AkramNadwi

শিরোনাম : মাওলানা রশীদ আহমদ গঙ্গোহী রহিমাহুল্লাহ ও

শিরোনাম : মাওলানা রশীদ আহমদ গঙ্গোহী রহিমাহুল্লাহ ও দর্শন।
|২৯|১২|২০২৫|

মাওলানা মুহাম্মদ কাসিম নানুতবী রাহিমাহুল্লাহ এর পর দারুল উলূম দেওবন্দের সর্ববৃহৎ ব্যক্তিত্ব ছিলেন মাওলানা রশীদ আহমদ গঙ্গোহী রহিমাহুল্লাহ। তিনি দর্শনের ঘোর বিরোধী ছিলেন। নিজের ছাত্র ও মুরিদদের তিনি দর্শন শিক্ষা থেকে কঠোরভাবে নিষেধ করতেন; বরং একে হারাম ও অবৈধ বলে গণ্য করতেন। দারুল উলূম দেওবন্দে দর্শন অন্তর্ভুক্ত করার ব্যাপারে তিনি কখনোই সম্মত ছিলেন না।

মাওলানা গঙ্গোহী রাহিমাহুল্লাহ কেবল দর্শনের সমালোচক ছিলেন না; বরং একে তিনি ইসলামী দ্বীনের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর ও পথভ্রষ্টকারী জ্ঞান বলে মনে করতেন। তাঁর দৃষ্টিতে দর্শন কোনো নিরপেক্ষ বা সহায়ক বিদ্যা ছিল না; বরং এমন এক চিন্তাব্যবস্থা, যা ইসলামী আকীদার শিকড়ে আঘাত হানে। এই কারণেই তিনি দর্শনের প্রতি প্রবল ঘৃণা পোষণ করতেন এবং একে স্পষ্ট ভাষায় অবৈধ ও হারাম ঘোষণা করতেন।

মাওলানা আশিক ইলাহী মিরাঠী লিখেছেন:
“দর্শন প্রভৃতিকে শরিয়তের বিরোধিতার কারণে তিনি অবৈধ বলতেন, এবং এমন তীব্র ঘৃণা সৃষ্টি করতেন যে, তার কোনো সীমা থাকত না।”
(তাযকিরাতুর রশীদ, খণ্ড ১, পৃষ্ঠা ৯৪)

এর স্পষ্ট অর্থ হলো, মাওলানা গঙ্গোহী রাহিমাহুল্লাহর কাছে দর্শন নিজেই শরিয়তে ইসলামের মোকাবিলায় দাঁড়ানো একটি স্বতন্ত্র চিন্তাব্যবস্থা ছিল।

এই গ্রন্থেই আরও উল্লেখ আছে:
“একবার এক ছাত্র নিবেদন করল: হুজুর! আমাদের আকীদা তো দার্শনিক মাসআলার উপর প্রতিষ্ঠিত নয়; আমরা কেবল মুখে মুখে এগুলো পড়ি ও পড়াই, এতে ক্ষতি কোথায়?
হুজুর বললেন: প্রথমত, কুফর ও শিরকের বাক্য মুখে উচ্চারণ করা, সেগুলোকে দলিলের মাধ্যমে প্রমাণ করার চেষ্টা করা, তারপর সেগুলোর বিরুদ্ধে ওঠা আপত্তির জবাব দেওয়া, এগুলোই প্রমাণ করে যে অন্তরে তার প্রভাব বিদ্যমান। আর ধরেও নিলাম, আকীদা সৃষ্টি হয়নি, তবুও এটি হারাম এবং আল্লাহর গজব ডেকে আনে।”

তিনি উদাহরণ দিয়ে বলেন:
“যদি কেউ তোমাকে গাধা বা শূকর বলে ডাকে, কিংবা কোনো কঠোর গালি দেয়, তাহলে স্পষ্ট যে সে এই বিশ্বাস পোষণ করে না যে তুমি সত্যিই গাধা বা শূকর; সে কেবল মুখে বলেছে। কিন্তু বলো তো, এতে কি তোমার রাগ হবে না? অবশ্যই হবে। ঠিক তেমনি কুফর ও শিরকের বাক্যগুলোকে বুঝে নাও, এগুলো যেকোনো অবস্থায়ই আল্লাহর গজবের কারণ; কেননা আল্লাহ তাআলার সত্তা একজন লজ্জাশীল মুসলমানের চেয়েও অধিক গায়রতসম্পন্ন।”

ছাত্র তখন সম্পূর্ণ নিরুত্তর হয়ে আরজ করল: হুজুর! আমরা কী করব, এগুলা বাধ্যতামূলক , এগুলো ছাড়া চাকরি মেলে না।
হুজুর বললেন: যদি কেউ তোমাকে বলে, মাসে একশ টাকা দেবে, তবে শর্ত হলো, পায়খানার ঝুড়ি মাথায় তুলে বাজারের এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে নিয়ে যেতে হবে, তাহলে ন্যায়ের সাথে বলো, তোমার গায়রত কি তা মেনে নেবে? কখনোই নেবে না। আফসোস! আল্লাহ তাআলাকে গালি দেওয়ার ক্ষেত্রে মানুষের গায়রত এতটুকুও জাগে না, যতটুকু একটি বৈধ কাজ করতে গিয়ে জাগে।

এরপর ছাত্র পুরোপুরি নিরুত্তর হয়ে গেল। আর এর সঙ্গে সঙ্গে অন্য ছাত্রদের হৃদয় থেকেও চিরতরে তথাকথিত বুদ্ধিবৃত্তিক বিদ্যার প্রতি আগ্রহ ও অনুমতির ধারণা বিদায় নিল।
(তাযকিরাতুর রশীদ, খণ্ড ১, পৃষ্ঠা ৯৪)

মাওলানা গঙ্গোহী রাহিমাহুল্লাহর অবস্থান ছিল এই যে, দর্শনে কুফর ও শিরকভিত্তিক মতবাদ শুধু আলোচিতই হয় না, বরং সেগুলোকে যুক্তি দিয়ে প্রমাণ করার চেষ্টাও করা হয়। তাঁর দৃষ্টিতে কোনো মুসলমানের জন্য এমনকি মুখে মুখেও এমন কুফরপূর্ণ ধারণা উচ্চারণ করা কখনোই বৈধ নয়; নি‎য়ত যদি কেবল শিক্ষা, সমালোচনা বা উদ্ধৃতিরই হয় তবুও নয়।
“আমরা অন্তরে এগুলো মানি না, কেবল ভাষায় পড়ি ও পড়াই”, এই অজুহাতকে তিনি সম্পূর্ণ ভ্রান্ত মনে করতেন। কারণ তাঁর মতে, যে ব্যক্তি কোনো মতবাদ বারবার উচ্চারণ করে, তার যুক্তি মুখস্থ করে এবং তার পক্ষে কথা বলে, তার মন ও হৃদয় ধীরে ধীরে তা দ্বারা প্রভাবিত হবেই। এ কারণেই তিনি বলতেন, মুখে কুফর উচ্চারণ করাও আল্লাহ তাআলার গজবকে আহ্বান করার শামিল, অন্তরে অস্বীকারের দাবি থাকলেও।

মাওলানা গঙ্গোহী রাহিমাহুল্লাহর উপমাগুলোর উদ্দেশ্য ছিল মূলত ঈমানি গায়রতকে জাগ্রত করা। ব্যক্তিগত অপমান বা পায়খানার উদাহরণ দিয়ে তিনি বোঝাতে চেয়েছেন, মানুষ দুনিয়াবি লাঞ্ছনায় তো সঙ্গে সঙ্গে গায়রত অনুভব করে, কিন্তু আল্লাহ তাআলার সত্তা ও তাঁর দ্বীনের ব্যাপারে সেই গায়রতই হারিয়ে ফেলে। তাঁর কাছে দর্শন পড়া ও পড়ানো ছিল আল্লাহ তাআলার শানে বেয়াদবি, তাঁর ক্ষমতা ও কর্তৃত্বে হস্তক্ষেপ, এবং কুফরপূর্ণ ধারণা প্রচারের সমতুল্য। তাই “বাধ্যতা” বা “চাকরি”র অজুহাত পেশ করা তাঁর কাছে ছিল অত্যন্ত অপছন্দনীয়।

আরও বলেন, মাওলানা আশিক ইলাহী মিরাঠী তাযকিরাতুল খলীল-এ লিখেছেন:

শেয়ার করুন:

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *