AkramNadwi

শিরোনাম : শুরু করো, যেখান থেকে তিনি (সা.)শুরু করেছিলেন।

শিরোনাম : শুরু করো, যেখান থেকে তিনি (সা.)শুরু করেছিলেন।
بسم الله الرحمن الرحيم. নবী মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যখন আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে মানবজাতির প্রতি প্রেরিত হলেন, তখন তিনি তাঁর সমাজের প্রচলিত সব রীতি, অভ্যাস ও কুসংস্কারের সঙ্গে সম্পূর্ণ সম্পর্ক ছিন্ন করলেন। তাঁর চিন্তা ও কর্মজীবনের ভিত্তি স্থাপন করলেন আসমানি ওহির উপর। যা তাঁর প্রতি অবতীর্ণ হয়েছিল, যা পূর্ববর্তী নবীদের ওহি থেকে তিনি জেনেছিলেন এবং যা তিনি এই দুইয়ের আলোকে নিজে বিবেচনা করে গ্রহণ করেছিলেন। অবশেষে আল্লাহ তাআলা তাঁর জন্য দ্বীনকে পূর্ণ করলেন, নিয়ামত সম্পূর্ণ করলেন। এরপর তিনি তাঁর প্রতিপালকের সান্নিধ্যে চলে গেলেন, রেখে গেলেন এমন এক উজ্জ্বল ও স্বচ্ছ পথ, যার উপর অটল ও অবিচল থাকলে কোনো দিন বিভ্রান্তি আসে না। তিনি স্পষ্ট করে আলাদা করে দিলেন সোজা পথকে বক্র পথ থেকে, হেদায়েতকে গোমরাহি থেকে, তাঁর সুন্নতকে জাহেলিয়াতের পথ ও রীতিনীতি থেকে। তিনি ঘোষণা করলেন যে তাঁর শরিয়ত পূর্ববর্তী সব আসমানি বিধান এবং মানবসৃষ্ট সব ব্যবস্থা ও কাঠামোকে রহিত করেছে। তিনি জানিয়ে দিলেন যে আল্লাহ এই উম্মতের জন্য ইসলামকেই একমাত্র মনোনীত দ্বীন হিসেবে পছন্দ করেছেন এবং যে কেউ ইসলাম ছাড়া অন্য কোনো দ্বীন গ্রহণ করতে চাইবে, তা তার কাছ থেকে কখনোই গ্রহণ করা হবে না। পরকালে সে হবে নিঃসন্দেহে ক্ষতিগ্রস্তদের অন্তর্ভুক্ত। আল্লাহ তাআলা তাঁর জন্য এমন সাহাবিদের নির্বাচন করেছিলেন, যারা তাঁর আদর্শকে আপন করে নিয়েছিলেন, তাঁর পদাঙ্ক অনুসরণ করেছিলেন, দ্বীনের ভেতর নতুন কিছু সংযোজন করেননি, তাঁর শিক্ষা ও পদ্ধতির বাইরে কিছু আবিষ্কার করেননি। তারা নিজেদেরকে বিচ্ছিন্ন করে নিয়েছিলেন প্রবৃত্তির দাসত্ব, জাহেলি রসম-রেওয়াজ এবং গোত্রীয় সংকীর্ণতা থেকে। এসব তারা পরিত্যাগ করেছিলেন নোংরা ও দুর্গন্ধময় আবর্জনার মতো। অতীতে তারা আশ্রয় নিতেন গণক, পুরোহিত, গোত্রপ্রধান ও সমাজের প্রভাবশালীদের কাছে। কিন্তু ইসলাম গ্রহণের পর তারা নির্ভর করলেন আল্লাহর কিতাবের উপর। যে বিষয়ে অস্পষ্টতা হতো, তাতে তারা সরাসরি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে জিজ্ঞাসা করতেন। তারা গভীরভাবে উপলব্ধি করেছিলেন নতুন জীবনব্যবস্থা ও পুরোনো জাহেলি জীবনের মধ্যে বিস্তর ব্যবধান। ইমাম বুখারি আনাস রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণনা করেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, তোমরা তোমাদের ভাইকে সাহায্য করো, সে জালিম হোক বা মজলুম। এই কথাটি তারা জাহেলিয়াতের যুগেও বলত এবং এর অর্থ তাদের মনে গভীরভাবে গেঁথে ছিল। কিন্তু ইসলাম গ্রহণের পর তারা সেই পুরোনো অর্থ পরিত্যাগ করল। এক ব্যক্তি জিজ্ঞেস করল, হে আল্লাহর রাসূল, মজলুম হলে তো আমি তাকে সাহায্য করব, কিন্তু সে যদি জালিম হয়, তখন আমি তাকে কীভাবে সাহায্য করব। তিনি বললেন, তাকে জুলুম থেকে বিরত রাখা, তাকে থামিয়ে দেওয়া। এটিই তার প্রকৃত সাহায্য। এইভাবেই সাহাবায়ে কেরাম শুরু করেছিলেন, যেভাবে শুরু করেছিলেন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম। তাঁদের পরবর্তী কল্যাণময় যুগগুলোও একই পথে চলেছিল। এরপর এমন একদল মানুষের আবির্ভাব হলো, যারা এই মৌলিক ভিত্তি থেকে বিচ্যুত হয়ে গেল। তারা জাহেলিয়াতের নানা রূপ ও রঙ থেকে মানসিকভাবে হিজরত করল না। বরং সেগুলোকে আসমানি শিক্ষার সঙ্গে মিশিয়ে দিল। অথচ আল্লাহর দ্বীন শিরক ও মিশ্রণ গ্রহণ করে না। তারা দ্বীনকে ভরে দিল বিদআত ও নতুন উদ্ভাবনে এবং তাকে ভয়াবহভাবে বিকৃত করল। তারা আল্লাহকে নাম দিল ‘ওয়াজিবুল উজুদ’, এমন এক নাম যার পক্ষে আল্লাহ কোনো প্রমাণ নাজিল করেননি। এই নাম মেনে নেওয়ার পর তারা তার অনিবার্য পরিণতিগুলোকেও মেনে নিল। তারা নয়টি আসমানের কথা বলল। কুরআনে বর্ণিত সাত আসমানের সঙ্গে এর সংঘর্ষ হলে তারা সংখ্যাটি পূর্ণ করতে আরশ ও কুরসিকে যুক্ত করল। তারা কুরআন সৃষ্ট বলে বিশ্বাস করল, জবরবাদে লিপ্ত হলো, তাকদির অস্বীকার করল কিংবা কাসব ও কদরের মধ্যে কৃত্রিম বিভাজন তৈরি করল। তারা সাধারণ মুসলমানদের উপর নির্ভুল নন এমন মানুষের অন্ধ অনুকরণ বাধ্যতামূলক করল। সত্যকে সীমাবদ্ধ করে ফেলল মানবীয় ইজতিহাদ, ফিকহি মাজহাব, কালামি মতবাদ ও সুফি তরিকার ভেতর। আমাদের এই যুগেও এমন চিন্তাবিদ দেখা দিয়েছে, যারা ইসলামের মধ্যে এমন সব কুসংস্কার ও ভ্রান্ত ধারণা ঢুকিয়েছে, যার কোনো উৎস কুরআন ও সুন্নাহ নয়। বরং সেগুলো কুরআন ও সুন্নাহর সঙ্গে সামগ্রিক ও আংশিক উভয় দিক থেকেই বিরোধপূর্ণ। যেমন বিবর্তনবাদ, সমাজতন্ত্র, সাম্যবাদ, পুঁজিবাদ, গণতন্ত্র, ধর্মনিরপেক্ষতা এবং নতুন রাজনৈতিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিক মতবাদসমূহ। এই সব বিচ্যুত রচনা ও ভ্রান্ত মতবাদের মূল কারণ একটাই। তারা সেখান থেকে শুরু করেনি, যেখান থেকে শুরু করেছিলেন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম। বরং তারা শুরু করেছে গ্রিক, ভারতীয় ও রোমান দর্শন থেকে, কিংবা ইহুদি, খ্রিস্টান, বৌদ্ধ ও ব্রাহ্মণ্য ধর্মীয় বিকৃতি থেকে, অথবা প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের ভিনদেশি চিন্তা ও তত্ত্ব থেকে। তারপর সেগুলোকে ইসলামী পরিভাষায় সাজিয়ে নতুন মোড়কে মুসলমানদের মন ও সমাজে জোরপূর্বক ঢুকিয়ে দিয়েছে। ইমাম ইবন তাইমিয়্যা রহমাহুল্লাহ বলেন, বিদআতপন্থীরা অন্তরে ও বাস্তবে রাসূলের কাছ থেকে প্রাপ্ত শিক্ষার উপর নির্ভর করে না। তারা নির্ভর করে যা তারা নিজেরা দেখেছে ও অনুভব করেছে তার উপর। যদি সুন্নাহ তাদের অভিজ্ঞতার সঙ্গে মিলে যায়, ভালো। আর যদি না মিলে, তারা কোনো পরোয়া করে না। বরং সুন্নাহ তাদের মতের বিরুদ্ধে গেলে তারা তা উপেক্ষা করে, কিংবা ব্যাখ্যার নামে বিকৃত করে। অতএব পুরোনো ও নতুন সব জাহেলিয়াত থেকে সম্পূর্ণভাবে হিজরত করো। যেখান থেকে শুরু করেছিলেন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম, সেখান থেকেই আবার শুরু করো। ইমাম শাফেয়ি তাঁর রিসালায় বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের পরে আল্লাহ কাউকে এই অধিকার দেননি যে সে পূর্ববর্তী জ্ঞানের ভিত্তি ছাড়া কিছু বলবে। জ্ঞানের উৎস হলো কুরআন, সুন্নাহ, ইজমা, সাহাবি ও তাবেয়িদের آثار (আসার) এবং এগুলোর আলোকে কিয়াস। আর ইবনুল মাজিশুন বলেন, আমি মালিক ইবন আনাসকে বলতে শুনেছি, যে ব্যক্তি ইসলামে কোনো বিদআত উদ্ভাবন করে এবং তাকে ভালো মনে করে, সে মূলত এই দাবি করে যে মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম রিসালাতের দায়িত্বে খিয়ানত করেছেন। কারণ আল্লাহ বলেছেন, আজ আমি তোমাদের জন্য তোমাদের দ্বীন পূর্ণ করে দিয়েছি। সুতরাং সে দিনের দ্বীন যা ছিল না, আজও তা দ্বীন হতে পারে না। ইমাম ইবনু হাযম রাহিমাহুল্লাহ আল-ইহকাম (খণ্ড ১, পৃষ্ঠা ১৩–১৪)-এ বলেন: এই আয়াতের দ্বারা নিশ্চিতভাবে প্রমাণিত হলো যে, দ্বীন সম্পূর্ণরূপে কেবল আল্লাহ তাআলার কাছ থেকেই গ্রহণযোগ্য। এরপর তা আমাদের কাছে পৌঁছায় রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের জবানিতে। তিনিই আমাদের কাছে আমাদের প্রতিপালকের আদেশ, নিষেধ ও অনুমতির বার্তা পৌঁছে দেন। আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে তাঁর ছাড়া আর কেউ আমাদের কাছে কিছু পৌঁছানোর অধিকার রাখে না। আর তিনি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নিজ ইচ্ছায় কিছু বলেন না; তিনি যা বলেন, তা তাঁর প্রতিপালকের পক্ষ থেকেই বলেন। এরপর আমাদের মধ্য থেকে দায়িত্বপ্রাপ্তদের জবানিতে সেই দ্বীন প্রজন্মের পর প্রজন্ম আমাদের কাছে পৌঁছে। তারাই রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আল্লাহ তাআলার কাছ থেকে যা নিয়ে এসেছেন, তা ধারাবাহিকভাবে আমাদের কাছে পৌঁছে দেন। তাদের জন্যও নিজেদের পক্ষ থেকে কিছু বলার কোনো সুযোগ নেই। তারা যা বলেন, তা কেবল নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সূত্রেই। এটাই সত্য দ্বীনের স্বরূপ। এর বাইরে যা কিছু আছে, সবই বাতিল এবং দ্বীনের অন্তর্ভুক্ত নয়। কারণ যা আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে নয়, তা আদৌ আল্লাহর দ্বীন নয়। আর যা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম স্পষ্ট করে ব্যাখ্যা করে দেননি, তা দ্বীনের অন্তর্ভুক্ত নয়। এবং যা আমাদের মধ্যকার দায়িত্বপ্রাপ্তরা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সূত্রে আমাদের কাছে পৌঁছাননি, তাও দ্বীনের অন্তর্ভুক্ত নয়। ———- | ক্যাটাগরি : তাজকিয়াহ, হাদিস , ইসলামি চিন্তাধারা, কোরআন, সমালোচনা। ✍️ মূল : ড. মুহাম্মদ আকরাম নাদভী, অক্সফোর্ড। ✍️ অনুবাদ যাচাই ও সম্পাদনা: মাওলানা মারজান আহমদ, সিলেট, বাংলাদেশ। 🔗 অনূদিত মূল প্রবন্ধের লিংক: 👇 https://t.me/DrAkramNadwi/2387
শেয়ার করুন:

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *