بسم الله الرحمن الرحيم.
কয়েক বছর আগে ইংল্যান্ডের এক শান্ত, নির্জন, শহর থেকে দূরে অবস্থিত ছোট্ট গ্রামে, মেয়েদের একটি দীনী মাদ্রাসায় আমাকে বক্তৃতা দেওয়ার আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। আমন্ত্রণটি ছিল না আনুষ্ঠানিকতা বা ভদ্রতার সৌজন্য; বরং এর মধ্যে লুকিয়ে ছিল এক ভিন্নধর্মী সাংস্কৃতিক ও চিন্তাগত অভিজ্ঞতার প্রতিশ্রুতি।
সেখানে পৌঁছে ভবনটি আমাকে এমন এক নীরবতায় স্বাগত জানাল, যে নীরবতা জীবন্ত স্থাপনার স্বাভাবিক নিস্তব্ধতা নয়, বরং একটি সভ্যতার পতনের প্রতিফলন। উঁচু স্তম্ভ, প্রশস্ত খিলান, বিস্তৃত প্রাঙ্গণ, আর চারদিকে এক অদ্ভুত ম্লান বিষণ্ণতা। যেন এই স্থাপনাগুলো কেবল তাদের সময়কেই নয়, তাদের নির্মাতাদের ইতিহাসকেও অগোচরে স্মরণ করাতে চায়।
আমি বক্তৃতা শেষ করে ছাত্রীদের দিকে মনোযোগ দিলাম। তাদের চিন্তা ও বোঝাপড়ার পরিধি বুঝতে কয়েকটি সহজ প্রশ্ন করলাম। প্রশ্নগুলো বাহ্যত সহজ ছিল, কিন্তু ভেতরে লুকানো গভীর নীরবতাকে প্রকাশ করার জন্য যথেষ্ট।
তাদের মুখে যে নীরবতা দেখলাম, তা সেই শূন্য নিস্তব্ধতা, যা কখনো কোনো পরিত্যক্ত স্থাপনায় অনুভব করা যায়; যেখানে আকাশ দেখা গেলেও, মাটির যেন আর শ্বাস নেওয়ার শক্তি অবশিষ্ট নেই। দৃষ্টি নিচু, মুখ বন্ধ, আর মন যেন সম্পূর্ণ শূন্য, যেন জ্ঞানের আলো কোনোদিন তাদের দরজায় কড়া নেড়ে দেখেনি।
এই নিস্তব্ধতা আমাকে বলছিল, শুধু জ্ঞান উপস্থিত থাকা যথেষ্ট নয়; তাকে অনুভব করতে হয়, আত্মায় গ্রহণ করতে হয়।
পরে আমি মাদ্রাসার শিক্ষকাদের বললাম, “এই মেয়েরা তো মৌলিক বিষয়গুলোই জানে না। এরা কিভাবে আলিমা হয়ে দীনকে সেবা করবে?”
তারা অত্যন্ত সরলভাবে উত্তর দিল, “আমাদের লক্ষ্য শিক্ষা নয়। কেবল নিরাপত্তা। আমরা চাই মেয়েরা বিবাহ-উপযোগী বয়স পর্যন্ত এই পরিবেশে থাকুক। সরকারি স্কুলের পরিবেশ আমরা সইতে পারি না।”
এই উত্তর আমার মনে এক দার্শনিক ধাক্কার মতো লাগল।
নিরাপত্তা শুধু দেহকে রক্ষা করে,
কিন্তু শিক্ষা আত্মাকে রক্ষা করে।
নিরাপত্তা মানুষকে সময়ের কঠিনতা থেকে আড়াল করে,
কিন্তু শিক্ষা তাকে সময়ের চেতনায় রূপ দেয়।
আর জাতি তখনই পতনের দিকে যায়, যখন তাদের কাছে দেহরক্ষার ব্যবস্থা থাকে, কিন্তু বুদ্ধিবৃত্তিক ও আত্মিক বিকাশের উপায় অনুপস্থিত থাকে।
এই একই অভিজ্ঞতা আমার ভারতে হয়েছিল। এক পুরোনো মাদ্রাসা আমাকে আরবি নসর ও অনুবাদের পরীক্ষা নিতে ডেকেছিল। পুরো শ্রেণি ফেল করল।
আমি বুঝলাম, এ ব্যর্থতা ছাত্রদের নয়, বরং পুরো ব্যবস্থার গল্প। এমন এক ব্যবস্থার গল্প, যা ভবন নির্মাণ করেছে যত্নে, কিন্তু মগজ গড়ার প্রাচীন কৌশল কোথাও হারিয়ে ফেলেছে।
সম্ভবত এই কারণেই আমাকে আর ডাকা হয়নি, কারণ সত্যের আয়না সাধারণত কাউকে স্বস্তি দেয় না; তা অস্থিরতা জাগায়।
অনেক মাদ্রাসায় আমি মুহতামিম (পরিচালক) সাহেবদের সঙ্গে ভবন পরিদর্শনে গিয়েছি। তারা আমাকে দেখিয়েছেন, মসজিদ, প্রাঙ্গণ, অতিথিশালা, নতুন নির্মাণ, সাজসজ্জা, বিস্তৃতি সবই।
কিন্তু সেই কক্ষগুলোতে জ্ঞানের উপস্থিতির কোনো ঘ্রাণ ছিল না। বারবার মনে হচ্ছিল-
ভবন আর জ্ঞান এক নয়।
ভবন কেবল পাত্র,
আর জ্ঞান সেই পানীয়,
যা মানুষের ভেতরে ঢুকে তাকে উষ্ণ করে, জীবন্ত রাখে।
জ্ঞান না থাকলে প্রতিটি ভবন হয়ে যায় খালি সাগর, চমৎকার, অলঙ্কৃত, ঝকঝকে, কিন্তু খালি।
আমাদের এক পুরোনো বন্ধু প্রায়ই বলেন,
“মুসলমানরা যে জিনিস কেনা যায়, সেটায় সবার আগে; আর যা উৎপাদন করতে হয়, সেটায় সবার পেছনে।”
এটা শুধু একটি বাক্য নয়,
একটি সভ্যতার বিলাপ।
কেনা জিনিস বাইরে থেকে আসে,
কিন্তু সৃষ্ট জিনিস জন্মায় অন্তর থেকে।
যদি অন্তরের মাটি বন্ধ্যা হয়ে যায়,
তবে দুনিয়ার কোনো সার তাকে সবুজ করতে পারবে না।
এই কারণেই আমাদের মাদ্রাসাগুলোয় বাহ্যিক জৌলুস আছে,
কিন্তু জ্ঞান, চিন্তা ও গবেষণার প্রদীপ নিভে গেছে।
এই মুহূর্তে বেদিল দেহলভীর সেই পঙ্ক্তিটি হৃদয়ে তীক্ষ্ণ ব্যথার মতো নেমে আসে :
“باده ندارم كه به ساغر كنم”
“সাগর আছে, কিন্তু ঢালার মতো জ্ঞানরস নেই।”
আমাদের হাতে সাগর আছে, মনোরম, স্বচ্ছ, মূল্যবান, কিন্তু সত্যের সুধা, জ্ঞানের পানীয়, তা অনুপস্থিত।
স্থাপনাগুলো অটুট দাঁড়িয়ে আছে,
কিন্তু তাদের ভেতর জ্ঞানের আলো নিভে গেছে।
সভ্যতার নবীন বংশধরেরা বসে আছে,
কিন্তু আত্মার প্রদীপ নিভে রয়েছে।
প্রজন্মেরা পাচ্ছে না সেই আলো,
যা জাতিকে জীবিত রাখে।
এ আমাদের সন্ধ্যা,
এক এমন সন্ধ্যা, যেখানে ছায়া লম্বা হয়,
কিন্তু আলো হারিয়ে যায় দূর, হারানো কোনো দিগন্তে।
আমরা হাতে সাগর ধরে দাঁড়িয়ে আছি,
আর সভ্যতা, তার পুরোনো প্রাচীর থেকে,
মনে হয় যেন আর্তি জানাচ্ছে:
‘আমরা সাগরকে রক্ষা করেছি, কিন্তু সত্যের অমৃতকে বাঁচাতে পারিনি।’
———-
ক্যাটাগরি : ফিলোসোফি, ইসলামি চিন্তাধারা।
✍️ মূল : ড. মুহাম্মদ আকরাম নাদভী, অক্সফোর্ড
✍️ অনুবাদ যাচাই ও সম্পাদনা: মাওলানা মারজান আহমদ, সিলেট, বাংলাদেশ।
🔗 অনূদিত মূল প্রবন্ধের লিংক: 👇
https://t.me/DrAkramNadwi/7774