|১৫ |জানুয়ারি |২০২৬|
|| প্রশ্ন
সম্মানিত ও প্রিয় মাওলানা আবদুল আহাদ নাদভী সাহেব নিম্নোক্ত প্রশ্নটি পাঠিয়েছেন।
আসসালামু আলাইকুম।
আপনি গামদি সেন্টারে রেকর্ড করা আপনার একটি সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন যে, ইমাম ইবন তাইমিয়া কুরআন মাজিদকে আল্লাহর বাণী হিসেবে দেখেন, আর ইমাম ফারাহি কুরআনকে আল্লাহর গ্রন্থ হিসেবে বোঝেন। কুরআন বোঝার ক্ষেত্রে এই মৌলিক দৃষ্টিভঙ্গিকেই তাঁরা প্রবেশদ্বার হিসেবে গ্রহণ করেন।
আমি বিষয়টি আরও স্পষ্টভাবে বুঝতে চাই। এই দুই অভিব্যক্তি, আল্লাহর বাণী এবং আল্লাহর গ্রন্থ, এর মধ্যে কুরআন বোঝার দিক থেকে প্রকৃত পার্থক্য কোথায়? এই পার্থক্য তাফসিরের পদ্ধতি, ভঙ্গি ও ফলাফলের ওপর কীভাবে প্রভাব ফেলে?
(আবদুল আহাদ নাদভী)
|| উত্তর
ওয়া আলাইকুমুস সালাম ওয়া রহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহ।
আপনার এই গভীর, গম্ভীর ও চিন্তাশীল প্রশ্নটি প্রকৃতপক্ষে কুরআন বোঝার এক অত্যন্ত মৌলিক অথচ সূক্ষ্ম বিষয়ে আলোকপাত করার সুযোগ করে দিয়েছে। এটি কেবল শব্দচয়ন বা পরিভাষার ভিন্নতা নয়; বরং কুরআনের সঙ্গে আমাদের জ্ঞানগত সম্পর্ক, চিন্তন-পদ্ধতি এবং দৃষ্টিভঙ্গির সঙ্গে নিবিড়ভাবে জড়িত একটি বিষয়। সে কারণেই এর উত্তর কিছুটা বিস্তৃত ও ব্যাখ্যাপ্রবণ হওয়া স্বাভাবিক।
সবার আগে একটি নীতিগত সত্য স্পষ্ট থাকা জরুরি। কুরআন কারিম তার বাস্তব সত্যের দিক থেকে একই সঙ্গে আল্লাহর বাণীও বটে, আবার আল্লাহর গ্রন্থও বটে। আল্লাহ তাআলাই কুরআনকে এই দুই পরিচয়ে অভিহিত করেছেন। এই দুই অভিব্যক্তি একে অপরের বিরোধী বা পরস্পর-বর্জনকারী নয়; বরং একই সত্যের দুটি পরিপূরক দিক। কুরআন কেবল একটি লিখিত গ্রন্থ নয় যে তাকে শুধু বইয়ের ভঙ্গিতে বোঝা হবে, আবার এটি কেবল একটি সাময়িক ভাষণও নয়, যাকে তার স্থায়ী বিন্যাস ও শৃঙ্খলা থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেখা হবে। এখানে আসল প্রশ্ন বিরোধের নয়; প্রশ্ন হলো কোন দৃষ্টিভঙ্গিটি প্রাধান্য পাচ্ছে। আর এই প্রাধান্যই কুরআন বোঝার পদ্ধতি, ভঙ্গি ও ফলাফলের ওপর গভীর ছাপ ফেলে।
যখন কুরআনকে আল্লাহর বাণী হিসেবে দেখা হয়, তখন তার অর্থ নির্ণয়ের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে ওঠে বাহ্যিক প্রেক্ষাপট। বাহ্যিক প্রেক্ষাপট বলতে বোঝানো হয় বক্তা হিসেবে আল্লাহ তাআলা, যাঁদের উদ্দেশে কথা বলা হচ্ছে, বক্তব্যের পরিস্থিতি এবং সেই ঐতিহাসিক, সামাজিক ও মানসিক অবস্থা, যার মধ্যে এই বাণী অবতীর্ণ হয়েছে। বাণীর স্বভাবই হলো তা জীবন্ত ও গতিশীল। এটি স্থির বা জমাট নয়; বরং শ্রোতার অবস্থান অনুযায়ী রূপ গ্রহণ করে। একটি বক্তব্যের মধ্যেই বক্তা বিভিন্ন শ্রোতার দিকে দৃষ্টি ফেরাতে পারেন, প্রত্যেকের অবস্থা, মর্যাদা ও দায়িত্বকে সামনে রেখে কথা বলতে পারেন, তবুও পুরো বক্তব্যের ঐক্য, প্রবাহ ও সামঞ্জস্য অক্ষুণ্ণ থাকে।
কুরআন মাজিদে এই ভঙ্গির একটি অত্যন্ত স্পষ্ট উদাহরণ রয়েছে সূরা ইউসুফের সেই আয়াতে, যেখানে মিসরের আজিজের উক্তি বর্ণিত হয়েছে। সেখানে একই ঘটনায় একই বাক্যের ধারাবাহিকতায় দুই ভিন্ন ব্যক্তিকে সম্বোধন করা হয়েছে। যখন স্পষ্ট হয়ে গেল যে অভিযোগটি ইউসুফ আলাইহিস সালামের বিরুদ্ধে নয়, বরং আজিজের স্ত্রীর বিরুদ্ধেই সত্য, তখন আজিজ প্রথমে ইউসুফ আলাইহিস সালামের দিকে ফিরে বললেন যে, তিনি যেন এই বিষয়টি উপেক্ষা করেন। এরপর একই নিঃশ্বাসে নিজের স্ত্রীকে উদ্দেশ করে বললেন, সে যেন নিজের গুনাহের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করে। সময় ও প্রেক্ষাপট এক, বক্তব্য এক, কিন্তু সম্বোধিত ব্যক্তি ভিন্ন হয়ে গেল অবস্থান ও দায়ের পার্থক্যের কারণে। এটি পরিষ্কার করে দেয় যে কুরআনকে বাণী হিসেবে বোঝার জন্য বক্তা ও শ্রোতার সম্পর্ক এবং পরিস্থিতির বিবেচনা অপরিহার্য, যা কেবল অভ্যন্তরীণ বিন্যাস দেখেই পুরোপুরি অনুধাবন করা সম্ভব নয়।
অন্যদিকে, যখন কুরআনকে আল্লাহর গ্রন্থ হিসেবে দেখা হয়, তখন বোঝার ভিত্তি গড়ে ওঠে তার অভ্যন্তরীণ প্রেক্ষাপটের ওপর। অভ্যন্তরীণ প্রেক্ষাপট বলতে কুরআনের নিজস্ব কাঠামো, তার বিন্যাস, রচনাশৈলী, আয়াত ও সূরার পারস্পরিক সম্পর্ক, বিষয়বস্তুর অগ্রাধিকার ও ক্রম, এবং সামগ্রিক গঠনকে বোঝানো হয়। গ্রন্থ হিসেবে কুরআন একটি সুসংহত ও সুবিন্যস্ত সমগ্রতা। এর একটি সূচনা আছে, একটি সুস্পষ্ট ধারাবাহিকতা আছে এবং একটি দৃঢ় পরিসমাপ্তি আছে। এই দৃষ্টিকোণ থেকে কুরআনের সূচনা সূরা ফাতিহার মাধ্যমে, যা পুরো কুরআনের উদ্দেশ্য, দোয়া, হিদায়াত ও বান্দেগির সারসংক্ষেপ। এরপর কুরআন বিভিন্ন সূরায় বিন্যস্ত, যেখানে প্রতিটি সূরা একদিকে স্বতন্ত্র একটি একক, আবার একই সঙ্গে পুরো কুরআনিক ব্যবস্থার অবিচ্ছেদ্য অংশ।
ইমাম ইবন তাইমিয়া রহিমাহুল্লাহ এবং আল্লামা হামিদুদ্দিন ফারাহি রহিমাহুল্লাহ উভয়েই এ বিষয়ে একমত যে কুরআন একই সঙ্গে আল্লাহর বাণী এবং আল্লাহর গ্রন্থ। তবে কুরআন বোঝার ক্ষেত্রে তাঁদের দৃষ্টিভঙ্গির প্রাধান্য ভিন্ন। ইমাম ইবন তাইমিয়ার চিন্তায় কুরআনকে বাণী হিসেবে দেখার দিকটি বেশি উজ্জ্বল, আর আল্লামা ফারাহির ক্ষেত্রে কুরআনকে গ্রন্থ হিসেবে বোঝার প্রবণতা প্রধান। এই মৌলিক পার্থক্যই তাঁদের তাফসিরি পদ্ধতি ও চিন্তন-নীতিতে স্পষ্টভাবে প্রতিফলিত হয়েছে।
ইমাম ইবন তাইমিয়া রহিমাহুল্লাহ তাঁর রচনাবলিতে কুরআনের জন্য বারবার “কালাম” শব্দটি ব্যবহার করেছেন এবং জোর দিয়ে বলেছেন, সত্যিকারের তাদাব্বুর তখনই সম্ভব, যখন অর্থ অনুধাবন করা হয়। তিনি স্পষ্ট ভাষায় বলেন, অর্থ না বুঝে কোনো বক্তব্যের গভীর অনুধ্যান সম্ভব নয়। তিনি আরও পরিষ্কার করে বলেন, বক্তব্যের বোধগম্যতাই তার অর্থ বোঝার অন্তর্ভুক্ত। এরপর তিনি একটি সর্বজনীন নীতি তুলে ধরেন, যা মূলত তাঁর পুরো চিন্তাধারার ভিত্তি। তাঁর কথা হলো, যেকোনো বক্তব্যের উদ্দেশ্য কেবল শব্দ উচ্চারণ নয়, বরং তার অর্থ বোঝা। আর সে হিসেবে কুরআন তো এ বিষয়ের সবচেয়ে বেশি হকদার।
ইমাম ইবন তাইমিয়ার কাছে বক্তা ও শ্রোতার অবস্থা থেকে বিচ্ছিন্ন করে শব্দের অর্থ নির্ণয় করা জ্ঞানগত সততার পরিপন্থী। তিনি স্পষ্ট করে বলেন, কোনো শব্দই কখনো শূন্যে ব্যবহৃত হয় না; বরং তা সবসময় কিছু নির্দিষ্ট সীমা ও শর্তের মধ্যে ব্যবহৃত হয়। বক্তব্যের প্রকৃত তাৎপর্য তখনই সম্পূর্ণভাবে উন্মোচিত হয়, যখন বক্তার কথা বলার রীতি, তার ভাষাভ্যাস এবং শ্রোতার মানসিক ও বাস্তব অবস্থা বিবেচনায় নেওয়া হয়। তাই তিনি বলেন, বক্তব্য বোঝার ক্ষেত্রে বক্তা ও শ্রোতার অবস্থা সর্বাবস্থায় বিবেচ্য।
এই নীতির আলোকে তিনি আরও জোর দেন যে, কুরআনের ভাষা বোঝার জন্য তার শব্দগুলোর কুরআনিক দৃষ্টান্ত একত্র করতে হবে এবং কুরআন ও হাদিসকে পরবর্তী কালের গড়ে ওঠা ভাষাগত, ফিকহি বা কালামি পরিভাষার আলোকে ব্যাখ্যা করা যাবে না। কারণ এই পরিভাষাগুলো রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের যুগে ছিল না, সাহাবিদের উপলব্ধিতেও ছিল না।
যেহেতু কালাম শ্রবণযোগ্য বিষয়, তাই ইমাম ইবন তাইমিয়া “শ্রবণ” ধারণাটিকে কেবল ধ্বনি শোনার মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখেন না। তিনি এটিকে বোঝা ও গ্রহণ করার সঙ্গে যুক্ত করেন। তাঁর মতে, যে শ্রবণের নির্দেশ আল্লাহ দিয়েছেন, তার মূল উদ্দেশ্য হলো রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বার্তা এমনভাবে শোনা, যাতে তা বোঝা হয় এবং অন্তরে গ্রহণ করা হয়।
এই পদ্ধতির স্বাভাবিক ফল হিসেবে ইমাম ইবন তাইমিয়ার কাছে শানে নুজুল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ নাজিল হওয়ার প্রেক্ষাপট, নির্দিষ্ট শ্রোতা ও আল্লাহর উদ্দেশ্য অনুধাবনে এগুলো মৌলিক ভূমিকা পালন করে।
এর বিপরীতে আল্লামা হামিদুদ্দিন ফারাহি রহিমাহুল্লাহ কুরআনকে মূলত একটি সুসংগঠিত, পরস্পরসংযুক্ত ও সুরেলাভাবে বিন্যস্ত গ্রন্থ হিসেবে দেখেন। তাঁর কাছে পুরো কুরআন একটি মহান ঐক্য, যা সাতটি বড় সমষ্টিগত কাঠামোয় বিভক্ত। প্রতিটি কাঠামোর একটি কেন্দ্রীয় লক্ষ্য রয়েছে, যা সাধারণত মক্কি সূরা দিয়ে শুরু হয়ে মাদানি সূরায় পরিণতি লাভ করে। তাঁর মতে, বহু সূরা যুগল আকারে অবতীর্ণ হয়েছে এবং প্রতিটি সূরার একটি কেন্দ্রীয় অক্ষ বা মূল বিষয় রয়েছে, যার চারপাশে তার সব বক্তব্য আবর্তিত হয়।
আল্লামা ফারাহি “নজম” বা কাঠামোর সংজ্ঞা দিতে গিয়ে বলেন, একটি সূরা এমন এক পূর্ণাঙ্গ সত্তা হওয়া উচিত, যা নিজেই একটি সম্পূর্ণতা বহন করে। তিনি আরও জোর দিয়ে বলেন, সূরাগুলোর বিন্যাস কাকতালীয় নয়; বরং তা আল্লাহ নির্ধারিত ও গভীর প্রজ্ঞাভিত্তিক। এই বিন্যাসে পরিবর্তন আনলে যেমন আয়াতের ক্রম বদলে দিলে অর্থের বড় অংশ নষ্ট হয়ে যায়, তেমনি কুরআনের সামগ্রিক প্রজ্ঞারও বড় অংশ হারিয়ে যায়।
এই কারণেই ফারাহির কাছে কুরআন বোঝার ক্ষেত্রে অভ্যন্তরীণ প্রেক্ষাপট, অর্থাৎ সূরার কাঠামো ও পুরো কুরআনের সামগ্রিক বিন্যাস, মূল ভিত্তি হিসেবে বিবেচিত। তিনি শানে নুজুলকে পুরোপুরি অস্বীকার করেন না, তবে তা তাঁর কাছে গৌণ ও সহায়ক সূত্র; তাফসিরের সূচনাবিন্দু নয়।
সারকথা হলো, কুরআনকে কেবল একটিমাত্র দৃষ্টিকোণ থেকে দেখা, চাই তা কেবল কালাম হিসেবে হোক বা কেবল গ্রন্থ হিসেবে, তার পূর্ণ সত্যকে ধারণ করতে পারে না। কুরআন আল্লাহর সেই বাণী, যা নির্দিষ্ট পরিস্থিতি, প্রশ্ন ও ঘটনার প্রেক্ষাপটে অবতীর্ণ হয়েছে; আবার একই সঙ্গে তা এমন এক গ্রন্থ, যার বিন্যাস, গঠন ও কাঠামো চিরন্তন প্রজ্ঞার ওপর প্রতিষ্ঠিত।
ইমাম ইবন তাইমিয়ার পদ্ধতি আমাদের শেখায় আল্লাহর খেতাব এর সূক্ষ্মতা, পরিস্থিতির মর্যাদা এবং ভাষা ও প্রচলিত রীতির গভীর অনুধাবন। আর আল্লামা ফারাহির পদ্ধতি আমাদের পরিচয় করিয়ে দেয় কুরআনের অভ্যন্তরীণ ঐক্য, বিষয়গত সাযুজ্য ও কাঠামোগত অলৌকিকতার সঙ্গে।
এই কারণেই কুরআন বোঝার ভারসাম্যপূর্ণ ও পরিপূর্ণ পথ হলো, এই দুই দৃষ্টিভঙ্গিকে একত্র করা। যেখানে বক্তব্য কোনো নির্দিষ্ট ঘটনা বা অবস্থার সঙ্গে যুক্ত, সেখানে বাহ্যিক প্রেক্ষাপট সামনে রাখা; আর যেখানে কুরআনের সামগ্রিক বার্তা, সূরার কেন্দ্রীয় বিষয় ও তার অবস্থান আলোচ্য, সেখানে অভ্যন্তরীণ কাঠামোকেই ভিত্তি করা। এই সমন্বিত পদ্ধতিই মুফাসসিরকে দুটি বড় জ্ঞানগত বিপর্যয় থেকে রক্ষা করে, এক, কুরআনকে খণ্ডিতভাবে বোঝার বিপদ; দুই, তাকে তার ঐতিহাসিক ও ভাষাগত প্রেক্ষাপট থেকে বিচ্ছিন্ন করার বিপদ।
যখন কুরআন একই সঙ্গে কালাম এবং গ্রন্থ -এই দুই পরিচয়ে একত্রে উপলব্ধ হয়, তখন কুরআন বোঝার সেই দিগন্ত উন্মোচিত হয়, যা আল্লাহর বাণীর মর্যাদার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। সেই দিগন্ত, যা বুদ্ধিকে হেদায়াত দেয়, হৃদয়কে পরিশুদ্ধ করে এবং ঈমানের ইমারতকে জ্ঞান ও অন্তর্দৃষ্টির সুদৃঢ় ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত করে।
————–
ক্যাটাগরি : কোরআন, তাফসির, ইসলামি চিন্তাধারা
✍ মূল : ড. মুহাম্মদ আকরাম নাদভী, অক্সফোর্ড।
✍ অনুবাদ যাচাই ও সম্পাদনা: মাওলানা মারজান আহমদ, সিলেট, বাংলাদেশ।
🔗 অনূদিত মূল প্রবন্ধের লিংক: 👇
https://t.me/DrAkramNadwi/8202