AkramNadwi

শিরোনাম : আজীবন শিক্ষার্থী হও।

শিরোনাম : আজীবন শিক্ষার্থী হও।
মানুষের জীবনের সবচেয়ে প্রজ্ঞাময় ও হৃদয়স্পর্শী সত্য হলো, তাকে মৃত্যুর শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত শিক্ষার্থী হয়ে থাকতে হবে। যে ব্যক্তি নিজের মন ও মস্তিষ্কের দরজা বন্ধ করে দেয়, নতুন কোনো ভাবনা বা আবিষ্কারকে “বিদআত” বা বিচ্যুতি বলে প্রত্যাখ্যান করে, আর প্রতিটি বিষয়ে শুধু চূড়ান্ত মত বা অনুসারীদের বইকেই মান্য মনে করে, সে আসলে মহান আল্লাহর দান—বুদ্ধি ও বিবেচনাশক্তির অবমূল্যায়ন করছে। বুদ্ধি ও চিন্তা এমন এক মহামূল্যবান সম্পদ, যা কেবল অনুসন্ধান, গবেষণা ও গভীর মননচর্চার মাধ্যমে অর্জন করা যায়। জ্ঞানের ক্ষেত্র এক সীমাহীন সমুদ্র, যার ঢেউ চলে যুক্তি ও প্রমাণের তরীতে ভর করে। পৃথিবী যদি মিলেমিশে যুক্তিহীন কথা বলে, তবে সেটি স্পষ্ট ভ্রান্তি; কিন্তু একজন মানুষও যদি যুক্তির প্রদীপ হাতে পথ চলে, তবে সে-ই সত্যের ওপর প্রতিষ্ঠিত, সে-ই সত্যবাদীদের দলের অন্তর্ভুক্ত, এবং সে-ই প্রকৃত জ্ঞানতান্ত্রিক মনোভাবের প্রতীক। শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে যারা পাঠ সমাপ্ত করে বের হয়, তাদের সবচেয়ে বড় দুর্বলতা হলো—তারা নিজেদের পূর্ণাঙ্গ শিক্ষিত ভেবে বসে। ইসলামী চিন্তার মুরব্বি হযরত মাওলানা সাইয়্যিদ আবুল হাসান আলী নদভী (রহ.) বলতেন: “ফারিগ হওয়া মানে জ্ঞানের পরিপূর্ণতা নয়, বরং এটি কেবল সেই চাবি যা তোমাকে প্রদান করা হয়েছে।” এই চাবিই তোমাকে নতুন দরজা খুলতে আহ্বান জানায়, অজানা প্রান্তরে পা বাড়াতে সাহস দেয়, এবং মনে করিয়ে দেয়, জ্ঞান অন্বেষণের পথ কোনোদিন থেমে থাকে না। যদি কোনো শিক্ষার্থী এই চাবির যথার্থ ব্যবহার না করে, তবে সে নিজের জ্ঞানের আসল শক্তি থেকে বঞ্চিত থাকে এবং মানসিক ও আত্মিক স্থবিরতার শিকার হয়। যখন আমি অক্সফোর্ডে আসি, হযরত মাওলানা (রহ.) আমাকে উপদেশ দিয়েছিলেন: “তোমার মস্তিষ্ক কখনো বন্ধ করো না। পশ্চিমাদের কাছ থেকে যথাসম্ভব শিক্ষা গ্রহণ করো, কারণ এ জ্ঞানের মাধ্যমেই তুমি তাদের মোকাবিলার যোগ্য হতে পারবে।” আমি যথাসাধ্য তাঁর উপদেশ বাস্তবায়নের চেষ্টা করেছি। গবেষক ও পণ্ডিতদের সেমিনারে অংশ নিয়েছি, তাদের গ্রন্থ অধ্যয়ন করেছি, এবং জ্ঞানচর্চার বিতর্ক ও আলোচনা সভাগুলোতে উপস্থিত থেকেছি। এই প্রক্রিয়া আমার অন্তর থেকে ভীতিবোধ ও পক্ষপাতিত্ব দূর করেছে। আমি উপলব্ধি করেছি—প্রতিটি জাতির কাছে রয়েছে মূল্যবান অভিজ্ঞতা ও আলোকিত চিন্তা, যা প্রত্যেক শিক্ষার্থীর জানা ও শেখা উচিত। জ্ঞান নামের এই অসীম সমুদ্র সমগ্র মানবজাতির জন্য এক যৌথ ভান্ডার। যে শিক্ষার্থী এই ভান্ডার থেকে বঞ্চিত থাকে, সে অন্ধকারে আবদ্ধ থেকে যায়। এই অনুসন্ধান ও শিক্ষার প্রেরণা ইতিহাসের পূর্ব-পশ্চিমের মহান চিন্তাবিদদের জীবনে উজ্জ্বলভাবে প্রতিফলিত হয়েছে। ইমাম আবু হানিফা (রহ.) সবসময় তাঁর শিক্ষকদের আসরে বসতেন। ইমাম শাফেয়ী (রহ.) মক্কা, মদিনা, ইয়েমেন ও মিশরের বিস্তীর্ণ অঞ্চল জুড়ে জ্ঞানের সন্ধানে সফর করেছেন, গবেষণা ও অধ্যয়নের আগুনে নিজের জীবন উৎসর্গ করেছেন। ইমাম বুখারী (রহ.) হাজার হাজার মাইল পথ পাড়ি দিয়েছেন, কঠিন দারিদ্র্য ও বিপদ সহ্য করে প্রতিটি হাদিসের সত্যতা যাচাই করেছেন, এবং পুরো জীবন উৎসর্গ করেছেন জ্ঞানসেবায়। তাঁদের এই ত্যাগ ও অধ্যবসায়ই প্রমাণ করে, জ্ঞান অর্জনের পথে ধৈর্য, কষ্ট ও নিবেদন অপরিহার্য। পরবর্তী যুগে শাহ ওলিউল্লাহ দেহলভী (রহ.)ও একই পথ অনুসরণ করেন। নিজ উচ্চ বিদ্যাবুদ্ধির পরেও তিনি নিরবচ্ছিন্ন অধ্যয়ন, গবেষণা ও চিন্তার নবীকরণে নিমগ্ন ছিলেন। তিনি হিজাজ সফর করেন, হারামাইন শরিফাইনের আলেমদের কাছ থেকে শিক্ষা গ্রহণ করেন, এবং মুসলিম উম্মাহর বুদ্ধিবিভ্রাট দূরীকরণে জীবন উৎসর্গ করেন। তাঁর জীবনের শ্রেষ্ঠ বৈশিষ্ট্য ছিল, তিনি কখনো নিজের জ্ঞানে গর্বিত হননি; বরং সর্বদা শেখার ও বোঝার জন্য প্রস্তুত থেকেছেন। পাশ্চাত্যের প্রজ্ঞাবানরাও এই নীতির অনুসারী ছিলেন। সক্রেটিস বলেছিলেন, “আমি জানি যে আমি কিছুই জানি না।” এই বিনয়ই তাঁকে দর্শনের জনক করেছে। তাঁর শিষ্য প্লেটো এবং পরবর্তীতে এরিস্টটল যুক্তি, পর্যবেক্ষণ ও প্রশ্নের ওপর জ্ঞানের ভিত্তি স্থাপন করেন। শতাব্দী পরে আইজ্যাক নিউটন যখন গতির ও মহাকর্ষের সূত্র আবিষ্কার করেন, জীবনের শেষ প্রান্তে বলেন, “আমি তো সমুদ্রতীরে খেলা করা একটি শিশু মাত্র; সত্যের বিশাল সাগর এখনো আমার সামনে।” আলবার্ট আইনস্টাইনও মৃত্যুর আগ পর্যন্ত গবেষণা ও অনুসন্ধান অব্যাহত রেখেছিলেন। তিনি বলতেন, “কল্পনাশক্তি জ্ঞানের চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ; কারণ জ্ঞান সীমিত, কিন্তু কল্পনা অসীম।” এই সব উদাহরণ আমাদের শেখায়, সবচেয়ে বড় আলেম ও চিন্তাবিদ তারা-ই, যারা সারাজীবন শিক্ষার্থী থেকেছেন। তাঁরা জ্ঞানকে ইবাদতের মর্যাদা দিয়েছেন, অনুসন্ধান ও গবেষণাকে জীবনের লক্ষ্য বানিয়েছেন, এবং অধ্যয়ন ও পরিশ্রমের কষ্ট কখনো এড়িয়ে যাননি। তাঁরা দেখিয়েছেন, জ্ঞান অর্জনের পথ সহজ নয়; এটি ধৈর্য, পরিশ্রম ও অবিচলতার দাবি রাখে। আজকের যুগে, যখন ডিগ্রিকেই জ্ঞান এবং সনদকেই প্রজ্ঞার পরিচয় মনে করা হয়, তখন প্রতিটি শিক্ষার্থীর জন্য এ শিক্ষা অত্যন্ত জরুরি যে, জ্ঞানার্জনের যাত্রা কখনো শেষ হয় না। সত্যিকার জ্ঞান হলো বিনয়, প্রশ্ন, গবেষণা ও অনুসন্ধানের সমন্বয়। যে হৃদয়ে শিক্ষার তৃষ্ণা নিভে যায়, তা ভারাক্রান্ত হয়ে পড়ে; আর যে মস্তিষ্ক অনুসন্ধানের আলো থেকে বঞ্চিত হয়, তা অন্ধকারে বন্দী হয়ে যায়। নিশ্চয়ই, যে মানুষ সারাজীবন শিক্ষার্থী হয়ে থাকে, সে কখনো বার্ধক্যে পৌঁছায় না; আর যার হৃদয়ে অনুসন্ধানের আলো জ্বলে, সে চিরজীবী হয়ে থাকে। যে ব্যক্তি জ্ঞানের এই অনন্ত সাগরে নিমগ্ন থাকে, সে পার্থিব জীবনের ক্ষণস্থায়ী আলো-ছায়ার ঊর্ধ্বে উঠে আত্মিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক উচ্চতায় পৌঁছে যায়। সে প্রতিটি মুহূর্তে নিজের জ্ঞানকে শাণিত করে, এবং তার আলোয় নিজের মন ও মস্তিষ্ককে উদ্ভাসিত রাখে। এই পঙক্তিগুলো প্রতিটি নিষ্ঠাবান শিক্ষার্থীর উৎসাহ ও অনুপ্রেরণার জন্য লেখা হয়েছে। আল্লাহ তাআলা আমাদের সবার প্রতি দয়া করুন, আমাদের উপকারী জ্ঞান দান করুন, এবং আমাদের সৎ ও পরহেজগার বানান। ——————– ক্যাটাগরি : শিক্ষা, তাজকিয়াহ, ইসলামি চিন্তাধারা, — ✍️ মূল : ড. মুহাম্মদ আকরাম নাদভী, অক্সফোর্ড। ✍️ অনুবাদ, যাচাই ও সম্পাদনা: মাওলানা মারজান আহমদ, সিলেট, বাংলাদেশ। — 🔗 অনূদিত মূল প্রবন্ধের লিংক: 👇 https://t.me/DrAkramNadwi/7568
শেয়ার করুন:

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *