AkramNadwi

শিরোনাম : হে কায়েস! হে ফারহাদ! তোমরা কিছুই করনি!

শিরোনাম : হে কায়েস! হে ফারহাদ! তোমরা কিছুই করনি!
——————–

হে কায়েস ইবনে আমির! বনি তামীম তোমাকে অতিরিক্ত বড় করে দেখিয়েছে, তোমার প্রকৃত মর্যাদার সীমা ছাড়িয়ে তোমাকে গৌরব দিয়েছে। অথচ তুমি তো কেবল এমন এক তরুণ, যে প্রথম যে মেয়েটিকে দেখেছিল, তাকেই ভালোবেসেছিল, তারপর সেই ভালোবাসার ব্যথা সহ্য করতে না পেরে পাগল হয়ে গিয়েছিল। তোমার ধৈর্য ছিল না! তবু আরবরা তোমাকে অতিমানবীয় এক কাহিনিতে পরিণত করেছে—অথচ একজন ব্যর্থ, উন্মাদ যুবক কি আদৌ এত সম্মানের যোগ্য?

আর হে ফারহাদ! ফারসিরা তোমার গল্প নিয়ে অতি প্রশংসায় মেতে উঠেছে, অথচ তুমি কেবল শিরিন নামের এক মেয়ের প্রেমে পাগল এক মানুষ, যে তোমাকে বলেছিল, তার পাশে পাহাড় থেকে দুধের নদী প্রবাহিত করো। তুমি সেই নদী খননও করতে পারলে না—আর শেষ পর্যন্ত তোমারই কুদাল তোমার মাথায় পড়ে তোমার জীবন শেষ করে দিল। কী ভয়ানক অজ্ঞতা তোমার! আর কী অন্ধ মোহ ফারসিদের, যে তারা তোমাকে বানিয়েছে প্রতিটি বইয়ের শিরোনাম, প্রতিটি অধ্যায়ের সূচনা! এমন এক মূর্খ কি সত্যিই এত প্রশংসার যোগ্য?

হে কায়েস! হে ফারহাদ! শোনো, সচেতন হও—
তোমরা কিছুই করনি!
যদি তোমরা গাজার মানুষদের কাছ থেকে ভালোবাসা শিখতে, তবে জানতে—ভালোবাসা মানে ত্যাগ। মূল্যবান ও প্রিয়তম জিনিস উৎসর্গ করতে হয় মাতৃভূমির জন্য, মাটির জন্য, দেশের জন্য।

অভিশপ্তরা চেয়েছিল গাজার মানুষদের ধ্বংস করতে, তাদের বুদ্ধি কেড়ে নিতে, তাদের মনে হতাশা ও পরাজয়ের বিষ ঢেলে দিতে। কিন্তু তাদের সমস্ত ষড়যন্ত্র ব্যর্থ হয়েছে। আজ গাজার মানুষরা আবার জেগে উঠেছে—অটল, অবিচল, উঁচু হয়ে দাঁড়িয়ে। তারা প্রমাণ করছে—অটলতা ও আনুগত্য যে কোনো কিংবদন্তি বা কল্পকাহিনির চেয়েও মহান।

হে গাজা!
হে সাগর ও বালুর কন্যা!
হে ক্ষতের তীরে জন্মানো ফুল, যাকে আকাশ সেচেছে ধৈর্য ও বিশ্বাসের জলে!
আজ তোমাকে আমি দেখি, যেমন ইতিহাস একদিন তোমাকে দেখেছিল—ধ্বংসস্তূপের নিচে থেকেও দৃঢ়, হাস্যোজ্জ্বল, বিনাশ ও নিধনের দন্তবেষ্টনের মাঝেও উচ্চারণে অটল, যদিও তোমার কণ্ঠ স্তব্ধ করে দেওয়ার ষড়যন্ত্র হয়েছিল।

তোমার মানুষ তোমাকে দেখে তাদের ভালোবাসার চোখে—
তুমি তাদের প্রাণের চেয়েও প্রিয়, তুমি এক নক্ষত্র যে নিভে না, এমনকি ছাইয়ে ঢেকে গেলেও।
গাজার মানুষ তোমাকে এমন ভালোবাসে—যদি তাদের এই ভালোবাসা পৃথিবীর সব শহরে ভাগ করে দেওয়া হয়, তবুও সেই উষ্ণতা যথেষ্ট হবে পুরো পৃথিবীকে আলোকিত করতে।

তারা তোমাকে ভালোবাসে না তোমার উর্বর ভূমির জন্য, না তোমার আরামদায়ক জীবনের জন্য—
তারা তোমাকে ভালোবাসে কারণ তুমি মা—যে মায়ের বিকল্প নেই।
ক্ষুধা যতই তীব্র হোক, বিপদ যতই ভয়াবহ হোক, তারা তোমার মাটি চুম্বন করে যেমন মানুষ বৃদ্ধা মায়ের হাত চুম্বন করে। তারা তোমার পাথরকে বুকে জড়িয়ে ধরে যেন তা মৃত্যুর নিঃসঙ্গতায় তাদের সঙ্গ দেয়।

তাদের হত্যা করা হলেও তারা তোমাকে ত্যাগ করে না। বরং প্রতিবার যখন অবরোধ তাদের তাড়িয়ে দেয়, বা ধ্বংস তাদের ছড়িয়ে দেয়, তখন তারা ফিরে আসে তোমার কোলে—যেন তাদের হৃদয়ের ভেতর থেকে এক অদৃশ্য আহ্বান শোনা যায়:
“যে তোমার থেকে দূরে গেল, সে নিজেকে হারাল;
আর যে তোমার সঙ্গে রইল, সে মুক্তি পেল।”

তোমার দীর্ঘ রাত্রিতে, যখন ঘর ভেঙে পড়ে একের পর এক,
যখন আগুন নিভিয়ে দেয় জীবনের প্রদীপগুলো,
তখন দেখা যায়—গাজার মানুষ ধ্বংসস্তূপের নিচ থেকে উঠে আসছে যেন পৃথিবীর গর্ভ থেকেই জন্ম নিচ্ছে নতুন করে।
সে ধীরে ধীরে মৃত্যুর ধুলো ঝেড়ে বলে—
“আমরা এখানেই জন্মেছি, এখানেই মরব, এখানেই আবার জেগে উঠব।”

কি অনুপম এই প্রেম!
যে প্রেমকে নিভিয়ে দিতে পারে না রক্ত, ভয় দেখাতে পারে না কামান!
এ এক নীরব প্রেম—কিন্তু তার বাচনশক্তি হাজার ভাষণের চেয়েও গভীর।

আর কত সুন্দর গাজার চিত্র যখন শীতের বৃষ্টি নামে!
তখন তরুণরা তাকে দেখে না এক জখম দেশ হিসেবে, বরং এক নববধূ হিসেবে—
যে বৃষ্টির অশ্রুতে স্নান করে নবজীবন পেয়েছে।
বাতাস বইলে গাছগুলো দোলে, যেন তারা জীবনকে প্রশংসা করছে।
আর মেঘের ফাঁক দিয়ে পাখিরা ফিরে আসে গোপনে,
গেয়ে ওঠে প্রত্যাবর্তনের গান, এমন বাগানে যেগুলো এখনো স্বপ্নের ঘ্রাণে ভরা।

কী আশ্চর্য এই জাতি!
যারা কবরের ওপর ফুল রোপণ করে,
আর ধ্বংসস্তূপ থেকে আশা’র সিঁড়ি গড়ে তোলে।

আল্লাহ চেয়েছেন তোমার মানুষদের পরীক্ষা করতে—
ধৈর্য ও ঈমানের পরীক্ষায়।
তারা হার মানেনি, ভেঙে পড়েনি, বরং তোমার সঙ্গেই আরও দৃঢ়ভাবে জুড়ে গেছে।
তারা যেন তোমার মাটি থেকে শক্তি পায়, তোমার জলের মতো স্বচ্ছ হয়, তোমার ক্ষত থেকে জীবনের মানে শেখে।
তারা যখন তাদের শহিদ সন্তানদের বিদায় দেয়, তখন তারা মাথা উঁচু করে—
মৃত্যুতে গর্ব করতে নয়, বরং জীবনের সেই প্রতিশ্রুতিতে অবিচল থাকতে,
যে একদিন সূর্য উঠবে—ধোঁয়ামুক্ত, ভয়মুক্ত।

হে গাজা!
হে ইতিহাসের সেই কণ্ঠ, যে অত্যাচারের ওপরে উঠেছে!
হে স্বাধীনতার অবিচ্ছেদ্য ছন্দ,
হে আকাশের প্রদীপ, যখন দিগন্ত অন্ধকারে ঢাকে!

তুমি সেই মাতৃভূমি, যা বিক্রি হয় না,
তুমি সেই ঘর, যা ভুলে থাকা যায় না,
তুমি সেই স্বপ্ন, যা কখনো মলিন হয় না।

সাক্ষী থাকো, হে গাজা!
তোমার সন্তানরা প্রতিশ্রুতি রক্ষা করেছে, তারা বিশ্বাসঘাতকতা করেনি।
তুমি যতবারই ধ্বংস হও না কেন—
তুমি চিরকাল রয়ে যাবে হৃদয়ের গভীরে,
কারণ তোমার মধ্যেই আছে মাতৃভূমি, জীবন ও সেই অর্থ,
যা মৃত্যুকেও পরিণত করে অমরত্বের পথে।

——————–

ক্যাটাগরি : আত্মসমালোচনা, ইতিহাস, ইসলামি চিন্তাধারা।

✍️ মূল : ড. মুহাম্মদ আকরাম নাদভী, অক্সফোর্ড
✍️ অনুবাদ, যাচাই ও সম্পাদনা: মাওলানা মারজান আহমদ, সিলেট, বাংলাদেশ।

🔗 অনূদিত মূল প্রবন্ধের লিংক: 👇
https://t.me/DrAkramNadwi/7403

শেয়ার করুন:

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *