AkramNadwi

শিরোনাম : ফারাহীর চিন্তা ও মনন : কোরআনের শপথসমূহ।

শিরোনাম : ফারাহীর চিন্তা ও মনন : কোরআনের শপথসমূহ।
|২২ |নভেম্বর |২০২৫| কোরআনী জ্ঞানের বিশাল দিগন্তে কিছু আলোচনা আছে, যা যুগে যুগে চিন্তাশীল মনকে আকর্ষণ করেছে। এ বিষয়গুলোর কিছু এমন গভীর ও সূক্ষ্ম যে অবিরত মনোনিবেশ ও ভাবনার দাবি করে; তবু বহু দিন পর্যন্ত এগুলোর কোনো সমন্বিত, সুসংগঠিত ও নীতিমূলক ব্যাখ্যা সামনে আসেনি। এসব বিস্তৃত আলোচনার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হলো কোরআনের শপথসমূহ। সেই মর্যাদাপূর্ণ আয়াতগুলো, যেখানে মহান রব মহাবিশ্বের দৃশ্যাবলি, ইতিহাসের নিদর্শন, এবং আকাশ-প্রকৃতি ও মানব-অন্তরের অসংখ্য চিহ্নকে শপথ হিসেবে পেশ করেছেন, মানুষকে এমন এক যুক্তিনির্ভর জগতে প্রবেশ করিয়ে, যেখানে প্রতিটি দৃশ্য এক একটি দলিল, প্রতিটি রেখা এক একটি সাক্ষ্য, এবং প্রতিটি গতি তাওহিদ ও আখিরাতের অব্যক্ত ঘোষণা। শপথের এই ভাষাশৈলী আপাতদৃষ্টিতে অলংকারের দরজা মনে হলেও, বাস্তবে এটি কোরআনের যুক্তির বিশাল একটি দিক। বহু মুফাসসির বিভিন্ন সময়ে এ বিষয়ে কথা বলেছেন; কিন্তু আল্লাহর বাণীতে আসা সব শপথকে একটি সুসংবদ্ধ নীতির আলোকে বোঝার যে প্রয়োজন যুগ যুগ ধরে আলেমদের আকৃষ্ট করে এসেছে—সেই প্রয়োজন পূরণে দরকার ছিল এক সর্বাঙ্গীণ বৈজ্ঞানিক পদ্ধতির। এই শূন্যতা তিনিই পূরণ করতে পারেন, যিনি কোরআনের বয়ান-শৃঙ্খলা, তার যুক্তিনির্ভর প্রজ্ঞা এবং মহাবিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে থাকা ইশারাগুলোর ওপর গভীর দৃষ্টিসম্পন্ন। সেই কারণে আল্লামা হামিদুদ্দীন ফারাহী তাঁর অসাধারণ অন্তর্দৃষ্টি, নীতিবোধ ও কোরআনী ধ্যানের আলোকে এই বিষয়টিকে এক স্বতন্ত্র জ্ঞানশাস্ত্রের রূপ দেন। তাঁর অমর কৃতি “ইমআন ফি আকসামিল কুরআন” শুধু বিষয়টির সীমানাই নির্ধারণ করেনি; বরং এর প্রতিটি স্তরকে সুসংগঠিত, ধারাবাহিক চিন্তার মধ্যে উন্মোচন করেছে। ফারাহীর মতে, কোরআনের শপথ কোনো বাক্যশক্তি বাড়ানোর অলংকার নয়; বরং মানুষের বিবেককে প্রমাণ ও সাক্ষ্যের মাধ্যমে সত্যের দিকে পৌঁছে দেওয়ার এক রাব্বানী পদ্ধতি। যখন তাওহিদ, রিসালাত, আখিরাত, মানবিক হিদায়াত ও ইতিহাসের সুন্নাহর মতো মৌলিক সত্যে শপথ আসে, উদ্দেশ্য শুধু কথার জোর নয়; বরং পাঠককে সেই প্রত্যক্ষ বাস্তবতার দিকে ফেরানো, যার সাক্ষ্য সমগ্র সৃষ্টিজগত তার নিজস্ব গঠন ও শৃঙ্খলায় দিচ্ছে। এই দৃষ্টিতে দেখলে কোরআনের শপথ হয়ে ওঠে মহাবিশ্বের নিদর্শনের এক মহান আহ্বান, এক এমন দ্বার, যার ভেতর প্রবেশ করলে মানুষ অনুভব করে: আকাশের বিস্তার, পর্বতের দৃঢ়তা, ইতিহাসের চিহ্ন, অন্তরের নিঃশব্দ স্বর, সবই যেন একই সত্যের দিকে ইঙ্গিত করছে। প্রাচীন মুফাসসির যেমন ইমাম ফাখরুদ্দীন রাযী, ইবনুল কাইয়্যিম ও অন্যান্য ইমামগণ শপথের অর্থ ও তাৎপর্য নিয়ে মূল্যবান দিকনির্দেশ দিয়েছেন; কিন্তু এসব ছিল বিচ্ছিন্ন। কোরআনের সব শপথকে তাদের প্রকৃত পরিসরে বোঝার মতো কোনো সমন্বিত পদ্ধতি তখনও তৈরি হয়নি। ফারাহী প্রথমবার এই সত্যটি স্পষ্ট করেন যে, শপথের মূল উদ্দেশ্য হলো সংকল্প ও নিশ্চিতকরণ, কোনো পবিত্র বস্তুকে সম্মান প্রদর্শন নয়। শপথ করা বস্তুর “মর্যাদা” আরবী ভাষার স্বাভাবিক শর্ত নয়; বরং মানবসভ্যতার সকল পর্যায়ে শপথের লক্ষ্য ছিল কথার চূড়ান্ততা ও মনোভাবের দৃঢ়তা। কোরআন এ স্বাভাবিক মানবিক রীতিকে নিজের ই‘জাজপূর্ণ ভাষায় এমনভাবে ব্যবহৃত করেছে, যাতে সৃষ্টির প্রতিটি অংশ প্রমাণ হয়ে দাঁড়ায়। এই আলোচনায় যে তিনটি মূল আপত্তি ওঠে, ফারাহী সেগুলো গভীর যুক্তির মাধ্যমে দূর করেছেন: প্রথমত: মহান রব কি শপথ করতে পারেন? এটি কি তাঁর শানের বিরুদ্ধে? ফারাহী বলেন, এ আপত্তি আরবী ভাষার প্রকৃতি না বোঝার ফল। আরবদের কাছে শপথ দুর্বলতা নয়; বরং কথার দৃঢ়তা ও নিশ্চিততার প্রকাশ। কোরআনে শপথ এসেছে সম্পূর্ণ হুজ্জত প্রতিষ্ঠার জন্য; কারণ বিবাদের নিষ্পত্তি হয় সাক্ষ্য বা শপথের মাধ্যমে, আর কোরআন উভয়টিই এনেছে। দ্বিতীয়ত: কাফেরের কাছে শপথ তো অকার্যকর, মুমিনের জন্য অপ্রয়োজনীয়, তাহলে লাভ কী? বাস্তবে, কোরআনের শপথ শব্দমাত্র নয়, এটি মহাবিশ্বের সাক্ষ্য। প্রতিটি চিন্তাশীল মানুষের জন্য এটি এক নতুন দৃষ্টির দরজা খুলে দেয়। তৃতীয়ত: শপথ তো মহান বস্তুর হয়; তাহলে “তিন” ও “জয়তুন” কেন? ফারাহী স্পষ্ট করেন, কোরআনের শপথ ”সম্মানসূচক“ নয়, ”সাক্ষ্যসূচক“। আল্লাহ সৃষ্টিজগতের বস্তুগুলোকে পবিত্র করে নয়, প্রমাণ করে পেশ করেন। তাঁর ব্যাখ্যায় “তিন” ও “জয়তুন” বলতে ঐ দুটি ঐতিহাসিক ও নববী পর্বত বোঝানো হয়েছে, যাদের কোরআনের যুক্তিগত বিন্যাসে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা আছে। এ গবেষণায় ফারাহীর বৈজ্ঞানিক শৈলী অতুলনীয়। তিনি সংক্ষিপ্ত বাক্যে গভীরতা আনেন, সরল বর্ণনায় মহিমা সৃষ্টি করেন, এবং তাঁর অনুক্রমে এমন শৃঙ্খলা থাকে, যা প্রাচীন পণ্ডিতদের মতো দৃঢ়তা, সংযম, পরিমিতি ও পরিপক্ব প্রশান্ত ভঙ্গি ধারণ করে, আবার আধুনিক জ্ঞানের সাহসিকতাও বহন করে। তাঁর ছোট ছোট বাক্য থেকে নীতির বিশাল কাঠামো গড়ে ওঠে, আর তাঁর লেখায় সেই স্বকীয় মর্যাদা রয়েছে, যা প্রকৃত বিদ্যাপরিশ্রমের পরিচয়। “ইমআন ফি আকসামিল-কুরআন” এর ভূমিকায় আল্লামা সাইয়্যিদ সুলায়মান নদভী যে স্পষ্টতায় ফারাহীর তাফসিরি মাহাত্ম্য স্বীকার করেছেন, সেটিই এক বৈজ্ঞানিক প্রমাণ। মাওলানা আবুল হাসান আলী নদভীও এ গবেষণাকে শুধু প্রশংসাই করেননি; বহু স্থানে একে কোরআন অনুধাবনের ক্ষেত্রে এক অসাধারণ অবদান বলে আখ্যা দিয়েছেন। সমকালীন বহু মুফাসসিরও ফারাহীর মতামত আন্তরিকভাবে গ্রহণ করেছেন। এই ক্ষুদ্র পুস্তিকাটি তবু এমন একটি নীতিগত পদ্ধতি সামনে আনে, যা একজন শিক্ষার্থীর কাছে কোরআনের শপথসমূহের সব আলোচনা স্পষ্ট করে দেয়। এর মাধ্যমে কোরআনের যুক্তিতন্ত্র, তার সাক্ষ্যসমূহ, তার মহাবিশ্বময় ইশারা এবং তার বর্ণনার প্রজ্ঞা এক নতুন আলোয় উদ্ভাসিত হয়। আল্লাহ আমাদের কোরআনের এসব সূক্ষ্ম ও উচ্চতর অর্থ অনুধাবনের তাওফিক দান করুন, তাঁর প্রমাণসমূহ থেকে আলো দান করুন, এবং তাঁর বাণীর হক আদায় করার ক্ষমতা দান করুন। আমীন, ইয়া রাব্বাল ‘আলামীন। ————– | ক্যাটাগরি : কোরআন, তাফসির, ইসলামি চিন্তাধারা। ✍️ মূল : ড. মুহাম্মদ আকরাম নাদভী, অক্সফোর্ড ✍️ অনুবাদ, যাচাই ও সম্পাদনা: মাওলানা মারজান আহমদ, সিলেট, বাংলাদেশ। 🔗 অনূদিত মূল প্রবন্ধের লিংক: 👇 https://t.me/DrAkramNadwi/7717
শেয়ার করুন:

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *