শিরোনাম : বার্ধক্য: এক নীরব রূপান্তর
|২ |জানুয়ারি|২০২৬|
হে আমার নিজের সত্তা, মনে রেখো, বার্ধক্য কোনো আকস্মিক দুর্ঘটনার নাম নয়। এটি হঠাৎ দরজায় কড়া নেড়ে ঢুকে পড়ে না, যেন কোনো গোপন অতিথি হঠাৎ জানিয়ে দিল—আমি এসে গেছি। বরং এটি জীবনের গ্রন্থে ঘটে যাওয়া এক অত্যন্ত ভদ্র, অথচ অনড় সংশোধন। লেখা আগের মতোই থাকে, কিন্তু তার অর্থ ধীরে ধীরে রূপ বদলায়, যেন কোনো সূক্ষ্মদৃষ্টি সম্পাদকের আঙুল ধৈর্য ও বিবেচনায় বাক্যের ওপর আলতো করে ছুঁয়ে যায়। আর যে বাক্যগুলো একদিন শিরোনাম হয়ে ঝলমল করত, তারা নিঃশব্দে সরে গিয়ে প্রান্তলেখায় শান্ত আশ্রয় খুঁজে নেয়।
আর একদিন আমি পূর্ণ আস্থায় বলতাম, আমি আছি। অল্প কিছুদিন পর সেই একই বাক্য পড়া হয় এভাবে, এটা একসময় ছিল।
এই মুহূর্তটি, এই উপলব্ধি যে সময় নিজেই আমার উপস্থিতিকে অপ্রয়োজনীয় মনে করতে শুরু করেছে, আমার অস্তিত্বের গায়ে এক অদ্ভুত, হালকা সিল মেরে দেয়: “আর কোনো কার্যক্রমের প্রয়োজন নেই।” আর আমি মুচকি হাসি, কারণ জানি, জীবনই আমাকে অবসর দিয়েছে, কোনো শত্রু নয়, কোনো দুর্ঘটনাও নয়।
আমার থাকা, আমার অস্তিত্বের অর্থ এখন আর শুধু শ্বাস নেওয়ায় সীমাবদ্ধ নয়। দর্শন ও সামাজিক বিধান বলে অস্তিত্ব মানে অংশগ্রহণ, জগতের সঙ্গে যুক্ত থাকা। অর্থাৎ, পৃথিবী আমাকে ডাকবে, আমার সঙ্গে তর্ক করবে, আমার কথা কেটে দেবে, আর কখনো কখনো আমার ভুলে হালকা বকুনি দেবে। আমি বুঝেছি, এসবই ছিল যৌবনের সৌজন্য, যা আমি আনন্দের সঙ্গে ভোগ করেছি, আর বার্ধক্যে এসে দুনিয়া কেবল ভদ্রতার খাতিরে সেগুলোর স্মৃতি টিকিয়ে রাখে।
আমি অনুভব করেছি, বার্ধক্য নিঃশব্দে কিন্তু চূড়ান্তভাবে নিজেকে নিষ্ক্রিয় ঘোষণা করে দেয়। দুনিয়া বৃদ্ধদের সঙ্গে বিতর্ক করে না; কেবল বোঝায়, এখন তাদের মতামত, তাদের উদ্দীপনা কেবল অতীতের প্রতিধ্বনি। এভাবে আমি আছি, কিন্তু বর্তমান কালের ক্রিয়া থেকে সরে গিয়ে অতীত কালের কোনো অপ্রয়োজনীয় শাখায় গিয়ে বসেছি। এই বোধ কখনো তিক্ত, কখনো অদ্ভুত এক প্রশান্তি এনে দেয়, আমি এখন কেবল উদাহরণ, কোনো নতুন কীর্তির সহযাত্রী নই।
দার্শনিকেরা যুগ যুগ ধরে বলে এসেছেন, অস্তিত্ব সত্তার আগে। আর এখন আমি সেই ছোট অক্ষরে লুকিয়ে থাকা ব্যাখ্যাটি বুঝতে পারি, শেষ পর্যন্ত অস্তিত্ব সত্তার মধ্যেই বিলীন হয়ে যায়। আমি আর হয়ে ওঠার পর্যায়ে নেই; আমি নমুনা হয়ে গেছি, রেফারেন্স হয়ে গেছি, আর হয়তো কখনো কখনো অন্যের ঠাট্টার কারণও। মানুষ আমাকে “জ্ঞানী” বলে ডাকে, আর আমি জানি—এই উপাধি আসলে এক ভদ্র অবসর-নোটিশ। প্রজ্ঞা তখনই দেওয়া হয়, যখন অনুসন্ধান থেকে লিখিত অঙ্গীকার নেওয়া হয় যে ভবিষ্যতে আমি আর কোনো নতুন বিষয়ে জোর করব না।
আমার প্রশংসা করা হয় এই জন্য যে আমি সব জানি, যাতে আমার কাছ থেকে নতুন কিছু জানার প্রত্যাশা চিরতরে শেষ হয়ে যায়। আর আমি হেসে ভাবি—এভাবে সমাজ আমাকে সুগন্ধি মমির মতো সংরক্ষণ করছে, যেন কোনো মোমের মূর্তিতে মেহেদি পরানো হচ্ছে।
আমার শরীর, যে একসময় আমার জীবনের সঙ্গী ছিল,এখন হিসাবরক্ষক হয়ে গেছে। হাঁটু প্রতিবাদ জানায়, স্মৃতি আগেভাগেই অবসর চায়, আর আয়না প্রতিদিন এক নতুন অপরিচিতের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেয়, যেন আমি নিজেই আগন্তুক। আমি আছি, কিন্তু প্রতিটি নড়াচড়ার আগে শরীর অনুমতিপত্র চায়—মনে হয়, জীবন আমাকে পাসওয়ার্ড ছাড়া লগইন করার সাময়িক অনুমতি দিয়েছে।
সময়—যা একসময় আমার কাছে পালানোর মুদ্রা ছিল, বার্ধক্যে এসে এক বিরল স্মারকে পরিণত হয়েছে। ভবিষ্যৎ সঙ্কুচিত হয়ে কেবল এক প্রশাসনিক সমস্যায় নেমে এসেছে—সতর্কতা, আশঙ্কা, শিক্ষা ও রচনা, আর কখনো কখনো এই ভাবনা, হয়তো কিছু মনে পড়ে যাবে। আর অতীত, তার বিপরীতে, হয়ে উঠেছে এক বিশাল প্রাসাদ, যার প্রতিটি কক্ষে কোনো না কোনো স্মৃতি বিশ্রাম নিচ্ছে, আর প্রতিটি কক্ষ নিজস্ব গল্প শোনাচ্ছে।
আমি সময়ের ভেতর বাঁচি না; আমি সময়কে সাজাই, সম্পাদনা করি। স্মৃতিই আমার স্থায়ী ঠিকানা, আমার আশ্রয়। আমি সবচেয়ে বেশি সেখানে উপস্থিত, যেখানে আমি স্মরণ করছি, সেখানে নয়, যেখানে আমার শরীর নড়াচড়া করছে। এভাবে আমার অস্তিত্ব পিছনের দিকে হিজরত করেছে, যেন কোনো সভ্যতা নিজেরই ধ্বংসাবশেষে আশ্রয় নিয়েছে, আর ছাদ থেকে অনবরত জল ঝরছে।
সমাজে আমার জায়গা দৃষ্টিতে আছে, কিন্তু কেন্দ্রে নয়। আমি আছি, কিন্তু চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের অধিকারী নই। আমার মতামত গ্রহণযোগ্য—শর্ত এই যে, তার ফল ভোগ করবে অন্য কেউ। আমার রাগের নাম দেওয়া হয় তিক্ততা, আমার আকাঙ্ক্ষাকে বলা হয় বাস্তবতা অস্বীকার, আর আমার হাসি এ বলে এড়িয়ে দেওয়া হয়- বেশ তো, এখনো হাসতে পারেন! এমনকি বিদ্রোহও আমার কাছ থেকে কেড়ে নেওয়া হয়েছে; আমি আর বিপজ্জনক নই, শুধু হয়তো চশমার নম্বর বদলেছে।