AkramNadwi

শিরোনাম : যে ওষুধে ভূমিকম্প থেমে যায়!

শিরোনাম : যে ওষুধে ভূমিকম্প থেমে যায়!

بسم الله الرحمن الرحيم.

একবার ইতালিতে ভয়ঙ্কর এক ভূমিকম্প হয়েছিল। ব্যাপক ধ্বংসে হাজারো মানুষের মৃত্যু হলো, অগণিত ভবন মাটির সঙ্গে মিশে গেল, রাস্তা ভেঙেচুরে ধ্বংসস্তূপে পরিণত হলো, গাছ উপড়ে গেল, অর্থনীতি বিপর্যস্ত হয়ে পড়ল। পুরো দেশ আতঙ্কে কাঁপছিল; চারদিকে ছড়িয়ে পড়েছিল নিস্তারহীন ভয়ের ছায়া।
এই দুর্যোগকে সুযোগ বানিয়ে এক ব্যক্তি গলি-গলি “ভূমিকম্প রোধী ওষুধ” বিক্রি শুরু করল। লোকেরা জিজ্ঞেস করল, এই ওষুধে কীভাবে ভূমিকম্প থেমে যাবে?
সে জবাব দিল “এর বাইরে আর উপায় কী আছে?”
“হে হতাশার ভিড়, থাকো আনন্দে, বেঁচে থাকো!”

শৈশব থেকেই আমরা জুহার প্রজ্ঞার ভক্ত। তাঁর প্রকৃত নাম খাজা নসিরুদ্দিন, মধ্য এশিয়ায় তিনি এ নামেই পরিচিত। জুহার গল্প আমরা শুনেছি, পড়েছি, অন্যদেরও বলেছি। লুকমান হাকিম ও আসিফ হাকিমের পর জুহাই সেই অনন্য জ্ঞানী, যার সূক্ষ্ম বুদ্ধির বহু রসিকতা ও অন্তর্ভেদী কথা যুগ যুগ ধরে মানুষকে উপকৃত করেছে। পূর্ব ও পশ্চিম দু’দিকেই তাঁর সমান সমাদর। ভারতে শায়খ চিল্লি তাঁরই ধারা–বাহক হিসেবে বিখ্যাত হয়ে গেছেন।

শায়খ চিল্লির কোনো উত্তসূরি আজও জন্মায়নি; তবে তাঁর অনুসারী পাওয়া যায় মোড়ের পর মোড়, গলির পর গলিতে। জুহা ও শায়খ চিল্লির কাছে যখন কোনো সমস্যা আসত, তাঁরা সেটি নিয়ে চিন্তা করতেন এবং প্রকৃত সমাধান খুঁজে বের করতেন। সমস্যার উপযুক্ত চিকিৎসা যা-ই হতো, তাই বলতেন; তাঁদের জবাব হতো সবসময় নতুন, পুরোনো কোনো জবাবের অনুকরণ তাঁরা করতেন না। এই স্বাধীন, গবেষণাভিত্তিক মননের কারণেই তাঁদের রসিকতা ও প্রজ্ঞা অগণিত; আর পরবর্তী সব মানব প্রজন্মই সেগুলো থেকে শিক্ষা নিয়ে চলেছে।

গবেষণা এদেশ থেকে বিদায় নিয়েছে। অনুকরণের লোহার নখর এখানে চিন্তাকে চেপে ধরেছে। ফলত শায়খ চিল্লিকে ‘সকলের উপরে সবার ইমাম’ বানানো হয়েছে, আর তাঁর নাম বহন করাকে সম্মানের প্রতীক ভাবা হচ্ছে। বহুদিন ধরে এই বন্ধ্যা চিন্তার দেশটি শায়খের অনুসারীদের অভিভাবকত্বেই দিন কাটাচ্ছে। এ অনুসারীরা প্রতিটি সমস্যার সমাধান দিতেই প্রস্তুত; কিন্তু তারা চিন্তা করে না, তাই প্রতিটি সময় তারা একই জবাবই পুনরাবৃত্তি করে।
এসব অনুসারীকে চলতি কথায় “লাল বুজাক্কড়” বলা হয়, তারা যতই মাটিতে হাঁটে, পা পড়ে যেন আকাশেই!

এই লাল বুজাক্কড়দের নানা ধরন আছে, কেউ ঝাড়ফুঁক করে, কেউ তাবিজ লেখে, কেউ আবার ‘দক্ষ’ হয়ে নানা ওজিফা বাতলে দেয়। আপনি অসুস্থ? বিয়ে করতে চান? সন্তান হচ্ছে না? ঋণে জর্জরিত? ব্যবসায় সমস্যা? চাকরি মিলছে না? আপনার ছেলে-মেয়ের পরীক্ষায় ফেল করার ভয়? ব্যক্তিগত বা পারিবারিক কোনো জটিলতা?
যেই হোক, এসব লাল বুজাক্কড়ের কাছে গেলে তারা আপনাকে তাবিজ দেবে বা কোনো না কোনো ওজিফা শিখিয়ে দেবে, তারা কখনোই বলবে না: “এই সমস্যার কোনো সমাধান আমাদের কাছে নেই।”

তাদের অবিকল সেই দিল্লির দোকানদারের মতো অবস্থা, যার দাবি ছিল, তার দোকানে সবই পাওয়া যায়। কারও পক্ষে খালি হাতে ফেরত যাওয়া নাকি অসম্ভব!
একবার এক শিখ সাহেব দোকানে গিয়ে পুরো দোকান ঘুরে হতাশ হয়ে বের হয়ে আসছিলেন। দোকানদার ডেকে বলল, “সর্দারজি, কী হলো? ফিরছেন কেন?”
তিনি বললেন, “আমি যে জিনিসের খোঁজে এসেছিলাম, তা তোমার দোকানে নেই।”
দোকানদার জিজ্ঞেস করল, “কী চাই আপনার ?”
সর্দারজি বললেন, “গুরু নানকের খুলি চাই।”
দোকানদার তৎক্ষণাৎ একটি খুলি এনে দিল।
সর্দারজি খুলিটি দেখে বললেন, “এটা গুরু নানকের খুলি হতে পারে না, এটা খুব ছোট, তাঁর মাথা বড় ছিল।”
দোকানদার উত্তর দিল, “এটা তাঁর শৈশবের খুলি!”

কয়েক দিন ধরে এই লাল বুজাক্কড়রা সাম্প্রদায়িক ও জাতীয় সমস্যাও ‘সমাধান’ করতে শুরু করেছে। কোথাও দাঙ্গা হলে সঙ্গে সঙ্গে তারা ওজিফা বাতলে দেয়। কোনো মসজিদ ভেঙে গেলে, কোনো নেতাকে গ্রেপ্তার করা হলে, কোনো প্রতিষ্ঠান বন্ধ হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিলে, তারা কোনো প্রশ্ন ছাড়াই নতুন ওজিফা ঘোষণা করে বসে।
সঙ্গে আবার জোরও দেয়, এ ওজিফা দ্রুত ছড়িয়ে দিতে হবে!
কারও কাছে নাকি ওজিফা ‘ইলহাম’ হয়ে আসে, কারও কাছে তা স্বপ্নে শেখানো হয়। তাঁদের নামে নানা ‘কারামত’ও প্রচলিত:

“খোদা যখন কাউকে পীর বানায়, কেরামত আপনাতেই আসে।”

যখন তাঁদের কেউ জিজ্ঞেস করে, এই ওজিফায় দাঙ্গা কীভাবে থেমে যাবে? জাতীয় সংকটই বা কীভাবে সমাধান হবে?
তারা জবাব দেয়, ‘যখন আর কোনো উপায় নেই, তখন এটাকে গ্রহণ করতে ক্ষতি কী? মরুভূমির কবরের প্রদীপ, জ্বলতেও পারে, আবার নাও জ্বলতে পারে।’

অদ্ভুত ব্যাপার হলো, এত বছরের পরেও এসব ওজিফার কোনো বাস্তব প্রভাবের চিহ্ন কোথাও দেখা যায়নি।

“মধু-চিনির চেয়ে মিষ্টি তোমার ভাবনা,
তবু আমি তিক্ত কাজ করি, এও এক বিস্ময়!

যখন এই “ওজিফা ব্যবসায়ীদের” সমালোচনা করা হয়, তখন তাঁদের সমর্থকেরা সঙ্গে সঙ্গে পাল্টা অভিযোগ তোলে-
“হে কলঙ্কিত মুখ! তুমি তো এটুকুও করতে পারোনি!”

তারপর কিছুটা সামলে উঠে গবেষণার মোড়কে যে উত্তরটি দেয়, তা হলো-
“কিছু না কিছু তো হবেই, এতে ভয় কী?
এই সব ওজিফায় তো আল্লাহর নাম আছে। আল্লাহ কি সব সমস্যার সমাধানে সক্ষম নন?
তারপর সাধারণ মানুষ কিছুটা সময় আল্লাহর জিকিরে কাটালে তাতেও তো ভালোই হয়।
এখন এই উত্তরের বিরোধিতা করার সাহস রাখে কোন কাফের?”

তাদের এই জবাব শুনে জুহার একটি ‘ফতোয়া’ মনে পড়ে যায়।
এক ব্যক্তি তাঁকে জিজ্ঞেস করেছিল,
“আমি রমজানে হজ করতে চাই; কীভাবে করব?”
জুহা বলেছিল,
“রমজানের সাতাশ তারিখে আরাফাতে গিয়ে দাঁড়িয়ে এসো, হজ হয়ে যাবে।”
লোকেরা বলল,
“হজ তো হজের মাসগুলোতেই হয়, আর আরাফার দিন হলো যিলহজ্জের নয় তারিখ!”
জুহা উত্তর দিল,
“তার মানে তোমরা লাইলাতুল কদরের মাহাত্ম্য অস্বীকার করছো?”

এ দেশে এখন এমন ‘কারামত তৈরি করা’ মুফতিদের ভিড় লেগে গেছে। যেন প্রত্যেকেই নিজেরেকে জাতির একমাত্র সৌভাগ্যতারকা মনে করে। তাদের বিচারে, ইমাম রুকুতে থাকলেও মুকতাদি নিশ্চিন্তে সিজদায় যেতে পারে; কেননা সিজদাও ইবাদত, বরং রুকুর চেয়ে আরও ‘উচ্চ’ ইবাদত!

“এ কোন দুঃসাহসী লিখে রাখল মসজিদের মেহরাবে,
‘বোকা লোকেরা পড়ে গেল সিজদায়, যখন দাঁড়ানোর সময় ছিল!’

মুসলমানরা তাই খুশি হওয়া উচিত, যে তাদের ধর্ম এখন কত সহজ হয়ে গেছে!
এখন আর প্রয়োজন নেই জিহাদের, নেই রোজার, নেই যাকাতের, নেই বিয়ে-শাদির, প্রয়োজন নেই কোনো আমলেরও,
প্রতিটি বিষয়ের জন্য তৈরি করা আছে রেডিমেড একটি ওজিফা!
তা পড়ো আর নিশ্চিন্তে থাকো।

ইশ, এমন দিনও যদি আসে,
যেদিন খানকাহ আর মাদরাসা নির্মাণের জন্যও কোনো ওজিফা বের হবে,
আর গরিব মুসলমানরা চাঁদা দেওয়ার বোঝা থেকে মুক্তি পাবে!

————-

| ক্যাটাগরি : সমালোচনা, উপদেশ, ইসলামি চিন্তাধারা, তাজকিয়াহ।

✍️ মূল : ড. মুহাম্মদ আকরাম নাদভী, অক্সফোর্ড।
✍️ অনুবাদ যাচাই ও সম্পাদনা: মাওলানা মারজান আহমদ, সিলেট, বাংলাদেশ।
🔗 অনূদিত মূল প্রবন্ধের লিংক: 👇
https://t.me/DrAkramNadwi/4774

শেয়ার করুন:

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *