AkramNadwi

ইসলামের “দুর্গসমূহ” ❞

https://t.me/DrAkramNadwi/3180

بسم الله الرحمن الرحيم.

মুহতারাম মাওলানা আরিফুর রহমান মজাহিরী সাহেব (মাদ্দা জিলাহু) আমার ওস্তাদ হযরত ক্বারী যুবায়ের সাহেব (রাহি.)-এর ভাতিজা। তিনি কয়েক দিন আমার গ্রামে অবস্থান করেছেন। বর্তমানে তিনি দরভাঙ্গা এলাকার একটি মাদ্রাসার দায়িত্বশীল ও শিক্ষক। তিনি অত্যন্ত সৎপ্রকৃতি ও নেক স্বভাবের অধিকারী। আল্লাহ তাআলা তাঁর এবং আমাদের সবার মাধ্যমে নিজের দ্বীনের কাজ নিন। আমিন।

|| আপত্তি :

মাওলানা আরিফুর রহমান সাহেব আমার এ মতের সঙ্গে একমত নন যে, ছাত্রদের অধ্যয়নের স্বাধীনতা থাকা উচিত এবং তাদের উপর এ নিয়ন্ত্রণ আরোপ করা উচিত নয় যে তারা কী পড়বে আর কী পড়বে না। তিনি তাঁর আপত্তি প্রকাশ করে লিখেছেন:
“কিতাব অধ্যয়ন হলো সাহচর্যের বিকল্প, আর ‘সৎ সাহচর্য তোমাকে সৎ করবে এবং অসৎ সাহচর্য তোমাকে অসৎ করবে’।

|| উত্তর :

| পৃথিবীতে দুই ধরনের সেনাবাহিনী রয়েছে।
:: প্রথম ধরনের সেনাবাহিনী হলো,
যারা মুক্ত প্রান্তরে প্রশিক্ষণ গ্রহণ করে। মরুভূমি, নদী, পর্বত, বালুকাময় ভূমি এবং বরফময় এলাকায় তারা শক্তি অর্জন করে। তারা শত্রুর কোনো চালাকি বা আকস্মিক আক্রমণে আতঙ্কিত হয় না। বরং তারা কঠিন এবং ধৈর্য-পরীক্ষার পরিস্থিতিতে মোকাবিলা করতে প্রস্তুত থাকে। তারা শুধু নিজেদের দেশ ও জাতির রক্ষা করে না, বরং নতুন নতুন এলাকায় বিজয়ের পতাকা উড়ায়। সাহাবায়ে কেরাম (রাযি.), বনু উমাইয়া, বনু আব্বাস, উসমানীয় এবং মুঘলদের প্রাথমিক যুগের সেনাবাহিনী এই বৈশিষ্ট্যগুলোর অধিকারী ছিল।

:: দ্বিতীয় ধরনের সেনাবাহিনী হলো,
যারা দুর্গে বন্দি থাকে এবং একটি ক্ষয়িষ্ণু ক্ষমতার প্রতিরক্ষাকে তাদের মিশন মনে করে। তারা দুর্গের বাইরে যুদ্ধ করতে অক্ষম এবং দুর্গের ভেতরে প্রত্যেক অপরিচিত মুখকে সন্দেহের দৃষ্টিতে দেখে। দুর্গের ভেতরকারদের বাইরের পৃথিবীর সঙ্গে কোনো সম্পর্ক থাকলে তা অবিশ্বাস্য হয়ে যায়। দুর্গের বাইরে কাউকে দেখলেই তাদের মধ্যে ভীতির সঞ্চার হয়। মুঘলদের শেষ যুগের সৈন্যরা এই মনোবৃত্তির অধিকারী ছিল। এ ধরনের সেনাবাহিনী অভ্যন্তরীণভাবে দুর্বল ও শারীরিকভাবে অক্ষম হয়ে থাকে। মরু এলাকার কিছু যাযাবরও এই বাহিনীকে মুহূর্তের মধ্যে ধ্বংস করে দিতে পারে।

| শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রেও এই বৈশিষ্ট্য দুই রকম হয়।

:: প্রথম ধরনের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান হলো, যেখানে ছাত্রদের চিন্তা-ভাবনার প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। তাদের বুদ্ধিকে যথোপযুক্ত খাদ্য সরবরাহ করা হয়। তাদের জন্য স্বাধীন পরিবেশ তৈরি করা হয়। এতে তাদের আত্মবিশ্বাস বৃদ্ধি পায়। তারা কোনো মানসিক চ্যালেঞ্জে ভীত হয় না। বরং তারা অন্য চিন্তা-ধারণাকে পরাজিত করতে সক্ষম হয়। তারা কোনো আবদ্ধ স্থানে বন্দি থাকতে চায় না। বরং গোটা দুনিয়াকে তাদের যুদ্ধক্ষেত্র বানিয়ে ফেলে। তাদের মাধ্যমে স্থবির চিন্তার ঘরে কম্পন সৃষ্টি হয়।

:: দ্বিতীয় ধরনের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান হলো, যারা তাদের ছাত্রদের একটি চার দেয়ালের মধ্যে বন্দি করে রাখে। তারা তাদের চিন্তা ও বুদ্ধির প্রশিক্ষণ দেয় না। বরং তাদের মধ্যে এমন এক ভয়ানক মানসিকতা তৈরি করে যে, গোটা দুনিয়া তাদের শত্রু। প্রতিটি জ্ঞান ও বিদ্যা ঈমান-তাকওয়ার বিরোধী। সমস্ত বই বিভ্রান্তিকর। তাদের চিন্তার পরিসরের বাইরের কারো সঙ্গে সম্পর্ক রাখা উচিত নয়। অন্যথায় সেই ব্যক্তি তাদের প্রভাবিত করবে।

হায়, খাঁচার বন্দিত্বে আত্মতৃপ্ত মানসিকতা! তাদের কী-ইবা ধারণা পাহাড়ের চূড়ায় বাসা বাঁধা, মরুভূমির মুক্ত বাতাসে উড়ে বেড়ানো এবং আকাশের সঙ্গে সখ্যতা গড়ে তোলার মজা কেমন হতে পারে!

ভারতের সাধারণ মাদ্রাসাগুলো এই প্রতিরক্ষামূলক মানসিকতার ফল। তাদের ছাত্ররা চিন্তাগত এবং বুদ্ধিগতভাবে দুর্বল হয়ে থাকে। তারা কোনো বস্তুর সৌন্দর্য বা কুৎসিততা বিচার করার যোগ্যতা রাখে না। তাদের কাছে জীবনের প্রতিটি সমস্যার সমাধান হলো তাদের পূর্বসূরিদের অনুসরণ করা এবং কয়েকটি নির্দিষ্ট বইয়ের উপর নির্ভর করা। এই ছাত্ররা কোনো মানসিক আক্রমণ মোকাবিলা করার সামর্থ্য রাখে না। তারা নিম্নমানসিকতার ভয়ানক শৃঙ্খলে আবদ্ধ থাকে।

এ ধরনের মাদ্রাসাগুলোর দায়িত্বশীলরা তাদের ছাত্রদের বাহ্যিক অবস্থা ও পোশাক-পরিচ্ছদকেই তাকওয়া ও নেকি হিসেবে অভিহিত করেন এবং তা নিয়ে গর্ববোধ করেন। অথচ এটি এমন এক সভ্যতা, যার পেছনে কোনো ঈমান নেই। এই ছাত্ররা এমন বন্দি পরিবেশে বিশেষ নির্ধারিত রূপ না নিলে আর কী-ইবা করতে পারে? এ ধরনের ছাত্রদের জন্য বেঁচে থাকা কঠিন এবং মৃত্যু সহজ।

বর্তমান বিশ্বের পরিস্থিতিতে মাদ্রাসাগুলোর কার্যকারিতা তখনই টিকে থাকতে পারে, যখন মাদ্রাসার ছাত্ররা অন্যান্য পার্থিব ও সেক্যুলার ছাত্রদের সঙ্গে মেলামেশা করবে। তারা সেসব শিক্ষকদের লেকচার শুনবে, যারা তাদের গণ্ডির বাইরে। তাদের পরিমণ্ডলের বাইরের লেখকদের বই অধ্যয়ন করবে এবং বৃহত্তর মানব সমাজে বেঁচে থাকার পদ্ধতি শিখবে।

ছাত্রদের এ কথা বলা উচিত নয় যে কী পড়বে আর কী পড়বে না, কার সঙ্গে দেখা করবে আর কার সঙ্গে করবে না। এমন বিভ্রান্তিতে থাকা উচিত নয় যে অর্থহীন প্রচেষ্টাকেও ফলপ্রসূ হিসেবে বিবেচনা করা হবে। বরং তাদের বুদ্ধিমত্তা এবং চিন্তাশক্তিকে এতটাই শক্তিশালী করতে হবে যে, তারা ভুল প্রভাব গ্রহণ করার বদলে সঠিক বিষয়গুলো শিখতে পারে। তাদের শেখাতে হবে, “যা বিশুদ্ধ তা গ্রহণ কর এবং যা দূষিত তা পরিত্যাগ কর”।

মাদ্রাসাগুলোকে শক্তিশালী শিক্ষালয় এবং সৎ প্রশিক্ষণের স্থান বানানোর জন্য চারটি নীতির উপর অবশ্যই আমল করা জরুরি।

১. প্রথমত, শিক্ষাদান ও প্রশিক্ষণের ব্যবস্থাকে উন্নত করুন, প্রতি বছর তা পুনর্মূল্যায়ন করুন, বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে পরামর্শ চালিয়ে যান এবং সময় ও পরিস্থিতির ভিত্তিতে এতে প্রয়োজনীয় পরিবর্তন আনুন।

২. দ্বিতীয়ত, মাদ্রাসার গ্রন্থাগারে পছন্দ ও অপছন্দ উভয় ধরনের লেখকদের মানসম্পন্ন বই রাখুন। ছাত্রদের মধ্যে অধ্যয়নচর্চার উৎসাহ সৃষ্টি করুন। তাদের স্বভাবকে বুদ্ধির দিকনির্দেশনা অনুসরণ করতে দিন। এ ভয় করবেন না যে তারা ভুল করবে। ভুল করা মানুষের মৌলিক অধিকারের অন্তর্ভুক্ত, যা আপনি তাদের কাছ থেকে ছিনিয়ে নিতে পারেন না।

৩. তৃতীয়ত, বিভিন্ন বিষয়ে সেমিনারের আয়োজন করুন, যেখানে বাইরের বিষয়-নিপুণদের আমন্ত্রণ জানানো হবে। ছাত্ররা এসব সেমিনারে অংশগ্রহণ করবে এবং বিতর্কে অংশ নেবে। এই ব্যবস্থার মাধ্যমে ছাত্ররা বিভিন্ন বিষয়ের ভিন্ন দিক সম্পর্কে অবগত হবে, তারা জানবে বিষয়টির পক্ষে ও বিপক্ষে যুক্তি কী, এবং তাদের সামনে উভয় দলের যুক্তির শক্তি ও দুর্বলতা স্পষ্ট হয়ে উঠবে।

৪. চতুর্থত, মাদ্রাসার ছাত্ররা কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় পরিদর্শন করবে, সেখানে আয়োজিত কর্মসূচিতে অংশ নেবে এবং দেশের শিক্ষাগত ও সামাজিক কর্মকাণ্ডে কার্যকর ভূমিকা পালনের চেষ্টা করবে। এর ফলে তাদের হীনমন্যতা দূর হবে এবং তারা অন্যদের নিজ নিজ ক্ষেত্রে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার যোগ্যতা অর্জন করবে।

৫. এবং সর্বশেষে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, ছাত্রদের মধ্যে তাদের মিশনের প্রতি আন্তরিকতা সৃষ্টি করুন, যেন তারা আপনাকে অনুকরণ করার বদলে নিজেদের পরিস্থিতি ও পরিবেশ অনুযায়ী নতুন নতুন উপায়ে এই মিশনকে এগিয়ে নিতে পারে এবং তার সেবা করতে পারে।

যদি আপনি এই বিষয়গুলো মাথায় রাখেন, তাহলে আপনি দুর্গ-আবদ্ধ সৈনিকদের নেতিবাচক দিক থেকে মুক্ত থাকবেন এবং আপনার ছাত্ররা প্রকৃতির পরিচর্যায় গড়ে ওঠা সৈনিকদের মতো দৃঢ়, দৃঢ়সংকল্প এবং সাহসী হবে। তারা নতুন পৃথিবী জয় করবে, বিশ্বে চিন্তার প্রাসাদগুলোতে কম্পন সৃষ্টি করবে এবং ইসলামের বার্তা আত্মবিশ্বাস ও উচ্চ মনোবলের সঙ্গে উপস্থাপন করবে।

সংক্ষেপে, মাদ্রাসাগুলোকে দুর্গে পরিণত করবেন না; বরং সেগুলোকে স্বাভাবিক বুদ্ধি ও হৃদয়ের শিক্ষার জন্য প্রাকৃতিক প্রশিক্ষণকেন্দ্র বানান।

——–

মূল : > ড. মুহাম্মাদ আকরাম নদভী, অক্সফোর্ড।
অনুবাদ যাচাই ও সম্পাদনা :
|| মাওলানা মারজান আহমদ, সিলেট, বাংলাদেশ।

শেয়ার করুন:

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *