ঘটনাটি এমন: একদিন আমি ছাদে ধীরে ধীরে হাঁটতে হাঁটতে নিচের আঙিনায় নেমে এলাম।
কী দেখলাম?
শাইখ চিল্লি একটি কোণে বসে আছেন, মুখে এমন বিষণ্ণতার ছায়া, যেন সদ্য জীবনের সব দুঃখ পান করে ফেলেছেন। মুখ এমন ঝুলছিল, যেন কেউ ভোরবেলা তাঁর সব স্বপ্নের উপর পানি ঢেলে দিয়েছে।
আমি কাছে গিয়ে জিজ্ঞাসা করলাম:
হে শাইখ! এমন মনমরা অবস্থা কেনো ? এতো ক্লান্তি, মনহীনতা ও গভীর দুশ্চিন্তা কেন?
শাইখ একটি দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেললেন এবং এমনভাবে তাকালেন, যেন বহুদিন ধরে কোনো গোপন বন্ধু খুঁজে বেড়াচ্ছেন। তারপর বললেন, এমনভাবে যেন একজন কবি তার নতুন রচনা কোনো অজানা শ্রোতাকে শোনাচ্ছেন:
ভাই, শুনো! সময় আমার প্রতি বিশ্বাস রাখে না। একজন আমাকে একটি তেলের মটকো দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। আমি মনে মনে কত স্বপ্ন বোনা শুরু করেছিলাম! মনে হচ্ছিল ভাগ্যের পরী আমার কানে আলতো ফুঁ দিয়েছে, মটকা বিক্রি করব, তেল ভালো দামে যাবে, সেই টাকায় ছাগল কিনব, ছাগলের বাচ্চা হবে, বাচ্চা বিক্রি করব, সেই টাকায় গরু কিনব, গরু দুধ দেবে, দুধ বিক্রি করব, ধীরে ধীরে টাকা জমবে, খেত কিনব, শক্তিশালী দুটি ষাঁড় আনব, হাল চালাব, ফসল ফলাব, আর যখন ধনসম্ভার জমে যাবে, তখন একটি সুন্দর ও সদাচারিণী স্ত্রী বিয়ে করব।
শাইখ একটি আরও দীর্ঘ নিঃশ্বাস তোলেন, যা দেয়ালের কোণে প্রতিধ্বনিত হলো। তারপর তিনি বললেন:
কিন্তু ভাগ্য আমার সুখ সহ্য করতে পারল না। আমি সেই সব কল্পনায় ডুবে ছিলাম, হঠাৎ সামনে দাঁড়িয়ে থাকা একটি ষাঁড়কে দেখতে পেলাম না, সরাসরি তার সঙ্গে ধাক্কা লাগল, মুখ নিচে পড়ে গেল, মটকা চূর্ণ, তেল মাটিতে শোষিত, আর আমার সঙ্গে আমার ছাগল, বাচ্চা, গরু, দুধ, খেত, ষাঁড়, সবকিছু রোদে বালি হয়ে হাতের মধ্য দিয়ে ফিসফিস করল। এখন বলো, এই দুঃখের ক্লান্তি ছাড়া আর কী থাকতে পারে?
এটা শুনে আমি অনিচ্ছাকৃতভাবে হেসে উঠলাম, এমন খিলখিলানি উঠল যে শব্দটি দরজার কাছে পৌঁছালো। শাইখ রেগে বললেন:
হে বোকা! এমন ধ্বংসের মধ্যে থেকেও কি তোমার হাসির সুযোগ হলো? তোমার মধ্যে শিষ্টাচার নামের কিছু আছে কি না?
আমি হেসে কণ্ঠ আটকিয়ে বললাম:
হে শাইখ, আপনি তো আমার প্রাণের বন্ধু, আমার অন্তরের বন্ধু। আপনার উপর আমি কখনো হাসতে পারি? আমি শুধু একটি ঘটনা মনে পড়েছিল, তাই হাসি থামছিল না।
শাইখ রেগে কিন্তু শান্তভাবে বললেন:
চল, এখন যেহেতু তুমি কিছু বুঝেছ, সেই ঘটনা বলো, হয়তো আমার মন হালকা হবে।
আমি বললাম :
একদিন এক মাছি কোথা থেকে যেন ভনভন করতে করতে উড়ে এলো আর গিয়ে জমিয়ে বসল একটি ষাঁড়ের শিঙে।
কৃষক ষাঁড়টাকে নিয়ে মাঠে গেল, তপ্ত রোদ মাথায়, ধুলো-মাটি উড়ছে চারদিকে, আর সারাদিন ধরে কেবল হাল, হাল আর হাল।
একসময় সূর্য নিজেও হাঁপিয়ে উঠে পশ্চিমের আড়ালে লুকিয়ে পড়ল, ষাঁড়টাও হাঁসফাঁস করতে করতে ঘরে ফিরল, ঘাম, ধুলো, ক্লান্তি, সব মিলিয়ে যেন যুদ্ধ জিতে এসেছে।
এই পুরো সময়টা মাছিটি আরামে শিঙের ওপরে বসে দুনিয়ার খবরদারি করছিল। ফেরার পথে এসে ফটাস করে উড়ে গেল, আরেকটি মাছির পাশে গিয়ে গম্ভীর ভঙ্গিতে বসল।
ওই মাছি অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল “বোন, তোমাকে এত ক্লান্ত ক্লান্ত লাগছে কেন?”
প্রথম মাছি বুক ফুলিয়ে (যেন কোন মহাশ্রমিক) উত্তর দিল “উফ! জিজ্ঞেস কোরো না! সারাদিন হাল চালাতে চালাতে কোমরটাই গেছে! আজ আর এক ইঞ্চিও নড়তে পারছি না।”
শাইখ এটি শুনে আগুনের মতো রেগে গেলেন এবং বললেন:
বাহ! তুমি কি আমাকে মাছি বানিয়ে দেখাচ্ছ? এটা অন্যায়! এটা অবমূল্যায়ন! এটি শতাব্দীর বোকামি!
তারপর তিনি আরও উত্তেজিত হয়ে বললেন:
শুনো! মাছি নিয়ে উপহাস করো না। আমাদের দেশের মুসলিম ভাইরা তো এই মাছির থেকেও বেশি অসহায়। নির্বাচনের সময় তারা কল্পনার হাল চালায়, মনে করে যেন রাষ্ট্রের সিংহাসন তাদেরই পায়ে। একটি কাগজে একটি চিহ্ন ধরে তারা সন্তুষ্ট হয়, মনে করে সরকার এখন তাদের দত্তক হবে। কিন্তু ফলাফল আসলেই হাত খালি, হতাশা এমন চরমে পৌঁছায় যে মাছির ক্লান্তিও যেন তাদের সামনে মাথা নোয়ায়। তারপর নতুন নির্বাচনের জন্য তারা আবার নতুন স্বপ্ন বোনে, নতুন আশা সাজায়, হাল চালাচ্ছে, কিন্তু শ্রম… মাছির!
শেষে শাইখ গভীর নিঃশ্বাস নিয়ে বললেন: এখন বলো! যখন সময় মানুষের হাত থেকে সব কিছু ছিনিয়ে নেয়, মানুষ ক্লান্ত না হলে আর কী করবে?
আমি উদাসভাবে বললাম:
শাইখের তো ব্যবসা শেষ। তার সব স্বপ্নও মাছির মতো উড়ে গেল।
এই মাছির গল্প বলতে বলতে শাইখের মনে জমে থাকা সব দুঃখও কমে গেল এবং মনটা হালকা হয়ে গেল।
——————–
ক্যাটাগরি : আখলাক, তাজকিয়াহ, উপদেশ, ইসলামি চিন্তাধারা।
—
✍️ মূল : ড. মুহাম্মদ আকরাম নাদভী, অক্সফোর্ড
✍️ অনুবাদ, যাচাই ও সম্পাদনা: মাওলানা মারজান আহমদ, সিলেট, বাংলাদেশ।
—
🔗 অনূদিত মূল প্রবন্ধের লিংক: 👇
https://t.me/DrAkramNadwi/7662