|১৮|১২|২০২৫|
بسم الله الرحمن الرحيم.
আজ যদি কেউ হিজাবের পবিত্রতাকে চ্যালেঞ্জ করে, তবে মুহূর্তেই মুসলিম সমাজের আবেগে ঝড় ওঠে। ‘গায়রত’ এর ঢেউ আছড়ে পড়ে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে স্লোগান গর্জে ওঠে, মনে হয় যেন ইসলামের ভিত্তিই কেঁপে উঠেছে। অথচ আমরা যখন নিজেদের সমাজের তথাকথিত পবিত্র পরিবেশে নিজের বোন বা মেয়েকে নির্লজ্জতার পথে হাঁটতে দেখি, কিংবা সতীত্ব ও শালীনতার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ হতে দেখি, তখন না হৃদয়ে গায়রতের আগুন জ্বলে, না ঈমানের কোনো সাড়া জাগে। কেন এই বৈপরীত্য? এই দ্বিমুখিতা কেন?
যদি হিজাবের পবিত্রতা সত্যিই হৃদয়ে বাস করত, তবে তার মর্যাদা ঘরের দোরগোড়াতেও অটুট থাকত। বাস্তবতা হলো, আমাদের কষ্ট ঈমানের জন্য নয়, কষ্ট জাতিগত পরিচয়ের আঘাতে। আমাদের মধ্যে গায়রত নেই; আমরা কেবল গায়রতের ভঙ্গি ধারণ করি। আমরা হিজাবের রক্ষক নই; আমরা আমাদের দলীয় ও জাতিগত গৌরবের প্রহরী। এই বৈপরীত্যই আমাদের ঈমানি পতনের মূল শিকড়।
আমরা ইসলামকে ঈমান ও আমলের ভিত্তিতে গ্রহণ করিনি; বরং দল, জাতি, মাযহাব ও গোত্রের প্রতীক বানিয়ে নিয়েছি। ঈমানের প্রদীপ নিভে গেছে, কিন্তু জাতিগত উগ্রতার মশাল এখনো জ্বলছে। রাসুলুল্লাহ সা. যে জাহেলি উগ্রতাকে দুর্গন্ধময় বলে আখ্যা দিয়েছিলেন, আমরা তাকেই সুগন্ধ ভেবে সম্মানের অলংকার বানিয়ে নিয়েছি। আমরা দীনকে এমন লাঠি বানাইনি যা বাঁককে সোজা করে; বরং এমন পতাকা বানিয়েছি যা আমাদের ছবি সাজিয়ে তোলে।
সমস্যা কেবল হিজাবেই সীমাবদ্ধ নয়। কোনো নির্দিষ্ট মাযহাবি নেতার সমালোচনা হলে সভা-সমাবেশ কেঁপে ওঠে, চোখে রক্তিম রাগ ছুটে আসে, মনে হয় যেন বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের কেন্দ্রটাই নড়ে গেছে। আমরা চিৎকার করি না এ জন্য যে সত্য আহত হয়েছে; আমরা উত্তেজিত হই এ জন্য যে আমাদের দল ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ইমাম সুফিয়ান সাওরি, লায়স ইবন সাদ ও আওজাঈ, এমন মহান ব্যক্তিত্বদের নাম আমাদের হৃদয়ের জন্য আজ অপরিচিত। আজকের মুসলমান নিজের মাদরাসার পরিচয় মুখস্থ জানে, কিন্তু সাহাবি ও উম্মাহর ইমামদের নাম উচ্চারণ করতেও ভুলে যায়। এটা দীনের ভালোবাসা নয়; এটা মাযহাবি পক্ষপাত। এটা ঈমানের গায়রত নয়; এটা গোত্রের পাহারা। এটা সচেতনতা নয়; এটা ব্যক্তিপূজা।
আমরা পাগড়ি, জুব্বা আর বাহ্যিক বেশভূষার বন্দি, আর মনে করি, এটাই ইসলামের আত্মা। আমরা আকৃতিতে সুন্নাহ খুঁজি, চরিত্রে নয়। পাগড়ির ভাঁজে ভ্রু কুঁচকাই, কিন্তু ঈমানের ভাঙনে নীরব থাকি। বিবর্তনবাদ, নাস্তিকতা, ধর্মনিরপেক্ষতা ও বস্তুবাদ যখন আমাদের সন্তানদের আত্মায় ঢুকে পড়ে, তাদের হৃদয় থেকে আল্লাহর নূর নিভিয়ে দেয়, আখিরাতের বিশ্বাসকে টলিয়ে দেয়, তখন আমরা নির্বিকার থাকি। আমরা দীনকে চিহ্ন-প্রতীক বানিয়েছি, পথনির্দেশ ও জীবনব্যবস্থা নয়; শরিয়তকে পোশাক ভেবেছি, জীবন নয়; ধর্মকে উৎসব ভেবেছি, সংগ্রাম নয়।
আমাদের জাতি নিজের ভাষা, নিজের নায়ক, নিজের ইতিহাস ও জাতীয়তার গানে গর্ব করে; কিন্তু কুরআনের অর্থ আমাদের কাছে অপরিচিত, সীরাতে মুস্তফা সা. সম্পর্কে অজ্ঞতা প্রকট, আর উম্মাহর ইতিহাস নতুন প্রজন্মের কাছে অতীতের ধুলো। আমরা জাতীয় সঙ্গীতে কেঁদে ফেলি, কিন্তু উম্মাহর আর্তনাদে হৃদয় পাথর হয়ে থাকে।
মসজিদগুলো ঝাড়বাতিতে ঝলমল করে, কিন্তু হৃদয় ডুবে থাকে অন্ধকারে। মিম্বরে বক্তৃতার গর্জন, কিন্তু চরিত্রে মৃত্যুনীরবতা। সমাবেশে স্লোগান, কিন্তু আমলে শূন্যতা। ইবাদত হয়ে গেছে রীতি, শরিয়ত কেবল স্লোগান। আমরা কুরআনকে তাজবিদ ও সুর ভেবেছি, হিদায়াত ও নূর নয়; আজানকে কণ্ঠস্বর ভেবেছি, বার্তা নয়; নামাজকে গতিবিধি ভেবেছি, খুশু নয়; রোজাকে ক্ষুধা ভেবেছি, তাকওয়া নয়।
আমরা ঈমানকে উত্তরাধিকার ভেবে বসেছি, অর্জিত সত্য নয়। ইসলামকে পতাকা বানিয়েছি, জীবনসংবিধান নয়। ধর্মকে গর্বের অলংকার বানিয়েছি, চরিত্র নির্মাণের উপায় নয়। আমরা দীনকে পরিচয় বানাই, কিন্তু সর্বস্ব বানাই না।
এসবই প্রমাণ করে, ইসলামের সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক সচেতন নয়, পরিচয়ভিত্তিক; আত্মিক নয়, জাতিগত; নৈতিক নয়, আবেগী; ঈমানি নয়, প্রদর্শনমূলক; সর্বোপরি- জীবন্ত নয়, মৃত।
মনে রেখো: যখন ধর্ম স্লোগানে পরিণত হয়, তখন ঈমান বিদায় নেয়; ঈমান বিদায় নিলে জাতির ইতিহাস কবরস্থানে রূপ নেয়; আর ইতিহাস কবরস্থান হলে ভবিষ্যৎ হয়ে ওঠে শূন্য ও বিরান।
যতদিন আমরা ইসলামকে আত্মতৃপ্তির উপকরণ না ভেবে রবের সন্তুষ্টির পথ হিসেবে গ্রহণ না করব; পরিচয়ের বদলে কর্মবিধান হিসেবে না নেব; স্লোগানের চেয়ে আমলকে অগ্রাধিকার না দেব, ততদিন আমাদের মসজিদ নির্মিত হবে, কিন্তু ঈমানের ভিত্তি ধসে পড়তেই থাকবে।
আর সে দিন পর্যন্ত, আমরা মুসলমান তো থাকব, কিন্তু ইসলাম টিকে থাকবে না।
————-
ক্যাটাগরি : তাজকিয়াহ, ইসলামি চিন্তাধারা, উপদেশ, সমালোচনা।
✍️ মূল : ড. মুহাম্মদ আকরাম নাদভী, অক্সফোর্ড।
✍️ অনুবাদ যাচাই ও সম্পাদনা: মাওলানা মারজান আহমদ, সিলেট, বাংলাদেশ।
🔗 অনূদিত মূল প্রবন্ধের লিংক: 👇
https://t.me/DrAkramNadwi/7952