|১৫ |জানুয়ারি| ২০২৬|
আল্লাহ তাআলা বলেন:
উভয় দলের মাঝে আছে পর্দা আর আ‘রাফে (জান্নাত ও জাহান্নামের মধ্যবর্তী অংশ) কিছু লোক থাকবে যারা প্রত্যেক লোককে তার চিহ্ন দ্বারা চিনতে পারবে (যে সে জান্নাতের বাসিন্দা না জাহান্নামের)। জান্নাতবাসীদেরকে ডেকে তারা বলবে, ‘তোমাদের প্রতি সালাম’। তারা (আ‘রাফবাসীরা) তখনও জান্নাতে প্রবেশ করেনি কিন্তু তারা আশা করছে।
আর যখন তাদের দৃষ্টিকে আগুনের অধিবাসীদের প্রতি ফেরানো হবে, তখন তারা বলবে, ‘হে আমাদের রব, আমাদেরকে যালিম কওমের অন্তর্ভুক্ত করবেন না’।
আ‘রাফবাসীরা যাদেরকে চিহ্ন দেখে চিনতে পারবে তাদেরকে ডেকে বলবে, ‘তোমাদের দলবল আর গর্ব-অহঙ্কার কোন কাজে আসল না।’
এরাই (অর্থাৎ জান্নাতবাসীরা) কি ঐ সব লোক যাদের ব্যাপারে তোমরা শপথ করে বলতে যে আল্লাহ তাদের প্রতি কোন দয়া দেখাবেন না। (আজ এদেরকেই বলা হল) তোমরা জান্নাতে প্রবেশ কর, তোমাদের কোন ভয় নেই, তোমরা দুঃখিতও হবে না।
(সূরা আল-আ‘রাফ, আয়াত ৪৬–৪৯)
মহান তাফসীরকারদের বৃহৎ অংশের মত অনুযায়ী, আল-আ‘রাফের অধিবাসীরা হলেন সেই লোকেরা যারা সর্বশেষে জান্নাতে প্রবেশ করবে, কারণ তাদের কাজের পরিমাণ সীমিত ছিল। তারা এমন লোক হতে পারে, যাদের ভালো কাজ এবং মন্দ কাজ প্রায় সমানভাবে মিশ্রিত ছিল, বা যাদের বিচারের বিষয় কিছু সময়ের জন্য স্থগিত রাখা হয়েছিল। তারা তখন জান্নাত ও জাহান্নামের মাঝখানে আটকানো থাকতো যতক্ষণ না আল্লাহ তাদের ব্যাপারে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতেন, তারপর তাঁর অনুগ্রহে তারা জান্নাতে প্রবেশ করতো। তবে এই ব্যাখ্যা যদিও প্রচলিত, কিন্তু সরাসরি আয়াত থেকে এর কোনো প্রমাণ পাওয়া যায় না এবং এটি আয়াতের প্রেক্ষাপটও বাধ্যতামূলকভাবে ধরে নেয় না; এটি এক ধরনের দারসিক অনুমান, যা গ্রহণ করা বা না করার ক্ষেত্রে বাধ্যতা নেই।
আল-আ‘রাফ শব্দটি ‘উরফ’ (عُرْف) এর বহুবচন। আরব ভাষায় ‘উরফ’ হলো যে কিছুর উচ্চতা বা উত্থান থাকে। ইমাম তাবারি বলেছেন, আল-আ‘রাফ শব্দটি বহুবচন, এর একক রূপ হলো ‘উরফ’। যে কোনো উঁচু স্থানকে ‘উরফ’ বলা হয়। উদাহরণস্বরূপ, মুরগির কপাল বা পেছনের অংশকে উঁচুতে থাকার কারণে ‘উরফ’ বলা হয়। আরবের সাহিত্যে এই ব্যবহার প্রচলিত ছিল,উচ্চ স্থান বা বিশেষ মর্যাদা বোঝাতে।
উদাহরণস্বরূপ, আল-শামাখ ইবনে দরারের একটি কবিতার লাইন:
وظلت بأعرافٍ تغالى كأنهار ماحٌ نحاها وجهةَ الريحِ راكزُ
“এরা উঁচুতে দাঁড়িয়ে থাকে, যেন নদীর মতো প্রসারিত, বাতাসের মুখে স্থির।”
অন্য কবি লিখেছেন:
كل كنازٍ لحمه نيافك العَلَمِ الموفي على الأعراف
“প্রত্যেক ধনবান ব্যক্তির মাংস, আল-আ‘রাফের উচ্চ চূড়ায় মোরিয়ার মতো স্থাপিত।”
এই প্রেক্ষাপটে ‘আল-আ‘রাফ’কে অর্থ করা যায় জান্নাত ও জাহান্নামের মাঝের উঁচু স্থান, যেন দুর্গ বা পাহাড়ের কেল্লার মতো। এ থেকে উভয় দলের মানুষ, জান্নাতবাসী এবং জাহান্নামবাসী, পরিষ্কারভাবে দেখা যায়।
আয়াতে ‘رجال’ শব্দের অজ্ঞাত ব্যবহার”আল-আ‘রাফে কিছু মানুষ” তাদের মর্যাদা বৃদ্ধির সংকেত, শুধু পুরুষ বোঝানোর জন্য নয়। যেমন অন্য আয়াতে এসেছে:
“যেসব মানুষ তাদের ব্যবসা-বাণিজ্যে এত ব্যস্ত হয় না যে তারা আল্লাহর স্মরণ থেকে বিচ্যুত হয়।”
এখানে ‘মানুষ’ বলতে বোঝানো হয়েছে উচ্চ মর্যাদার অবস্থান, সত্যের প্রতি অটল থাকা ও গুরুতর দায়িত্ব বহন।
প্রশ্ন জাগে, এই আল-আ‘রাফের মানুষরা আসলে কারা? তারা সাধারণ মানুষ নয়। তাবারি থেকে জানা যায়, ইমাম মুজাহিদ বলেছেন: আল-আ‘রাফের অধিবাসীরা হলেন সদাপ্রশিক্ষিত, ধার্মিক, জ্ঞানী মানুষ। তারা নবী বা রাসূল নয়; কারণ নবীদের কাজ শেষ হয়েছে। বরং তারা ছিলেন মুসলমান জাতির নেতা ও শিক্ষাবিদ, যারা মানুষের মধ্যে ইসলামের আদেশ পালন এবং মন্দ থেকে বিরত রাখার দায়িত্ব পালন করেছেন। আল্লাহ তাদের এই মর্যাদায় উন্নীত করেছেন।
তারা আল-আ‘রাফে দাঁড়িয়ে থাকেন যেন মানুষদের ভাগ্য পর্যালোচনা করতে পারেন। জান্নাতবাসীদের শান্তির শুভেচ্ছা জানান, আর আশা প্রকাশ করেন প্রবেশের জন্য।”যখন তারা জাহান্নামের দিকে তাকায়, তারা প্রার্থনা করে বলবে: ‘হে আমাদের রব, আমাদেরকে অন্যায়কারীদের সঙ্গে মিলিত করিও না।’” পরিশেষে, তারা জান্নামবাসীদেরকে তাদের চিহ্ন দিয়ে চিনিয়ে শাসন করবেন, তাদের প্রতিজ্ঞা ও অহংকারের ব্যর্থতা স্মরণ করিয়ে দেবেন।
সংক্ষেপে, আল-কুরআন এই লোকদের পরিচয় বিস্তারিতভাবে প্রকাশ করেনি। কারণ এখানে উদ্দেশ্য ব্যক্তিগত নয়, বরং তাদের ভূমিকা, সত্য ও মিথ্যাকে পৃথক করা। তারা জান্নাত ও জাহান্নামের মানুষদের চিহ্নিত করতে পারেন। এই চিহ্ন শুধু বাহ্যিক নয়, বরং মানুষের কর্ম, বিশ্বাস বা অমর্যাদার প্রতিফলন। এভাবেই আল্লাহর ন্যায়পরায়ণতা স্পষ্ট হয়, কোনো অন্যায় বা বিভ্রান্তি ছাড়া।
যেমনভাবে আয়াতে ব্যবহৃত “رجال” শব্দের মাধ্যমে এখানে শুধু পুরুষদের বোঝানো নয়, বরং এটি আরবী ভাষা ও কুরআনের বিশেষ ভঙ্গিতে উচ্চ মর্যাদা ও গুরুদায়িত্বের অধিবাসীকে প্রকাশ করার একটি উপায়। এমনকি যারা বলেন যে আল-আ‘রাফের অধিবাসীরা সর্বশেষ জান্নাতে প্রবেশকারী, তারাও মত দেন যে এখানে কেবল পুরুষদের সীমাবদ্ধ করা হয়নি; উদ্দেশ্য হলো তাদের উচ্চ মর্যাদা ও অবস্থান প্রদর্শন করা, লিঙ্গ নয়। কুরআনে এমন অনেক উদাহরণ রয়েছে যেখানে পুরুষদের নাম বা সর্বনাম ব্যবহার করেও উভয় লিঙ্গকে বোঝানো হয়েছে, যদি সেই বক্তব্য বর্ণনামূলক ও معنوی হয়।
আল-আ‘রাফের দৃশ্যটি সূরা আল-আ‘রাফে আসে বহু দীর্ঘ প্রাচীন জাতির গল্পের পর। এটি যেন মানুষের জীবনের এক সংক্ষেপিত চিত্র। মানুষের ভিন্ন ভিন্ন প্রতিক্রিয়া, বিশ্বাস ও অস্বীকার, ভক্তি ও অহংকার, সব দেখানো হয়েছে, এবং তারপর পরকালের চূড়ান্ত পরিণতি সম্পূর্ণভাবে প্রকাশ করা হয়েছে। এখানে বোঝানো হয়েছে যে, জীবনের ফলাফল, উদ্ধার বা ধ্বংস, পরিপূর্ণভাবে নির্ধারিত, এবং এটি যে কেউ যিনি সত্যের দিকে দৃষ্টি রাখেন, তারা তা বুঝতে পারবেন।
কুরআনে আল-আ‘রাফকে কোনো রহস্যময় স্থান বা অপেক্ষার অবস্থান হিসেবে দেখানো হয়নি। বরং এটি একটি স্পষ্ট মঞ্চ, যেখানে ন্যায় ও সত্য প্রকাশ পায় এবং সৃষ্টিকর্তার বিচার এবং স্বচ্ছতা ফুটে ওঠে। এখানে দেখা যায় যে প্রতিফলন সম্পূর্ণভাবে মানুষের বিশ্বাস, ধৈর্য, ভক্তি বা অহংকারের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ।
————-
ক্যাটাগরি : তাফসির, তাজকিয়াহ, কোরআন, ইসলামি চিন্তাধারা
✍ মূল : ড. মুহাম্মদ আকরাম নাদভী, অক্সফোর্ড।
✍ অনুবাদ যাচাই ও সম্পাদনা: মাওলানা মারজান আহমদ, সিলেট, বাংলাদেশ।
🔗 অনূদিত মূল প্রবন্ধের লিংক: 👇
https://t.me/DrAkramNadwi/8199