AkramNadwi

হয়েছে সে কাফির না হয়, তবে বলনেওয়ালাই কাফির সাব্যস্

হয়েছে সে কাফির না হয়, তবে বলনেওয়ালাই কাফির সাব্যস্ত হয়। আর যেহেতু সবাই একে অপরকে কাফির বলে, তাই শেষ পর্যন্ত ফল দাঁড়ায়, সবাই কুফরের পরিসরে প্রবেশ করে।

এখানে একটি মৌলিক প্রশ্ন উঠে আসে, যদি কুফর সবচেয়ে বড় গুনাহ হয়, তবে মানুষ নিজের নিজের কুফর থেকে তওবা করে না কেন? এই প্রশ্ন আমাদেরও দীর্ঘদিন ভাবিয়ে রেখেছিল। অবশেষে মানুষের মনস্তত্ত্বের একটি গভীর পর্যবেক্ষণ থেকে এর জবাব স্পষ্ট হলো। মানুষ নিজের ময়লা পরিষ্কার করা সহজ মনে করে, কিন্তু অন্যের ময়লা ছোঁয়াকে অত্যন্ত ঘৃণ্য মনে করে। সে নিজের অপবিত্রতাকে হালকা ও ক্ষমাযোগ্য বলে ধরে নেয়, আর অন্যের অপবিত্রতাকে ভয়ংকর, দুর্গন্ধময় ও অসহনীয় বলে বিবেচনা করে। ঠিক তেমনি, মানুষ নিজের কুফর বা নিফাকের জন্য কোনো না কোনো ব্যাখ্যা দাঁড় করিয়ে নেয়, কিন্তু অন্যের কুফর তার কাছে চরম ঘৃণ্য ও অগ্রহণযোগ্য মনে হয়।

অথচ কুফরের অবস্থায় মৃত্যু হওয়াই সবচেয়ে ভয়াবহ পরিণতি, যার ফল হতে পারে চিরস্থায়ী ধ্বংস। এ থেকে মুক্তির পথ এই নয় যে আমরা অন্যের ঈমান খুঁটিয়ে দেখতে বসব; বরং পথ হলো, নিজের ঈমান নিয়ে ভীত থাকা, অন্যদের অবস্থার ভালো ব্যাখ্যা করা, এবং নিজের গুনাহের ব্যাপারে কোনো রকম শৈথিল্য না দেখানো।

সালাফে সালেহিনের পথচলা ছিল ঠিক এমনই। তারা সাধারণ মুসলমানদের ব্যাপারে সদ্ভাব পোষণ করতেন, আর নিজেদের সম্পর্কে নিফাক ও কুফরের আশঙ্কা করতেন। ইমাম বুখারি রহ. ‘কিতাবুল ঈমান’-এ ইমাম হাসান বসরি রহ.-এর উক্তি উদ্ধৃত করেছেন, নিফাক থেকে কেবল মুমিনই ভয় পায়, আর নিফাক থেকে কেবল মুনাফিকই নির্ভয় থাকে। ইবনু আবি মুলাইকাহ রহ. বলেন, আমি ত্রিশজন সাহাবায়ে কেরামকে পেয়েছি, সবাই নিজের ব্যাপারে নিফাকের ভয় করতেন। এমনকি হজরত উমর ইবনুল খাত্তাব রা. এর মতো মহান সাহাবিও আশঙ্কা করতেন, কোথাও তিনি মুনাফিক না হয়ে যান। হজরত হাসান বসরি রহ. কে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল, আপনি এত কান্নাকাটি করেন কেন? তিনি বলেছিলেন, আমার আশঙ্কা হয়—আগামীকাল যেন আমাকে জাহান্নামের আগুনে নিক্ষেপ করা না হয়।
সালাফদের বাণী ও অবস্থা একত্র করলে এ বিষয়ে একটি স্বতন্ত্র গ্রন্থ রচিত হতে পারে। সারকথা হলো, তারা নিজেদের নফসকে অভিযুক্ত করতেন, আর অন্যদের ঈমানের ব্যাপারে সদ্ভাব রাখতেন। এটাই সুন্নি পথ, আর আজ সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন এই পথটিকেই জীবিত করা।

অতএব, মুফতির জন্য অপরিহার্য হলো, তিনি যেন নিজের দায়িত্বের সীমার মধ্যে থাকেন। তিনি বিচারক হবেন না, মুহতাসিব হবেন না, এবং মানুষের ঈমানের হিসাব গ্রহণ করবেন না। তাঁর কাজ হলো, যারা শরিয়ত অনুযায়ী জীবন যাপন করতে চান, তাদের জন্য ফতোয়া দেওয়া; ফতোয়াকে অস্ত্র বানিয়ে মানুষকে ইসলামের গণ্ডি থেকে বের করে দেওয়া নয়। যদি মুফতি এই দরজা খুলে দেন, তবে এক মুফতি আরেক মুফতিকে কাফির ঘোষণা করবে, আর পরিণতি হবে, কোনো ব্যক্তি, কোনো গোষ্ঠী এবং কোনো প্রতিষ্ঠানই নিরাপদ থাকবে না।

আল্লাহ তাআলা আমাদের নিজেদের দোষত্রুটি চিনে নেওয়ার তাওফিক দিন, অন্যদের ব্যাপারে সদ্ভাব দান করুন, আমাদের তওবা ও আল্লাহমুখী প্রত্যাবর্তনের সামর্থ্য দিন, এবং আমাদের সব মুসলমানের জন্য কল্যাণকামী বানান। আমিন।

——————–

ক্যাটাগরি : উপদেশ, সমালোচনা, ইসলামি চিন্তাধারা

✍ মূল : ড. মুহাম্মদ আকরাম নাদভী, অক্সফোর্ড।
✍ অনুবাদ যাচাই ও সম্পাদনা: মাওলানা মারজান আহমদ, সিলেট, বাংলাদেশ।
🔗 অনূদিত মূল প্রবন্ধের লিংক: 👇
https://t.me/DrAkramNadwi/8299

শেয়ার করুন:

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *