আমি যখন অক্সফোর্ড নগরীর রাস্তায় ঘুরছিলাম—তার বিখ্যাত কলেজ আর বিভাগগুলোর মাঝে, সেই বিদ্যা ও চিন্তায় পূর্ণ প্রাঙ্গণগুলোতে—হঠাৎ আমার দৃষ্টি থেমে গেল সেই সুবিখ্যাত গ্রন্থাগারে, বডলিয়ান লাইব্রেরি।
সে এমন এক গ্রন্থাগার, যার বাতাসে শতাব্দীর ঘ্রাণ মিশে আছে, আর যার নীরব করিডোরে যেন শোনা যায় চিন্তা ও জ্ঞানের মৃদু গুঞ্জন—যেখানে বুদ্ধি ও প্রজ্ঞা লড়ে চলে মনের যুদ্ধ, তর্ক, অনুসন্ধান আর উপলব্ধির লীলায়।
আমি সেখানে কিছুক্ষণ স্তব্ধ দাঁড়িয়ে রইলাম। তাকিয়ে রইলাম তাকের পর তাক বইয়ের দিকে—বিজ্ঞান ও শিল্পের নানা শাখা, জ্ঞানের রত্ন আর বুদ্ধিবৃত্তির গোপন ভাণ্ডার। আমার মনে একসঙ্গে ভরে উঠল বিস্ময় আর বিনয়—মুগ্ধতা আর শ্রদ্ধার মিশ্র এক আবেশ।
হঠাৎ, সেই চিন্তার নিমগ্নতায় ডুবে থাকা অবস্থায়, দেখি—গ্রন্থাগারের প্রাঙ্গণে ধীরে ধীরে হেঁটে যাচ্ছে এক গাধা!
আমি বিস্মিত হয়ে উঠলাম। মনে মনে বললাম,
“এ কেমন কথা! জ্ঞানের মাটিতে, প্রজ্ঞার প্রাঙ্গণে, এই চারপেয়ে প্রাণী কী করছে?”
আর মানুষরা কীভাবে তাকে অবলীলায় এমন এক স্থানে ঘুরতে দিচ্ছে যেখানে কেবল জ্ঞান ও সভ্যতা বিচরণ করে?
কৌতূহল আর মজা মিশিয়ে আমি তার দিকে এগিয়ে গেলাম, আর ঠাট্টার ছলে বললাম—
“হে গাধার সন্তান গাধা!”
কিন্তু সে শান্ত ও গম্ভীর কণ্ঠে উত্তর দিল—
“হ্যাঁ, আর তুমি, হে মানুষের সন্তান মানুষ!”
আমি চমকে উঠলাম, কিছুটা রাগও হলো। বললাম,
“এই কী কথা? তুমি এমন জবাব দাও কেন? আমার কি কোনো নাম নেই, কোনো পরিচয় নেই—যা আকাশের নক্ষত্রের মতো চিনে নেওয়া যায়?”
গাধাটি হালকা বিদ্রূপভরা সুরে বলল—
“হে আদমসন্তান! আমারও তো এক পরিচয় আছে। কিন্তু তোমরা মানুষ এতটাই অহংকারে ভরা যে আমাদের মতো প্রাণীদের সবাইকে এক রকম ধরে নাও—একটাকে অপরের মতো, আলাদা কোনো সত্তা নয়, কোনো বৈশিষ্ট্য নয়। অথচ আমরা—তোমাদের মতোই—বিভিন্ন জাতি ও চরিত্রের অধিকারী।”
আমি কিছুটা লজ্জিত হয়ে, কিছুটা কৌতূহলী হয়ে জিজ্ঞাসা করলাম—
“তাহলে তোমাকে কী নামে ডাকব?”
সে বলল—
“আরবদের কাছ থেকে শিখো শিষ্টাচার। তারা ভাষার মানুষ, বাকশিল্পের অধিপতি। তারা শেখাতেন—যাকে সম্মান করতে চাও, তাকে কুনইয়ায় (সম্বোধনের উপাধিতে) ডাকো, কারণ কুনইয়া সম্মানের প্রকাশ। শুনোনি কি তাদের কবির সেই পংক্তি?
‘আমি তাকে কুনইয়া দিয়ে ডাকি—সম্মান জানানোর জন্য,
ডাকনাম দিয়ে নয়—কারণ তাতে অসম্মান।
এভাবেই আমি শিক্ষা পেয়েছি, এটাই আমার চরিত্রের অঙ্গ;
কারণ ভদ্রতা—হৃদয়ের প্রকৃত অলংকার।’
আমি বললাম—
“তাহলে তোমাদের কুনইয়াগুলো কী রকম?”
সে বলল—
“আমাদেরও আছে নানা কুনইয়া—আমাদের মধ্যে কেউ আবু জিয়াদ, কেউ আবু নাফি, কেউ আবু সাবির নামে পরিচিত।”
আমি হেসে বললাম—
“তাহলে সেই কবিই বুঝি তোমাকেই উদ্দেশ করে বলেছিলেন—
‘জিয়াদ, আমি জানি না তোমার পিতা কে,
তবে গাধাই নিশ্চয় তোমার বাবা—আবু জিয়াদ!’”
গাধাটি দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, গলায় যেন তিক্ততার ভার—
“এই জন্যই তো আমরা প্রাণীরা তোমাদের মানুষদের অপছন্দ করি। কারণ তোমাদের জীবনে গালি, কটাক্ষ, অপবাদই যেন স্বভাব হয়ে গেছে। একে অপরকে হেয় করা তোমাদের অহংকারের অংশ। অথচ আমরা কাউকে গালি দিই না, কারো নিন্দায় সময় নষ্ট করি না। বলো তো, অপবাদে ক্ষতি কার হয়—শোনার, না বলার? গালিই তো কেবল গালিদাতার মুখেই দাগ ফেলে।”
আমি একটু আত্মসম্মান ফিরে পেতে চাইলাম, বললাম—
“থাক, এসব বাদ দাও। তোমরা আমাদের সমান কী করে হবে? আমরা মানুষ—আমরা পড়তে ও লিখতে পারি। তোমার পিঠে বই চাপিয়ে রাখা যায় বটে, কিন্তু তুমি তো তার কিছুই বুঝতে পারো না!”
সে শান্তভাবে জিজ্ঞাসা করল—
“তাহলে তোমরা বই থেকে কী লাভ পাও?”
আমি বললাম—
“আমরা তাতে জ্ঞান অর্জন করি, প্রজ্ঞা শিখি।”
সে বলল—
“আর প্রজ্ঞার মূল কী?”
আমি বললাম—
“নিয়ামতের প্রতি কৃতজ্ঞতা আর কষ্টের সময় ধৈর্য।”
এই কথা শুনে গাধাটি এমনভাবে হেসে উঠল যে তার হাসি চারপাশে গুঞ্জন তুলল। যেন অন্তরের গভীর থেকে এক তিক্ত রসিকতা উছলে উঠছে।
আমি বিরক্ত হয়ে বললাম—
“হে আবু জিয়াদ! কী নিয়ে এমন হাসছো? আমায় নিয়ে উপহাস করছো নাকি?”
সে বলল—
“না, তোমার কথাতেই হাসি পেল। বড় অদ্ভুত শোনাল। তোমরা বই পড়ো, সারাজীবন কাটাও পাতার ভেতর ডুবে, বলো—প্রজ্ঞা শিখছো, কিন্তু তোমাদের প্রভু নিজেই বলেন:
‘আমার বান্দাদের মধ্যে খুব কমই কৃতজ্ঞ।’
আর বলেন,
‘তোমরা খুব অল্পই কৃতজ্ঞ হও।’
এমনকি বলেন,
‘মানুষ তো অতি অকৃতজ্ঞ।’
তিনি তোমাদের সম্পর্কে এ-ও বলেন—
‘মানুষকে সৃষ্টি করা হয়েছে অধীর ও উদ্বিগ্ন স্বভাবের;
বিপদে সে ব্যতিব্যস্ত হয়ে পড়ে,
আর সুখ এলে তা আঁকড়ে ধরে রাখে।’
তারপর সে উপদেশমিশ্রিত গম্ভীর সুরে বলল—
“আমরা কিন্তু সর্বদা কৃতজ্ঞ, যা পাই তাতেই সন্তুষ্ট। অকৃতজ্ঞতা আমাদের স্বভাবে নেই। কষ্টে ধৈর্য রাখি, অভিযোগ করি না, বিরক্ত হই না। আমাদের জীবনে নেই হাহাকার, নেই আফসোস। এসব গুণ পাওয়া যায় না বই উল্টে-পাল্টে বা পাতা গুনে—এগুলো জন্মায় ভালো স্বভাব আর পরিষ্কার হৃদয় থেকে।”
আমি লজ্জায় মাথা নিচু করলাম। মুখ ফিরিয়ে নিলাম তার দিক থেকে।
তখন সে শান্তভাবে চলে যেতে যেতে বলল—
“শোনো, হে আদমসন্তান! তোমরা ডুবে আছো পাপ আর অন্যায়ের স্রোতে, আর আমরা—আলহামদুলিল্লাহ—সেই সব থেকে মুক্ত। তাহলে বলো তো, সম্মান কার প্রাপ্য? যদি সন্দেহ হয়, তবে ফিরে যাও আবু বকর ইবনুল মারজুবানের বইয়ের দিকে: ‘যে কুকুরেরা অনেক পোশাকপরা মানুষের চেয়েও শ্রেষ্ঠ।’”
তারপর আবু জিয়াদ শান্ত ও মর্যাদাপূর্ণ ভঙ্গিতে চলে গেল।
আমি রয়ে গেলাম একা—লজ্জা ও ভাবনায় নিমগ্ন। নিজের মধ্যে তাকিয়ে নিজেকেই প্রশ্ন করলাম—
“আসলে কে শ্রেষ্ঠ?
সে ধৈর্যশীল, কৃতজ্ঞ গাধা?
না আমি—এই অহংকারী, অকৃতজ্ঞ, অধীর মানুষ?”
———- ———-
ক্যাটাগরি : আখলাক, তাজকিয়াহ, উপদেশ, সমালোচনা।
—
✍️ মূল : ড. মুহাম্মদ আকরাম নাদভী, অক্সফোর্ড।
✍️ অনুবাদ, যাচাই ও সম্পাদনা: মাওলানা মারজান আহমদ, সিলেট, বাংলাদেশ।
—
🔗 অনূদিত মূল প্রবন্ধের লিংক: 👇
https://t.me/DrAkramNadwi/7301