শিরোনাম : যে জীবন ফিরে আসে না
|০৯| ফেব্রুয়ারি| ২০২৬|
হে নশ্বরতার সন্তান, এই সম্বোধন কেবল কোনো উপদেশ নয়; এটি অস্তিত্বের গভীরতম সত্যের আহ্বান। এটি মানুষকে সেই ভ্রান্তি থেকে জাগিয়ে তোলে, যেখানে সে নিজের অস্তিত্বকে স্থায়ী ও স্বয়ংসম্পূর্ণ মনে করতে বসে। অথচ বাস্তবতা হলো মানুষ নিজের সত্তার স্রষ্টা নয়, নিজের অস্তিত্বের মালিকও নয়। সে কেবল এক ক্ষণস্থায়ী প্রকাশ, সময়ের স্রোতে জেগে ওঠা এক ঢেউ, যা সময়ের মধ্যেই মিলিয়ে যাবে। মানুষ প্রতিদিনের সকালের আলোকে সাধারণ ঘটনা ভেবে নেয়, অথচ এই আলোই প্রতিদিন তাকে একটি নতুন মুহূর্ত উপহার দেয়, যে মুহূর্ত আর কখনো ফিরে আসে না।
মানুষের মূল সমস্যা এই নয় যে সে নশ্বর; বরং এই যে নশ্বর হয়েও সে স্থায়িত্বের দাবি করে। সে শূন্যতা থেকে এসেছে এবং শূন্যতার দিকেই ফিরে যাচ্ছে, কিন্তু মাঝের এই সময়টুকুকে চিরস্থায়ী ভেবে বসেছে। এই ভ্রান্তিই তার অন্তরে নিজের গুরুত্বের এক মিথ্যা বোধ জন্ম দেয়, আর সময়ের সামনে তার ক্ষণস্থায়ী সত্য আড়াল হয়ে যায়। নিজের প্রতিটি কাজ, প্রতিটি আকাঙ্ক্ষা, প্রতিটি অহংকারে সে ভুলে যায়, তার অস্তিত্ব সীমিত ও অস্থায়ী। অথচ এই সীমাবদ্ধতাই যদি সে চিনতে পারে, তবে প্রতিটি মুহূর্ত অর্থবহ হয়ে উঠতে পারে।
আমরা কি কখনো ভেবে দেখেছি, শিশুর হাসি, বন্ধুত্বের সান্নিধ্য, একটিমাত্র ভালোবাসার ক্ষণ, এমনকি সাফল্যও ক্ষণস্থায়ী? এই মুহূর্তগুলো ফিরে আসে না, আর তাদের মূল্য জমা থাকে কেবল সচেতনতার গভীরে।
মানুষের অস্তিত্ব অনিশ্চিত। যে সত্তার ভেতরে স্থায়িত্বের কারণ নেই, তার প্রতিটি দাবি সাময়িক, প্রতিটি সম্পর্ক ধার করা, প্রতিটি শ্রেষ্ঠত্ব এক প্রতারণা। তবুও মানুষ এই ঝুলে থাকা অস্তিত্বকেই নিজের আসল পরিচয় ভেবে নেয় এবং নিজেকে বিশ্বজগতের কেন্দ্র বলে মনে করতে শুরু করে। প্রতিটি সাফল্য, প্রতিটি অবস্থান, প্রতিটি সম্মান স্থায়ী চিহ্ন হয়ে দাঁড়ায় তার কাছে, অথচ এগুলো সবই সময়ের ঢেউয়ে মুছে যাওয়ার অপেক্ষায়। অট্টালিকা, শহরের জৌলুস, পতাকার দোল, সবই কিছুক্ষণের জন্য; তারপর তারা কেবল স্মৃতিতে রয়ে যায়।
মৃত্যুই এই ভ্রান্তির চূড়ান্ত উন্মোচন। মৃত্যু মানুষের সমস্ত উপাধি, পরিচয় ও অলংকার ছিনিয়ে নেয়, আর কেবল সত্যটুকু রেখে দেয়, নশ্বরতা। কবর সেই জায়গা, যেখানে মানুষ প্রকাশ্যেই নিজের সীমা ও ক্ষণস্থায়ীতাকে দেখে। যে গতকাল সজ্জিত সিংহাসনে বসে ছিল, আজ সে ধুলোমাখা মাটিতে শুয়ে আছে; যে নিজেকে মহান ভাবত, সে মাটির সমান হয়ে যায়। তখন মানুষ বুঝতে পারে, তার ক্ষমতা, তার শক্তি, তার অহংকার, সবই সাময়িক।
আমরা কি কখনো অনুভব করেছি, যে বন্ধুর সঙ্গে আমরা হাসতাম, সে আজ কোথাও অনেক দূরে? কিংবা সেই বাবা-মা, যারা আমাদের সুখদুঃখের সঙ্গী ছিলেন, আজ তারা কেবল স্মৃতির নীরব অংশ? এসব মুহূর্তই মানুষকে তার নশ্বরতার কথা মনে করিয়ে দেয়।
পার্থিব ক্ষমতা ও সম্পদ, খ্যাতি ও সাফল্য, সবই স্বপ্ন। আদ, সামুদ, ফেরাউন, নমরুদ, কায়সার ও কিসরা, এরা সবাই ছিল মানবশক্তির প্রতীক, কিন্তু সময় তাদের এমনভাবে গ্রাস করেছে, যেমন বাতাস বালির ওপর লেখা মুছে দেয়। ক্ষমতার স্থায়িত্ব এক মরীচিকা, বাস্তবতা নয়। সাম্রাজ্য আসে যেন চলে যায়, আর মানুষ ওঠে যেন পড়ে যায়। এই সত্যই মানুষের অহংকার, প্রতারণা ও প্রদর্শনীর মুখোশ খুলে দেয়।
তবুও মানুষ তার হৃদয়ের নরম কোণগুলোতে পৃথিবীর দিকেই ছুটে যায়। কেন? কারণ আকাঙ্ক্ষা সাময়িক সুখকে সত্যের চেয়েও বাস্তব মনে করায়। মানুষ জানে এই ঘর ভেঙে পড়বে, তবুও সে তাকে সাজাতেই ব্যস্ত থাকে, যেন এই ব্যস্ততাই তার টিকে থাকার প্রমাণ। সে নিজের দিন, নিজের মুহূর্ত, নিজের স্বপ্ন সবই পার্থিব প্রতিশ্রুতির জন্য উৎসর্গ করে দেয়, অথচ সবই ধোঁকা ও কল্পনা। এই দ্বন্দ্বই মানবজীবনের সবচেয়ে বড় ধাঁধা, জেনেও না জানা, দেখেও না দেখা, আর নশ্বরতাকে মেনে না নেওয়া।
এই মুহূর্তই মানুষের জন্য সবচেয়ে বড় পরীক্ষা। আসল প্রশ্ন এই নয় যে পৃথিবী কতটা স্থায়ী, বরং এই যে মানুষ নিজের অস্তিত্বকে কোন দৃষ্টিতে দেখে। যদি সে নিজের নশ্বরতাকে চিনে নিতে পারে, তবে প্রতিটি মুহূর্ত অর্থে ভরে উঠতে পারে। প্রতিটি নিঃশ্বাস, প্রতিটি ব্যথা, প্রতিটি আনন্দ, প্রতিটি ভালোবাসা, প্রতিটি সম্পর্ক গুরুত্ব ও সত্য লাভ করে। আর যদি সে ভুলে যায়, তবে প্রতিটি আনন্দ মরীচিকা আর প্রতিটি দুঃখ অর্থহীন হয়ে যায়। এভাবেই মানুষ জীবনের প্রকৃত আলোর থেকে বঞ্চিত থাকে।
আমরা প্রতিদিন কত ছোট ছোট মুহূর্ত নষ্ট করে দিই—হোক তা কোনো কথা, কোনো স্পর্শ, কিংবা কোনো নীরবতা। অথচ এই মুহূর্তগুলোই আমাদের নশ্বরতার কথা মনে করিয়ে দেয় এবং আমাদের সত্যের কাছাকাছি নিয়ে যায়।