হবে। এসব মুহূর্তে আমাদের উত্তেজনা এড়িয়ে চলতে হবে; স্লোগান ও শোরগোলের জবাব দিতে হবে নীরব স্থিরতায়।
ইরাক ও সিরিয়ার অভিজ্ঞতা থেকে আমাদের বিরোধীরা নতুন কৌশল খুঁজে পেয়েছে—মুসলিম ও অমুসলিম সংঘর্ষের পরিবর্তে মুসলমানদের অভ্যন্তরীণ মতভেদ উসকে দেওয়া এবং তাদের পরস্পরের বিরুদ্ধে লেলিয়ে দেওয়া। আমরা ইতিহাসের এক সংকটময় সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছি। নিজেদের মতভেদকে পাশে রেখে উম্মাহর জন্য কাজ করার মানসিকতা গড়ে তুলতে হবে।
শিয়া-সুন্নি মতভেদ, দেওবন্দি-বেরেলভি বা সালাফি-অসালাফি পছন্দ, এসবকে শ্রেণিকক্ষের আলোচনার মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা উচিত। মসজিদ ও জনসমাবেশে আমাদের সাম্প্রদায়িক বিভাজন ভুলে দ্বীনের মৌলিক বিষয়ে ঐক্য জোরদার করতে হবে। জাতির সামগ্রিক কল্যাণে ব্যক্তিগত ও গোষ্ঠীগত স্বার্থ হাসিমুখে বিসর্জন দেওয়ার শিক্ষা অর্জন করতে হবে।
উপসংহার
এই চিন্তা ও প্রস্তাবগুলো তখনই ফলপ্রসূ হবে, যখন এগুলোকে আন্দোলনের রূপ দেওয়া হবে। প্রতিটি পরিকল্পনা বাস্তবায়নের জন্য পৃথক সংগঠন গড়ে তুলতে হবে, যারা দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে এই নির্দেশনাগুলোর প্রচার ও বাস্তব প্রয়োগ নিশ্চিত করবে।
আলহামদুলিল্লাহ, কিছু স্থানে ইতোমধ্যে এসব নীতির আলোকে কাজ শুরু হয়েছে। এখন প্রয়োজন, এসব উদ্যোগকে আরও বিস্তৃত ও সুশৃঙ্খল করা। আমরা দোয়া করি, আল্লাহ তাআলা আমাদের সাহস ও স্থিরতার সঙ্গে কাজ করার তাওফিক দিন এবং অনর্থক সমালোচনা ও বিদ্বেষপূর্ণ আচরণ থেকে আমাদের রক্ষা করুন। আমীন।
———–
ক্যাটাগরি : ইসলামি চিন্তাধারা, জামাআত, উপদেশ, আখলাক
✍ মূল : ড. মুহাম্মদ আকরাম নাদভী, অক্সফোর্ড।
✍ অনুবাদ যাচাই ও সম্পাদনা: মাওলানা মারজান আহমদ, সিলেট, বাংলাদেশ।
🔗 অনূদিত মূল প্রবন্ধের লিংক: 👇
https://t.me/DrAkramNadwi/377