১৮ নভেম্বর ২০২৫
ইমাম হামিদুদ্দীন ফারাহী রহ. এর দৃষ্টিতে জ্ঞানজগতের সর্বোচ্চ স্থানে রয়েছে শুধু কোরআন।
সমস্ত মানবিক প্রচেষ্টার ঊর্ধ্বে, সব চিন্তাশীল রচনার উপরে, এবং যেকোনো ধর্মীয় ঐতিহ্যের তুলনায় অসীমভাবে স্পষ্ট, নির্ভুল ও নিশ্চিত হেদায়েত হিসেবে।
তার মতে, কোরআন এমন এক বাণী যাতে আল্লাহর প্রজ্ঞা সরাসরি এবং অবিকৃত রূপে উদ্ভাসিত হয়েছে।
অন্যদিকে ফিকহ ও কালামের গ্রন্থ মানব-পরিশ্রমের ফল; মানুষের মানসিক গঠন, বুদ্ধিবৃত্তিক রুচি ও ব্যক্তিগত অগ্রাধিকারের প্রতিফলন।
আল্লাহর কালাম ও মানুষের লেখা, এই দুই জগতের মৌলিক পার্থক্য হৃদয়ে গভীরভাবে ধরতে পারলে চিন্তার পথ খুলে যায় এবং দ্বীনের সত্যিকারের রূপ অন্তরে গভীরভাবে প্রোথিত হয়।
ফিকহ ও কালাম: খুঁটিনাটির জগত:
ফিকহের বইগুলো সাধারণত বাস্তব জীবনের সূক্ষ্ম বিষয়ের তালিকা নিয়ে ব্যস্ত থাকে :
নামাজের শর্ত, রুকন, ওয়াজিব, সুন্নত, মাকরূহ;
হজের পর্যায় ও বাধ্যবাধকতা;
তালাকের ধরন;
ক্রয়-বিক্রয়ের সহীহ, ফাসিদ ও বাতিল রূপ;
সুদের নানা বিভাগ, জাহেলি রিবা ও ইসলামী রিবার পার্থক্য।
এসব এমনভাবে সাজানো হয় যে সাধারণ মানুষ চিন্তা ছাড়া, চোখ বুজে অনুসরণ করতে পারে।
নিজে কোনো ইজতিহাদ, অনুসন্ধান বা যাচাইয়ের প্রয়োজন অনুভবই না করে।
কালামের বইয়েও একই ধারা :
কোন বিশ্বাস মানুষকে মুসলমান করে;
কোন কথা তার ঈমান নষ্ট করে;
কখন সে আহলে সুন্নতের সীমানা ছাড়িয়ে যায়।
অর্থাৎ ফকীহ ও কালামবিদের কাজ, খুঁটিনাটি বিশদ করা, এবং অনুসারীকে চিন্তার পরিশ্রম থেকে মুক্ত রাখা।
কোরআনের ধরন: আত্মায় আলো জ্বালানো দিশা :
একই বিষয় যখন কোরআনে আসে, দৃশ্যপট সম্পূর্ণ বদলে যায়।
কোরআনে নেই সেই অন্তহীন তালিকা, সূক্ষ্ম খুঁটিনাটি বা বিভাজনের পর বিভাজন।
বরং কোরআন, ইবাদতের আত্মাকে সামনে আনে,
মৌলিক ও সার্বজনীন নীতিমালা প্রদান করে, সীরাত ও চরিত্রের জীবন্ত উদাহরণ তুলে ধরে,
এবং মানুষের অন্তরকে জাগিয়ে তোলে চিন্তা, তাদাব্বুর ও তাফাক্কুরের পথে।
তবে কি এর মানে ফিকহ ও কালামের বইগুলো আরও পূর্ণাঙ্গ, আর কোরআন (নাউযুবিল্লাহ) কোনো অসম্পূর্ণতায় ভোগে?
কখনোই না।
বরং সত্য হলো,
কোরআনের পূর্ণতা তো অকাট্যই; তার কার্যকারিতা, প্রভাব, আলো ও বিস্তার মানুষের লেখা যেকোনো গ্রন্থের চেয়ে তুলনাতীতভাবে উচ্চতর।
হ্যাঁ, কোরআনের ধরন ভিন্ন, এটি বুদ্ধিকে সক্রিয় করে, অন্তরকে জাগায়, মানুষকে অনুসন্ধান ও অনুধ্যানের পথে পরিচালিত করে।
হেদায়েত কোরআনেই রয়েছে; তবে সেই হেদায়েতে পৌঁছাতে পরিশ্রম আছে,
আর এই পরিশ্রমই মানুষের অন্তর ও বোধে যে আলো প্রজ্বলিত করে, তা গভীর রূপান্তর এনে দেয়।
একটি সহজ উদাহরণ :
এই পার্থক্য বোঝাতে একটি সাধারণ উদাহরণই যথেষ্ট ; ধরুন, আপনি পুরান দিল্লির জামে মসজিদের কাছে দাঁড়িয়ে আছেন, যেতে চান ফতেপুরি মসজিদে।
একজন ব্যক্তি আপনাকে প্রতিটি মোড়, প্রতিটি বাঁক, প্রতিটি পদক্ষেপ বুঝিয়ে দিলেন,
আপনি তার নির্দেশনা মেনে সহজেই গন্তব্যে পৌঁছালেন,
কিন্তু পুরো এলাকার সম্পর্কে কিছুই জানলেন না।
একটি রাস্তা বন্ধ পেলে আপনি হিমশিম খাবেন, আবার কারো সাহায্য চাইতে হবে।
অন্যদিকে কেউ যদি আপনাকে পুরো এলাকার মানচিত্র দেয়, প্রথমে সময় লাগবে, দিক চিনতে হবে, পথ বুঝতে হবে, কিন্তু একবার বুঝে নিলে,
এলাকার পুরো রূপ আপনার মনে গেঁথে যাবে।
পথ বন্ধ হয়ে গেলে বিকল্প পথ খুঁজে নেবেন,
ভুল পথে গেলে নিজেই ফিরতে পারবেন,
কাউকে আর প্রয়োজন হবে না।
পরিশ্রম বেশি, কিন্তু লাভও বহুগুণ, জ্ঞান বাড়ে, দৃষ্টিও প্রসারিত হয়।
প্রথম অবস্থাটি, ফিকহ ও কালাম। দ্বিতীয়টি, কোরআন। ফিকহ পথ দেখায়; কোরআন পথ চিনতে শেখায়।
ফিকহ নির্দেশ দেয়; কোরআন লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যের বোধ জাগায়।
ফিকহ মানুষকে কখনো নির্ভরশীল করে; কোরআন তাকে স্বাধীন ও সচেতন পথিক বানায়।
নামাজের কথাই ধরুন :
যখন আপনি কুরআনের আলোয়, কুরআনের হাত ধরে নামাজ শিখবেন, তখন হৃদয়ের গভীরে স্পষ্ট হয়ে ওঠে, নামাজ কেবল কতকগুলো অঙ্গ-ভঙ্গি আর শর্ত-নিয়মের যান্ত্রিক সমষ্টি নয়; বরং এ এক জীবন্ত বন্ধন, যিকিরের আলোড়ন, ফিকিরের গভীরতা, আত্মার সঙ্গে আল্লাহর সরাসরি সংলাপ।
এ খুশু ও বিনয়ের সম্মোহন, কুনূতের দীর্ঘ নিবেদন, কিয়াম-রুকু-সিজদার অপরূপ সৌন্দর্য, কুরআনের মধুর সুর, কিবলার দিকে মুখ ফেরানোর পবিত্র আহ্বান, ওযু ও তাহারাতের আত্মিক পরিচ্ছন্নতা।
তারপর কুরআন আপনার সামনে খুলে দেয় নবীদের নামাজের ছবি, ইবরাহীম আ., মূসা আ., ঈসা আ. ও মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর নামাজের জীবন্ত নমুনা। শেষ পর্যন্ত রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর উসওয়াতুন হাসানাহকে আদর্শ ঘোষণা করে। এভাবে কুরআন থেকে শেখা নামাজ হয়ে ওঠে এক জীবন্ত নামাজ, যার মধ্যে রূহের পরিপুষ্টি ও দিলের মিষ্টতা বেশি, একাগ্রতা ও আল্লাহ ভীতি বেশি।
হ্যাঁ, কুরআন থেকে সরাসরি শিখতে সময় লাগে বটে, কিন্তু যে জিনিস হৃদয় ও মস্তিষ্ককে জাগিয়ে তোলে, সেটা কেবল সময়ের কোরবানি নয়, সেটা পুরো ব্যক্তিত্বের নির্মাণ। কুরআন মানুষকে সেই মাকামে নিয়ে যায় যেখানে সে আকল, ফিতরাত ও রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর অনুসরণের সঙ্গে আল্লাহর হিদায়াতকে পূর্ণরূপে উপলব্ধি করতে পারে।
মানুষের কাছে এ পথ কঠিন মনে হয় কারণ দুনিয়ার সবচেয়ে কঠিন কাজ হলো চিন্তা করা। অধিকাংশ মানুষ চায় কেউ যেন তাদের হয়ে ভেবে দেয়, আর তারা চোখ বুজে সেই পথে চলতে থাকে। ফকীহ ও মুতাকাল্লিমগণ খাঁটি নিয়তে এ দায়িত্ব কাঁধে তুলে নিয়েছিলেন। কিন্তু ধীরে ধীরে ফুরূআত ও জুযইয়াতের পাহাড় এত বেড়ে গেল যে, এমনকি এমন মাসআলাও আলোচিত হতে লাগল যাদের প্রয়োজন হয়তো কখনো পড়বে না। এ বিশাল ভারের চাপে দীন তার আসল রূহ থেকে দূরে সরে গেল, আর মানুষ সেই তাতহীর ও তাযকিয়া থেকে বঞ্চিত হল যার ওপর কুরআন সবচেয়ে বেশি জোর দেয়।
এটাও এক ঐতিহাসিক সত্য যে, সাহাবায়ে কিরাম রাদিয়াল্লাহু আনহুম নামাজ শিখেছিলেন কুরআনের পদ্ধতিতে, জীবন্ত সম্পর্ক, সরল বোধ, হৃদয়ের গভীর অবস্থা। আর আমরা শিখেছি কুদুরী, নূরুল ঈযাহ ও এ জাতীয় কিতাব থেকে সূক্ষ্ম বিভাজন, দীর্ঘ তালিকা, অগণিত পরিভাষা। ফলে আমাদের ও সাহাবাদের নামাজের মধ্যে সেই তফাতই হয়ে গেল যা জীবন্ত সিংহ আর কাগজের ছবি আঁকা সিংহের মাঝে থাকে।
ইমাম ফারাহী রহ. এর মূল আহ্বান :
কোরআনকে সর্বোচ্চ মানদণ্ড হিসেবে গ্রহণ করো। কোরআনকে নিজের জীবনের ভিত্তি বানাও। মানুষ রচিত বইগুলোকে কখনো চূড়ান্ত সত্য মনে কোরো না। ফিকহ ও কালামের বইগুলো সহায়ক, প্রয়োজনীয় এবং সম্মানিত, কিন্তু সবসময় গৌণ।
এগুলো দিশা দেখায়, কিন্তু বোধ দেয় কোরআন। এগুলো পথ দেখায়, কিন্তু মহৎ লক্ষ্য স্পষ্ট করে কোরআন।
শেষ কথা এতটুকুই: একদিকে আল্লাহর কালাম, নূর, হিদায়াত, রহমত; অন্যদিকে মানুষের পরিশ্রম মূল্যবান, কিন্তু সীমাবদ্ধ। ফারাহী রহ. এই পার্থক্যটিই উজ্জ্বল করে তুলেছেন এবং মানুষকে আবার সেই হিদায়াতের ঝরনার কাছে ফিরিয়ে এনেছেন, যেখান থেকে ঈমানে, ফিকিরে ও আমলে প্রাণের উৎসমুখ খুলে যায়।
——————–
ক্যাটাগরি : সালাত, আখলাক, তাজকিয়াহ, ইসলামি চিন্তাধারা।
—
✍️ মূল : ড. মুহাম্মদ আকরাম নাদভী, অক্সফোর্ড
✍️ অনুবাদ, যাচাই ও সম্পাদনা : মুহাম্মাদ মাশহুদ শরীফ
—
🔗 অনূদিত মূল প্রবন্ধের লিংক: 👇
https://t.me/DrAkramNadwi/7690