AkramNadwi

শিরোনাম : রাগের মাথায় উচ্চারিত কুফরি শব্দ

শিরোনাম : রাগের মাথায় উচ্চারিত কুফরি শব্দ

২২|০১|২০২৬|

❖ প্রশ্ন:

আসসালামু আলাইকুম ওয়া রহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহ।
আশা করি আপনি ভালো আছেন। একটি প্রশ্ন ছিল। আশাবাদী, আপনি এর সন্তোষজনক জবাব দিয়ে আমাকে কৃতজ্ঞ করবেন।
স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে নামাজ নিয়ে কথা হচ্ছিল। স্ত্রী নামাজে গাফলতি করত। স্বামী তাকে বলল, তুমি নামাজে নিয়মিত হও। উত্তরে স্ত্রী বলল, আমি জীবনে অতিষ্ঠ হয়ে গেছি, মরে যাওয়াই ভালো। স্বামী বলল, আখিরাতের জীবন তো দ্বীনদারদের জন্যই উত্তম। এর জবাবে স্ত্রী রাগের বশে বলে ফেলল, “ঠিক আছে, আমি কাফিরই হলাম”
স্বামী বলল, তুমি কী বললে? স্ত্রী তখন বলল, আমি মন থেকে বলিনি।
এই অবস্থায় কি নারীর ঈমানে কোনো প্রভাব পড়বে?

❖ উত্তর:
ওয়া আলাইকুমুস সালাম ওয়া রহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহু।

আপনার প্রশ্নে বর্ণিত পরিস্থিতিটি অত্যন্ত সংবেদনশীল এবং গভীর মনোযোগের দাবি রাখে। তাই এ বিষয়ে কথা বলতে হলে শরিয়তের মৌলিক নীতিগুলো সামনে রাখা জরুরি, যেন কারও ঈমান সম্পর্কে অকারণে কঠোর সিদ্ধান্ত দেওয়া না হয়, আবার এমন ভয়ংকর কথাকেও হালকা করে দেখা না হয়।

প্রথমেই বুঝে নেওয়া দরকার, ইসলামে কুফরি কোনো তুচ্ছ বা হালকা বিষয় নয় যে, রাগের মাথায় মুখ থেকে বেরিয়ে যাওয়া প্রতিটি শব্দ মানুষকে সঙ্গে সঙ্গে ঈমানের গণ্ডি থেকে বের করে দেবে। কুফর তখনই প্রমাণিত হয়, যখন কেউ পূর্ণ সচেতনতা, স্বেচ্ছা ও দৃঢ় অন্তরের সিদ্ধান্তের সঙ্গে ইসলামের অস্বীকার করে, কিংবা কুফরকে গ্রহণ করার ও তাতে সন্তুষ্ট থাকার ঘোষণা দেয়। কেবল মুখ থেকে এমন কোনো কথা বেরিয়ে যাওয়া, যা অন্তরের বিশ্বাসের বিপরীত, বিশেষত ঝগড়া, তীব্র রাগ ও মানসিক অস্থিরতার মুহূর্তে, মানুষকে তাৎক্ষণিকভাবে কাফির বানিয়ে দেয় না।

আপনার বর্ণিত ঘটনায় ওই নারীর “আমি কাফিরই হলাম” বলা নিঃসন্দেহে অত্যন্ত বিপজ্জনক ও ঘৃণ্য উক্তি। তবে তারই পরের কথা, “আমি মন থেকে বলিনি”, স্পষ্টভাবে প্রমাণ করে যে তার বিশ্বাস বদলায়নি এবং সে কুফরকে গ্রহণ করেনি। সুতরাং শরিয়তের দৃষ্টিতে তাকে ঈমান থেকে বের হয়ে গেছে বলে রায় দেওয়া সঠিক নয়। তবে এটাও অস্বীকার করার উপায় নেই যে, এমন শব্দ উচ্চারণ করা মারাত্মক গুনাহ এবং ঈমানের জন্য ভয়াবহ হুমকি।

এ কথাও মনে রাখা জরুরি যে, রাগ মানুষকে সব অবস্থায় তার কথা ও কাজের দায় থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত করে দেয় না। তবে যদি রাগ এমন পর্যায়ে পৌঁছে যায়, যেখানে বুদ্ধি ও বিবেক লোপ পায় এবং মানুষ নিজের বলা কথার উপলব্ধিই হারিয়ে ফেলে, তখন ভিন্ন কথা। এখানে যেহেতু ওই নারী সচেতন ছিল এবং পরে নিজের কথার ব্যাখ্যাও দিয়েছে, তাই তাকে কাফির বলা যায় না। কিন্তু তার জন্য আবশ্যক হলো, সে আল্লাহ তাআলার কাছে আন্তরিকভাবে তওবা করবে, নিজের এই কথার জন্য গভীর অনুশোচনা প্রকাশ করবে এবং ভবিষ্যতে এ ধরনের শব্দ থেকে সম্পূর্ণভাবে বিরত থাকবে। কারণ ঈমান রক্ষা করা প্রতিটি মুসলমানের ওপর ফরজ, আর জিহ্বার একটি সামান্য বিচ্যুতিও অনেক সময় মানুষকে বড় ফিতনায় ফেলে দেয়।

একই সঙ্গে এ দিকেও দৃষ্টি দেওয়া প্রয়োজন যে, স্বামীর পক্ষ থেকে স্ত্রীকে নামাজের কথা বলা নিঃসন্দেহে একটি দ্বীনি দায়িত্ব ও নেক কাজ। তবে নেকির আদেশ দেওয়ারও একটি শরিয়তসম্মত ও প্রজ্ঞাপূর্ণ পদ্ধতি রয়েছে। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম দ্বীনের দাওয়াতে কোমলতা, সহানুভূতি ও সুন্দর আচরণ অবলম্বনের শিক্ষা দিয়েছেন। বারবার কঠোর ভাষায় তাগিদ দেওয়া, চাপ সৃষ্টি করা এবং এমন ভঙ্গিতে কথা বলা, যা অপর পক্ষের মনে মানসিক চাপ ও রাগ তৈরি করে, অধিকাংশ সময় সংশোধনের বদলে জেদ, বিরক্তি ও বিমুখতাই জন্ম দেয়। এই ক্ষেত্রে স্বামীর উচিত ছিল, তিনি প্রজ্ঞা, ভালোবাসা, দোয়া ও ধাপে ধাপে বোঝানোর মাধ্যমে নামাজের গুরুত্ব তুলে ধরতেন, এমন ভঙ্গিতে নয়, যার ফলে বিষয়টি এতদূর গড়ায়।

আল্লাহ তাআলা আমাদের সবার জিহ্বা ও হৃদয়কে হেফাজত করুন, আমাদের দ্বীনের ওপর অবিচল রাখুন এবং পারস্পরিক সম্পর্কগুলোতে প্রজ্ঞা ও রহমত দান করুন। আমিন।

——————–

ক্যাটাগরি : ফাতাওয়া, ফিকহ, উপদেশ।

✍ মূল : ড. মুহাম্মদ আকরাম নাদভী, অক্সফোর্ড।
✍ অনুবাদ যাচাই ও সম্পাদনা: মাওলানা মারজান আহমদ, সিলেট, বাংলাদেশ।
🔗 অনূদিত মূল প্রবন্ধের লিংক: 👇
https://t.me/DrAkramNadwi/8247

শেয়ার করুন:

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *