লিখেছেন : ড. মুহাম্মাদ আকরাম নদভী, অক্সফোর্ড।
তারা জিজ্ঞেস করল: পরিবার কী?
আমি বললাম: ভাষাগতভাবে ‘উসরাহ’ শব্দের অর্থ হলো এক ধরনের মজবুত ঢাল, আর মানবসমাজে এর অর্থ হলো, ঘনিষ্ঠ আত্মীয়দের এমন এক গোষ্ঠী, যারা একে অপরের জন্য আশ্রয় ও রক্ষাকবচ। তাদের বন্ধন দৃঢ়, সম্পর্ক উষ্ণ, অনুভূতি ও কর্মকাণ্ডে সুর ও সামঞ্জস্য বিরাজমান।
তারা জিজ্ঞেস করল: পরিবারের ভাঙন বলতে কী বোঝায়?
আমি বললাম: এর অর্থ হলো পিতা-মাতা বা তাদের একজনের দায়িত্ব পালনে ব্যর্থতা। যার ফলে পিতা-মাতা ও সন্তানদের সম্পর্ক দুর্বল হয়ে পড়ে, পারস্পরিক উত্তেজনা সৃষ্টি হয়, একে অপরের থেকে দূরত্ব বাড়ে, আবেগ ও সহযোগিতার ঐক্য ভেঙে যায়। এরপর পরিবারে আচরণগত অবক্ষয় ঘটে, স্বাভাবিক চলন ব্যাহত হয়, সম্পর্কের সুতো ছিঁড়ে যায়। এই ভাঙনই সামাজিক সমস্যার মূল শিকড় এবং সভ্যতার পথে সবচেয়ে বড় অন্তরায়।
তারা জিজ্ঞেস করল: আধুনিক যুগে পরিবারের এই ভাঙনের মূল কারণ কী?
আমি বললাম: এর মূল কারণ হলো, যৌন সম্পর্ককে প্রজনন থেকে আলাদা করে ফেলা। ষাটের দশক থেকে এই বিপর্যয় আরও তীব্র হয়েছে, যখন জন্মনিয়ন্ত্রণ বড়ি ও বিভিন্ন প্রতিরোধমূলক পদ্ধতি সহজলভ্য হলো, আর গর্ভপাত ও ভ্রূণ নষ্ট করার প্রবণতা সমাজে স্বাভাবিক হয়ে গেল।
তারা বলল: একটু স্পষ্টভাবে ব্যাখ্যা করুন।
আমি বললাম: যে কেউ মানবস্বভাব নিয়ে চিন্তা করবে, সে বুঝবে পুরুষ ও নারীর পারস্পরিক সম্পর্কের আসল উদ্দেশ্য কেবল ভোগ বা আনন্দ নয়। এর প্রাকৃতিক ও মৌলিক লক্ষ্য হলো নতুন প্রজন্মের সৃষ্টি ও তাদের লালন-পালন। যেহেতু এই দায়িত্বে নারীর ভূমিকা মুখ্য, তাই পুরুষের ওপর দায়িত্ব আরোপ করা হয়েছে সে যেন স্ত্রী ও সন্তানদের জন্য বাসস্থান, ভরণপোষণ ও নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করে। কিন্তু যখন যৌন সম্পর্ককে তার স্বাভাবিক লক্ষ্য ও দায়িত্ব থেকে আলাদা করা হলো, তখন পরিবার নামের প্রতিষ্ঠানটির অর্থই হারিয়ে গেল, এর বন্ধন ছিন্ন হয়ে গেল। যৌন সম্পর্কের সঙ্গে দায়িত্ব ও উদ্দেশ্যের সংযোগ থাকা ছিল আবশ্যক, কিন্তু সেটাই এখন বিচ্ছিন্ন।
তারা বলল: কিন্তু নারীরা তো মনে করে, এই বিচ্ছিন্নতাই তাদের কষ্ট কমায়, পুরুষদের সমকক্ষ করে এবং জীবনকে সুখকর করে তোলে।
আমি বললাম: আসলে নারীদের এই ধারণার দিকে ঠেলে দেওয়া হয়েছে কিছু শক্তি ও প্রতিষ্ঠান দ্বারা, যারা মানবফিতরতের শত্রু, বুদ্ধি ও অভিজ্ঞতার পরিপন্থী। এর ফল ভয়াবহ। নারীরা এতে চরম ক্ষতির শিকার হয়েছে, তাদের মর্যাদা পদদলিত হয়েছে, সম্মান নষ্ট হয়েছে। তারা পরিণত হয়েছে এক ধরনের পণ্য ও ভোগ্যবস্তুতে। সমাজে তাদের মূল্যায়ন হচ্ছে তাদের সৌন্দর্য ও যৌন আকর্ষণের ভিত্তিতে, যেন তারা পুরুষদের কামনার ফাঁদ, এমন না যে তারা ভবিষ্যতের জননী, ঘরের রক্ষক, সমাজের নতুন প্রজন্মের নির্মাতা।
তারা বলল: তাহলে কি নারীদের কর্মক্ষেত্রে প্রবেশও পারিবারিক ভাঙনের কারণ?
আমি বললাম: হ্যাঁ। ঠিক ষাটের দশক থেকেই নারীদের কর্মক্ষেত্রে নিয়ে যাওয়ার জন্য ব্যাপক ও সংগঠিত প্রচেষ্টা শুরু হয়, তাদের বোঝানো হয়, এতে তারা স্বাধীন হবে, বাবার ও স্বামীর ওপর নির্ভরশীলতা থেকে মুক্তি পাবে। কিন্তু এর ফলে স্ত্রী ও মায়ের ভূমিকা তুচ্ছ হয়ে পড়ে, অবমাননাকর হয়ে যায়। নারীরা হারায় তাদের অন্তর্নিহিত শক্তি, লালনক্ষমতা ও স্নেহের দান। সন্তান জন্মদান হয়ে পড়ে এক বিরক্তিকর বিষয়, যার প্রতি সমাজ তাচ্ছিল্য দেখায়। এমনকি কোনো নারী যদি নিজের ফিতরতের ডাকে সাড়া দিয়ে মাতৃত্বকে প্রাধান্য দিতে চায়, চাকরি ছেড়ে সন্তান প্রতিপালনে মনোযোগ দেয়—তবুও সমাজের চাপ তাকে পুনরায় কর্মক্ষেত্রে ফিরে যেতে বাধ্য করে।
তারা বলল: নারীরা যখন ঘর থেকে বাইরে চলে গেল, এর প্রভাব কী হলো?
আমি বললাম: আধুনিক সামাজিক ব্যবস্থায় নারীদের সারাদিন কর্মক্ষেত্রে ব্যস্ত থাকতে হয়। ফলে তারা বাধ্য হয় তাদের ছোট সন্তানদের ডে-কেয়ার সেন্টারে রেখে যেতে, যেখানে শিশুরা ভালোবাসা, যত্ন ও স্নেহ থেকে বঞ্চিত হয়। তারা বেড়ে ওঠে ভয়, উদ্বেগ ও অনিশ্চয়তায়, যেন তারা পিতামাতাহীন অনাথ।
যেহেতু পিতা-মাতা দুজনই কর্মজীবী, তারা সন্তানদের সঙ্গে গভীর সম্পর্ক এড়িয়ে চলে। পরিবর্তে, তারা সন্তানদের ব্যস্ত রাখে ভিডিও গেম, মোবাইল ও কৃত্রিম বিনোদনে। এর ফলে সন্তানদের মধ্যে পরিবারের প্রতি সংযুক্তি হারিয়ে যায়, তারা আবেগগত শূন্যতায় ভোগে, আচরণে বিকৃতি দেখা দেয়। তারা পরিবারের আনন্দ-বেদনায় অংশ নেয় না, দায়িত্বে সহযোগিতা করে না, ফলে সম্পর্কের দূরত্ব আরও বাড়ে।
তারা বলল: এই পরিস্থিতির নেতিবাচক প্রভাবটা ব্যাখ্যা করুন।
আমি বললাম: আমি তো আগেই বলেছি। এর ফলেই শিশুরা তাদের পিতা-মাতার সঙ্গে সেই নিরাপদ, গভীর সম্পর্ক গড়ে তুলতে পারে না, যা তাদের চরিত্র ও ব্যক্তিত্ব গঠনের জন্য অপরিহার্য। ফলে তারা দৃঢ় নৈতিকতা নয়, বরং খামখেয়ালি মানসিকতা অর্জন করে। তারা সর্বক্ষণ নজরদারি ও যত্নের দাবি করে, কারণ তাদের মধ্যে মনোযোগের অভাব, অন্তর্দ্বন্দ্ব, অতিসংবেদনশীলতা, আত্মবিশ্বাসহীনতা ও একাকিত্ব বাসা বাঁধে।