AkramNadwi

শিরোনাম : আমেরিকান মানদণ্ডের পতন।

শিরোনাম : আমেরিকান মানদণ্ডের পতন।

আমেরিকানদের স্বপ্ন মিষ্টি—তাদের আকাঙ্ক্ষা মোহনীয়। তারা বাঁচে শুধু সেই স্বপ্নগুলো পূরণ করার জন্য, অস্তিত্বহীন থেকেও সেগুলোকে বাস্তব রূপ দেওয়ার জন্য। এই সব স্বপ্ন মূলত দুই বিষয়কে কেন্দ্র করে ঘুরে বেড়ায়।

প্রথমত—অর্থ উপার্জন, সম্পদ বৃদ্ধি, আরাম-আয়েশের সমস্ত উপকরণ জোগাড় করা, এবং বিনোদন ও আমোদের উপায়গুলো ভোগ করা।

দ্বিতীয়ত—একটি উত্তম ও আদর্শ জীবন গড়ে তোলা; এমন জীবন যেখানে মানবিক মূল্যবোধ ও নৈতিক আদর্শের চর্চা থাকবে—অন্যকে সাহায্য করা হবে, কাউকে কোনো ক্ষতি করা হবে না।

কিন্তু বাস্তবতা হলো, অধিকাংশ আমেরিকান কেবল প্রথম লক্ষ্যেই নিবিষ্ট—তারা এর বাইরে যেতে চায় না, যাওয়ার কথাও ভাবে না। আর যারা দ্বিতীয় লক্ষ্য অর্জনের চেষ্টা করে, তাদের সংখ্যা অল্প, তাদের দৃঢ়তাও ক্ষীণ। তদুপরি, তারাও সেই মূল্যবোধের প্রতি প্রয়োজনীয় যত্ন ও আন্তরিকতা দেখাতে পারে না।

আমেরিকানরা তাদের সেই স্বপ্ন—যাকে তারা “আমেরিকান ড্রিম” বলে—পুরো পৃথিবীতে ছড়িয়ে দিয়েছে। দুঃখের বিষয়, আজকের দিনে শিক্ষিত ও অশিক্ষিত—অধিকাংশ মুসলমানই সেই স্বপ্ন পূরণের পেছনে জীবন কাটাচ্ছে।

কিন্তু আমাদের জানতে হবে—এই দুনিয়ায় যে জীবনকে “সফল জীবন” বলা হয়, যেভাবে আমেরিকান স্বপ্নে তার মানদণ্ড নির্ধারিত, তা কখনোই আমাদেরকে পরকালে আল্লাহর রহমতের নিরাপদ আশ্রয়ে পৌঁছে দিতে পারে না।
একইভাবে, এই পৃথিবীতে যাকে “উত্তম” বা “সৎ জীবন” বলা হয়, সেটিও আল্লাহর রহমতে নিরাপদ প্রবেশের নিশ্চয়তা দেয় না।

আল্লাহর রহমতের নিরাপদ প্রবেশপথ কেবল একটিই—সেটি হলো আল্লাহর সঙ্গে একান্ত, স্থায়ী ও সচেতন সম্পর্ক।
আমাদের প্রত্যেকের জন্য ব্যক্তিগতভাবে এই স্থায়ী সম্পর্ক গড়ে তোলা জরুরি—শুধু আল্লাহর সঙ্গে, অন্য কারও সঙ্গে নয়। এর চেয়ে ভিন্ন বা কম কিছুই যথেষ্ট নয়, যদি আমরা পরম নিশ্চয়তা ও শান্তি নিয়ে আল্লাহর রহমতে প্রবেশ করতে চাই, তাঁর পুরস্কারের প্রত্যাশা রাখি।

তুমি হয়তো প্রশ্ন করবে—এটা কেন?
পরিশ্রম কি যথেষ্ট নয়?
সততার সঙ্গে অর্জিত সাফল্য কি যথেষ্ট নয়?
অন্যকে কষ্ট না দেওয়া, এমনকি নিজের ক্ষতির বিনিময়ে তাদের উপকার করা—এগুলোই বা কেন যথেষ্ট নয়?

তাহলে কেন আল্লাহ আমাদেরকে আদেশ দেন যেন আমরা একনিষ্ঠভাবে তাঁকে ইবাদত করি?
তিনি তো মহাবিশ্বের স্রষ্টা ও রিজিকদাতা—তাঁরই হাতে জীবনের সব রূপ ও ব্যবস্থা। এমন অবস্থায় তাঁরই বা কী প্রয়োজন ইবাদতের?

উত্তর হলো—তাঁর কোনো প্রয়োজন নেই।
কারণ, পরিপূর্ণ স্বয়ংসম্পূর্ণতা আল্লাহর সত্তার স্বাভাবিক গুণ।
প্রয়োজন আসলে সৃষ্ট জীবদেরই—ইবাদত আসলে তাদের নিজের কল্যাণের জন্য, তাদের নিজের লাভের জন্য।

কিন্তু আমরা সাধারণত ইবাদতকে সীমিত করে ফেলি কিছু বাহ্যিক চেহারায়—যেমন প্রশংসা করা, তাসবিহ পাঠ করা, দোয়া করা—মূলত আমাদের নানা চাওয়া-পাওয়ার জন্য, বিশেষত রিজিক ও মাফের আশায়।

কুরআন বহু জায়গায় বলেছে—আকাশ ও পৃথিবীর সব সৃষ্টিই আল্লাহর তাসবিহ করে, তা আমরা জানি বা না জানি, প্রকাশ্যে বা গোপনে, আলোয় বা অন্ধকারে।
এ থেকে আমরা বুঝতে পারি—ইবাদতের সবচেয়ে প্রাকৃতিক রূপ হলো সৃষ্টির এই স্বীকারোক্তি ও কৃতজ্ঞতা—যে তারা তাদের স্রষ্টার প্রতি ঋণী, তাঁরই দানভারে বেঁচে আছে, এবং তাঁরই প্রশংসা তাদের অস্তিত্বের অন্তরতম স্বর।

কিন্তু এই প্রাকৃতিক তাসবিহ ও কৃতজ্ঞতার পথে একমাত্র অন্তরায় আমাদের মানবিক প্রকৃতি—যা নিজেকে আলাদা করে চিনতে পারে।

মানুষের মধ্যে বিচার-বিবেচনা, যুক্তি-তর্ক, কল্পনা-চিন্তা, ভাষা ও প্রতীকের মাধ্যমে ভাব প্রকাশের ক্ষমতা—এই সবই অন্য সৃষ্টির চেয়ে অনেক সূক্ষ্ম, গভীর ও উন্নত।
এমনকি পার্থক্যটা এতটাই মৌলিক যে, তা কেবল “ডিগ্রির” নয়, বরং “ধরনের” পার্থক্য।

মানুষই একমাত্র প্রাণী, যে নিজের পরিবেশকে নিজের প্রয়োজন ও ইচ্ছা অনুযায়ী বদলে নিতে পারে।
এই ক্ষমতাই তাকে এমন এক ভ্রান্ত ধারণায় ফেলে যে, সে নাকি সৃষ্টিশীল—সে নাকি জগতে নতুন কিছু যোগ করতে পারে।

যেমন, যতদূর জানা যায়, মানুষের বাইরে কোনো প্রাণী রান্না করে না।
এই রান্না করার ক্ষমতা—যার ফলে আমরা খাবারের বৈচিত্র্য বাড়াতে পারি—আমরা একে “সৃজনশীলতা” ভাবি।
কিন্তু বাস্তবে এটি কেবল আমাদের শারীরিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক সক্ষমতার একটি প্রয়োগ, যা আল্লাহ আমাদের দিয়েছেন।

এই ভ্রান্ত আত্মবিশ্বাসে—যে আমরা স্বাধীন, আত্মনির্ভর—মানবজাতি বিপদের জায়গায় দাঁড়ায়।
তারা মনে করে, ব্যক্তিগত বা সামষ্টিকভাবে তারা জানে কী তাদের জন্য সর্বোত্তম।

এই মিথ্যা বিশ্বাসের ফলেই, মানুষের মধ্যে প্রাকৃতিক ইবাদতের সেই অনুভূতি দুর্বল হয়ে পড়ে;
আল্লাহর অনুগ্রহের প্রতি কৃতজ্ঞতা ও তাঁর প্রতি দায়বদ্ধতার স্বীকৃতি ম্লান হয়ে যায়।

ইসলামে নতুনভাবে প্রবেশ করা মানুষের জন্য সবচেয়ে কঠিন বিষয়গুলোর একটি হলো—যখন তারা এমন পিতা-মাতা, ভাই-বোন ও আপনজনদের শ্রদ্ধা করে, যাদের তারা জানে পৃথিবীর সবচেয়ে মহান, সদাচারী ও দয়ালু মানুষ হিসেবে। তারা কখনো তাদের কোনো মন্দ অভিপ্রায় বা খারাপ কাজের স্মৃতি মনে করতে পারে না। অথচ ইসলামে প্রবেশের পর যখন তাদের সামনে আসে সেই বাস্তবতা—যে, আল্লাহর ইবাদত না করার কারণে এই সৎ, প্রিয় মানুষগুলো পরকালের শান্তির আবাসে প্রবেশ করতে পারবে না—তখন তা তাদের অন্তর ভেঙে দেয়।

এমন ভাবনা শুধু তাদের নয়, নবীজির সাহাবারাও (রাদিয়াল্লাহু আনহুম) এই বেদনাকে অনুভব করেছিলেন। এমনকি নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নিজেও এর সম্মুখীন হয়েছিলেন—যখন তিনি তাঁর প্রিয় চাচার প্রতি গভীর ভালোবাসা ও কৃতজ্ঞতা অনুভব করতেন, যিনি তাঁকে জীবনের নানা বিপদে রক্ষা করেছিলেন। কিন্তু তিনি চাইলেও তাঁর চাচার জন্য আল্লাহর দয়ার নিশ্চয়তা আনতে পারেননি।

কুরআন স্পষ্ট ভাষায় ঘোষণা করে—এই দুনিয়ার ভালোবাসা ও রক্তের সম্পর্ক, যা এখানে এত দৃঢ় বলে মনে হয়, সেগুলো পরকালে সম্পূর্ণ ছিন্ন হয়ে যাবে। মানুষ তখন একা একা আল্লাহর সামনে দাঁড়াবে, নিঃসঙ্গভাবে।
এ সত্য নিঃসন্দেহে ভয়াবহ ও কঠিন। এমনকি কারও কারও মনে এর ফলে সন্দেহ ও বিদ্রোহের ভাবও জাগতে পারে—কেউ কেউ সাহস করে এমন কথাও বলে ফেলে (আল্লাহ তাদের হেদায়েত দিন), “যদি আল্লাহ ইবাদত দাবি করেন, তবে তিনি ইবাদতের উপযুক্ত নন।”

কিন্তু বাস্তবতা হলো—একটি নৈতিক জীবন—যেখানে মানুষ সৎভাবে চলে, অন্যের ক্ষতি করে না, ন্যায় ও করুণার চর্চা করে—এইসব দিয়েও পরকালে সফলতা অর্জিত হয় না।
মানবপ্রচেষ্টার সকল সৎ কাজের লক্ষ্য হতে হবে সেই দিন—যেদিন মানুষ রবুল আলামিনের সামনে দাঁড়াবে; যেদিন মানুষের কাছে একমাত্র গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হবে আল্লাহর রায়; যেদিন তাঁর অনুমতি ছাড়া কেউ কথা বলতে পারবে না।

আমরা কোনো কাজকে ভালো বা উপকারী বা দয়াময় বলেই মেনে নিতে পারি না, যতক্ষণ না আমরা সেই কাজের পেছনে থাকা চেতনা ও উদ্দেশ্যকে বিশ্লেষণ করি—যে, আমাদের সব শক্তি ও ক্ষমতা আসলে আল্লাহরই দান, তাঁরই রহমত ও রুবুবিয়তের উপর নির্ভরশীল।

যে কাজ আমরা সচেতনভাবে বেছে করি—যেখানে ইচ্ছা ও বিকল্প থাকে—সেই সব কাজের অন্তরে থাকা উচিত এক সজাগ ও আন্তরিক নিয়ত: আল্লাহর সন্তুষ্টি ও রহমত অর্জনের প্রয়াস।
যদি আমাদের আচরণের প্রেরণা এই নিয়ত না হয়—বরং নিজেকে খুশি করা বা অন্য কোনো সত্তাকে খুশি করার উদ্দেশ্য হয়—তাহলে সেই আচরণ আমাদের পরকালের সফলতায় সরাসরি ভূমিকা রাখবে না।

যে ব্যক্তি আল্লাহ ছাড়া অন্য কারও জন্য কাজ করে, অথচ পুরস্কারের আশা রাখে, তার অবস্থা সেই ব্যক্তির মতো—যে নিজের পরিশ্রমের মজুরি চায় এমন কারও কাছ থেকে, যার জন্য সে কোনো কাজই করেনি।

আমাদের মানবিক সমস্যার মূলে আছে এক বিভ্রম—আমরা মনে করি, আমাদের অভিজ্ঞতা ও বিশ্লেষণই ঠিক নির্ধারণ করে দেয় কী সঠিক, কী ভুল।
কিন্তু সত্য হলো—মানুষের সিদ্ধান্ত সবসময় অনুমান ও আন্দাজের উপর নির্ভরশীল।
আমরা দেখেছি, কখনো যেটা ভালো মনে হয়, তা পরিণামে ক্ষতিকর হয়; আবার যেটা খারাপ মনে হয়, তা ভবিষ্যতে কল্যাণ বয়ে আনে।

চূড়ান্ত বিচার—একটি জীবন সৎ না অসৎ, সফল না ব্যর্থ—এই নির্ধারণ একমাত্র আল্লাহর সিদ্ধান্ত ও তাকদিরের উপর নির্ভরশীল।
অতএব, আমাদের জানা উচিত—সফলতা নির্ধারিত হয় আমাদের রায়ের দ্বারা নয়, বরং আল্লাহর রায়ের দ্বারা।
এই সত্যকে হৃদয় দিয়ে মেনে নেওয়াই “ইসলাম”।

তবে এই ধরনের ইসলামে স্থির থাকা সহজ নয়—বরং অত্যন্ত কঠিন।
আমরা প্রায়ই “বিসমিল্লাহ”, “ইন-শা-আল্লাহ”, “মা-শা-আল্লাহ”, “আলহামদুলিল্লাহ” ইত্যাদি শব্দ উচ্চারণ করি—কিন্তু এগুলোর মাধ্যমে আমরা কেবল এক সচেতন ইসলামের অভাব পূরণ করার চেষ্টা করি।

আমাদের জীবন পরিস্থিতি, ব্যস্ততা, নানা জটিলতার ঘূর্ণিতে আমরা খুব কমই নিজেদের ফিরিয়ে আনতে পারি সেই গভীর সচেতনতার জায়গায়—যেখানে মানুষ নিজেকে আল্লাহর উপর নির্ভরশীল হিসেবে অনুভব করে।

এই কারণেই, শ্রেষ্ঠ ইবাদতের শুরু এবং শেষ—উভয়ই ধৈর্য ও ক্ষমা প্রার্থনা।
কারণ আমরা নিশ্চিত নই—আমাদের কাজ আসলে কাঙ্ক্ষিত ফল বয়ে আনবে কি না।
আমরা আমাদের নিয়ত ও প্রেরণাকে নিখুঁতভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে পারি না, পুরোপুরি বুঝতেও পারি না।

তবুও আমাদের আশার অবলম্বন হলো—আল্লাহর প্রতিশ্রুতি।
তিনি ক্ষমা করতে ভালোবাসেন, তাঁর বান্দার প্রতি দয়া করতে সন্তুষ্ট হন।
আর তাঁর রহমতই তাঁর শ্রেষ্ঠ গুণ।

চিন্তা করো—এই দুনিয়ায় জীবন ও টিকে থাকা কি আদৌ সম্ভব হতো, যদি রহমত ও মাগফিরাত আল্লাহর পূর্বগুণ না হতো?

অতএব, সফল জীবন সেই—যে জীবন আল্লাহর ক্ষমা ও রহমত অর্জনের জন্য একান্ত আন্তরিকভাবে চেষ্টা করে,
এমনভাবে যে মনে হয়—সে যেন সত্যিই আল্লাহর ক্ষমা ও দয়ার উপযুক্ত হয়ে উঠেছে।

——————–

ক্যাটাগরি : তাজকিয়াহ, আখলাক, উপদেশ, সমালোচনা,

✍️ মূল : ড. মুহাম্মদ আকরাম নাদভী, অক্সফোর্ড।
✍️ অনুবাদ, যাচাই ও সম্পাদনা: মাওলানা মারজান আহমদ, সিলেট, বাংলাদেশ।

🔗 অনূদিত মূল প্রবন্ধের লিংক: 👇
https://t.me/DrAkramNadwi/7492

শেয়ার করুন:

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *