AkramNadwi

শিরোনাম : সর্বোত্তম প্রার্থনা।

শিরোনাম : সর্বোত্তম প্রার্থনা।

তারা বলল—

“আমরা তো তোমাকে সবসময় দেখি, তুমি দু’হাত তুলে তোমার রবের দিকে ফিরে যাচ্ছ, তাঁর সাথে নীরবে কথা বলছ, আকুতি জানাচ্ছ, বারবার মিনতি করছ একনিষ্ঠভাবে, কোনো ক্লান্তি বা বিরক্তি ছাড়াই। বলো তো, তুমি সবচেয়ে উত্তম কী চেয়েছ তাঁর কাছে?”

আমি বললাম—
“একবার আমি গভীর তীব্রতায়, অন্তরের পরম অনুরোধে তাঁর কাছে এমন এক চাওয়া জানিয়েছিলাম—যা সব চাওয়াকে ছাড়িয়ে যায় মর্যাদায়, মূল্যে, মহিমায় ও মর্যাদার স্তরে। আমি মনে করি, আমি কখনোই তার চেয়ে উৎকৃষ্ট কোনো প্রার্থনা করিনি।”

তারা বলল—
“তুমি তো আমাদের কৌতূহল জাগিয়ে তুললে! তাহলে বলো, সেই প্রার্থনা কী ছিল?”

আমি বললাম—
“আমি তাঁর কাছে গোনাগুনতি কিছু মুদ্রা চাইনি—না রৌপ্য, না সোনা; চাইনি বিপুল ধনসম্পদ বা বিশাল ঐশ্বর্য, চাইনি কোষাগার ভর্তি রত্নরাজি বা কারূনের ধনভাণ্ডার আমার করে দিতে।”

তারা বলল—
“তোমার মতো মানুষ কি কখনো কারূনের ধনের দিকে চোখ তুলতে পারে? তুমি তো ভালো করেই জানো তার পরিণাম আল্লাহ তাঁর কিতাবে কীভাবে বর্ণনা করেছেন!”

আমি বললাম—
“না, আমি তো আমার রবকে বলিনি যেন আমাকে কারূনের ধনসম্পদ দেন এবং পরে তাঁর পথে তা ব্যয় করার ক্ষমতাও দেন। আমি চাইনি যেন তিনি আমাকে হাতেমের মতো দানশীল করেন, বা হাসান ও হুসাইন কিংবা আবদুল্লাহ ইবনু জাফারের মতো উদার ও খোলামনের বানিয়ে দেন।

আমি কোনো পদ-মর্যাদা বা উপাধি চাইনি, কোনো মন্ত্রণালয় বা রাষ্ট্রপ্রধানত্বও নয়; চাইনি আছাফ হাকিমের মতো প্রজ্ঞা, রাজা ইবন হাইওয়ার মতো মর্যাদা, নিযামুল মুলক তুসীর মতো রাজকীয় মহিমা, বা ইবনুল আমীদ ও সাহিব ইবন আব্বাদের মতো লেখনীর গৌরব, কিংবা আয়াজ ও আবুল ফজলের মতো জ্ঞানী রাজপদ।

আমি চাইনি কোনো রাজত্ব বা ক্ষমতার সিংহাসন—
না উমাইয়া বা আব্বাসীয় খিলাফত,
না উসমানীয় সুলতানাত,
না সালাহুদ্দীনদের, না মুঘলদের, না মাহমুদ গজনবীর, না শিহাবুদ্দীন ঘোরীর রাজ্য,
বরং এমনকি সুলায়মান ইবন দাউদ (আ.)-এর রাজ্যও নয়।

আমি চাইনি কোনো বিরল ইজাযাহ বা উঁচু সনদ,
না কোনো দীর্ঘজীবী শায়খের সাক্ষাৎ,
না কোনো মহাশিক্ষকের কাছ থেকে উচ্চ সনদপ্রাপ্তির সৌভাগ্য।
না এমন কোনো মুহাদ্দিসের সোহবত,
না মুহাম্মদ রশিদ, মজদ মক্কী বা মুহাম্মদ বিন আবি বকর বাদীবের মতো জ্যোতির্ময় পরিমণ্ডল।
আমি চাইনি দ্রুত পাঠে খ্যাত আবদুল্লাহ আত-তুম বা মুহাম্মদ জিয়াদের কৃতিত্ব।
না আহমদ আশূরের মতো হাদিসের সূক্ষ্ম পথে জ্ঞান ও বিশদ বোঝাপড়া,
না নেজাম আল-ইয়াকুবি ও মুহাম্মদ ইবন নাসির আল-আজমির মতো গল্প ও উপাখ্যানের ভাণ্ডার।
না এমন মাপা বুদ্ধিমত্তা ও ভারসাম্য যা ছিল উমর নাশুকাতির।

আমি চাইনি ইতিহাসবিদ মিজ্জি, যাহাবি, বা বরযালির উচ্চ আসন;
না ইবন তায়মিয়ার মতো প্রজ্ঞা, দূরদৃষ্টি, অসাধারণ বুদ্ধি, জ্ঞান, ফিকহ, তর্ক, সংস্কার ও জিহাদের নেতৃত্ব।
না ইবন হাযর ও ইবন নাসিরুদ্দীনের মতো হাদিসের সূক্ষ্মতা জ্ঞানে নিপুণতা।
না হাসান আল-বান্না, ইবন বায, আবুল হাসান নাদভী ও ইবন উছাইমিনের মতো হৃদয়ের পবিত্রতা, আন্তরিকতা ও আল্লাহর পথে আহ্বানের দৃঢ়তা।
না আবদুল ফাত্তাহ আবু গুদ্দার মতো কোমলতা, ভদ্রতা, সৌন্দর্য, শিষ্টাচার ও বাকশৈলীর প্রজ্ঞা।

আমি চাইনি ইবরাহিম নাখাঈ ও আবু হানিফার মতো ফিকহে প্রজ্ঞা,
না শুবা ও মালিকের মতো নিখুঁততা ও সতর্কতা,
না মুহাম্মদ ও শাফেয়ীর মতো তর্কশক্তি,
না ইবন মাহদি ও ইবন হাম্বলের মতো সুন্নাহর পতাকা উঁচু রাখার কৃতিত্ব,
না ইবনু মইন, ইবনুল মাদিনী, বুখারি, রাজি ও দারাকুতনির মতো রিজালবিদ্যায় পারদর্শিতা।

না চেয়েছি সাঈদ ইবন মুসাইয়্যিব ও উমর ইবন আবদুল আজিজের মতো ন্যায়নিষ্ঠা,
না হাসান বসরির মতো আত্মসংযম ও অন্তর্দৃষ্টি,
না ইবন সিরিনের মতো সততা,
না আইয়ুব সাখতিয়ানের মতো বিনয় ও নবীপ্রেম,
না সুফিয়ান সাওরির মতো ভয় ও মৃত্যু-স্মরণ,
না মুহাম্মদ ইসমাঈল শহীদ ও রশীদ আহমদ গাংগুহির মতো সুন্নাহ প্রচার ও বিদআত দমন।”

তারা বলল—
“তুমি আমাদের বিস্ময়ে ভরিয়ে দিলে!
তুমি কি তবে এই মহৎ ব্যক্তিদের পথের অনুগামী নও,
তাদের জীবনদীপে নিজের পথ খুঁজো না?
তারা কি তোমার প্রিয়জন ও গর্ব নয়,
যাদের স্মরণে তুমি উল্লাসে ভরে ওঠো?”

আমি বললাম—
“অবশ্যই, তারা আমার প্রিয়জন, আমার আদর্শ।”

তারা বলল—
“তবুও তুমি কেন তাদের সবার পথ থেকে এমন ভিন্ন দিকে গেলে?
তুমি তো সুফিদের অতিরঞ্জিত দাবির সমালোচক,
তবু এমন উচ্চ স্বপ্নের আকাঙ্ক্ষা কীভাবে করলে?”

“আমরা তো কেবল সহজ প্রশ্ন করেছিলাম,
তুমি কেন আমাদের এত দীর্ঘ পথে নিয়ে গেলে!
একটি বাক্যে বললেই হতো।”

আমি বললাম—
“আমি দীর্ঘ বলেছি শুধু এ জন্য যে,
তোমরা যেন আমার প্রার্থনার মর্যাদা ও মহিমা অনুধাবন করতে পারো।”

তারা বলল—
“ঠিক আছে, এখন সংক্ষেপে বলো।”

আমি বললাম—
“কাছে এসো, আমি তোমাদের কানে কানে বলি—
আমি আল্লাহর কাছে যা চেয়েছি তা হলো—
তিনি যেন আমাকে তাঁর সন্তুষ্ট দাস বানান,
আমাকে ইবাদতের জীবনে বাঁচান,
ইবাদতের অবস্থায় মৃত্যুবরণ করান,
আর ইবাদতের পর ইবাদতে আমার পথ দীর্ঘতর করেন।
আমি চাইনি তিনি আমাকে আমার দাসত্ব থেকে মুক্ত করুন,
না তাঁর বন্ধনের দড়ি থেকে ছাড়িয়ে দিন,
কারণ তাঁর দাসত্ব—
সব ধরনের স্বাধীনতার চেয়ে উত্তম, শ্রেষ্ঠ,
আরো উচ্চ—
লক্ষ লক্ষ গুণ বেশি!

হে আল্লাহ!
আমি আপনারই দাস,
আপনার এক দাসের সন্তান,
আর এক দাসীর সন্তান।
আমার কপালের নিয়ন্ত্রণ আপনার হাতে।

আমি আপনাকে রব হিসেবে গ্রহণ করেছি —
করুণাময়, স্নেহময়, মমতাময় রব হিসেবে।
আর নিজেকে জেনেছি আপনার এক দাস,
নম্র, বিনীত, অনুগত ও আজ্ঞাবহ দাস হিসেবে।
আপনার সামনে আমার গাল মাটিতে নত,
আমার নাক বিনম্রভাবে ধূলায় লুটিয়ে আছে।

হে আল্লাহ!
আমি আপনার দাসত্বের চেয়ে মধুর কিছু জানি না,
আমি এর পরিবর্তে কিছুই চাই না,
না কোনো বিকল্প, না অন্য কোনো স্থান।

হে আল্লাহ!
আমাকে আপনার দাসত্ব থেকে মুক্ত করবেন না,
আমাকে আপনার দরজা থেকে তাড়াবেন না।

হে আল্লাহ!
আপনার কাছ ছাড়া আমার কোনো আশ্রয় নেই,
আপনার কাছ ছাড়া আমার কোনো মুক্তি নেই —
আপনার থেকেই রক্ষা, কেবল আপনারই দিকে ফিরে।

হে আল্লাহ!
নিশ্চয়ই আপনি সর্বশ্রোতা, সর্বপ্রতিউত্তরদাতা।

——————–

ক্যাটাগরি : আত্মশুদ্ধি, আখলাক, ইসলামি চিন্তাধারা, প্রার্থনা।

✍️ মূল : ড. মুহাম্মদ আকরাম নাদভী, অক্সফোর্ড
✍️ অনুবাদ, যাচাই ও সম্পাদনা: মাওলানা মারজান আহমদ, সিলেট, বাংলাদেশ।

🔗 অনূদিত মূল প্রবন্ধের লিংক: 👇
https://t.me/DrAkramNadwi/7425

শেয়ার করুন:

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *