শিরোনাম : দাজ্জাল
——
দাজ্জাল সম্পর্কে এমন কোনো নির্ভরযোগ্য তথ্য নেই, যা মানুষকে দায়িত্বশীলভাবে তার আচরণ বা নীতি পরিবর্তনে উদ্বুদ্ধ করতে পারে। তাহলে প্রশ্ন হলো—রাসুল ﷺ কেন দাজ্জাল সম্পর্কে কিছু তথ্য দিলেন, যদিও তা সীমিত? এই প্রশ্নের উত্তর শুরু হয় এখান থেকে যে, মানুষের আসলে এই ধরনের বিষয়ের সম্পর্কে জানার প্রয়োজন কী?
মানবজীবনের মূল অভিমুখ হওয়া উচিত আল্লাহর বিচার দিবসের দিকে। মানুষের জীবনের প্রকৃত মূল্য নির্ধারিত হয় না এই জীবন থেকেই; কারণ এই জীবনের পূর্বাবস্থা মানুষ জানে না—তা গায়বের অন্তর্গত; এবং এই জীবনের পরিণতিও মানুষ জানে না—সেটাও মূলত গায়ব।
তবুও মানুষ স্বভাবতই আত্মগরিমায় ভোগে—ভাবতে চায় তার জীবনের পরিণতি যেন কোনোভাবে গোটা বিশ্বের শেষ পরিণতির সঙ্গে তুলনীয় হয়।
অর্থাৎ, নিজের পরকালের হিসাবের চিন্তা করতে গিয়ে মানুষ প্রায়ই পুরো বিশ্বের অন্তিম পরিণতি নিয়ে উৎকণ্ঠায় ভোগে। ফলে, নিজের নিয়ত ও কর্মের গুণমান নিয়ে ভাবার বদলে, যা একদিন প্রকাশিত হবে তার কাছে, সে ব্যস্ত হয়ে পড়ে সবার শেষের গল্পে।
এটাই আসলে কিয়ামতের লক্ষণ নিয়ে বাড়াবাড়ির প্রধান ক্ষতি—মানুষ তার নিজস্ব পরিণতি ও তার প্রস্তুতি থেকে বিমুখ হয়ে যায়।
ধরা যাক, ইসরাইলিরা আল-আকসা মসজিদ ও হারাম ধ্বংস করে সেখানে নিজেদের মন্দির গড়ার সিদ্ধান্ত নিল। কোনো দায়িত্বহীন বক্তা হয়তো একে “শেষ সময়ের নিদর্শন” বলে ব্যাখ্যা করবে। এ ধারণা টিকিয়ে রাখতে তাকে বহু অতীত ঘটনার নতুন ব্যাখ্যা দিতে হবে এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে কল্পনাও বুনতে হবে, যাতে এই ঘটনাকে শেষ সময়ের অংশ হিসেবে মানানো যায়।
এই পুরো প্রচেষ্টা মানুষকে আসল দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেয়—ইসরাইলিদের এই সিদ্ধান্তের মোকাবিলায় করণীয় কী, সেটি ভাবা থেকে। বরং তারা ভাবে—সবকিছু শেষ হয়ে আসছে, সবকিছু আল্লাহর হাতে, আমাদের করণীয় শুধু ঈমান নবায়ন করা আর বেশি বেশি নামাজ পড়া।
এই বিভ্রান্তিই আমি বোঝাতে চাইছি—এই ধরনের আলোচনার “বিক্ষিপ্তকারী প্রভাব” হিসেবে।
একবার ভাবো—তুমি যদি দাজ্জাল সম্পর্কিত সহীহ ও দুর্বল হাদিসগুলো নিয়ে কোনো আলেমের দীর্ঘ বক্তৃতা দুই ঘণ্টা শুনো, তারপর কী হয়?
তুমি কি নিজের ব্যাপারে নতুন করে ভাবো?
তোমার নিয়ত কি বদলায়?
তোমার কোনো আমল—ইবাদত বা দুনিয়াবি কাজ—কী পরিবর্তিত হয়?
উত্তর একটাই: না।
তাহলে কেন কেউ এই বিষয়ে বক্তৃতা প্রস্তুত করবে?
উত্তর হলো—দাজ্জাল সম্পর্কে প্রচুর ভুল তথ্য ও ভ্রান্ত ধারণা ছড়িয়ে পড়েছে, এবং অসংখ্য মানুষ এই ভুল তথ্যের ভিত্তিতে বর্তমান ঘটনাগুলিকে “দাজ্জালের আগমনের লক্ষণ” হিসেবে ব্যাখ্যা করে।
ফলে, তারা শুধু নিজেদের দায়িত্ব থেকে বিচ্যুত হয় না, বরং ভুল ধারনার ভিন্ন ভিন্ন দলের সমর্থক হয়ে পড়ে—প্রত্যেকে ভাবে, তার দলই বেশি সচেতন, বেশি প্রস্তুত, আর অন্যরা অজ্ঞ। অথচ বাস্তবে উভয়ই সমানভাবে বিভ্রান্ত ও বিভ্রান্তিকর।
এর চেয়েও খারাপ হলো—তারা স্বাভাবিক ঘটনাগুলোকেও প্রতীকীভাবে ব্যাখ্যা করতে শুরু করে, আর তাই সেসব ঘটনার সঠিক প্রতিক্রিয়া নির্ধারণে ভয়ংকর ভুল করে বসে।
অতএব, আমার মতে, এই ধরনের বিষয় নিয়ে দায়িত্বশীল আলোচনা করতে হলে তিনটি জিনিস জরুরি—
১️⃣ নির্ভরযোগ্য ও অনির্ভরযোগ্য তথ্যের মধ্যে স্পষ্ট পার্থক্য করা,
২️⃣ রাসুল ﷺ যে মনোভাব ও কর্মপন্থা শিক্ষা দিয়েছেন, তা স্পষ্টভাবে ব্যাখ্যা করা,
৩️⃣ মানুষকে শেখানো, এই তথ্যগুলিকে কীভাবে তারা দৈনন্দিন ইবাদত, দোয়া ও আচরণে সঠিকভাবে ব্যবহার করবে।
———–
ক্যাটাগরি : আত্মসমালোচনা, নাসিহাহ, হাদিস, তাজকিয়াহ।
—
✍️ মূল : ড. মুহাম্মদ আকরাম নাদভী, অক্সফোর্ড।
✍️ অনুবাদ, যাচাই ও সম্পাদনা: মাওলানা মারজান আহমদ, সিলেট, বাংলাদেশ।
—
🔗 অনূদিত মূল প্রবন্ধের লিংক: 👇
https://t.me/DrAkramNadwi/7427