https://t.me/DrAkramNadwi/3703
بسم الله الرحمن الرحيم.
❝
ইমাম আবু হানিফা রহ. এর জীবন ও কর্ম নিয়ে ইংরেজি ভাষায় আমার একটি বই রয়েছে, যা প্রায় পনেরো বছর আগে প্রকাশিত হয়ে ব্যাপক জনপ্রিয়তা পেয়েছিল। এই বইতে ইমাম সাহেবের জ্ঞান ও কর্মের শ্রেষ্ঠত্ব, তাঁর ইজতিহাদী মর্যাদা, ফিকহী অবদান এবং সকল সুন্নি ও গায়রে-সুন্নি মতধারার উপর তাঁর প্রভাব বিশ্লেষণ করা হয়েছে। এছাড়া ফিকহ ও উসূলুল ফিকহের ক্ষেত্রে হানাফি মতধারার উন্নতির বিভিন্ন ধাপও আলোচনা করা হয়েছে। তবে এই প্রবন্ধে ঐ বিষয়গুলোর পুনরুল্লেখ বা সংক্ষেপিত উপস্থাপন উদ্দেশ্য নয়; বরং এখানে ইমাম আজমের দুটি কারামাতের আলোচনা রয়েছে, যা আমার উপর গভীর প্রভাব ফেলেছে এবং আমার মতে সমগ্র উম্মতের জন্য তা সমানভাবে উপকারী।
সাধারণত কারামাতের মধ্যে অলৌকিক ঘটনাবলির উল্লেখ করা হয়। জ্ঞানী ব্যক্তিদের মতে, অলৌকিক ঘটনাগুলো আল্লাহর কর্ম, যা সুস্পষ্ট ও গোপন হিকমতের কারণে সংঘটিত হয়। বান্দার প্রকৃত কারামত হলো তার ইবাদতের নিদর্শন ও প্রভাব। যেমন কুরআনুল কারিমে বলা হয়েছে:
“নিশ্চয় আল্লাহর কাছে তোমাদের মধ্যে সেই ব্যক্তিই অধিক মর্যাদাবান, যে অধিক তাকওয়াধারী।” (সূরা আল-হুজরাত: ১৩)
অর্থাৎ যে তাকওয়ায় যত এগিয়ে, সে ততই কারামতধারী ও শ্রেষ্ঠ। এই অর্থটিকেই পৌঁছানো ব্যক্তিরা এভাবে বর্ণনা করেছেন: “আল ইস্তিকামাতু ফাওকাল-কারামাহ”, অর্থাৎ আনুগত্যের উপর অবিচল থাকা অলৌকিক কারামাতের চেয়ে উত্তম।
এখানে সেই প্রকৃত কারামতের কথাই আলোচনা করা হয়েছে। এটাই সেই কারামত, যা মানুষকে মূল্যবান ও আল্লাহর দরবারে প্রিয় করে তোলে এবং সাধারণ মানুষ থেকে পৃথক করে দেয়। ইমাম আবু হানিফা রহ. এর তাকওয়া ও নেকির বিষয়ে তাঁর সমর্থক এবং বিরোধী সকলেরই ঐকমত্য রয়েছে। এই মুহূর্তে যেসব কারামতের কথা উল্লেখ করা হচ্ছে, তা নিম্নরূপ:
|| প্রথম করামত :
সিয়ারু আ’লাম আন-নুবালা ইত্যাদি গ্রন্থে ইমাম মুহাম্মদ বিন হাসান আশ-শাইবানী থেকে বর্ণিত হয়েছে যে, তিনি ইমাম কাসিম ইবনে মাঈন থেকে শুনেছেন, ইমাম আবু হানিফা রহ. একবার এশার নামাজের পর নফল নামাজ শুরু করেছিলেন এবং এই আয়াতটি তিলাওয়াত করেছিলেন:
بَلِ السَّاعَۃُ مَوۡعِدُهُمۡ وَ السَّاعَۃُ اَدۡهٰی وَ اَمَرُّ.
অর্থাৎ – “বরং কেয়ামত তাদের প্রতিশ্রুত সময়, আর কেয়ামত আরও ভয়াবহ ও তিক্ত।” (সূরা আল-কামার: ৪৬)
তিনি এই আয়াত বারবার পড়তে থাকেন এবং কাঁদতে থাকেন ও প্রার্থনা করতে থাকেন, এতক্ষণ পর্যন্ত যে ফজরের সময় হয়ে যায়।
একটি আয়াতকে সারারাত বারবার পড়তে পারেন শুধুমাত্র সেই ব্যক্তি, যিনি এর অর্থ সম্পর্কে গভীর জ্ঞান রাখেন, এর বিভিন্ন দিক নিয়ে চিন্তা করেন, যাকে সেই আয়াত গভীরভাবে নাড়া দেয় এবং যার হৃদয় ও মস্তিষ্কে তা প্রোথিত হয়ে যায়। কুরআনের এই ধরণের চিন্তার ফলস্বরূপ ইমাম সাহেব কিতাবুল্লাহ থেকে যে সূক্ষ্ম বিষয়গুলো উদ্ভাবন করেছেন, তা অন্য কারও ভাগ্যে জুটেনি। এই চিন্তাভাবনা, তারপর এই ফিকহি দক্ষতা এবং ইবাদত ও বিনয়াবনতির সাথে আল্লাহর গোলামির সর্বোচ্চ অবস্থানে পৌঁছানোই হলো প্রকৃত কারামাত।
সাহাবায়ে কেরাম ও পূর্বসূরিদের কাছ থেকে এই ধরণের চিন্তা-মননের অনেক ঘটনার বর্ণনা পাওয়া যায়। ইমাম মালেক রহ. “মুআত্তা” গ্রন্থে বর্ণনা করেছেন যে, হযরত আবদুল্লাহ ইবনে উমর রা. সূরা আল-বাকারাহ শিখতে আট বছর সময় নিয়েছিলেন। ইমাম হাসান বসরি রহ. থেকে বর্ণিত হয়েছে যে, তিনি বলতেন, “আহলুল কুরআন সেই ব্যক্তি, যারা কুরআন ভালোভাবে পড়ে, এর জ্ঞান অর্জন করে এবং এর উপর আমল করে।” হাসান বসরি আরও বলতেন, “আল্লাহর কিতাব আঁকড়ে ধরো, এর নির্দেশনার জ্ঞান অর্জন করো এবং তাদের অন্তর্ভুক্ত হও, যারা কুরআনের অন্তর্দৃষ্টি লাভ করেছে।”
অতঃপর তিনি আরও বলতেন, “কিছু লোক বলে যে, আমরা পুরো কুরআন শেষ করেছি এবং একটি অক্ষরও বাদ দেইনি। আল্লাহর শপথ, তারা পুরো কুরআনকেই বাদ দিয়েছে। কুরআনের প্রভাব নেই তাদের চরিত্রে বা আমলে।” ইমাম হাসান বসরি সেই লোকদের কঠোর সমালোচনা করতেন, যারা কুরআন দ্রুত পড়তে অভ্যস্ত, এবং চিন্তা-ভাবনা না করে শুধুমাত্র কত দ্রুত শেষ করতে পারবে সেই বিষয়ে মনোযোগ দেয়।
যে বিষয়টি হাসান বসরি সমালোচনা করেছেন, সেটাই আজ অনেক লোকের মূল সম্পদ। তারা দিনে পুরো কুরআন খতম করাকে বড় কাজ মনে করে। কেউ কেউ দিনে দুইবার খতম করে এবং কেউ কেউ এর চেয়েও বেশি। কিন্তু নেই কোনো উপলব্ধি, কোনো চিন্তা-ভাবনা, নেই কোনো ভয় বা অশ্রু। বরং এটি সরাসরি নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের শিক্ষার বিরুদ্ধাচরণ।
আমাদের শিক্ষকদের মধ্যে মাওলানা শাহবাজ রহ. এই চিন্তার একটি উল্লেখযোগ্য অংশ পেয়েছিলেন। তিনি বেশিরভাগ সময় কুরআন শরিফ অধ্যয়ন করতেন এবং মাঝে মাঝে সেই কঠিন বিষয়গুলোর কথাও উল্লেখ করতেন, যেগুলো বুঝতে তার অনেক সময় লেগেছিল। তিনি বলতেন, ইমাম আবু হানিফা রহ. এবং ইমাম বুখারি রহ.
এর মধ্যে অনেক মিল রয়েছে। এর কারণ হলো, উভয়েই কুরআনে অসাধারণ গভীর চিন্তা করেছেন এবং দ্বীনের ফিকহ বোঝার ক্ষেত্রে উভয়ের প্রথম সূত্র ছিল কুরআনুল কারিম।
|| দ্বিতীয় কেরামত :
ইমাম আবু হানিফা রহ. এর দ্বিতীয় বড় কেরামত হলো তিনি কখনো কারো গীবত করেননি। তাকে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল, “আপনি কেন কারো গীবত করেন না?” তিনি বলেছিলেন, “যদি আমি কারো গীবত করতাম, তবে আমার মায়ের গীবত করতাম, যাতে আমার নেকি আমার মায়ের কাছে পৌঁছে যায়।”
ইমাম আবদুল্লাহ ইবনে মুবারক রহ. বলেন, আমি ইমাম সুফিয়ান সাওরি রহ. এর কাছে আরজ করলাম, “ইমাম আবু হানিফা গীবত থেকে কত দূরে থাকতেন! আমি তাকে কখনো কারো গীবত করতে শুনিনি।” তখন সুফিয়ান সাওরি বললেন, “ইমাম আবু হানিফা রহ. অত্যন্ত বুদ্ধিমান ছিলেন। তিনি কখনো চাননি যে তার নেকি অন্যদের নামে চলে যাক।”
আজ এমন অনেক মানুষ রয়েছেন, যারা ইমাম আবু হানিফার অনুসারী হওয়ার দাবি করেন, অথচ তারা মুসলমানদের গীবত করেন। তাদের নাম উল্লেখ করে তাদের দোষত্রুটি প্রকাশ করেন এবং মুসলমানদের কষ্ট দেওয়াকে তারা তাকওয়া মনে করেন।
আউফ আল-আরাবি বলেন, আমি ইমাম ইবনে সিরিনের রহ. কাছে গিয়েছিলাম এবং তার সামনে হাজ্জাজ বিন ইউসুফকে নিয়ে মন্দ কথা বলেছিলাম। তখন তিনি বললেন, “আল্লাহ সুবিচারক। যারা হাজ্জাজের গীবত করে, আল্লাহ তাদের থেকে হাজ্জাজের প্রতিশোধ নেবেন, যেমন আল্লাহ হাজ্জাজ থেকে তাদের প্রতিশোধ নেবেন, যাদের উপর হাজ্জাজ জুলুম করেছেন। কাল যখন তুমি আল্লাহর দরবারে উপস্থিত হবে, তখন তোমার সবচেয়ে ছোট গুনাহ হাজ্জাজের সবচেয়ে বড় গুনাহের চেয়েও গুরুতর মনে হবে।”
আমাদের শিক্ষকদের মধ্যে মাওলানা সৈয়দ মুহাম্মদ ওয়াজেহ রশীদ নদভি রহ. গীবত থেকে অনেক দূরে ছিলেন। বরং তিনি এমনকি অনুমোদিত কথাবার্তা বলার ক্ষেত্রেও অত্যন্ত সতর্ক ছিলেন। তার মজলিসে কখনো কারো নাম উল্লেখ করে কথা হতো না। একবার তিনি আমাদের বলেছিলেন, “মানুষ শাখাগত বিষয় নিয়ে একে অপরকে গালমন্দ করে। তারা ভুলে যায় যে, অন্যকে দোষারোপ করা গীবত এবং এটি একটি কবিরা গুনাহ।”
আল্লাহ আমাদের সবাইকে তার কিতাবের গভীর জ্ঞান দান করুন, আমাদের নেক বানান এবং পাপ থেকে বেঁচে থাকার তৌফিক দিন। আমিন।
———–
> মূল :
ড. মুহাম্মদ আকরাম নাদভী, অক্সফোর্ড।
> অনুবাদ যাচাই ও সম্পাদনা :
মাওলানা মারজান আহমদ, সিলেট, বাংলাদেশ।