AkramNadwi

মহিলারা এবং পর্দার বিধান ❞

https://t.me/DrAkramNadwi/5710

بسم الله الرحمن الرحيم.

ড. সাইয়্যেদা হিনা ফাতিমা মুম্বাইয়ের বাসিন্দা, একজন সৎ ও ধার্মিক নারী এবং নারীদের শিক্ষা ও সংশোধনের ক্ষেত্রে সক্রিয়। তিনি জিজ্ঞেস করেছেন: মহিলাদের পর্দার বিধান কী?

|| উত্তর :

এটি বলার প্রয়োজন নেই যে স্বামী ও স্ত্রীর মধ্যে কোনো পর্দা নেই। স্বামীর ছাড়া অন্য সব পুরুষ ও মহিলার থেকে নারীদের পর্দা করতে হবে। তবে এই পর্দার বিধান সবার জন্য একরকম নয়। নিচে এর বিস্তারিত আলোচনা করা হচ্ছে। এই আলোচনায় ঘরের বাইরে যাওয়ার বিধান অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি; এটি ইনশাআল্লাহ অন্য একটি প্রবন্ধে আলোচনা করা হবে।

|| মূল পর্দা :

মুখমণ্ডল, হাতের তালু এবং পা (হানাফি মাজহাব অনুযায়ী) ছাড়া নারীর সমগ্র দেহ “আওরত”। অর্থাৎ, এর পর্দা করা ফরজ। কুরআন কারিমে আল্লাহ তা‘আলা বলেন:
“তারা যেন তাদের সৌন্দর্য প্রকাশ না করে, তবে যা আপনা-আপনি প্রকাশ পায়।”
(সূরা আন-নূর, আয়াত ৩১)

কিছু আলেমের মতে, এখানে “যা আপনা-আপনি প্রকাশ পায়” বলতে মুখমণ্ডল, হাত এবং পা বোঝানো হয়েছে। হযরত আবদুল্লাহ ইবনে উমর (রা.) বলেন:
“এর দ্বারা বোঝানো হয়েছে মুখমণ্ডল ও উভয় হাতের তালু।”
(মুসান্নাফ ইবনে আবি শাইবা ৯/২৮১)

হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস, সাঈদ ইবনে জুবায়ের এবং মাখুল (রা.) থেকেও একই ব্যাখ্যা বর্ণিত হয়েছে। (মুসান্নাফ ইবনে আবি শাইবা ৯/২৮২-২৮৩)

>> ইমাম হাসান বসরি বলেন:
“এর দ্বারা বোঝানো হয়েছে মুখমণ্ডল এবং পোশাক।”
(মুসান্নাফ ইবনে আবি শাইবা ৯/২৮১)

>> ইমাম শাফেয়ী বলেন:
“এর দ্বারা বোঝানো হয়েছে মুখমণ্ডল এবং হাতের তালু।”
(আল-সুনান আল-কুবরা, কিতাবুন নিকাহ, باب تخصيص الوجه والكفين)

মুখমণ্ডল পর্দার অন্তর্ভুক্ত নয়—এ বিষয়ে চার ইমাম এবং আলেমদের একটি বৃহৎ দলের ঐকমত্য রয়েছে। (কিতাব আল-মাবসুত للشيباني ৩/৫৬, الموطأ برواية يحيى ২/৯৩৫, المدونة ২/৩৩৪, كتاب الأم ১/৮৯)

পরবর্তীকালের আলেমগণ ফিতনার আশঙ্কায় মুখমণ্ডলের পর্দাও বাধ্যতামূলক করেছেন। তবে ফিতনা একটি অস্থায়ী অবস্থা, এবং এটি অস্থায়ীই থাকা উচিত। একে স্থায়ী বা চিরস্থায়ী বিধান বানানো সঠিক নয়।

এটি মনে রাখা প্রয়োজন যে মুখমণ্ডল পর্দার অন্তর্ভুক্ত নয়—এর অর্থ এই নয় যে পুরুষরা মহিলাদের দিকে অবলীলায় দৃষ্টি নিবদ্ধ করবে। বরং আল্লাহর নির্দেশ হলো, পুরুষ এবং নারী উভয়েই এ ধরনের ক্ষেত্রে দৃষ্টি সংযত রাখবে। এর বিস্তারিত অন্য প্রবন্ধে আসবে।

নারীদের এই পর্দা নামাজের জন্য এবং বাড়িতে স্বামী বা মাহরাম ছাড়া অন্য পুরুষদের সামনে আসার জন্য প্রযোজ্য। (তুহফাতুল ফুকাহা, পৃষ্ঠা ৫৬৯)
বাড়ির বাইরের বিস্তারিত অন্য প্রবন্ধে আসবে।

খিমার-এর অর্থ:
কুরআন কারিমে বলা হয়েছে:
“আর তারা (মহিলারা) তাদের খিমার (ওড়না) তাদের বক্ষদেশের উপর ফেলুক।” (সূরা আন-নূর, আয়াত ৩১)

এই আয়াতের প্রেক্ষাপট থেকে স্পষ্ট হয় যে নারীদের যতটা সম্ভব তাদের দেহ ঢেকে রাখা উচিত, এবং এর মধ্যে তাদের চুলও অন্তর্ভুক্ত। হযরত আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত হয়েছে যে নবী করিম (সা.) বলেছেন:
“আল্লাহ কোনো প্রাপ্তবয়স্ক নারীর নামাজ কবুল করেন না, যতক্ষণ না সে খিমার (ওড়না) পরিধান করে।” (সুনান আবু দাউদ, কিতাব আস-সালাত, باب المرأة تصلي بغير خمار)

হযরত উম্মে সালমা (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি নবী করিম (সা.)-কে জিজ্ঞেস করেছিলেন:
“একজন নারী কি একটি লম্বা কাপড় এবং খিমার (ওড়না) পরে, কিন্তু শালোয়ার/ইযার ছাড়া নামাজ আদায় করতে পারে?” নবী করিম (সা.) বললেন: “যদি কাপড়টি লম্বা এবং ঢিলা হয় এবং তার পায়ের উপরের অংশ ঢেকে রাখে, তবে (নামাজ শুদ্ধ হবে)।” (সুনান আবু দাউদ, কিতাব আস-সালাত, باب في كم تصلي المرأة)

অদ্ভুত বিষয় হলো, কিছু লোক কুরআন কারিমে উল্লেখিত “খিমার” শব্দের অর্থ পরিবর্তন করার চেষ্টা করছে। এখানে মনে রাখা গুরুত্বপূর্ণ যে কোনো বক্তার উদ্দেশ্য শুধুমাত্র একটি শব্দ থেকে বোঝা যায় না, বরং সম্পূর্ণ বাক্য এবং প্রেক্ষাপট থেকে বোঝা যায় যেখানে শব্দটি ব্যবহৃত হয়েছে। কুরআনে যেখানে “খিমার” শব্দটি এসেছে, সেখানে এই বাক্যটির প্রতি মনোযোগ দিন:
“তারা (মহিলারা) তাদের খিমারকে তাদের বক্ষদেশের উপর ফেলুক।”
যদি “খিমার”-এর অর্থ কোনো সাধারণ আবরণ হত, তাহলে এই বাক্যটি তার উদ্দেশ্য প্রকাশ করতে পারত না।

কুরআনে আল্লাহ্‌র মুমিন নারীদের জন্য সহজতা প্রদান করেছেন। গলার এবং বক্ষদেশ ঢাকার জন্য আলাদাভাবে কোনো কাপড়ের ব্যবস্থা করার নির্দেশ না দিয়ে, তাদের মাথার ওড়নাকে নিচে নামিয়ে এই অংশটি ঢাকার কথা বলেছেন।

আমরা কোনো শব্দের অর্থ নির্ধারণ করি সেই ভাষার মানুষদের ব্যবহারের উপর ভিত্তি করে। আমরা পূর্ণ নিশ্চয়তার সাথে বলতে পারি যে “খিমার” বলতে মাথার পর্দা বোঝানো হয়েছে। কারণ নবী করিম (সা.) এবং তাঁর সাহাবারা এটিই বুঝেছেন। হাদিস এবং সীরাতে এর ব্যাপক প্রমাণ বিদ্যমান এবং পূর্ববর্তী সকল আলেম এ বিষয়ে ঐকমত্য পোষণ করেছেন।

এটি অকল্পনীয় যে কুরআন, প্রাথমিক মুসলিমদের কার্যকরী উদাহরণ এবং আরবি কবিতায় শব্দটির ব্যবহারের প্রমাণের বিপরীতে আলেমগণ অন্য কোনো অর্থে একমত হবেন। আমি “খিমার” শব্দের গবেষণার উপর একটি প্রবন্ধ লিখেছি। আরো বিস্তারিত জানার জন্য সেটি দেখুন।

|| মাহরাম পুরুষদের উপস্থিতিতে :

নারী তার মাহরাম পুরুষদের (পিতা, পুত্র, ভাই ইত্যাদি) সামনে মুখ, মাথা, হাত এবং পা প্রকাশ করতে পারে। এই অঙ্গগুলো ছাড়া শরীরের অন্যান্য অংশ ঢেকে রাখা আবশ্যক।
(তুহফাতুল ফুকাহা, পৃষ্ঠা ৫৬৯)।
প্রয়োজনের ক্ষেত্রে পুরুষ তার মাহরাম নারীদের পোশাকের ওপর দিয়ে স্পর্শ করতে পারে, যেমন সওয়ারিতে উঠতে সাহায্য করার জন্য বা অন্য কোনো উদ্দেশ্যে। (তুহফাতুল ফুকাহা, পৃষ্ঠা ৫৬৯)।

>> ইমাম মারগীনানী (রহ.) বলেন:
“পুরুষ মাহরাম নারীদের মুখ, মাথা, বুক, পায়ের পাতা এবং হাত দেখতে পারে। তবে তাদের পিঠ, পেট এবং উরুর দিকে তাকানো তার জন্য অনুমোদিত নয়।” (আল-হিদায়া, ৭/২০৫)

|| নারীদের পর্দা একে অপরের সাথে :

নারীকে অন্য নারীদের সামনে নাভি থেকে হাঁটু পর্যন্ত অংশ ঢেকে রাখতে হবে। (তুহফাতুল ফুকাহা, পৃষ্ঠা ৫৭০)। ইমাম মারগীনানী (রহ.) বলেন:
“এক নারী অন্য নারীর এমন অংশ দেখতে পারে, যেসব অংশ একজন পুরুষ আরেক পুরুষের দেখতে পারে।” (আল-হিদায়া, ৭/২০৩)।

এর অর্থ এই নয় যে নারীরা একে অপরের সামনে এই অবস্থায় উপস্থিত হবে। বরং এর অর্থ হলো, কোনো কারণে এসব অঙ্গের কিছু প্রকাশ হয়ে গেলে তা গুনাহের অন্তর্ভুক্ত হবে না।

|| আপৎকালীন পরিস্থিতি:
নারীদের পর্দার যে বিধান বর্ণনা করা হয়েছে, তা সাধারণ অবস্থার জন্য প্রযোজ্য। তবে প্রয়োজনের সময় নারীর মুখ দেখা বৈধ, এমনকি আকর্ষণের আশঙ্কা থাকলেও।

যেমন:
একজন কাজী সাক্ষ্য প্রদানকারী নারীর মুখ দেখতে পারে। একজন পুরুষ সেই নারীর মুখ দেখতে পারে যার সঙ্গে সে বিবাহ করার ইচ্ছা রাখে। (তুহফাতুল ফুকাহা, পৃষ্ঠা ৫৬৯-৫৭০)।

তদ্রূপ, কোনো মহিলা ডাক্তার না থাকলে, চিকিৎসার প্রয়োজনে একজন পুরুষ ডাক্তার নারীর শরীর দেখা বা স্পর্শ করতে পারেন।

প্রয়োজনে নারীরা গায়রে-মাহরাম পুরুষদের উপস্থিতিতে অজু করতেও পারেন। হযরত আবদুল্লাহ ইবনে উমর (রা.) বর্ণনা করেন:
“আল্লাহর রাসুল (সা.)-এর যুগে পুরুষ ও নারীরা একত্রে অজু করতেন।” (সহীহ বুখারী, কিতাবুল অজু, باب وضوء الرجل مع امرأته)। এটি সাধারণত হজযাত্রার সময় বা অন্য কোনো সফরের সময় হতো।

তদ্রূপ, প্রয়োজন হলে মহিলা চিকিৎসকরা পুরুষদের সামনে তাদের হাত খুলে রাখতে পারেন। ইমাম আবু ইউসুফ (রহ.) থেকে বর্ণিত হয়েছে:
“নারীদের হাত দেখা বৈধ, কারণ রুটি বানানো বা কাপড় ধোয়ার সময় তাদের হাত খোলার প্রয়োজন হয়।” (আল-মাবসূত লিস-সারাখসী, ১০/১৫৩; আল-হিদায়া, ৭/১৯৬)।

———–

> মূল :
ড. মুহাম্মদ আকরাম নাদভী, অক্সফোর্ড।
> অনুবাদ যাচাই ও সম্পাদনা :
মাওলানা মারজান আহমদ, সিলেট, বাংলাদেশ।

শেয়ার করুন:

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *