AkramNadwi

এই দৃশ্য আমরা খেলাধুলার মাঠেও দেখি। কখনো পাকিস্তান

এই দৃশ্য আমরা খেলাধুলার মাঠেও দেখি। কখনো পাকিস্তান জেতে, কখনো ভারত। কিন্তু কেউই মনে করে না যে পাকিস্তানের জয় মানে ইসলাম সত্য, কিংবা ভারতের জয় মানে ইসলাম মিথ্যা। ইসলামের সত্যতা ও ন্যায়নিষ্ঠতা প্রতিষ্ঠিত হয় তার স্বভাবগত ও যুক্তিনির্ভর প্রমাণের মাধ্যমে। এই প্রমাণগুলো স্থায়ী, অবিচল এবং কোনো বিতার্কিকের জয়-পরাজয়ে প্রভাবিত হয় না। অতএব বিতর্কের সাফল্যকে দীনের সত্যতার মাপকাঠি বানানো নিছকই এক বুদ্ধিবৃত্তিক বিভ্রম।

💠 তৃতীয় প্রশ্নের উত্তর :

আপনার বক্তব্য হলো, বিতর্কে জয়লাভ কোনো পক্ষের সত্যের ওপর প্রতিষ্ঠিত হওয়ার প্রমাণ নয়। এই প্রেক্ষাপটে প্রশ্ন ওঠে, তবে এই বিশেষ বিতর্কে ইতিবাচক পক্ষের সাফল্যের প্রকৃত কারণ কী ছিল।

প্রথমেই একটি বিষয় স্পষ্ট করা জরুরি, বিতর্ক জেতা নিজেই একটি শিল্প। এই শিল্প কেবল তারই আয়ত্তে থাকে, যে নিয়মিতভাবে এর অনুশীলন করে এবং কৌশলগতভাবে একে ব্যবহার করতে জানে। সাধারণত যে ব্যক্তি বিতর্কের রীতি, কৌশল ও মনস্তত্ত্ব বোঝে এবং সে অনুযায়ী নিজের বক্তব্য উপস্থাপন করে, সে-ই বিজয়ী হয়।

এই জয়ের কয়েকটি প্রধান কারণ ছিল :

প্রথমত, জ্ঞান ও বুদ্ধিবৃত্তিক শ্রেষ্ঠত্ব। বিজয়ী বিতার্কিক তার জ্ঞান ও যুক্তির শক্তিতে প্রতিপক্ষের তাত্ত্বিক দুর্বলতা ও সীমাবদ্ধতা স্পষ্ট করে তুলতে সক্ষম হয়েছিলেন। এর ফলে শ্রোতাদের মনে এই ধারণা গড়ে ওঠে যে ইতিবাচক পক্ষের অবস্থান অধিক গ্রহণযোগ্য, সুসংহত ও যুক্তিসঙ্গত।

দ্বিতীয়ত, মর্যাদা, সংযম ও আত্মবিশ্বাস। বিতর্ক চলাকালে ইতিবাচক পক্ষ ক্রোধ এড়িয়ে ধৈর্য ও স্থিরতার পরিচয় দিয়েছে। এই আচরণ শ্রোতাদের ওপর গভীর প্রভাব ফেলেছে। তারা অনুভব করেছে, এই আত্মবিশ্বাস ফাঁপা নয়; বরং তা এসেছে সুদৃঢ়, স্পষ্ট ও বিশ্বাসযোগ্য যুক্তি থেকে।

তৃতীয়ত, ইতিবাচক দাবির মনস্তাত্ত্বিক প্রাধান্য। সাধারণ নিয়ম হলো, যখন এক পক্ষ কোনো বিষয়ের অস্তিত্ব বা সত্যতার পক্ষে দাঁড়ায় আর অন্য পক্ষ তা অস্বীকার করে, এবং উভয়ের যোগ্যতা প্রায় সমান হয়, তখন অধিকাংশ ক্ষেত্রে ইতিবাচক পক্ষই এগিয়ে থাকে।

উদাহরণস্বরূপ, কেউ যদি বলে, সোমনাথ মন্দিরে গেলে বরকত লাভ হয়, আর অন্যজন যদি তা অস্বীকার করে, তবে যে ব্যক্তি বরকতের অস্তিত্ব প্রমাণ করতে সক্ষম হয়, সাধারণত তাকেই সফল মনে করা হয়। তেমনি কেউ যদি বলে, আজমীর শরিফে গেলে সন্তান লাভ হয়, আর অন্যজন যদি তা প্রত্যাখ্যান করে, তবে শ্রোতাদের চোখে প্রমাণ উপস্থাপনকারীই প্রাধান্য পায়। অস্বীকারকারীর সম্পর্কে তখন এই ধারণা জন্মায় যে সে হয়তো দাবিটির বাস্তবতা সম্পর্কে পূর্ণ অবগত নয়।

এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ জ্ঞানতাত্ত্বিক নীতি কাজ করে, অজ্ঞতা কখনোই অস্তিত্বের অনুপস্থিতির প্রমাণ নয়। যেমন কোনো অন্ধ ব্যক্তি যদি কোনো দৃশ্য দেখতে না পায়, তার মানে এই নয় যে দৃশ্যটি আদৌ নেই। ঠিক তেমনি, প্রতিপক্ষের অস্বীকার বা অজ্ঞানতা ইতিবাচক পক্ষের দাবিকে ক্ষুণ্ন করে না।

💠 চতুর্থ প্রশ্নের উত্তর :

আপনি বলেছেন, বিতর্ক নিজেই স্বভাবগতভাবে অকল্যাণকর ও ক্ষতিকর একটি কার্যক্রম। প্রশ্ন হলো, আপনি কি এখনো সেই মতেই অটল আছেন।

আমার অবস্থান সম্পূর্ণ স্পষ্ট ও সুদৃঢ়, এবং আমি এখনো সেই মতেই অবিচল আছি। এই মত কোনো আবেগতাড়িত প্রতিক্রিয়া নয়; বরং অভিজ্ঞতা ও গভীর চিন্তার ওপর প্রতিষ্ঠিত। দাওয়াতি দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে, এই বিতর্ক বাস্তবিকই ক্ষতিকর প্রমাণিত হয়েছে। এর ফলে নাস্তিকদের মনে এমন একটি ধারণা জন্মেছে যে আলেমসমাজ কম জ্ঞানসম্পন্ন, শিষ্টাচারহীন ও অসংগঠিত। এই চিত্র তাদের বুদ্ধিবৃত্তিক ও নৈতিক দারিদ্র্যকেই উন্মোচিত করে।

এই বিতর্কের তথাকথিত সাফল্য উপলক্ষে যে উচ্ছ্বাস ও উদযাপন দেখা গেছে, তা নাস্তিকদের কাছে টানার বদলে বরং তাদের সঙ্গে মানসিক ও চিন্তাগত দূরত্ব আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। দাওয়াতের প্রকৃত সাফল্য কখনোই বিতর্ক জেতার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; আসল সাফল্য হলো মানুষের হৃদয় জয় করা। অনেক সময় এই লক্ষ্য অর্জনের জন্য কিছু লড়াইয়ে পরাজয় বরণ করাই অধিক শ্রেয় ও অপরিহার্য হয়ে ওঠে, যাতে ভবিষ্যতে প্রভাব আরও গভীর ও স্থায়ী হয়।

বর্তমানে তরুণদের মধ্যে এক ধরনের উত্তেজনা ও আবেগ প্রবল হয়ে উঠেছে, যা অনেক সময় প্রায় নেশার মতো অনুভূত হয়। মুসলমান সমাজে এমন এক মানসিকতা কাজ করে যে, খেলাধুলা কিংবা কোনো বিতর্কে বাহ্যিকভাবে জয়ী হলেই তারা এমন উল্লাসে মেতে ওঠে, যেন কোনো দেশ জয় করে ফেলা হয়েছে। এই উন্মত্ততা ও উচ্ছ্বাসের আবহে যুক্তি, জ্ঞান কিংবা সংযত বোধের কথা আর শোনা যায় না।

এই মোহ ও মাতাল ভাব যখন কাটবে, তখনই বাস্তববাদী দৃষ্টিতে আলোচনা ও ব্যাখ্যা সম্ভব হবে। তখন তরুণদের মনে প্রকৃত উপলব্ধি জন্ম নেবে এবং একটি সঠিক, সুস্থ ও ভারসাম্যপূর্ণ চিন্তাধারা গড়ে উঠবে।

———-

ক্যাটাগরি : ইসলামি চিন্তাধারা, দর্শন, নাসিহাহ, বাইনাল আদয়ান, সমালোচনা।

শেয়ার করুন:

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *