৩০ জানুয়ারি ২০২৬
আমি এই বিশ্বে আসিনি, আমাকে আনা হয়েছে। এটাই আমার প্রথম এবং সবচেয়ে বড় সত্য।
আমার আগমনের আগেই এই জগতের সব আয়োজন সম্পূর্ণ ছিল। আমার জন্য একটি দেহ প্রস্তুত ছিল, আমার পরিচয়ের জন্য একটি পরিবার বিদ্যমান ছিল, একটি ইতিহাস যেন আমাকে অপেক্ষা করছিল। এসব কিছুর কোনোটি বাছাইয়ে আমার কোনো ভূমিকা ছিল না। আমি আমার অস্তিত্বের নকশা আঁকিনি, আমার আত্মার গঠনে কোনো মত দিইনি। আমার পিতা-মাতা, তাঁদের পূর্বপুরুষরা, প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে দাঁড়িয়ে থাকা সেই নীরব সারি, সবই আমার ইচ্ছার বাইরে ছিল। আমাকে এমন এক কাফেলায় এনে দাঁড় করানো হয়েছে, যা আমার চেতনার জন্মের বহু শতাব্দী আগ থেকেই চলমান।
যে গ্রাম আমার প্রথম কান্না শুনেছিল, সেটি আমার সৃষ্টি ছিল না। তার মাটি আমার পায়ের আগে থেকেই জীবনের উষ্ণতায় ভরা ছিল। তার মাঠ আমার আগমনের আগেই সবুজে ঢেউ খেলাত। তার পুকুরগুলো আমার আগে থেকেই আকাশকে বুকে ধরে রাখত। সেখানকার মানুষ এমন এক ভাষায় কথা বলত, যা আমি সৃষ্টি করিনি; তারা এমন এক সভ্যতার উত্তরাধিকার বহন করত, যা আমি নির্মাণ করিনি। আমি এসবের উপকার ভোগ করেছি, তাদের ছায়ায় বড় হয়েছি, তাদের রিজিকেই বেঁচেছি, কিন্তু এর কোনো কিছুর মধ্যেই আমার তৈরি করা একটি কণাও ছিল না।
আমার মাথার ওপর বিস্তৃত আকাশ, সূর্যের অবিরাম উদয়, চাঁদের কোমল পরিক্রমা, নক্ষত্রদের নীরব সমাবেশ, মেঘের উদাস যাত্রা, সবই এমন এক শৃঙ্খলার অংশ, যার বিন্যাসে আমার কোনো হাত নেই। আমি চোখ মেলেছি এমন এক ব্যবস্থার ভেতর, যা আমার জ্ঞান ও ইচ্ছা থেকে স্বাধীনভাবে চলমান। বাতাস আমাকে জীবন দেয়, পানি আমাকে টিকিয়ে রাখে, পৃথিবী আমাকে ধারণ করে, আর এসব নিয়ামতের কোনোটিরই স্রষ্টা আমি নই।
আমার শিক্ষাও আমার আবিষ্কার ছিল না; তা আমাকে দান করা হয়েছে। জ্ঞান আমার কাছে কোনো ব্যক্তিগত উদ্ভাবন হিসেবে আসেনি; এসেছে এক আমানতের মতো, প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে সঞ্চারিত হয়ে। যে মাদরাসাগুলো আমার মনে আলো জ্বালিয়েছে, সেগুলো কেবল ইট-পাথরের স্থাপনা ছিল না; সেগুলো ছিল সংরক্ষিত স্বপ্নের ভাণ্ডার, সেসব মানুষের স্মৃতিচিহ্ন, যারা এই বিশ্বাসে জীবন উৎসর্গ করেছিলেন যে জ্ঞান কোনো একক ব্যক্তির সম্পত্তি নয়, বরং প্রজন্মের উত্তরাধিকার। আমি সেই প্রতিষ্ঠানগুলোর ভিত্তি স্থাপন করিনি, তাদের স্তম্ভ তুলিনি; তবু তাদের ছায়ায় বসে আমি বোধের স্বাদ পেয়েছি, প্রশ্ন করতে শিখেছি, নীরবতার আড়ালে লুকিয়ে থাকা অর্থ শুনতে শিখেছি।
আমার শিক্ষকেরা কেবল ব্যক্তি ছিলেন না; তাঁরা ছিলেন এক দীর্ঘ ধারাবাহিকতার জীবন্ত কড়ি। তাঁদের কণ্ঠে শতাব্দীর প্রতিধ্বনি ধ্বনিত হতো। তাঁরা যখন কথা বলতেন, মনে হতো, সময় নিজেই তার স্মৃতি আমার হাতে তুলে দিচ্ছে। আমি তাঁদের কাছ থেকে পাঠ নিতাম, অথচ বাস্তবে একটি সভ্যতাই আমার সঙ্গে সংলাপে লিপ্ত থাকত। সেই মুহূর্তগুলোতে বারবার উপলব্ধি করেছি, আমি জ্ঞানের স্রষ্টা নই; আমি তার উত্তরাধিকারী। আর উত্তরাধিকার মানেই দায়িত্ব, তাকে রক্ষা করা, বিকৃত না করে পরের হাতে তুলে দেওয়া।
নদওয়ায় পৌঁছানো আমার কৌশলের ফল ছিল না; এটি ছিল এমন এক পথ, যা আমার জন্য খুলে দেওয়া হয়েছিল, যেন কোনো অদৃশ্য প্রজ্ঞা আমার পা রাখার আগেই জমিন মসৃণ করে দিয়েছিল। আমি নদওয়াকে সৃষ্টি করিনি, তার প্রতিষ্ঠাতাদের অন্তরে সেই প্রথম আগুন জ্বালাইনি, যেখান থেকে এই প্রদীপ আলোকিত হয়েছিল। কিন্তু আমি সেই আলোতে বসেছিলাম, আর তা আমাকে আমার সামর্থ্য অনুযায়ী আলোকিত করেছিল। সেখানে আমি শুধু বই পড়িনি; আমি একটি জীবন্ত ঐতিহ্যকে নিঃশ্বাস নিতে দেখেছি।
ইংল্যান্ড যাত্রাও আমার জীবনের মানচিত্রে এমন এক মোড় ছিল, যা আমি নিজ হাতে আঁকিনি। আমি অক্সফোর্ডের ইট বসাইনি, তার শতাব্দীব্যাপী ইতিহাসে আমার কোনো অংশ নেই; তবু তার কক্ষগুলোতে বসে আমি অনুভব করেছি, মানুষের চিন্তা ভূগোলের চেয়েও বিস্তৃত। সেখানে বসে আমি জেনেছি, জ্ঞানের সীমানা জাতির চেয়ে প্রশস্ত এবং সময়ের চেয়েও দীর্ঘ। আমি এমন এক জগতে প্রবেশ করেছি, যা আমার অনুপস্থিতিতেও সম্পূর্ণ ছিল, একটি নির্মিত জগৎ, যা আমার আগমনে শুরু হয়নি এবং আমার প্রস্থানে শেষও হবে না।
এই অনুভবই আমাকে বারবার থামিয়েছে, বারবার নত করেছে। আমি পথিক, মালিক নই। আমি ঐতিহ্যের নদী থেকে এক পেয়ালা ভরতে পারি, কিন্তু নদীটি আমার নয়। আমি এই ধারাবাহিকতার একটি ক্ষণমাত্র, পুরো কাহিনি নই। আমার মর্যাদা সৃষ্টিকর্তার নয়; আমানত বহনকারীর।
তবু মানুষের ভেতরে এক সূক্ষ্ম প্রতারণা বাস করে, সে নিজেকেই কেন্দ্র ভাবতে শুরু করে। আমিও কখনো কখনো আমার সাফল্যকে নিছক নিজের সৃষ্টি বলে ধরে নিয়েছি। অথচ আমি ছিলাম দান করা সম্ভাবনাগুলোর সমষ্টি মাত্র। আমি আগে থেকে জানতাম না, কোন কোন বই আমার কলম থেকে বের হবে, কোন কোন মননের সঙ্গে আমার সংলাপ গড়ে উঠবে। অনেক কিছু আমার সামনে ঘটেছে, আর আমি তাতে যুক্ত হয়ে গেছি। না আমার চেষ্টা একান্তই আমার ছিল, না আমার ক্ষেত্র আমি নিজে নির্মাণ করেছিলাম।
আমার ব্যক্তিগত জীবনও এই সত্যেরই সাক্ষ্য দেয়।
আমার স্ত্রী আমার সৃষ্টি নন; তিনি একটি স্বতন্ত্র জগৎ, যে আমার জীবনের সঙ্গে এসে মিলেছে।
আমার সন্তানরা আমার কোনো পরিকল্পনার ফল নয়; তারা এক রহস্যের মতো আমার হাতে সোপর্দ করা আমানত।
ভালোবাসা এমন কোনো বস্তু নয় যা বানানো যায়; তা এক ধরনের উদ্ঘাটন, এক অনুগ্রহ, এক আলো যা মানুষের ওপর অবতীর্ণ হয়।
তবে একটি ক্ষেত্রে আমার দক্ষতা অস্বীকার করার উপায় নেই, নিজের সমস্যাগুলো নিজেই সৃষ্টি করা।
নিজের দুর্বলতা, নিজের তাড়াহুড়া, নিজের অহংকারের হাতেই আমি প্রায়ই এমন সব গিঁট বেঁধে ফেলি, যেগুলো আদতে ছিলই না।
কিন্তু সেই গিঁট খোলার সূচনা প্রায়ই হয় ঠিক সেখান থেকেই, যেখানে আমার নিয়ন্ত্রণ শেষ হয়ে যায়।
আর সাহায্য আসে সেই দিক থেকেই, যেখান থেকে অস্তিত্বের সব আলো উৎসারিত হয়, সৃষ্টিকর্তার দিক থেকে।
এই কথা বলা যে আমি খোদা নই, এটি সত্যের স্বীকারোক্তি, আত্মপ্রতারণার অস্বীকৃতি।
এ কথা মানুষকে তার প্রকৃত উচ্চতায় দাঁড় করিয়ে দেয়।
অহংকারের দেয়াল ভেঙে পড়ে, আর ভেতরে কৃতজ্ঞতার একটি দরজা খুলে যায়।
তখন বোঝা যায়, আমি এই বিশ্বজগতের মালিক নই, আমি একজন অতিথি। আর অতিথির হাতে মালিকানা থাকে না; থাকে আমানত। প্রতিটি নিয়ামত আমার কাছে রাখা একটি দায়িত্ব, প্রতিটি সুযোগ একটি পরীক্ষা।
আমি অসংখ্য হাতের শ্রমের ওপর দাঁড়িয়ে আছি।
আমার প্রতিটি সুবিধার ভেতরে অগণিত মানুষের অদৃশ্য পরিশ্রম মিশে আছে। প্রতিটি সাফল্যের পেছনে এমন অনেক মানুষের অংশ রয়েছে, যাদের নামও আমি জানি না। আমার জীবন আমার একার উপার্জন নয়; এটি একটি যৌথ অনুগ্রহ, যেখানে জমিন, সময়, মানুষ এবং আল্লাহর রহমত, সবাই শরিক। রহমতই আসল বাস্তবতা।
যে ভাষায় আমি কথা বলি, তা শতাব্দীর সভ্যতার নির্যাস।
যে জ্ঞান দিয়ে আমি লিখি, তা হাজারো মস্তিষ্কের সঞ্চিত অর্জন।
আমি স্বনির্মিত নই; আমি ইতিহাস, উত্তরাধিকার ও অনুগ্রহের মিলনবিন্দু।
শেষ পর্যন্ত এই বোধ হৃদয়ে এক ধরনের কোমলতা জন্ম দেয়, এমন কোমলতা যা দুর্বলতা নয়, বরং প্রজ্ঞার চিহ্ন।
মানুষ যখন বুঝে ফেলে যে তার জীবন শক্তির ঘোষণা নয়, বরং প্রাপ্তির স্বীকারোক্তি, তখন তার ভেতরে এক নতুন অবস্থা জন্ম নেয়। কৃতজ্ঞতা শুধু তার জিহ্বায় সীমাবদ্ধ থাকে না, তার দৃষ্টির অংশ হয়ে ওঠে। বিনয় তার চলাফেরায় নেমে আসে। আর সেই পবিত্র বিস্ময়, যেখান থেকে দর্শনের জন্ম হয় এবং ইবাদতও নতুন করে প্রাণ পায়।
তখন মানুষ দুনিয়াকে দখল করার বস্তু মনে করে না, বরং পাঠ করার একটি গ্রন্থ বলে মনে করে। প্রতিটি দৃশ্য হয়ে ওঠে একটি ইশারা, প্রতিটি সাক্ষাৎ একটি পাঠ, প্রতিটি বঞ্চনা একটি প্রশ্ন, প্রতিটি নিয়ামত একটি আমানত।
সে অনুভব করে, সে কেন্দ্র নয়, কিন্তু অর্থহীনও নয়;
সে অক্ষ নয়, কিন্তু বিচ্ছিন্নও নয়। সে এক বৃহৎ বিন্যাসের অংশ, এমন এক বিন্যাস, যেখানে তার স্থান ছোট হলেও উদ্দেশ্যহীন নয়।
আমি এই কাহিনি শুরু করিনি, এর সব পরিণতির মালিকও আমি নই। আমি কেবল একটি সংক্ষিপ্ত অধ্যায়ের আমানতদার। আর আমানতদার হওয়া মানে মালিক হওয়া নয়; দায়িত্ব বহন করা। আমার কাজ এই নয় যে আমি গল্পটি নিজের নামে করে নিই, বরং এই যে, যখন আমার পৃষ্ঠাটি পূর্ণ হবে, তা যেন বিকৃত না হয়, দাগি না হয়, শূন্য না থাকে।
তাতে যেন সত্য লেখা থাকে, চেষ্টা লেখা থাকে, কৃতজ্ঞতা লেখা থাকে।
মহত্ত্ব নিয়ন্ত্রণে নয়, সম্পর্কের মধ্যে; শক্তি দখলে নয়, বিশ্বস্ততায়। জীবন এমন এক লেখা, যা আমরা লিখি না৷ যার ভেতরে আমাদের লেখা হয়। আর সৌভাগ্যবান সে-ই, যে এই লেখার মধ্যে নিজের পংক্তিটি পরিষ্কার, কোমল ও আলোকিত রেখে যেতে পারে।
আমি স্রষ্টা নই, সৃষ্ট; আমি মালিক নই, আমানতদার;
আমি কেন্দ্র নই, কিন্তু সাক্ষী। আর হয়তো মানুষের জন্য এর চেয়ে বড় সম্মান আর কিছু নেই, যে তাকে এক মুহূর্তের জন্য হলেও অস্তিত্বের এই মহান গ্রন্থে লিখে নেওয়া হয়,
এবং তাকে বলা হয়, এই পংক্তিটির হেফাজত করো।
————–
ক্যাটাগরি : তাজকিয়াহ, আখলাক, ইসলামি চিন্তাধারা
✍ মূল : ড. মুহাম্মদ আকরাম নাদভী, অক্সফোর্ড।
✍ অনুবাদ যাচাই ও সম্পাদনা: মাওলানা মারজান আহমদ, সিলেট, বাংলাদেশ।
🔗 অনূদিত মূল প্রবন্ধের লিংক: 👇
https://t.me/DrAkramNadwi/8306