AkramNadwi

মাওলানা মওদুদিকে আমরা কীভাবে দেখব?

মাওলানা মওদুদিকে আমরা কীভাবে দেখব?<br>

|২৭|১২|২০২৫|

|| প্রশ্ন:

কদিন আগের কথা। একটা লেখা লিখেছিলাম আমি। সেখানে বলেছিলাম, ইসলামকে বুঝতে হলে, জানতে হলে কাদের বইপত্র পড়া দরকার। অনেক বড় বড় মনীষী আর চিন্তাবিদের নাম ছিল সেখানে। তাঁদের ভিড়ে আমি মাওলানা আবুল আলা মওদুদির নামটাও দিয়েছিলাম। বলেছিলাম, তাঁর বইও পড়া চাই।
এক বিদ্যানুরাগী ভাই বেশ অবাক হলেন মওদুদির নাম দেখে। তিনি আমাকে নিচের প্রশ্নটা পাঠালেন:
আস-সালামু আলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহ।
আল্লাহ আপনাকে সুস্থ রাখুন, দ্বীনের খেদমতে আপনাকে কবুল করুন।

 

হুজুর, আপনার লেখাটা পড়লাম। কিন্তু সেখানে মওদুদির নাম দেখে তো আমার চক্ষু চড়কগাছ! দয়া করে একটু খুলে বলবেন কি, এই নাম সত্যিই আপনি লিখেছেন? নাকি ছাপার সময় কেউ ওস্তাদি করে আপনার লেখার ভেতর এটা ঢুকিয়ে দিয়েছে?
মওদুদিকে নিয়ে তো অভিযোগের শেষ নেই। তিনি নবীদের শানে বেয়াদবি করেছেন, সাহাবিদের মানসম্মানে আঘাত করেছেন, এমনকি আহলে বাইতকেও ছাড়েননি—এমন কথা তো সবার মুখে মুখে। মাওলানা জাকারিয়া কান্ধলভি তো এ নিয়ে ‘ফিতনায়ে মওদুদিয়াত’ নামে একটা বই-ই লিখে গেছেন।
এখন বলুন, এমন একজন পথভ্রষ্ট লোকের বই পড়ে দ্বীনের কী সেবা হবে? যে লোক খোদ রাসুলুল্লাহর (সা.) সাহাবিদের সমালোচনা করে, তাঁর বই পড়ার পরামর্শ আপনারা দেন কীভাবে? দয়া করে বিষয়টি একটু বুঝিয়ে বলবেন। আর আমার এই সোজাসাপ্টা প্রশ্নে আবার মন খারাপ করবেন না যেন। জাজাকুমুল্লাহু খাইরান।

|| উত্তর

ওয়া আলাইকুমুস সালাম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহ।
আল্লাহ আপনাকে তাঁর হেফাজতে রাখুন। আপনার সবর আর জ্ঞানের পরিধি আরও বাড়িয়ে দিন। আপনার চিঠির জবাবে আমি মন খুলে কিছু কথা বলতে চাই। যাতে দ্বীন বোঝার ক্ষেত্রে মনের ভেতর কোনো ধোঁয়াশা না থাকে। সত্য তালাশের পথটা একদম পরিষ্কার হয়ে যায়।
প্রথমেই একটা কথা খুব ভালো করে বুঝে নিন। শেখার জন্য বা বোঝার জন্য কেউ যদি কোনো প্রশ্ন করে, সেটাকে খারাপ ভাবার কোনো কারণ নেই। এটা মানুষের স্বভাবজাত অধিকার। প্রশ্ন করা মানেই যে আপনি রেগে গেছেন বা বিরোধিতা করছেন, ব্যাপারটা মোটেও তা নয়। বরং এর মানে হলো—আপনি বিষয়গুলো নিয়ে ভাবছেন, জ্ঞানের চর্চা করছেন। তাই সহজ থাকুন। আল্লাহ আমাদের সবাইকে সত্যের পথে চলার তৌফিক দিন। আমিন।
ইসলামের শুরুর দিকের ইতিহাসের দিকে তাকালে আমরা কী দেখি? আমাদের বড় বড় আলিমেরা, ফকিহেরা—তাঁরা কিন্তু নিজেদের কোনো একটা গণ্ডির মধ্যে বা কোনো একজন লোকের ভক্তিতে আটকে রাখতেন না। তাঁরা ছিলেন মুক্ত বিহঙ্গের মতো। জ্ঞান যেখানে, তাঁরাও সেখানে।

কখনো তাঁরা ইমাম সুফিয়ান সাওরির কথা টেনে আনছেন, কখনো ইমাম মালিক বা লাইসের উদ্ধৃতি দিচ্ছেন। আবার কখনো ইমাম আবু হানিফা বা ইমাম আওজায়ির মতামতের ওপর গুরুত্ব দিচ্ছেন—তো কখনো ইমাম শাফিয়ি বা ইমাম আহমদ ইবনু হাম্বলের কথা মেনে নিচ্ছেন। আল্লাহ তাঁদের সবার ওপর রহমত বর্ষণ করুন।
মতের এই ভিন্নতাকে তাঁরা খুব স্বাভাবিকভাবে দেখতেন। তাঁরা সব পক্ষের কথা শুনতেন, বিচার-বিবেচনা করতেন। তারপর দলিল-সবুতের ভিত্তিতে যেটা সঠিক মনে হতো, সেটাই নিতেন। তাঁদের এই উদারতা আমাদের একটা বড় শিক্ষা দেয়। সেটা হলো—মতের অমিল থাকা মানেই কিন্তু বিরোধ নয়; বরং এভাবে কোনো একটা বিষয়কে গভীরভাবে বোঝার সুযোগ তৈরি হয়।

দিন যত গড়াতে লাগল, মানুষের মধ্যে দলাদলি আর রেষারেষি তত বাড়ল। তখন আর আলিমদের মেধা বা জ্ঞান দিয়ে বিচার করা হতো না। দেখা হতো—ইনি কোন দলের লোক? আমাদের দলের হলে ভালো, না হলে বাতিল। প্রত্যেক দল নিজেদের কয়েকজন বড় হুজুরকে আইকন বানিয়ে নিল। তাঁদের নাম ভাঙিয়েই দল ভারী করা শুরু হলো।

বড়দের নাম ব্যবহার করে মানুষকে নিজেদের গণ্ডিতে আটকে ফেলার এই যে প্রবণতা—এটা কি ঠিক? কুরআন-সুন্নাহ কি আমাদের এই সংকীর্ণতা শিখিয়েছে? মোটেও না। এতে না থাকে জ্ঞানের ভারসাম্য, না থাকে ইনসাফের ছিটেফোঁটা।
শুরুতে এই ব্যামোটা ছোট ছিল, পরে এটা মহামারির মতো ছড়িয়ে পড়ল। এখন অবস্থা এমন দাঁড়িয়েছে, কেউ যদি কোনো দলের লেজুড়বৃত্তি না করে নিরপেক্ষ থাকতে চায়, তাকে মানুষ সন্দেহের চোখে দেখে। ভাবে, ‘এর মনে নিশ্চয়ই কোনো মতলব আছে!’
এই জন্যই যখন আমি মাওলানা আবুল হাসান আলি নদভির নাম নিলাম, তখন কেউ কিছু বলল না। কারণ আমি তো নদভি ঘরানারই লোক। কিন্তু যেই মাওলানা মওদুদির নামটা নিলাম, অমনি সন্দেহ দানা বাঁধল। ভাবলেন, এটা আমার লেখা হতেই পারে না! অন্য কেউ হয়তো ঢুকিয়ে দিয়েছে।
বিশ্বাস করুন, শুধু আপনি না, অনেকে এমনটা ভাবেন। গতানুগতিক ধারার বাইরে নতুন কিছু দেখলে মানুষ একটু ভড়কে যায়, অস্বস্তিতে পড়ে—এটা স্বাভাবিক।
অথচ দেখুন, আধুনিক যুগেও অনেক বড় বড় আলিম আর চিন্তাবিদ জন্মেছেন। তাঁরা জীবনভর ইসলামের খেদমত করে গেছেন। তাঁদের সম্মান করা, তাঁদের কথা গুরুত্ব দিয়ে শোনা আর ভালোটুকু নেয়া আমাদের নৈতিক দায়িত্ব।

কোথাও যদি মনে হয় ভুল হয়েছে বা খটকা লাগে, তাহলে চট করে খারাপ মন্তব্য না করে ভালো কোনো ব্যাখ্যা খোঁজা উচিত। তাঁদের ভুলত্রুটি ক্ষমার জন্য আল্লাহর কাছে দোয়া করা চাই। কুরআন-সুন্নাহ আমাদের এই ইনসাফ আর উদারতাই শিক্ষা দেয়।
মাওলানা মওদুদি (রহ.)-এর ব্যাপারে আমার বিনীত কথা হলো—তাঁর চিন্তাভাবনা আর অবস্থান বুঝতে হলে সরাসরি তাঁর মূল বইপত্র পড়তে হবে। বিরোধীদের গালমন্দ বা অতিরঞ্জিত সমালোচনার চশমা দিয়ে দেখলে ভুল করবেন। তাঁর কথার গভীরতা আর পাণ্ডিত্য বুঝতে হলে তাঁর লেখাগুলো সঠিক প্রেক্ষাপটে রেখে নিজের বিচার-বুদ্ধি দিয়ে বিশ্লেষণ করতে হবে। অন্যের কানপড়া কথায় কান দিয়ে কি আর সত্য জানা যায়?

পড়া শুরু করতে পারেন তাঁর শুরুর দিকের বুনিয়াদি বইগুলো দিয়ে। যেমন—‘রিসালা দ্বিনিয়াত’, ‘খুতবাত’, ‘তানকিহাত’, ‘পর্দা’, ‘সুদ’ আর ‘দাওয়াতে ইসলামি অউর উসকে মুতালিবাত’।
এই বইগুলো পড়লে তাঁর ধর্মীয় আর চিন্তাগত দৃষ্টিভঙ্গির একটা শক্ত ভিত্তি পাবেন। তাঁর চিন্তার ক্রমবিকাশ কীভাবে হয়েছে, সেটাও পরিষ্কার হবে।
এরপর মনোযোগ দেবেন তাঁর বিখ্যাত তাফসির ‘তাফহিমুল কুরআন’-এর দিকে। এই বইটা বারবার পড়া খুব জরুরি। এতে আয়াতের অর্থ আর বুদ্ধিবৃত্তিক দিকগুলো গভীরভাবে বোঝা যায়। প্রতিটা সুরা, প্রতিটা আয়াত আর ব্যাখ্যা মনোযোগ দিয়ে খুঁটিয়ে পড়তে হবে। তা হলেই ফিকহ, আখলাক আর শিক্ষার ক্ষেত্রে তাঁর প্রখর অন্তর্দৃষ্টি আপনার কাছে স্পষ্ট হয়ে উঠবে।

শুরুর দিকের বই আর তাফসির পড়া শেষ হলে হাতে নেবেন তাঁর আরও কিছু গুরুত্বপূর্ণ বই। যেমন—‘তাজদিদ ও ইহয়ায়ে দ্বীন’ আর ‘রাসায়িল ও মাসায়িল’।
এই বইগুলো পড়লে তাঁর চিন্তার জগৎ আরও ভালো করে চিনতে পারবেন। দাওয়াতের ক্ষেত্রে তাঁর পদ্ধতি কী ছিল, সমসাময়িক নানা সমস্যা নিয়ে তিনি কী ভাবতেন—সব পরিষ্কার হয়ে যাবে। তাঁর পুরো চিন্তাধারা বুঝতে এই বইগুলো আয়নার মতো কাজ করবে। ইতিহাস, ধর্ম আর সমাজের অবস্থা তাঁর ভাবনায় কতটা প্রভাব ফেলেছিল, সেটাও তখন আর অজানা থাকবে না।
এভাবে ধাপে ধাপে যদি পড়েন, তা হলে মাওলানা মওদুদির চিন্তার সব দিক আপনার কাছে স্পষ্ট হয়ে উঠবে। তখন আর কোনো ভুল বোঝা বা বিভ্রান্তির সুযোগ থাকবে না। তাঁর ইলমি আর আমলি দিকগুলো থেকে আপনারা মন ভরে ফায়দা পেতে পারবেন।
আসল কথা হলো—কোনো আলিম বা চিন্তাবিদকে যদি সত্যিকার অর্থে চিনতে চান, তাহলে সোজা তাঁর লেখা বই পড়ুন। বিরোধীদের চশমা বা সমালোচকদের চোখ দিয়ে দেখলে কিন্তু আসল মানুষটাকে চিনতে পারবেন না। এটাই হলো পড়াশোনার আসল আদব। এতে মেধার সততা আর ইনসাফ বজায় থাকে।
কুরআন-সুন্নাহ আমাদের শিখিয়েছে—কারও ব্যাপারে সুধারণা রাখা, ন্যায়বিচার করা আর কোনো কথা শুনলে সেটা যাচাই-বাছাই করা। এই পথে চললে কেবল আমরা সত্যিকার অর্থে ইসলামের সেবা করতে পারব।

আল্লাহ আপনার জ্ঞানে বরকত দিন। আপনাকে বোঝার শক্তি আর দূরদৃষ্টি দান করুন। আমাদের সবাইকে ইনসাফের সাথে দ্বীনের খেদমত করার তৌফিক দিন। আমিন।

————–

| ক্যাটাগরি : আখলাক, ইসলামি চিন্তাধারা, তাজকিয়াহ

✍️ মূল : ড. মুহাম্মদ আকরাম নাদভী, অক্সফোর্ড।
✍️ অনুবাদ যাচাই ও সম্পাদনা: মাসুদ শরীফ
🔗 অনূদিত মূল প্রবন্ধের লিংক: 👇
https://t.me/DrAkramNadwi/8021

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *