AkramNadwi

শিরোনাম : ধোঁকা দিয়ে গ্রাউন্ড ফ্লোরে তাওয়াফ

শিরোনাম : ধোঁকা দিয়ে গ্রাউন্ড ফ্লোরে তাওয়াফ<br>

১৭ জানুয়ারি ২০২৬

|| প্রশ্ন:

সম্মানিত ড. মুহাম্মাদ আকরম নদভী সাহেব, আসসালামু আলাইকুম ওয়া রহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহ।
আশা করি আপনি ভালো আছেন। আমি উমরা আদায়ের উদ্দেশ্যে যাচ্ছি। কিছুদিন ধরে সৌদি কর্তৃপক্ষ কাবা শরিফের চারপাশের গ্রাউন্ড ফ্লোর কেবল উমরাকারীদের জন্য নির্দিষ্ট করে দিয়েছে। যারা উমরা করছেন, তারা গ্রাউন্ড ফ্লোরে তাওয়াফ করতে পারেন; আর যারা উমরাকারী নন, তাদের উপরের তলায় গিয়ে তাওয়াফ করতে হয়।

এ বিষয়ে কিছু আলেম এমন ফতোয়া দেন এবং নিজেরাও তা অনুসরণ করেন যে, উমরার নিয়ত না থাকলেও শুধু ইহরামের পোশাক পরে নেওয়া যাবে, যাতে হারামের নিরাপত্তাকর্মীরা তাকে মুহরিম মনে করে গ্রাউন্ড ফ্লোরে তাওয়াফের অনুমতি দিয়ে দেয়।

আমার প্রশ্ন হলো, এভাবে করা কি শরিয়তসম্মত? আর যদি আমি ওই আলেমদের ফতোয়ার ওপর আমল করি, তাহলে কি শরিয়তের দৃষ্টিতে তার কোনো গ্রহণযোগ্যতা আছে?

|| উত্তর:

ওয়া আলাইকুমুস সালাম ওয়া রহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহ।

আপনার প্রশ্নে এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, সূক্ষ্ম ও বহুস্তরবিশিষ্ট বিষয় আলোচনায় এসেছে, যার সম্পর্ক রয়েছে শরিয়ত, ইবাদতের আদব, নৈতিকতা এবং সামষ্টিক শৃঙ্খলার সঙ্গে। এ কারণে বিষয়টি বিস্তারিতভাবে ব্যাখ্যা করা প্রয়োজন, যাতে প্রতিটি দিক স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

প্রথমেই নীতিগতভাবে একটি কথা পরিষ্কার হওয়া দরকার, ইসলাম মুমিনদেরকে ওয়ালিল আমর ও প্রশাসনের আনুগত্য করতে বাধ্য করেছে, যতক্ষণ না তাদের নির্দেশ সরাসরি কোনো গোনাহের আদেশ হয়। কুরআন মাজিদে আল্লাহ তাআলা বলেন,
“হে মুমিনগণ, তোমরা আল্লাহর আনুগত্য করো, রাসূলের আনুগত্য করো এবং তোমাদের মধ্যকার কর্তৃত্বশীলদের আনুগত্য করো।”
আর রাসূলুল্লাহ সা. বলেছেন, মুসলিমের ওপর কর্তব্য হলো শোনা ও মান্য করা, তা তার পসন্দ হোক বা অপছন্দ, যতক্ষণ না তাকে গোনাহের আদেশ দেওয়া হয়।

এ থেকে স্পষ্ট হয় যে, জনস্বার্থে প্রণীত প্রশাসনিক বিধান ও শৃঙ্খলা মেনে চলাও একটি দ্বীনি দায়িত্ব, বিশেষত যখন এর উদ্দেশ্য মানুষের নিরাপত্তা, স্বাচ্ছন্দ্য ও সুশৃঙ্খল পরিবেশ নিশ্চিত করা।

সৌদি কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে কাবা শরিফের চারপাশের মাতাফ অর্থাৎ গ্রাউন্ড ফ্লোরকে কেবল উমরাকারীদের জন্য নির্দিষ্ট করা নিছক একটি প্রশাসনিক সিদ্ধান্তই নয়; বরং এটি ইবাদতকারীদের অধিকার ও সুবিধা বিবেচনায় নেওয়া এক বাস্তবসম্মত ও কল্যাণভিত্তিক পদক্ষেপ। এর উদ্দেশ্য হলো ভয়াবহ ভিড় নিয়ন্ত্রণ করা, প্রকৃত উমরাকারীদের জন্য সহজতা সৃষ্টি করা, নারী, বৃদ্ধ ও দুর্বলদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং ইবাদতের পবিত্রতা রক্ষা করা। এতে কারও প্রতি জুলুম নেই, কাউকে ইবাদত থেকেও বিরত রাখা হয়নি; কারণ তাওয়াফের জন্য উপরের তলাগুলো সর্বাবস্থায় উন্মুক্ত রয়েছে।

অতএব যারা উমরার নিয়তে মুহরিম হয়েছেন, তাদের জন্য গ্রাউন্ড ফ্লোরে তাওয়াফ করা সম্পূর্ণ বৈধ ও শরিয়তসম্মত, এবং সেটাই তাদের অধিকার। আর যারা উমরা আদায় করছেন না, তাদের জন্য উপরের তলায় তাওয়াফ করাই সঠিক ও শোভন।

এমন পরিস্থিতিতে কেবল গ্রাউন্ড ফ্লোরে প্রবেশ ও সেখানে তাওয়াফের অনুমতি পাওয়ার উদ্দেশ্যে, উমরার কোনো নিয়ত ছাড়াই ইহরামের পোশাক পরে নেওয়া শরিয়তের দৃষ্টিতে হারাম এবং নৈতিকতার বিচারে চরমভাবে নিন্দনীয় কাজ। এটি সরাসরি ধোঁকা, প্রতারণা ও ছলচাতুরির অন্তর্ভুক্ত। ইসলামি শরিয়তে ধোঁকার বিরুদ্ধে কঠোর নিষেধাজ্ঞা এসেছে। রাসূলুল্লাহ সা. বলেছেন, “যে ধোঁকা দেয়, সে আমাদের অন্তর্ভুক্ত নয়।” সাধারণ লেনদেনেই যদি এ কাজ অবৈধ হয়, তবে ইবাদতের মতো পবিত্র ও মহান বিষয়ে এর গর্হিততা বহু গুণ বেড়ে যায়।

এ কথাও গভীরভাবে উপলব্ধি করা প্রয়োজন যে, ইহরাম কেবল একটি পোশাক নয়; বরং এটি একটি বিশেষ ইবাদতি অবস্থা ও নিয়তের নাম। একে নিছক পরিচয়পত্র বা প্রশাসনিক সুবিধা আদায়ের উপকরণ হিসেবে ব্যবহার করা ইসলামের নিদর্শনসমূহের অবমাননা এবং তাদের পবিত্রতার লঙ্ঘন। আল্লাহ তাআলা বলেন,
“যে আল্লাহর নিদর্শনসমূহের সম্মান করে, তা অন্তরের তাকওয়ার পরিচায়ক।”

এই ধরনের আচরণের মধ্যে বহু গুরুতর শরিয়তগত ও বাস্তব ক্ষতি নিহিত রয়েছে:

এক. প্রকৃত উমরাকারীদের অধিকার ক্ষুণ্ন হয়। এ ধরনের লোকদের কারণে উমরাকারীদের জন্য নির্ধারিত জায়গা সংকুচিত হয়ে যায়, তাদের হক অন্যায়ভাবে দখল হয়, যার ফলে ভিড়, কষ্ট ও বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হয়।

দুই. রাষ্ট্রীয় ও প্রশাসনিক কর্তৃপক্ষের নির্দেশের বিরোধিতা করা হয়। এটি সরকার ও প্রশাসনের প্রণীত বৈধ নিয়মের প্রকাশ্য লঙ্ঘন, যা শরিয়তসম্মত নয়।

তিন. মিথ্যা পরিচয় প্রকাশ। ব্যক্তি নিজেকে মুহরিম হিসেবে উপস্থাপন করে, অথচ বাস্তবে সে মুহরিম নয়; ফলে নানা শরিয়তগত জটিলতা তৈরি হতে পারে।

চার. ফিকহি জটিলতা ও সংশয়। যদি কেউ এই অবস্থায় মৃত্যুবরণ করে, তবে বাহ্যিক লক্ষণে তাকে মুহরিম মনে করে মুহরিমের বিধান তার ওপর প্রয়োগ করা হতে পারে, অথচ সে প্রকৃতপক্ষে মুহরিম ছিল না। এভাবে সে প্রতারণার অবস্থায় দুনিয়া থেকে বিদায় নেয়, আল্লাহ আমাদের রক্ষা করুন।

অতএব একজন ঈমানদার মানুষের জন্য সঠিক, নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ পথ একটাই, তিনি আল্লাহর নিদর্শনসমূহের যথাযথ সম্মান রক্ষা করবেন, মিথ্যা ও প্রতারণা থেকে দূরে থাকবেন এবং প্রশাসনের প্রণীত শৃঙ্খলা ও নিয়মকানুন মেনে চলবেন। যদি গ্রাউন্ড ফ্লোরে তাওয়াফ করা সম্ভব না হয়, তবে উপরের তলাগুলোতে তাওয়াফ করা কেবল জায়েযই নয়, বরং সেটিই উত্তম।

যে ইবাদতের ভেতর ধোঁকা ও অবাধ্যতা মিশে থাকে, তা কখনোই সওয়াবের কারণ হয় না; বরং তা গোনাহের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। এ অবস্থায় তাওয়াফ ছেড়ে দেওয়া অনেক বেশি শ্রেয়, কেননা ইবাদতের আবরণে আল্লাহর অবাধ্যতায় লিপ্ত হওয়া কখনোই গ্রহণযোগ্য নয়।

আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে দীনের সঠিক উপলব্ধি দান করুন, অন্তরে ইখলাস ও সত্যনিষ্ঠা দান করুন, ইসলামের নিদর্শনসমূহের প্রকৃত সম্মান রক্ষা করার তাওফিক দিন এবং ইবাদতে খাঁটি নিয়ত ও নিষ্ঠার সঙ্গে আমল করার সামর্থ্য দান করুন। তিনি যেন আমাদের সব ইবাদতকে নিজের সন্তুষ্টির আলোকে কবুল করে নেন। আমিন।

————–

ক্যাটাগরি : ফাতাওয়া, হাজ্জ, ফিকহ।
✍ মূল : ড. মুহাম্মদ আকরাম নাদভী, অক্সফোর্ড।
✍ অনুবাদ যাচাই ও সম্পাদনা: মাওলানা মারজান আহমদ, সিলেট, বাংলাদেশ।
🔗 অনূদিত মূল প্রবন্ধের লিংক: 👇
https://t.me/DrAkramNadwi/8218

শেয়ার করুন:

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *