কুরআনুল কারিমে আসহাবে কাহফের কাহিনি বর্ণিত হয়েছে। এরা ছিল ঈমানদার কিছু তরুণ, যারা এমন এক সমাজে বাস করত, যেখানে মানুষ তাওহিদের থেকে বিমুখ ও বিরক্ত ছিল। তারা স্বার্থপরতা ও মূর্তিপূজায় নিমগ্ন, আর বুতপরস্তিতে উন্মত্ত ছিল। পুরো সমাজ তাদের শত্রুতে পরিণত হয়েছিল, এবং সে সময়ের রাজা তাদের উপর নির্যাতনে নেমে এসেছিল। নানা রকম নিপীড়ন-অত্যাচার চালিয়ে তাদের বাধ্য করতে চেয়েছিল যেন তারা আবার সেই বিদ্রোহ, কুফরি ও অবাধ্যতার ধর্মে ফিরে যায়।
কিন্তু এই তরুণরা তাদের ঈমান রক্ষার জন্য একটি গুহায় আশ্রয় নেয়। তারা নিজ দেশে থেকেও যেন পরবাসী হয়ে গেল, আপনজনের মাঝেও অচেনা হয়ে গেল। আল্লাহর পথে তারা কোনো ত্যাগে কার্পণ্য করেনি। তাদের ধর্মের প্রতি কী গভীর উদ্বেগ ও নিষ্ঠা ছিল, তা তাদের দোয়া ও দৃঢ় সংকল্প থেকেই প্রকাশ পায়। কুরআনের বাণীতে তাদের দোয়া এভাবে এসেছে—
“হে আমাদের প্রভু! তুমি আমাদের প্রতি তোমার পক্ষ থেকে রহমত দান করো, এবং আমাদের জন্য আমাদের এই বিষয়ে সঠিক পথনির্দেশ দাও।”
(সূরা কাহফ, আয়াত ১০)
এই দোয়ার প্রতিটি শব্দ তাদের প্রভুর সঙ্গে গভীর সম্পর্কের প্রতিচ্ছবি। এর বাহ্যিক ও অন্তর্নিহিত অর্থে ফুটে উঠেছে তাদের পূর্ণ নির্ভরতা, আল্লাহর উপর সম্পূর্ণ আস্থা। দোয়ার দুটি অংশই তা স্পষ্ট করে—
১. তারা আল্লাহর কাছ থেকে তাঁর রহমতের একটি অংশ প্রার্থনা করেছিল।
সাধারণত তরুণরা নিজেদের শক্তি, যোগ্যতা ও প্রতিভায় গর্ব করে। তারা মনে করে—আমরাই পারি, আমাদের পক্ষে কিছুই অসম্ভব নয়; আমরা ঢেউয়ের দিক ঘুরিয়ে দিতে পারি। কিন্তু এই পবিত্র তরুণরা নিজেদের সামর্থ্য বা কৃতিত্বের কোনো উল্লেখ করেনি। তারা বিনীতভাবে নিজেদের অসহায়ত্ব প্রকাশ করে আল্লাহর দিকে মুখ ফিরিয়েছে এবং তাঁর রহমতের একটি অংশ চেয়েছে।
২. তারা আল্লাহর কাছে সঠিক দিকনির্দেশনা চেয়েছে।
তাদের প্রার্থনা ছিল—যে প্রচেষ্টা তারা ঈমান রক্ষার জন্য করছে, তাতে যেন আল্লাহ তাদের সঠিক সিদ্ধান্ত ও সঠিক কৌশলের পথে চালিত করেন। এখানেও তারা নিজেদের বুদ্ধি বা পরিকল্পনার উপর নির্ভর করেনি; বরং আল্লাহর দিকনির্দেশনার জন্য নিজেদের চরম প্রয়োজনীয়তা ব্যক্ত করেছে।
এই দোয়ার পর তারা দৃঢ় অঙ্গীকারের ঘোষণা দেয়—
“যখন তারা উঠে দাঁড়াল, তখন বলল—আমাদের প্রভু আসমানসমূহ ও জমিনের প্রভু। আমরা কখনোই তাঁর পরিবর্তে অন্য কোনো উপাস্যের নাম নেব না। যদি নিই, তবে নিশ্চয়ই আমরা এক বড় অন্যায় ও ভ্রান্ত কথার অপরাধী হব। এ আমাদের জাতি, যারা তাঁর পরিবর্তে অন্য উপাস্য গ্রহণ করেছে, অথচ তারা কোনো স্পষ্ট প্রমাণ আনতে পারছে না। আল্লাহর উপর মিথ্যা আরোপ করার চেয়ে বড় জুলুম আর কী হতে পারে! তাই যখন তোমরা তাদের ও তাদের মিথ্যা দেবতাদের থেকে দূরে সরে গেলে, তখন গুহায় আশ্রয় নাও। তোমাদের প্রভু অবশ্যই তোমাদের উপর নিজের রহমত বিস্তার করবেন এবং তোমাদের প্রয়োজনীয় সব ব্যবস্থা করে দেবেন।”
(সূরা কাহফ, আয়াত ১৪–১৬)
তাদের এই অঙ্গীকারে কিছু বিষয় মৌলিক তাৎপর্য বহন করে—
১. তারা পূর্ণ অন্তর্দৃষ্টি দিয়ে তাদের প্রভুকে চিনেছিল।
যখন তারা তাঁকে চিনল, তাদের হৃদয়ে এক বিপ্লব ঘটে গেল। তাদের আকাঙ্ক্ষা বদলে গেল, শিরায়-উপশিরায় জমে থাকা শীতল রক্তে উত্তাপ এলো, হীনতা ও পাপবোধ দূর হয়ে গেল, আর তাদের হৃদয়ে জন্ম নিল পবিত্র চিন্তা ও আলোকিত উদ্যম।
২. তাদের দৃঢ় বিশ্বাস ছিল—রাজা বা শাসকের ক্ষমতা সীমিত।
তারা জানত—যাঁর উপর তারা ঈমান এনেছে, তিনি কেবল ওই রাজ্যের নয়, বরং সমগ্র আসমানসমূহ ও পৃথিবীর স্রষ্টা, মালিক ও পরিচালক। যে জমির সামান্য অংশে ওই রাজা শাসন করছে, সেটিও আল্লাহর সৃষ্টি।
৩. তাদের কাছে ঈমান এতই স্পষ্ট ও মজবুত ছিল যে, এর বিপরীত পথ তাদের নিকট সুস্পষ্ট ভ্রান্তি ও মিথ্যা মনে হতো।
৪. তারা নিশ্চিত জানত—তাদের জাতির কাছে তাদের শিরক ও কুফরির কোনো যুক্তি বা প্রমাণ নেই।
৫. তাদের ছিল অসাধারণ আস্থা তাদের প্রভুর প্রতি।
তারা বিশ্বাস করত—যদি তারা গুহায় আশ্রয় নেয়, তবে তাদের প্রভু তাদের উপর তাঁর রহমতের চাদর বিছিয়ে দেবেন, এবং তাদের সকল প্রয়োজনের ব্যবস্থা করবেন।
ماں باپ سے بھی سوا ہے شفقت تيرى
افزوں ہے ترے غصے سے رحمت تيرى
তোমার দয়া পিতামাতার স্নেহ থেকেও অধিক,
তোমার রহমত তোমার ক্রোধের চেয়েও প্রবল।
আসহাবে কাহফ তাদের দোয়ার মধ্যে কী বলেনি
১. তারা ঈমানের পথে পিতা-মাতা, আত্মীয়স্বজন, পরিবার ও মাতৃভূমি থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ার দুঃখের কোনো উল্লেখ করেনি।
ہر یک گل زحمتِ صد خار می باید کشید
(প্রতিটি ফুলের জন্য শত কাঁটার কষ্ট সহ্য করতে হয়।)
২. তাদের দোয়া ও সংকল্পে বাড়িঘর, সম্পদ বা জীবিকার ক্ষতির জন্য কোনো আফসোসের আভাস নেই।
৩. তারা কখনো ভাবেনি যে তাদের দুনিয়াবি ভবিষ্যৎ ধ্বংস হয়ে গেছে।
যদিও এ ভবিষ্যৎই প্রতিটি তরুণ ও তার পরিবারের কাছে সবচেয়ে প্রিয় বিষয়।
حاصلِ عمر نثارِ رہِ یارے کردم
شادم از زندگیِ خویش که کارے کردم
(আমি আমার জীবন প্রিয়জনের পথে উৎসর্গ করেছি,
জীবনের জন্য তৃপ্ত, কারণ আমি এক মহান কাজ করেছি।)
৪. তারা তাদের দুর্দশার জন্য জাতিকে দোষারোপ করেনি, রাগ প্রকাশ করেনি, কিংবা তাদের উপহাসও করেনি।
৫. তারা রাজা ও শাসক শ্রেণির প্রতি কোনো অভিশাপ দেয়নি,
এমনকি দেশবাসীর ধ্বংস কামনাও করেনি।
এইভাবেই আসহাবে কাহফের গল্প কেবল ইতিহাস নয়—এ এক অনন্ত শিক্ষা।
তারা আমাদের দেখিয়ে দিয়েছে, আল্লাহর পথে ঈমান ও আস্থাই হলো প্রকৃত আশ্রয়;
এ দুনিয়ার হারানো কিছুই হারানো নয়,
যদি প্রভুর রহমত তোমার সঙ্গে থাকে।
এই তরুণেরা জীবনের বিষাদ ও দুঃখকে তুচ্ছ করে চলে গেছেন—বরং দুঃখের সঙ্গেই সম্পর্ক গড়েছেন, আশঙ্কাকেই করেছেন বন্ধু। তাদের কাছে এমন এক সম্পদ আছে, যার উপস্থিতিতে তারা কোনো বেদনারই অনুভব করেন না। এই তরুণদের দৃষ্টিতে ঈমানের সম্পদের চেয়ে বড় আর কোনো সম্পদ নেই। যদি এই সম্পদ তাদের হাতে থাকে, আর তারা যদি কখনো এটিকে ত্যাগ করতে বাধ্য না হন, তবে তাদের আর কিছু নিয়ে কোনো চিন্তা নেই।
তাদের দৃঢ় বিশ্বাস—তাদের রবই মহিমা ও ক্ষমতার অধিপতি। জ্ঞান ও প্রজ্ঞা তাঁর মহত্ত্বের সামনে স্তব্ধ। এই সমগ্র পৃথিবী তাদের প্রতিপালকের আদেশেরই অনুগত। তাই মিথ্যা শাসকদের প্রতি তাদের না কোনো হিংসা আছে, না তাদের দুনিয়া কেড়ে নেওয়ার কোনো ইচ্ছা বা ষড়যন্ত্র। যদি তাদের রব তাদের সঙ্গে থাকেন, তবে তাদের কোনো ভয় নেই। তারা সমস্ত সুখ ভুলে গেছে, তাদের হৃদয় থেকে মুছে গেছে সব বেদনা—
“যদি তাঁর কৃপা আমার সঙ্গী হয়, তবে দুঃখ নেই;
মরুপ্রান্তের বুকে মাতৃকোলের চেয়ে কম আশ্রয়ও নেই।”
আসহাবে কাহফের ঈমান, দোয়া ও দৃঢ় সংকল্পের প্রতিদান তাদের রব এমন বিস্ময়করভাবে দিয়েছেন যে, তা মানববুদ্ধিকে অবাক করে দেয়।
এখন আসুন, আমরা সেই ঈমানদার তরুণদের সঙ্গে নিজেদের তুলনা করি। আমাদের মধ্যে নেই সেই ঈমানের প্রতি ভালোবাসা, যা তাদের কাছে ছিল সবচেয়ে প্রিয়। আমাদের চিন্তা শুধু সেইসব বিষয়ে, যেগুলো তারা ঈমানের পথে সহজেই বিসর্জন দিয়েছিল এবং পরে যেগুলোর নামও উচ্চারণ করতে তারা রাজি হয়নি। আমাদের দোয়ায় আল্লাহর রহমত চাওয়ার অনুরোধ খুবই কম, বরং আমাদের বেশিরভাগ প্রার্থনা জাগতিক সম্পদ ও সুবিধা অর্জনের জন্য। তারও বেশি, আমাদের দোয়া ভরা থাকে শত্রুদের অভিশাপ ও ধ্বংস কামনায়।
আমাদের মধ্যে না আছে আল্লাহর পথে স্থির থাকার কোনো সংকল্প, না আছে তাঁর রহমত ও পরিকল্পনার ওপর ভরসা ও আস্থা। তবুও আমরা আল্লাহর সাহায্য কামনা করি! আহা, যদি আমরা বুঝতে পারতাম যে এই কামনা আল্লাহর নির্ধারিত নিয়মের পরিপন্থী!
আল্লাহর সাহায্যের নিয়ম তো কিতাবুল্লাহে স্পষ্টভাবে বর্ণিত:
“তোমরা যদি আল্লাহকে সাহায্য করো, আল্লাহ তোমাদের সাহায্য করবেন।”
“তোমরাই শ্রেষ্ঠ, যদি তোমরা মুমিন হও।”
“আল্লাহ লিখে রেখেছেন, আমি ও আমার রাসূলগণই বিজয়ী হব।”
“আর যদি তোমরা মুখ ফিরিয়ে নাও, তবে আল্লাহ তোমাদের পরিবর্তে অন্য জাতিকে এনে দেবেন।”
——————–
ক্যাটাগরি : তাফসির, আখলাক, আত্মশুদ্ধি।
— মূল : ড. মুহাম্মদ আকরাম নাদভী, অক্সফোর্ড
অনুবাদ, যাচাই ও সম্পাদনা: মাওলানা মারজান আহমদ, সিলেট, বাংলাদেশ।
— অনূদিত মূল প্রবন্ধের লিংক:
https://t.me/DrAkramNadwi/7354