AkramNadwi

কোরআন কি আল্লাহর অস্তিত্ব প্রমাণ করে?

কোরআন কি আল্লাহর অস্তিত্ব প্রমাণ করে?<br>

|০১ |ফেব্রুয়ারি| ২০২৬|

❖ প্রশ্ন

আসসালামু আলাইকুম,
সম্মানিত শায়েখ ।
আমি দর্শন ও ইলমুল কালামবিষয়ক আপনার সমালোচনামূলক প্রবন্ধগুলো গভীর আগ্রহের সঙ্গে পড়েছি। সেগুলো থেকে আমি ভীষণভাবে উপকৃত হয়েছি। আপনি যদি কিছু মনে না করেন, তবে একটি প্রশ্ন করতে চাই। কোরআন মাজিদ কেন আল্লাহ তাআলার অস্তিত্বকে স্পষ্ট ভাষায় প্রমাণ করার পথে যায় না? আরও ভালো হতো না কি, যদি প্রথম আয়াতটি হামদের পরিবর্তে আল্লাহর অস্তিত্বের প্রমাণ দিয়ে শুরু হতো?

অনুগ্রহ করে আমার নাম প্রকাশ করবেন না।

❖ উত্তর
ওয়া আলাইকুমুস সালাম ওয়া রহমাতুল্লাহ।

আপনি আপনার চিঠিতে অত্যন্ত শালীনতার সঙ্গে লিখেছেন, “আপনি যদি কিছু মনে না করেন, তবে একটি প্রশ্ন করতে চাই।” যখন আপনি এই কথা বলার সাহস রাখেন, তখন আপনিও কিছু মনে করবেন না, কারণ আমি আপনার প্রশ্নের উত্তর দিতে চাই অত্যন্ত স্পষ্টভাবে, বরং কিছুটা কঠোর ভাষায়। এই কঠোরতার উদ্দেশ্য রূঢ়তা নয়; বরং সেই বুদ্ধিবৃত্তিক বিভ্রান্তির শিকড়ে পৌঁছানো, যা শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে মানুষের মনকে জটিল করে রেখেছে।

নদওয়াতুল উলামায় ছাত্রজীবনে দর্শন ও যুক্তিবিদ্যার প্রতি আমার আগ্রহ অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে উঠেছিল। এটি কোনো আনুষ্ঠানিক কৌতূহল ছিল না; ছিল গভীর ও আন্তরিক চিন্তামগ্নতা। ইংল্যান্ডে অবস্থানকালেও সেই আগ্রহ একই তীব্রতায় অব্যাহত ছিল। ইউরোপের আধুনিক দর্শনের বহু ভারী ও বিশাল গ্রন্থ আমি পাঠ করেছি এবং পাশ্চাত্য চিন্তাধারাকে সরাসরি বোঝার চেষ্টা করেছি।

আলহামদুলিল্লাহ, যখন ইবন তাইমিয়া, বার্ট্রান্ড রাসেল এবং মাওলানা হামিদুদ্দিন ফারাহির মতো গভীর মনীষীদের চিন্তা একত্রে অধ্যয়নের সুযোগ হলো, তখন দর্শন ও যুক্তিবিদ্যার দুর্বলতা, তাদের কৃত্রিম নির্মাণ এবং অনুমাননির্ভর স্তম্ভগুলো আমার সামনে সম্পূর্ণ উন্মোচিত হয়ে গেল।

এই সময়ে আমি যখনই ইলমুল কালামের কোনো বই পড়েছি বা পড়িয়েছি, তখন তার প্রতিটি দলিল, প্রতিটি পরিভাষা ও প্রতিটি যুক্তি আমার কাছে নিছক বুদ্ধিবৃত্তিক চৌর্যবৃত্তি বলেই মনে হয়েছে। উদাহরণস্বরূপ, আল্লাহর অস্তিত্ব প্রমাণের যে প্রসিদ্ধ যুক্তি, সম্ভব সত্তা ও অপরিহার্য সত্তার তত্ত্ব, তা হুবহু ইবন সিনা থেকে ধার করা। আর যাকে ‘হুদূসের দলিল’ বলা হয়, সেটিও মূলত সেই সম্ভাবনা ও অপরিহার্যতার দর্শনেরই নতুন পোশাক।

ইলমুল কালাম গ্রিক দর্শন থেকে ধারণাগুলো ঠিক সেভাবেই চুরি করেছে, যেভাবে আজকের তথাকথিত ইসলামি ফাইন্যান্স পাশ্চাত্যের কনভেনশনাল ফাইন্যান্স থেকে নাম পাল্টে পাল্টে কাঠামো ধার করে নিয়েছে।

বলা হয়, একটি সত্তা আছে যা সম্ভাব্য, যা অস্তিত্বের দরজায় দাঁড়িয়ে আছে, অস্তিত্ব ও অনস্তিত্বের মাঝখানে দোদুল্যমান। তারপর এক ‘অপরিহার্য সত্তা’ আবির্ভূত হয় এবং তার অস্তিত্বকে প্রাধান্য দেয়; ফলে সেই সম্ভাব্য সত্তা অস্তিত্বের অঙ্গনে প্রবেশ করে। এখন আমি আপনাকে গভীর আন্তরিকতার সঙ্গে জিজ্ঞেস করি, এই সম্ভাবনার জন্ম হলো কোথা থেকে? কে তাকে অস্তিত্ব ও অনস্তিত্বের মাঝখানে ঝুলিয়ে রাখল? এই দোদুল্যমানতা কার সৃষ্টি? কোনো সুস্থবুদ্ধিসম্পন্ন, বাস্তববাদী মানুষ যখন এই কল্পকাহিনি পড়ে, তখন অজান্তেই তার হাসি পেয়ে যায়। আর যখন সে পড়ে যে অপরিহার্য সত্তা এসে সম্ভাব্য সত্তার অস্তিত্বকে প্রাধান্য দিল, তখন সেই হাসি আরও উচ্চস্বরে রূপ নেয়।

হায় আফসোস। এ কেমন অপরিহার্য সত্তা, যার নিজের অস্তিত্বই প্রমাণিত নয়। যদি সম্ভাব্য সত্তা তার প্রতি অনুগ্রহ না করে, তবে অপরিহার্য সত্তা আদৌ প্রমাণিতই হতে পারে না। কী আশ্রিত, কী দরিদ্র এক অপরিহার্য সত্তা, যাকে নিজের প্রমাণের জন্য সম্ভাব্যের দরজায় হাত পাততে হয়।

আসল প্রশ্ন, যেটির দিক থেকে দর্শন ইচ্ছাকৃতভাবে চোখ ফিরিয়ে নেয় তা হলো, এই সম্ভাব্য সত্তাকে সৃষ্টি করল কে? অস্তিত্বকে অস্তিত্ব দান করল কে? এই প্রশ্নের কোনো উত্তর দর্শনের কাছে নেই। কারণ স্রষ্টাকে অস্বীকার করার একগুঁয়েমিতেই সম্ভাব্য ও অপরিহার্যের এই সম্পূর্ণ কাহিনি রচনা করা হয়েছে।

এখন সতর্ক হয়ে ও কান খুলে শুনুন। কোরআনে যে আল্লাহর কথা বলা হয়েছে, তিনি কেবল কোনো বিমূর্ত ‘কারণ’ নন। তিনি স্রষ্টা, তিনি রব, তিনি রহমান ও রহিম, তিনি সর্বশ্রোতা ও সর্বদ্রষ্টা, সর্বজ্ঞ, এবং সমগ্র জগতের পরিচালক। তিনি শুধু আদম আলাইহিস সালামের স্রষ্টা নন; তিনি আমারও স্রষ্টা, আপনারও স্রষ্টা।

আমি যখন কোরআন পাঠ করি, তখন দর্শন ও ইলমুল কালামের সব দুর্গ এক নিমিষে ধসে পড়ে। বরং সত্য কথা হলো, শুধু সূরা ফাতিহাই দর্শন ও কালামের সমস্ত ভ্রান্ত কল্পনার পর্দা ছিন্নভিন্ন করে দেয়।

বান্দা যখন বলে, “সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর জন্য, যিনি সকল জগতের রব”, তখন আল্লাহ বলেন, আমার বান্দা আমার প্রশংসা করেছে।
বান্দা যখন বলে, “তিনি পরম করুণাময়, পরম দয়ালু”, তখন আল্লাহ বলেন, আমার বান্দা আমার গুণগান করেছে।
আর যখন বান্দা বলে, “তিনি বিচার দিনের মালিক”,তখন আল্লাহ বলেন, আমার বান্দা আমার মহিমা ঘোষণা করেছে।

শেয়ার করুন:

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *