১৩ ডিসেম্বর ২০২৫-এর সন্ধ্যায় ইংল্যান্ডের লেস্টার শহর এক গভীরভাবে হৃদয়স্পর্শী ও স্মরণীয় সন্ধ্যার সাক্ষী হয়। সেদিন আস-সালাম ইনস্টিটিউট তাদের সেই সকল ছাত্র ও ছাত্রীদের সমাপনী অনুষ্ঠান আয়োজন করে, যারা কঠোর ও সুদীর্ঘ আলিমিয়্যাহ প্রোগ্রাম সফলভাবে সম্পন্ন করেছে। মর্যাদা, আন্তরিকতা ও আত্মিক ভাবগাম্ভীর্যে ভরপুর পরিবেশে আয়োজিত এই অনুষ্ঠান একত্র করেছিল নবীন আলিম-আলিমাদের, তাঁদের পরিবারবর্গ, শিক্ষক, বন্ধুস্বজন এবং আত্মশুদ্ধিমূলক রিহ্যাব বা আধ্যাত্মিক সাধনায় অংশগ্রহণকারী অতিথিদের। এটি নিছক কোনো একাডেমিক আনুষ্ঠানিকতা ছিল না; বরং ছিল ঈমান, ত্যাগ, ধৈর্য এবং পবিত্র জ্ঞানের সঙ্গে আজীবন অঙ্গীকারের এক গৌরবময় উদ্যাপন।
শীতল সন্ধ্যা নামার সঙ্গে সঙ্গে মিলনায়তন ধীরে ধীরে ভরে উঠছিল প্রত্যাশা ও নীরব আনন্দে। স্নিগ্ধ গাম্ভীর্যের আবেশে যখন স্নাতকরা প্রবেশ করলেন, তাঁদের মুখাবয়বে ফুটে উঠল দীর্ঘদিনের নিয়মানুবর্তী অধ্যয়ন, আত্মসংগ্রাম ও আধ্যাত্মিক পরিশ্রম শেষে পাওয়া স্বস্তি আর গভীর কৃতজ্ঞতা। উপস্থিত বহু পরিবারের জন্য এ মুহূর্ত ছিল অসংখ্য ত্যাগের পরিণতি, নির্ঘুম রাত, ভোরের অধ্যয়ন, আর্থিক চাপ এবং নীরব সহনশীলতার এক পরিপূর্ণ ফল। পিতামাতারা গর্বভরা দৃষ্টিতে দেখছিলেন তাঁদের সন্তানদের, যারা এমন এক মাইলফলকে পৌঁছেছে, যার তাৎপর্য কেবল শিক্ষাগত নয়, বরং গভীর আত্মিক গুরুত্ববাহী।
শিক্ষকরা এই দৃশ্য প্রত্যক্ষ করছিলেন এক অনন্য আনন্দ ও বিনয়ের অনুভূতি নিয়ে। তাঁরা জানতেন, তাঁদের ভূমিকা কেবল পাঠদানেই সীমাবদ্ধ ছিল না; তাঁরা ছিলেন পথপ্রদর্শক, সহযাত্রী ও নির্ভরতার আশ্রয়। তাঁদের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা এই তরুণ-তরুণীরা আর কেবল শিক্ষার্থী নয়; তারা এমন মানুষ, যাদের গড়ে তোলা হয়েছে জ্ঞান, চরিত্র ও ইখলাসের মাধ্যমে, যাতে তারা দ্বীন, সমাজ ও সমগ্র মানবতার খেদমতে নিজেদের উৎসর্গ করতে পারে।
অনুষ্ঠানে শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের বক্তব্য সমগ্র আয়োজনকে আরও সমৃদ্ধ করে তোলে। শিক্ষকেরা তাঁদের অনুভূতি ব্যক্ত করে ছাত্রছাত্রীদের অধ্যবসায় ও দৃঢ়তার প্রশংসা করেন এবং পরিবারগুলোর অবিচল সমর্থন ও আস্থার কথা কৃতজ্ঞচিত্তে স্মরণ করেন। এরপর কয়েকজন স্নাতক মঞ্চে উঠে তাঁদের শিক্ষক ও পিতামাতার প্রতি অন্তরের কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন এবং এই দীর্ঘ যাত্রাপথে তাঁদের ব্যক্তিগত সংগ্রামের কথা অকপটে তুলে ধরেন। আবেগে ভারী হয়ে ওঠা সেই কণ্ঠগুলো স্পষ্ট করে দেয়, আলিমিয়্যাহ যাত্রা কেবল বুদ্ধিবৃত্তিক নয়, গভীরভাবে আত্মরূপান্তরের পথ।
আমার বক্তব্যে আমি এমন এক বাস্তবতার কথা স্মরণ করিয়ে দিই, যা মেনে নেওয়া সহজ নয়, ইসলামি জ্ঞানচর্চার পথ আধুনিক বস্তুবাদী দুনিয়ায় সাধারণত কোনো উজ্জ্বল বা লাভজনক পেশার প্রতিশ্রুতি দেয় না। এই পথ বেছে নেওয়া মানে শিক্ষার্থীদের পাশাপাশি তাঁদের পরিবারগুলোরও এক গভীর ত্যাগ, যারা সামাজিক প্রত্যাশা ও অর্থনৈতিক চাপ সত্ত্বেও তাঁদের পাশে দাঁড়ান। কিন্তু এই ত্যাগ একমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্যই করা হয়, আর এই ইখলাসই তাকে অনন্ত ও অপরিমেয় মূল্য দান করে।
এরপর আমি কুরআনের সেই হৃদয়ছোঁয়া ঘটনার কথা স্মরণ করি, মারইয়াম আলাইহাস সালামের মায়ের মানত, যিনি তাঁর সন্তানকে দ্বীনের খেদমতে উৎসর্গ করেছিলেন। আল্লাহ তাঁর সেই মানত কবুল করেন, আর সেই নিঃস্বার্থ নিবেদন থেকেই জন্ম নেয় ইতিহাসের অন্যতম সম্মানিত এক নারীর জীবন। এই চিরন্তন কাহিনি আমাদের মনে করিয়ে দেয়, খাঁটি নিয়ত, ত্যাগ ও নিষ্ঠা আল্লাহর কাছে কখনোই বৃথা যায় না, যদিও তার ফল দুনিয়ার চোখে তৎক্ষণাৎ দৃশ্যমান না-ও হতে পারে।
শেষে আমি একটি ফারসি কবিতার পংক্তি পাঠ করি এবং উপস্থিত শ্রোতাদের কাছে তার মর্মার্থ ব্যাখ্যা করি –
درآں دیار کہ گوہر خریدن آئین نیست
دکاں کشودہ ام وقیمت گہر گويم
অর্থাৎ –
“যে দেশে হীরার কেনাবেচার রীতি নেই,
সেই দেশেই আমি এক দোকান খুলেছি, আর হীরার দাম ঘোষণা করছি।”
এই পংক্তিই যেন সমগ্র আয়োজনের আত্মা হয়ে উঠেছিল, অবমূল্যায়িত এক পৃথিবীতে মূল্যবান সত্যকে তুলে ধরার নির্ভীক আহ্বান।
আমি ব্যাখ্যা করেছিলাম যে আস-সালাম ইনস্টিটিউট আসলে এই বার্তাটিকেই জীবন্ত করে তুলেছে। এক বস্তুবাদী দুনিয়ায়, যেখানে পবিত্র জ্ঞানকে প্রায়ই অবমূল্যায়ন করা হয়, উপেক্ষা করা হয়, সেখানে এই প্রতিষ্ঠানটি নীরব দৃঢ়তায় ধর্মীয় জ্ঞানের শিক্ষার্থীদের লালন করে চলেছে এবং তাদের গড়ে তুলে সমাজের সামনে দাঁড় করাচ্ছে। সমাজ হয়তো সব সময় তাদের মূল্য বোঝে না, তাদের মর্যাদা স্বীকার করে না; কিন্তু আল্লাহ তাদের মূল্য জানেন। আর আল্লাহর কদর চিরস্থায়ী, সীমাহীন ও তুলনাহীন।
আনুষ্ঠানিক পর্ব শেষ হলে সবার জন্য সম্মিলিত নৈশভোজের আয়োজন করা হয়। এতে সবাই কিছুটা অবসর নিয়ে সন্ধ্যার আনন্দ ভাগাভাগি করার সুযোগ পান। পুরো মিলনায়তন ভরে ওঠে উষ্ণতা ও কৃতজ্ঞতায়—হাসি, হৃদয়খোলা আলাপ, আর নীরব গর্বের মুহূর্তগুলো ছড়িয়ে পড়ে চারদিকে। স্নাতকরা পরিবার-পরিজনের সঙ্গে আনন্দ উদ্যাপন করেন, শিক্ষকরা স্নেহভরে তাঁদের
শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কথা বলেন, আর অতিথিরা এমন একটি অর্থবহ আয়োজনের সাক্ষী হতে পেরে নিজেদের সৌভাগ্যবান মনে করেন।
আস-সালাম ইনস্টিটিউটের এই সমাপনী অনুষ্ঠান কেবল একটি শিক্ষাগত মাইলফলক ছিল না; এটি ছিল ঈমান, জ্ঞান ও ত্যাগের চিরন্তন মূল্যবোধের এক দৃঢ় ঘোষণা। এটি এমন এক সন্ধ্যা, যা উপস্থিত সকলের হৃদয় ভরিয়ে দিয়েছে, আত্মাকে উজ্জীবিত করেছে এবং জীবনের উদ্দেশ্যবোধকে নতুন করে জাগিয়ে তুলেছে। একই সঙ্গে এটি ছিল এক স্থায়ী স্মারক, এই পৃথিবী হীরার কদর না-ও বুঝতে পারে, কিন্তু হীরার প্রকৃত মূল্য কখনোই বদলায় না।
—————–
ক্যাটাগরি : তালিম, ইসলামি চিন্তাধারা, উপদেশ, তাজকিয়াহ।
✍ মূল : ড. মুহাম্মদ আকরাম নাদভী, অক্সফোর্ড।
✍ অনুবাদ যাচাই ও সম্পাদনা: মাওলানা মারজান আহমদ, সিলেট, বাংলাদেশ।
🔗 অনূদিত মূল প্রবন্ধের লিংক: 👇
https://t.me/DrAkramNadwi/7893